বদ্যিনাথের সংসার: মতি নন্দীর একটি অগ্রন্থিত গল্প

পারমিতা রায়

নব্বই অতিক্রম করছেন মতি নন্দী, শতরানের দিকে এগিয়ে চলেছেন। এমন দিনে মতি নন্দীর একটি গল্পের কথা আলোচনা করা যেতেই পারে। গল্পটি পড়েছিলাম ‘পরিচয়’ পত্রিকায়। মতি নন্দীর ছোটগল্পগুলির উৎস, সময় এইসব জানবার উদ্দেশ‍্যেই ‘পরিচয়’-এর সংখ‍্যাগুলো দেখাদেখি চলছিল। তখনই ‘বদ‍্যিনাথের সংসার’ চোখে পড়ে। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, অচেনা লাগছে কেন? এই গল্পটা কি আমি আগে পড়িনি? কেন? একটু বিভ্রান্ত হয়েই তখনকার মতো সংখ‍্যাটি রেখে দিয়েছিলাম লাইব্রেরির র‍্যাকে, নির্দিষ্ট জায়গায় । বাড়ি ফিরেও মতি নন্দীর কোনও গল্প সংকলনেই গল্পটি কিন্তু খুঁজে পেলাম না। তাঁর মৃত‍্যুর পরে প্রকাশিত ‘ছোটগল্প সমগ্র’ (২০১২)-তেও পেলাম না। অগত্যা গল্পটি টুকতেই হল। আঁকতে না জানলেও অলংকরণের একটা স্কেচ অপটু হাতে খাতায় কপি করে রাখলাম। অতিসম্প্রতি মতি নন্দীর সৃষ্টি নিয়ে যে নতুন গ্রন্থ ‘হারানো মতি’ (২০২১) প্রকাশিত হল। তার সূচিপত্রেও গল্পটিকে খুঁজে না পাওয়ায় আজ মতি নন্দীর জন্মদিনে গল্পটি নিয়ে দু’চার কথা বলার তাগিদ অনুভব করলাম। মতি নন্দী বড় তাড়াতাড়ি ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেলেন। নাহলে তাঁর কাছ থেকে জানবার চেষ্টা থাকত যে, তাঁর জীবদ্দশায় কোনও গল্প সংকলনেই এইরকম একটা গল্প ঠাঁই পেল না কেন? কেনই বা ‘ছাদ’ এবং কয়েকটি উপন্যাসকেও গ্রন্থিত করা সম্ভব  হয়নি? কিছু ক্ষেত্রে উনি চাননি বলেই হয়নি, তবে না চাওয়ার প্রকৃত কারণ এখন আর জানা সম্ভব নয়। যদিও তাঁর মৃত‍্যুর পর ‘ছাদ’ অবশেষে ‘ছোটগল্প সমগ্র’-এ এখন সসম্মানে অধিষ্ঠিত হয়েছে। প্রসঙ্গত, একটা কথা জানিয়ে রাখা জরুরি― মতি নন্দীর বন্ধু, বিশিষ্ট লেখক এবং অনুবাদক সদ্যপ্রয়াত এণাক্ষী চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘মতির কথা’ লেখাটিতে যে গল্প সংকলনের উল্লেখ করেছেন, সেটি আমি দেখিনি। এণাক্ষী চট্টোপাধ্যায় লিখছেন, “মতির প্রথম প্রকাশিত বই একটি মিনি বই। বার হয় ১৩৭৬ সালে, অর্থাৎ ইংরেজি ১৯৭০। নাম মতি নন্দীর গল্প। বার করেন চালচিত্র প্রকাশন। বইটি মতি আমাকে উৎসর্গ করে।” ‘প্রথম প্রকাশিত বই’ অর্থে ধরে নিচ্ছি, তিনি প্রথম গল্প সংকলনকে বোঝাতে চেয়েছেন। কারণ ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান’ কিংবা ‘ক্রিকেট রেকর্ডস’ আর ‘ক্রিকেটের আইন কানুন’ তো ইতিমধ‍্যেই বই হয়ে বেরিয়ে গেছে। যাই হোক, এই সংকলনটি খুঁজে পাইনি। কাজেই এই সংকলনের মধ্যে ১৯৬০-এ প্রকাশিত ‘বদ‍্যিনাথের সংসার’ কি ছিল? থাকলে নিশ্চয়ই ‘ছোটগল্প সমগ্র’-তে স্থান পেত। এই বিবেচনা থেকেই ‘অগ্রন্থিত’ শব্দটি ব্যবহার করছি।

আরও পড়ুন: বাংলাভাষাকে সঙ্গে নিয়ে হিল্লিদিল্লি

ছবি ঋণ: banglalive.com

‘পরিচয়’ পত্রিকার ১৩৬৭-র ভাদ্র-আশ্বিন সংখ‍্যায় ‘বদ‍্যিনাথের সংসার’ গল্পটি প্রকাশিত হয়। এটি শারদীয় সংখ‍্যাও বটে। ১৯৫৬-র ১৫ ডিসেম্বর ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘ছাদ’ গল্পটি প্রকাশিত হওয়ার পর পরই মতি নন্দীর ‘পরিচয়’ পর্ব শুরু হয়ে যায়। ‘চোরা ঢেউ’, ‘বেহুলার ভেলা’, ‘টুপু কখন আসবে’, ‘উৎসবের ছায়ায়’, ‘অপেক্ষা’, ‘তাপের শীর্ষে’র মতো একের পর এক গল্প প্রকাশিত হতে থাকে ‘পরিচয়’-এ। পাশাপাশি চলে গ্রন্থ সমালোচনার কাজ। তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘নক্ষত্রের রাত’-এর সমালোচনাও ‘পরিচয়’-এর পাতায় দেখতে পাওয়া যায়। সরোজ বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় করেছিলেন। ‘পরিচয়’-এর এই পরিচিত আবহেই প্রকাশিত হল ‘বদ‍্যিনাথের সংসার’। গল্পটি শুরু হচ্ছে এইভাবে: “তিনমাস ধরে সকলে জানে দুর্গাবতী আর বাঁচবে না। দুর্গাবতীর দুই ছেলে, ছেলে-বৌ, এক বিবাহিতা মেয়ে আর স্বামী বদ‍্যিনাথ বর্তমান। গত দুবছর যাবৎ একটু একটু করে সে অথর্ব হয়ে পড়ছিল। গত পুজোর পরেই সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পড়ে যায়। কিছুদিন ভুগে খাড়া হয়ে ওঠে।আবার পড়ে কলতলায়, সেই থেকে শয্যাশায়ী। এর ওপর আছে শরীরের নানান রোগ। কোবরেজমশাই পাড়ার লোকের কাছ থেকে দর্শনী নেন না, তাকে আনা হয়েছিল, বলে গেছেন, এই শেষশয‍্যা।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)

‘সাদা খাম’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পাচ্ছেন মতি নন্দী। ১৯৯৩। ছবি ঋণ: banglalive.com

বদ‍্যিনাথ ফিরছে কোবরেজখানা থেকে।” ফিরছে সকাল সকালই। তার এই ফেরা থেকেই বলা যায় গল্পের আসল শুরু। আগের অংশটি ভনিতা। এইবার এক সকাল থেকে পরের দিন সকাল পর্যন্ত এই গল্প চলবে। এই চব্বিশ ঘণ্টার একমুহূর্তও মনে হবে না অতিরিক্ত কোনও কথা বলা হল। এত নির্মেদ মতির গদ‍্য। কী ঘটবে পাঠক জানেন, কেমন করে ঘটবে তাও আন্দাজ করা শক্ত নয়, তবু টানটান উত্তেজনা এবং বৈচিত্র্য রচিত হয় এ গল্পের পরতে পরতে।

আরও পড়ুন: সাহিত্যের ইয়ারবুক (ঠিকানাপঞ্জি): বাংলা সাহিত্য-প্রেমীদের এক মূল্যবান সম্পদ

ছবি ঋণ: banglalive.com

প্রথম অংশটিকে ভনিতা বা মুখবন্ধ বলে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে চাওয়ার কারণ মতি নন্দীর ছোটগল্পে এইরকম উপক্রমিকা দেখা যায় না। তাঁর লেখা ছোটগল্পে শুরু থেকেই একটা ‘অ্যাকশন’ থাকে, সংলাপ থাকে। ‘বদ‍্যিনাথ ফিরছে কোবরেজখানা থেকে’— গল্পটির শুরু এইখান থেকে হলে বরং সেই ধারাটি বজায় থাকত। ‘বদ‍্যিনাথের সংসার’ এইদিক থেকে ব‍্যতিক্রমী। গল্পটিতে বদ‍্যিনাথেরই নিরঙ্কুশ প্রাধান্য। তার চিন্তা, তার ভাবনাই গল্পকে এগিয়ে  নিয়ে গেছে। কিন্তু কাহিনির শেষে এমন একটি মোচড় আসে, যার ফলে বদ‍্যিনাথের সঙ্গে সঙ্গেই পাঠকেরও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, বদ‍্যিনাথের হাত থেকে সংসারের রাশ ধীরে ধীরে মেজো ছেলে বঙ্কুবিহারীর হাতে চলে যাচ্ছে আর এই জায়গাটাতেই অনুচ্চারিত ব‍্যথার প্রদীপ জ্বলে ওঠে বদ‍্যিনাথের হৃদয়মাঝে। স্ত্রীর মৃত‍্যু আর ছেলের কর্তৃত্ব একটা জায়গায় মিশে গল্পটিকে একটা আলাদা উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

এছাড়া উত্তর কলকাতার অলিগলির যে মানুষজনের কথা তাঁর লেখায় উঠে আসে, এই গল্পেও তাদের দেখা যায়। পায়খানায় খেলার বল পড়েছে ‘নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান’র মতোই এ গল্পেও। বলা যায়, এই গল্প থেকে এই অসাধারণ এপিসোডটির সূচনা। বৃত্তান্তটি বলা যাক। দু’পাশের বাড়ির ছেলেরা ছাদে বল খেলছিল। বলটা এসে পড়ে উঠোনে। তারপর লাফাতে লাফাতে পায়খানায়। মেজোবউ এইমাত্র চতুর্থ কাপ চা শেষ করেছে। এখন একমিনিটও আর সবুর সইতে রাজি নয়। তাই চিৎকার চলে মেজ বউয়ের, “মায়েরা কি সব মরেছে? ছেলেদের শাসন করতে পারে না? এ কি খেলা রে বাপু, খেলতে হয় যা না গড়ের মাঠ তো রয়েছে, পরের অনিষ্ট করে খেলা কেন?”— মেজো বউমার এইসব কথাবার্তা তার শ্বশুরের পছন্দ তো হয়ইনি, মতি নন্দীও কিন্তু আর দেরি করেননি, পরের বছর থেকেই (১৯৬১) গড়ের মাঠের গল্প বলা (‘অমৃত’ পত্রিকায় ‘শূন‍্যে অন্তরীণ’) শুরু করে দিয়েছিলেন। ‘পরিচয়’-এর পর্বও শেষ হয়ে এলো। এবার তিনি হলেন ‘অমৃত’ পথের যাত্রী। তারপর তো তাঁর ‘আনন্দ’যাত্রা।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *