লকডাউনে বাদাবনের বাঘ

নিরঞ্জন মণ্ডল

নরেন বিদেশ-বিভুইয়ে এমন বিপদে পড়তে হবে কোন দিন ভাবতে পারিনি। সুন্দরবন এলাকা থেকে বউ-ছেলে নিয়ে তামিলনাড়ুতে কাজ করতে এসেছে। গেঞ্জিরখানায় ওরা দু’জনে কাজ পেয়েছে। সপ্তায় সপ্তায় মালিক টাকা দেয়। মালিকের দেওয়া ছোটঘরে থাকে। সরকার হঠাৎ করে গাড়ি ঘোড়া বন্ধ করে লকডাউন ঘোষনা করেছে। খবর এসেছে করোনাভাইরাস মারাত্মক ছোয়াছে রোগ। দিল্লি, বোম্বাই, কলকতা সব জায়গায় এ রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। সরকার থেকে কলকারখানা, অফিস-কাছারি, গাড়ি-ট্রেন সব বন্ধ করেছে। নরেন শুনেছে এই রোগটা নাকি চিন থেকে বিলেত আমেরিকা হয়ে এদেশের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। হরেন ওদের গ্রামের নিতাইকে ফোন করে। নিতাই চেন্নাইতে কাজ করে, ওকে সব খবরাখবর দেয়।

আরও পড়ুন: মনোহর আইচ: পান্তা ভাতের জল, তিন জোয়ানের বল

লকডাউনের আজ এক সপ্তাহ হল। নরেনের মালিক আর মাইনে দিতে পারছে না। বিনা ভাড়ায় ঘরে আর থাকতে দিতে চাইছে না। নিতাই ফোন করে বলে, ‘‘নরেন আজ বেরিয়ে পড়, না হলি ঝামেলায় পড়বি। আমাগো ওদিকির লোকজন সকুলি বারিয়ে পুড়েছ। তুগো সঙ্গে চেন্নাইতে দেখা হবে।’’ নরেন বউ-ছেলে নিয়ে পিকআপ ভ্যানে চেন্নাইতে এসে নিতাইদের সঙ্গে দেখা করে। এবার ওরা একসঙ্গে রেল লাইন ধরে হাঁটতে থাকে। নরেনের বাড়ি সুন্দরবনের সাতজেলিয়ার কাঁকমারি গ্রামে গাঁড়াল নদীর ধারে। মা নেই, বাবা গতবছর জঙ্গলে মধু ভাঙতে বাঘের কবলে পড়েছিল। ক’বছর আগে আয়লার প্রবল ঝড় আর জলোচ্ছ্বাসে নদীবাঁধ ভেঙে নোনা জলে ঘর বাড়ি সব ভেসে গিয়েছিল। সেই ধাক্কা আজও ওরা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। মাটিতে নুনের ভাগ বেড়ে যাওয়ায় ধান আর ভালো হয় না। গরমের সময় জমিতে আগে লঙ্কা তরমুজ, কুমড়োর চাষ হত। এখন নোনতা মাটিতে ওসবের আর চাষ হয় না। নরেন নিতাইদের তাই কাজের খোঁজে বাইরে বেরোতে হয়। এভাবে সুন্দরবনের অভাবী মানুষ দিল্লি, চেন্নাই, মুম্বই সব জায়গায় কাজের সন্ধানে যেতে হচ্ছে।         

পথ আর ফুরাতে চায় না। দু’দিন হয়ে গেল। নরেনের বউ সবিতা বলে, ‘‘আর কত হাঁটতি হবে? পায়ের জুতোটাও তো ছিঁড়ে গেল। পায় ঠোলা কাইটে উঠতেছ, এর পর রক্ত বারাবে। ছাবালটা তো আর হাঁটতি পারতেছ না, আট বছরের ছাবাল তুমি আর কত সময় কোলে করে হাঁটবে?’’

ওদের সঙ্গী নিতাই বলে, ‘‘আমার চাকা লাগানো ব্যাগের উপর তোমার ছাইলেডা বসাও, তোমার ভারী ব্যাগটা আমারে দেও, তুমি ছাইলের নে ব্যাগটা টেনে টেনে আগিয়ে যাও।’’ ট্রেন লাইন ও পাশের রাস্তা দিয়ে শয়ে শয়ে হাজারে হাজারে পরিযায়ী শ্রমিক হেঁটে চলেছে। খবর এসেছে, মালগাড়ির ধাক্কায় বেশ কয়েকজন শ্রমিক মারা গেছে। চারিদিকে একটা আতঙ্কের পরিবেশ। ছেলেটা আর বাক্সের উপর বসতে পারছে না। নরেন এবার ছেলে ঘাড়ে তুলে হাঁটতে থাকে।

ওদের টাকাও ফুরিয়ে আসছে। রাস্তার পাশের দোকানে রুটি তরকারি আধপেটা খাইয়ে ওদের পথ চলতে হচ্ছে। তৃতীয় দিনে হাওড়ায় পৌঁছে পরদিন অনেক কষ্টে গদখালির খেয়াঘাটে পৌঁছে দেখে লকডাউনে খেয়া বন্ধ। মাঝিকে হাতে পায়ে ধরে ওরা অতি কষ্টে বাড়ি পৌঁছয়। করোনার সংক্রামণের ভয়ে ওদেরকে বেশ ক’দিন স্কুলবাড়িতে থাকতে হয়।

নরেন ভেবেছিল গ্রামে এসে কাজ পাবে, কারণ চলে আসার সময় লকডাউনের জন্য কারখানার মালিক টাকা দিতে পারেনি। মাঠে এবার গরমের চাষ হয়নি। লকডাউনে অন্য কাজও বন্ধ। নরেন আর ভাবতে পারছে না, দোকানে ধার-কর্জ করে কতদিন চলবে। এর মধ্যে আর এক বিপদ এসে হাজির হয়। ক’দিন ধরে আকাশটা মেঘলা। উল্টো-পাল্টা হাওয়া দিচ্ছে। আজ সকালে নিতাই ও পঞ্চায়েতের লোক এসেছিল।

ওরা বলল, ‘‘খবর হুয়েছ, সাগরে ‘আমফান’ নামের ঝড় আসছে, আমাগ এলাকায় খুব ক্ষতি হবে। তোমাগ সকুলির এক্ষুনি ফ্লাডসেন্টারে যাতি হবে।’’ নরেন এ এলাকার ঝড়ের গতিপ্রকৃতি জানে।

ওর বউ সবিতা বলে— ‘‘দ্যাবতার গতিক ভালো না, সারাদিন আকলা মেঘলা কুরতেছ, হাবা ও জোরে জোরে হচ্ছে। আয়লার মতন নোনাজলে টেপা মাছের মতন ভাসতি না হয়। চল, তাড়াতাড় ওদিকি টাইনে গে উঠি।’’

আরও পড়ুন: ‘পকেট হারকিউলিস’ হার মেনেছিলেন

নিতাইয়ের সঙ্গে ওরাও পরিবারের সবাইকে নিয়ে ফ্লাডসেন্টারে চলে আসে। দুপুরের পরের থেকে ঝড়ের তেজ আরও বাড়তে থাকে। গাঙে ভাটা লেগে আবার জোয়ার আসে। জড়ের তাণ্ডবে নদীবাঁধ ভাঙে, নোনাজলে, বাড়িঘর ভেঙে সব একাকার হয়ে গেল। নরেনের বসবাসের খোড়ো দোচালা ঘর ও উলটে গেল। নরেন ভাবতেই পারিনি একটা বিপদ থেকে আর একটা চরম বিপদের মধ্যে পড়তে হবে। ঝড়ের পরে সরকারি ও বাহিরের লোকজনের সাহায্যে কাপড়-চোপড় শুকনো খাবার ত্রিপল, ওষুধপত্র এসব ওরা পেয়েছিল। থাকার ঘরটা অনেক কষ্টে খাড়া করে ত্রিপল দিয়ে ঢাকতে   পেরেছিল। সরকারি রেশনে আর কতদিন চলে? জঙ্গলে মধু ভাঙার সময়ও এসে গেল। তবু লকডাউনে বনের পাশ বন্ধ। বনে যাবার হুকুম নেই। এত বিপদের মধ্যে পেটের ভাতের জোগাড় কীভাবে হবে নরেন ভেবে পায় না। নিতাইয়েরও একই অবস্থা। আজ বিকেলে নরেন গাড়াল গাঙের জেটিঘাটে নিতাই আর পুবপাড়ার হারানকে ডেকেছিল।

নরেন বলে, ‘‘আর কতদিন উপোষ-কাপোষে এরাম কুরে মরব? কাঁকড়ার ভালো দাম আছে, চল বেপাশে কদিনির জন্নি বাদায় কাঁকড়া মারতি যাই।’’      

‘‘নরেনদা, বাদার ভাবগতিক তো ভালো না। মাল খুব গরম। লকডাউনির মধ্যি গত মাসে কাঁকড়া মারতি, আর মধু কাটতি গে মোল্লাখালি, সাতজেলের চরঘেরি, কুমিরমারির মিদ্দেরগো ঘিরি, আর বালির মোট পাঁচজন বনে পুড়েছ। লকডাউনি বনে বোধ হয় হরিণ শোর কুমে যাছে, এজন্নি বড়মিঞা মানুষ ধরতেছ। আবার খবর আসটেছ, বাদায় নামার সবিল দেচ্ছে না, তার আগে নৌকেরতে নাকি লোক ধুরে নেচ্ছে, আবার কোন জাগায় মুণ্ডুটা বড়শেয়াল নে যাচ্ছে, দলের লোকেরা বনকরার ধড় নে বাড়ি আসটি হচ্ছে। এবার তোমরা কী করবা, ঠিক কর।’’

নিতাইয়ের কথায় হারান উত্তর দেয়, ‘‘বনের কামাই আনতি গিলি বড়মিঞার ভয় করলি চলবে? প্যাটে দু’টো দে জানটা তো বাঁচাতি হবে। খটিদার বাবুলাল টাকা দাদনদে কাঁকড়া মারতি যাবার কথা বুলে লোক পাঠিয়েছে। অনিল বাছাড় নৌকোনে আমাগ সঙ্গে যাবার কথা বুলেছে।’’

আবার নরেন বলে, ‘‘প্যাটে গামছা বাইধে আর ক’দিন থাকপো? চল মা বনবিবির নাম কুরে কাঁকড়া মারতি যাই আমাক সঙ্গে বাউলে গুনিননি, দয়ার মা বনবিবি আমাগো ভরসা।’’

সবাই নরেনের কথায় রাজি হয়। বাড়িতে আসলে সবিতা সব শুনে বলে, ‘‘বনে পড়া এত লোকের কথা সব জেনে শুনে তবু বাদায় যাবা? আমাগ কি রাস্তায় বসাবা?’ বউয়ের কথায় নরেন উত্তর খুঁজে পায় না। পরে বলে, ‘‘এই লকডাউনি কার কাছে হাত পাতব? কেরা আমাক দু’টো নুন ভাত জোগাবে? আমাক মত দুখি মানষির জেবনের কি দাম আছে?’’

আরও পড়ুন: প্রকৃতি ও পরিবেশে ভারসাম্য রক্ষার আহ্বান

আজ সকাল থেকে রোদের তেজটা বেশি, মেঘশূন্য আকাশ, গাঁড়াল গাঙের ওপারে ঘন সবুজ বাদাবন। সারা পৃথিবী জুড়ে মারণ করোনা ভাইরাসের কালো ছায়া, তবু আদিগন্ত এই প্রকৃতির রাজ্যে কোথাও তার চিহ্ন চোখে পড়ে না। আজ কৃষ্ণা    দ্বাদশীর ভরা জোয়ারে জল গাংভেড়ির গোড়ায় এসে গেছে। অনিল বাছাড়ের নৌকা ঘাটে লাগানো হয়েছে। নরেন, নিতাই, হারান, আনিল সবাই নৌকায় উঠেছে। নৌকোর গলুই মাথায় সিঁদুর মাখিয়ে লাল কাঁচা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। প্রদীপ জ্বালিয়ে ধূপ ধরিয়ে মা বনবিবির নামে হাজোত দেওয়া হয়েছে। কাঁকড়া ধরার দোনে আজ্জে মাছের চার বেঁধে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। দু-ফুট বাঁশের কঞ্চির মাথায় সরু দড়িতে চার বেঁধে কাঁকড়া ধরার থোপা, সব সাজিয়ে নৌকোয় রাখা আছে। নরেন অনিলকে বলে, ‘‘মাঝি, ভাটি লাগলি নৌকো ছাড়তি হবে। আমরা বাঘনার কাছে ঝিলের জঙ্গলের  চিলমারির খালের দিকি যাব।’’

গাংভেড়ির ধারে নরেন নিমাই নিতাইয়ের বউরা সব ভিড় করে। নিতাইয়ের বউ সবিতাকে বলে, ‘‘এই লকডাউনি বাদায় খুব লোক পুড়তেছ, হরেন বউ ওর ফোনে বনে লোক পড়া ছবি দেখিয়েছে। মোল্লাখালির রবিরামের লাশ বনেরতে নে আইসে কলাবাগানে পুড়িয়ে দেছে। ওরা বেপাশে বনে গেল। জানাজানি হলি বন  অফিসির লোকেরা কেস দ্যাবে, এজন্নি ওরামাভায় লাশ পুড়িয়েছে। সব লোক বলা বলি কুরতেছ,  বড়শেয়াল বনে আর নাবতি দেচ্ছে না, নৌকেরতে বনের লোক ধুরে নেচ্ছে।’’

সবিতার এসব খবর শুনে, চোখের জল গড়িয়ে পড়ে, আর বলে,  ‘‘প্যাটের জ্বালায় তো যাতি হচ্ছে। আমাক মা বনবিবি ভরসা। মায়ের দয়া হলি বাঁইচে ফিরে আসপে। না হলি কপালে যা থাকে তাই হবে।’’

ভাটার টান বেড়ে যায়। নরেনের মাঝি অনিল নৌকা ছেড়ে দেয়। কোটালের স্রোতের প্রবল টানে নৌকা এগিয়ে যায়। পেটের টানে সুন্দরবনের এসব দলিত অবহেলিত জেলে মৌলে কাঁকড়ামারারা করোনার মারণ সন্ত্রাসের চেয়ে আরও ভয়ংকর এক  বিপদের দিকে এগিয়ে যায়।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *