উত্তরবঙ্গের বনদুর্গা

নিবেদিতা ঘোষ রায়

এখানে প্রতিমা জলে পড়ার পরের সেই শিরশিরে বাতাসটা বইতে শুরু করেছে। দু’দিন আগেও কাঁচপোকা প্রজাপতি ঘন হয়ে ওড়াউড়ি করত। পাইনের গুঁড়িতে কটকটে রোদ গাছটাকে যেন চকচকে ফেস পাউডার মাখিয়ে দিয়ে যেত। আজ দেখো! ঠান্ডা রোদ অলস হয়ে শুয়ে আছে দোপাটি ঝোপে। কি বিবাগী! উদার হাওয়া বইছে। শঙ্করের তৃণভূমির দক্ষিণ-পশ্চিমে কাশফুলের গোছা দেখা যাচ্ছে অঢেল। শরতের উগ্র চড়চড়ে রোদে চিরকাল কাশ দেখেছি মাথায় নীল পরিষ্কার আকাশ নিয়ে স্কুল যাবার পথে দিল্লি রোডের ধারে ফুটে থাকত। মৌনী উদার ক্লান্ত ফ্যাকাসে রোদের আলোর মধ্যে কাশফুল কেমন বেমানান লাগছে। কাশফুল মানেই দামামা উন্মাদ কেনাকাটা রাস্তায় বাঁশ, নারকেল দড়ির গোছা, চন্দননগরের লাইটিং, চরম দুঃখীর মুখেও কেমন তেল চটচটে ভাব, পাড়ার মোড়ে ঝিমন্ত সুবু ঘোলা চোখে বিড়ি ধরায় ওর মুখেও এনার্জি ঘাম।

আরও পড়ুন: উৎসবের ঋতু, ঋতুর উৎসব

এখানে হাওয়া বিবাগী হয়ে গেছে, দূরে ঠুকঠাক করে প্যান্ডেলে মন্থর পেরেক ঠোকার আওয়াজ। সবে ত্রিপল ছাওয়া হয়েছে। দু’টো লোক চিন্তিতভাবে দড়ির গাটরির উপর বসে আছে। নিস্তব্ধ করুণ দু’টি কুকুর মমতাময় বিভ্রম নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। সবকিছুর ওপর একটা বৈরাগ্যের ধুলো। একটা ছোকরা ছেলে আপশোসে মাথা নাড়ল, “রেলের পরীক্ষাটা ভালো হল না চাকরিটা হলে আমায় আর কাজ করতে হত না!” রেল কোম্পানিতে কাজকর্ম করতে হয় না। একটা বুড়ো ফোকলা মুখে হতাশ হয়ে বলল, “সিধাইতে টোটোর ভাড়া হয় না। পুজোয় চার টাকা রেট বেশি উঠেছিল সেবার। এবার মিষ্টির দোকানে জিলিপি ভাজব ক’টা টাকা বেশি।” শরতের ছদ্মবেশে শীত আসলে এটা চোরা হেমন্ত। কীর্তন গাইতে এসেছে বুড়োর দেখি গোড়ালি ফেটে কালচে ছাল উঠছে। পশ্চিমের ঘরটায় বেলা দু’টোয় কালো হয়ে যায়। রাতে বাঁশের খাঁচায় বাতাস বেঁধে সোঁ-সোঁ শব্দ হয়। খুঁড়ুলে পেঁচা এসে বসে। পাটের গাটরি হাবিজাবি জিনিসের আড়ালে ইঁদুর নখ আঁচরায়। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বাঁশগুলো রোদে পোড়ে। প্যান্ডেলের কাপড়ে হলুদের দাগ, কালির ছোপরা, গাঢ় মেজেন্ডা রঙের কাপড় ধুলো ময়লায় একটু বেখাপ্পা বেগুনি দেখাচ্ছে, জায়গায় জায়গায় রং চটা। পাড়ার টোটোওয়ালা বলে এইখানে দেখবেন পুজো! সেই! সারারাত লোক! কচু ঝোপের ধারে এঁদো পানা পুকুরে অবেলায় স্নান করতে নেমে কি তার গর্ব ভরা হাসি! আমিও হাসি, হায়রে! পেঁচা আর ইঁদুর ভরা গুমসুনি গন্ধমাখা প্যান্ডেল, ছাতা পড়া পানসে প্যান্ডেলের কাপড়, কবে শেষ হবে ঠিক নেই ষষ্ঠীর দিনও হয়তো খুট-খুট করে পেরেক ঠুকবে। লেবু ফুলের ঝুরঝুরে ঝরে পড়া সজনে গাছের ছায়ায় ছায়ায় এই ছোট পাড়া। অকিঞ্চিৎকর সামান্য আয়োজন, এই আজীবন সে দেখে এসেছে। এই তার অনেক তার আশা ভরা চাহনি আর হাসির দিকে চেয়ে আমি আর কিছু বলি না।

বহুকাল আগে অষ্টমীর দিন রাতে দূরপাল্লার বাসে কোথায় যেন যাচ্ছিলাম অনেক রাতে দেখেছিলাম এক নির্জন জঙ্গলে জায়গায় ঘন নিঝুম বাঁশঝাড়ের পাশে প্যান্ডেলে একা প্রতিমা দাঁড়িয়ে আছে চার হাত মেলে। কেউ কোথাও নেই। ফ্যাকাসে টিউব জ্বলছে বাঁশের ডগায়। কতগুলো বাচ্চা চটের ওপর ঘুমোচ্ছে, ঢাকিও ঘুমোচ্ছে চিৎপাত, সব অন্ধকার খোদোল থেকে জোনাকিরা উড়ে যায় এসময়।

আরও পড়ুন: পাকিস্তান থেকে শরণার্থী হয়ে আসা বান্নু সমাজের হাতে শুরু হওয়া রাবণ দহন আজ রাঁচির ঐতিহ্য

কিচকিচ করে কী পাখি ডাকছে। কুম্ভটুয়াটা আজ কুলঝোপ থেকে বেরিয়েছে রোদ পোয়াতে। রোদ আর কই? বেলা পড়ে গেছে, ঘু ঘু ঘুট্, ঘু ঘু ঘুট্ কন্ঠি ঘুঘু ডাকছে। কুল ঝোপের ওপারে কাশবন। কাশবনের আরও দূরে জঙ্গল, জঙ্গলের মাথার ওপর পূর্ব দিকে আরও দূরে পাহাড়। চা বাগান থেকে লরি করে ঠাকুর দেখতে আসে, নেপালি মেয়েরা তাদের সোজা সিল্কের মতো ইস্তি করা চুল চওড়া পাড় তাঁতের শাড়ি পরে, লাল ঘন লিপস্টিকে কলকল করে ওঠে প্যান্ডেলে, মনে হয় যেন মহম্মদ আলি পার্ক না বাগবাজার? কোথায় আমি? ওটা আসলে বাসন্তী রং মায়া, গাঁদার কুচো পাপড়ির ছদ্মবেশে কলকাতা থেকে এসেছে। পাঁচশো সাতাত্তর কিলোমিটার দূরে কলকাতা। আধা গঞ্জ অচেনা শহরে বসে আমি তার আঁচ পাই না। আমি জঙ্গুলে দুর্গা দেখি।

দুর্গারই অন্য রূপ বনদুর্গা। দুর্গাপুজোর চেয়ে অনেক বেশি রোমাঞ্চ। বাড়ি থেকে নরেশ মোড়ের হাট ঘুরে ডাইনে গেলেই ফাড়াবাড়ি। পৌষ পূর্ণিমার হলুদ গোলা আলো লবণাক্ত পালকের মতো হাল্কা হয়ে বনের মাথায় গড়িয়ে নামে। সারারাত বনে পুজো হয়। গভীর বন। ট্রপিক্যাল ময়েস্ট ডেসিডুয়াস ফরেস্ট। উত্তরের তরাই ডুয়ার্সের বন, অসম থেকে আরম্ভ করে বাংলার মধ্যে দিয়ে ওদিকে ওড়িশা-মধ্যপ্রদেশ পর্যন্ত চলে গেছে এই বনাঞ্চলের শাখা। ফাড়াবাড়ি মোড় থেকে ডাইনে বাঁক নিয়ে গেছে বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গলের দিকে। উঁচু-নীচু এবড়ো-খেবড়ো পাথরময় রাস্তা। বনদপ্তর এক দিনের জন্য খুলে দিয়েছে, বনের দুয়ার। জলপাই রং ইউনিফর্ম পরে তারা চেয়ার পেতে বসে লোকের ভিড় দেখছে। অন্যদিন শিরীষ, গামার, বহেড়া, জারন, ডালমারা, শিশু গাছের তলায় অন্ধকার ঝোপে ঘন কাষ্ঠল লতা, কোটরে জমা ধুলো-বালির ভেতর কালচে সবুজ বাকলে বসে পেঁচা ডাকে। আজ সেখানে গিজগিজ লোক। দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে, টোটোতে ভ্যানে, ম্যাটাডোরে, টাটাসুমো প্রাইভেট গাড়িতে কেবল লোকের কালো মাথা। বিকেলের উদাসী আলোয় কণ্ঠী ঘুঘুর একটানা ডাক, শালিখ, ঝুট শালিখের কিচকিচ, দুর্গা টুনটুনি টি-ই-উ-ট শিষ, গেছো ব্যাঙের তিড়িং লাফে বনের নিজস্ব পর্দা পড়ে যায়, ছেঁড়া শাল সেগুনের পাতা উড়ে উড়ে বনের গভীরে চলে যায়। হাতির পাল বাঁশ ভাঙে। অরণ্যের মৌতাত ঢাকা পড়েছে পেট্রোল, ডিজেলের কড়া গন্ধে, ধক ধক করছে যান্ত্রিক হেড লাইট, সড়াৎ করে, শেয়াল খরগোশ বন পার হয়।

আরও পড়ুন: অতিমারির ভয়ংকরতার মধ্যেও পুজোর আনন্দ নতুন করে বেঁচে থাকার খোরাক

নেপালি বস্তি থেকে সার দিয়ে লোক আসছে, মোবাইলের টর্চ ফোকাস মারছে, গাছে গাছে। ধেড়ে ছেলেরা গাছের পেছন দিয়ে বনের খোঁদলে নেমে দল বল নিয়ে গাঁজা টানছে। জঙ্গলের ভেতর নদী ডাইনে বাঁক নিয়ে মিলিয়ে গেছে বনের গভীরে, বাঁয়ে বন পেরিয়ে ঢালু খোলা জমিতে মেলা বসেছে। গ্রামের ছেলেরা নদী পাড় করাচ্ছে, ভালোই ব্যবসা হচ্ছে। চাকা প্রতি দশ টাকা। শুধু হাঁটা পায়ের দাম লাগছে না। ভ্যান তিরিশ, টোটো চল্লিশ, টাটা সুমো চল্লিশ, সাইকেল কুড়ি। শীতের ছিপছিপে স্রোতে কাঠের তক্তা পাতা। তার ওপর দিয়ে চাকা যাচ্ছে। জিলিপি কচুরি, পানমশলা, মনিহারী, দোকান পাঠ। কোলকাতার মত রোল চাউমিন মেলে না। চাউমিন বলতে মোটা, হলদে, গরম জলে সেদ্ধ নেপালি থুকপা। বড় বড় বট অশত্থ শালের গায়ে টিউব জ্বলছে। প্যান্ডেলে দুর্গার মূর্তি। আরও গভীরে ঘাসের জঙ্গলে, হিম উত্তরের হাওয়া সাহু নদীর বালুচরে জল ঝরাচ্ছে। নিকষ কালো ডালপালার জ্যামিতিক আঁকিবুকির ওপারে অনন্ত আকাশ থেকে চোরকাঁটার মাঠে জটিল গোলক ধাঁধার মতো বিভ্রমে সন্ধ্যা নেমে আসে। সাধুদের আখরায় মোটা শাল গুঁড়ি জ্বলছে। হরেক রকমের সাধু জটা জুটো দাড়ি গোঁফের ঝুরি নামিয়ে বট বৃক্ষের মতো বসে আছে। পুজোর আয়োজন চলছে, ঢাকিরা সব মাথায় পাগড়ি বেঁধে বসে বিড়ি টানছে। আখড়ায় সাধুদের চেলারা কেউ খিচুড়ি রান্নার তোড়জোড় করছে, তো কেউ জিমন্যাস্টিক দেখাচ্ছে। এসব জঙ্গলে হাতির পাল রাতে টহল দেয়, ক্ষেতে ঢুকে শস্য তছনছ করে। তাই বনকর্মীরা পাহারায় আছে বন্দুক হাতে। চামসে গন্ধ তেলে ভাজা কটকটি আর পাঁপড় হাতে বাচ্চা চলেছে মহা-উৎসাহে। তবে আমোদ চুপসে যেতে এখানে সময় দেয় না। অন্ধকার পাহাড়ের মতো পাড়ার ভেতর চলে আসে হাতি। বাড়ির গেট দরজা টেনেটুনে দেখে, উঠোনের কলা গাছ শুঁড় দিয়ে উপরে, গুমটি পান বিড়ির দোকানের টিনের চাল বাক্সের ডালা খোলার মত খুলে কৌতূহলী নজর বুলিয়ে, হেলে দুলে ফিরে যায়। পুজো দেখে ফেরার পথে মধ্যরাতে অনেকেই জখম হয়েছে। ধানক্ষেতে চাঁদের রাতে কুয়াশায় সড়াৎ-সড়াৎ করে তাদের পাকা ধান টেনে খাওয়ার শব্দ শোনা যায়।

আরও পড়ুন: কুমারীপূজা: বাংলাদেশের দিনাজপুরের রামকৃষ্ণ মিশন ও আশ্রম

পুজোর দিন প্রশাসন, বন দপ্তর সতর্ক পাহারায় থাকে। দু-চারটে ক্ষয়াটে টিউব, টুনির মালায় অরণ্যের অভ্যস্থ আঁধার আছন্ন হয়ে চরের দিকে সরে যায়। এ মূর্তি একক, প্রকৃতি দেবী, বন শংকরী, আদিম। অসুর, সিংহ, সন্তান-সন্ততিহীন, পৌষের শীতার্ত নক্ষত্রমণ্ডলের নীচে আদিগন্ত বিস্তৃত অরণ্যের নীলচে অন্ধকার তার গাত্রবর্ণ, গজরাজের গাঢ় খসখসে চামড়ার মতো অমসৃণ বালিয়াড়ি চুল, গলায় বিদ্যুৎ বর্ণের ঝলসিত মালা, তার ত্রিনয়ন মহাবিশ্বের মতো গোলাকার। সেখান ঘূর্ণায়মান মহাকাশের জ্যোতিপুঞ্জ, খয়েরি বুটিদার চিতার ছালের আঁচল। পাহাড় নদী, চর, বালি, গাছ সব নিশ্চিহ্ন হয়ে, অসীম গ্যালাক্সিতে জ্বলজ্বল করছে অরণ্য প্রতিমা। এই নিশ্চুপ বিশালের প্রেক্ষাপটে, গুটিকতক মানুষের আলোকিত আনাগোনা, রাতজাগা উৎসব, নিঃস্বমুঠি হৃদয়ের একতারা ঝঙ্কার কেমন অলৌকিক অন্য জগতের মনে হয়।

ছবি ইন্টারনেট

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *