বঙ্গদেশে চ কালিকা

সুগত পাইন

‘ব্রহ্মযামলোক্ত’ প্রসিদ্ধ ‘আদ্যাস্তোত্রে’ ভারতবর্ষ ব্যাপী বিভিন্ন স্থানের স্থানিক দেবীদের একচ্ছত্র ছায়ায় আনবার একটি প্রয়াস লক্ষণীয়। সেখানে সেতুবন্ধের ‘রামেশ্বরী’, থেকে পুরুষোত্তমের ‘বিমলা’, ওড়িশার ‘বিরজা’ থেকে নীলপর্বতের ‘কামাখ্যার’ পাশে বঙ্গের ‘কালিকা’র নাম দৃষ্ট হয়। এই ব্রহ্ম নারদ সংবাদ থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে, বঙ্গদেশে দেবী কালিকা নামে বিখ্যাত। বঙ্গের ধর্মীয় জীবনস্মৃতি প্রদর্শিত ও প্রভাবিত হলেও তার কেন্দ্রভূমি তন্ত্রশাসিত। আর তন্ত্রোক্ত দশমহাবিদ্যার আদি বিদ্যা কালী। ‘কুব্জিকাতন্ত্রে’ স্বয়ং সদাশিব বলেছেন কালীর উপাসনাই কলির মোক্ষদানকারী— “কালিকা মোক্ষদা দেবী কলৌ শীঘ্র ফলপ্রদা।” আর ‘পিচ্ছিলাতন্ত্র’ আরও একধাপ অগ্রসর হয়ে বলেছেন, কালী ভিন্ন কলির দ্বিতীয় কোনও উপাস্য নেই— “কলৌ কালী কলৌ কালী নান্যদেবো কলৌ যুগে।”

আরও পড়ুন: ‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ’

কালীঘাটের কালী

‘পীঠনির্ণয়’ তন্ত্রের ঊনবিংশ সতীপীঠ হল ‘কালীপীঠ’। ‘পীঠাধীশ’ ও ‘পীঠনায়িকার’ বিবরণ এইরকম— “নকুলীশঃ কালীপীঠে দক্ষপদাঙ্গুলি চ মে/ সর্বসিদ্ধিকরী দেবী কালিকা তত্র দেবতা।।” ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের পীঠবর্ণনায় হবহু এর বঙ্গীয় অনুবাদ ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত— “কালীঘাটে চারিটি অঙ্গুলি ডানিপার/ নকুলেশ ভৈরব কালিকা দেবী তার।।” এখন সমস্যা তন্ত্রশাস্ত্রের ‘কালীপীঠ’ বাঙালি কবির লেখায় ‘কালীঘাট’ হল। কেন হল, তার কোনও যুক্তিসিদ্ধ প্রমাণ নেই। কলকাতার প্রসিদ্ধ বর্তমান কালীঘাট মন্দিরের দেবী কালিকা এবং পীঠভৈরব নকুলেশ পূজিত হন। তাই এই স্থানকেই তন্ত্রের কালীপীঠ হিসেবে ধরে নিতে হবে। অবশ্য অর্বাচীন ‘নিগমকল্প’-এর পীঠমালায় বর্তমান কালীঘাটকে একটি পরিচিতি দানের কৌশলী প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। সেখানে মহাদেবের মুখে উক্ত হয়েছে— “দক্ষিণেশ্বরমারভ্য যাবচ্চ বহুলাপুরী/ ধনুকাকার ক্ষেত্রঞ্চ যোজনদ্বয়সংখ্যকং।।” অর্থাৎ ভাগীরথীর পূর্বতীরে দক্ষিণেশ্বর থেকে বহুলাপুরী পর্যন্ত ধনুকাকার দুই যোজন ক্রোশব্যাপী এলাকা কালীক্ষেত্র। তন্মধ্যে এক ক্রোশ পরিমিত ত্রিকোণ ক্ষেত্রে দেবী বিরাজমানা। এই ত্রিকোণের এক কোণে ব্রহ্মা, আর এক কোণে বিষ্ণু এবং অবশিষ্ট কোণে মহাদেব অবস্থিত থাকায় এই ক্ষেত্র মহাতীর্থে পরিণত হয়েছে। কাশীক্ষেত্র এবং কালীক্ষেত্রের মধ্যে কোনও ভেদ নেই। এই স্থানে ভৈরবী, বগলা ইত্যাদি অষ্টশক্তি বিরাজমানা। সেই জন্য এই ক্ষেত্রে শুধু মানব নয় কীটপতঙ্গাদিও দেহত্যাগ করলে মুক্তিলাভ করবে। লক্ষণীয়, এখানেও স্থাননাম হিসেবে আমরা কালীঘাটকে পেলাম না। বরং ‘কালীক্ষেত্র’ বলে একটু নতুন নামের সাক্ষী হলাম। এবং যেভাবে এই তীর্থকে কাশীর সমতুল করে তুলবার প্রয়াস লক্ষ্য করা গেল তাতে ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের ব্যাসদেবের ‘দ্বিতীয় কাশী’ নির্মাণের প্রত্যক্ষ প্রভাব সুস্পষ্ট। মধ্যযুগীয় মঙ্গলকাব্যগুলির মধ্যে দু’টিতে কালীঘাটের কথা পাওয়া যায়। ষোড়শ শতকের প্রথমপাদে রচিত হয়েছিল কবিকঙ্কন মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্য। সেখানে কালীঘাটা স্থাননাম হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে— “ত্বরায় চলিল তরী তিলক না রয়/ চিৎপুর শালিখা এড়াইয়া যায়/ কলিকাতা এড়াইল অবসান বেলা/ বেতাই চণ্ডিকা পূজা কৈল সাবধানে/ কালীঘাটা এড়াইল বেনের নন্দন/ কালীঘাটে গিয়া ডিঙ্গি দিল দরশন।।” বেতাই চণ্ডীর উদ্দেশ্য পূজা দিলেও কালীঘাটে তাঁরা পূজা দিলেন না বটে, তবে ঘাটের নাম যেহেতু কালীঘাট তাই কালীর অবস্থান অস্বীকার করবার উপায় নেই। ভাগীরথী নদী ধরে ধনপতির শ্রীমন্তসহ সিংহল যাত্রার এই বিবরণ ১৬৬০ সালে অঙ্কিত ফান ডান ব্রোকের মানচিত্রের সঙ্গে মেলে না। সেসময় বেতেড়ের অবস্থান ছিল সরস্বতী ও আদিগঙ্গার সঙ্গমস্থলে। আর এটি ছিল সেসময়ের বিখ্যাত বন্দর সপ্তগ্রাম। এখান থেকেই সরস্বতীর একটি শাখা তমলুক হয়ে তাম্রলিপ্ত বন্দরে মিশেছিল। যা উপরোক্ত বর্ণনায় হিজলীর পথ নামে উল্লিখিত। তাই হিজলীর পথ পেরিয়ে বাণিজ্যতরীর কালীঘাটে উপনীত হওয়া অবাস্তব, অসম্ভব। দ্বিতীয় কথা ‘চণ্ডীমঙ্গল’-এর অন্য পুথিতে কালীঘাটের নাম নেই। এই প্রসঙ্গে সপ্তদশ শতকের ‘ভবিষ্য পুরাণ’-এর ব্রাহ্মখণ্ডের ২২তম অধ্যায়ের শ্লোকটি স্মরণীয়— “গোবিন্দপুর প্রান্তেচ কালী সুরধুনী তটে।” মনে রাখতে হবে এই পুরাণে বৈষ্ণব কুলতিলক শ্রীমন নিত্যানন্দ মহাপ্রভু ও রানি ভিক্টোরিয়া নামোল্লেখ আছে। এর অর্বাচীনত্ব এতখানি। সেখানেও কালীঘাট না বলে গোবিন্দপুরের উল্লেখ যথেষ্ট সন্দেহজনক। ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে, ১৬৮৬ নাগাদ গোবিন্দরাম মিত্র নামে জনৈক জমিদার গোবিন্দপুর গ্রাম পত্তন করেছিলেন এবং তাঁর নামেই গোবিন্দপুর গ্রামনাম। ১৭২০-১৭৫৩ খ্রিঃ পর্যন্ত এই গোবিন্দরাম ব্ল্যাক জমিদার পদে বর্তমান ছিলেন। তাই ‘চণ্ডীমঙ্গল’-এর আখ্যানকে প্রামাণ্য হিসেবে গ্রহণ করতে আমাদের অসুবিধা আছে। এটি পরবর্তীকালের কৌশলী প্রক্ষেপ বলেই মনে হয়। পঞ্চদশ শতকের শেষপাদে রচিত বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় এর ‘গঙ্গাভক্তি তরঙ্গিনী’তে কালীঘাট তীর্থ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত— “চলিল দক্ষিণ দেশে বালি ছাড়া অবশেষে/ উপনীত যথা কালীঘাট/ দেখেন অপূর্বস্থান পূজা হল বলিদান/ দ্বিজগণ করে চণ্ডীপাঠ।।”

আরও পড়ুন: ভূতেরা ফিরে আসে যে দিনগুলোয়

নলহাটির নলাটেশ্বরী

এই বিবরণ আবার কালীঘাটের প্রতিষ্ঠা বিষয়ক জনশ্রুতির বিপরীত। পরবর্তীতে  লালমোহন বিদ্যানিধির ‘ঘটককারিকা’র সম্বন্ধ নির্ণয় অংশে দেখতে পাই— “কালীঘাটে কালী হল সাবর্ণ সম্পত্তি/ হালদার পূজক এইত তার বৃত্তি।।” ইতিহাস অনুসারে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের ২৮তম পুরুষ  রাজীবলোচন রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করে দেবীর বর্তমান মন্দির নির্মাণ করেন ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে। ‘পীঠনির্ণয়ের’ চতুশ্চ ত্বারিংশৎ সতীপীঠ হল বীরভূমের নলহাটি— “নলহাট্যাং নলাপাতো যোগীশো ভৈরবস্তথা/ তত্র সা কালিকা দেবী সর্বসিদ্ধি প্রদায়িকা।।” স্থানীয়রা দেবীকে ‘নলাটেশ্বরী’ মতান্তরে ‘ললটেশ্বরী’ নামেই চেনেন। যদিও দেবীর শাস্ত্রোক্ত নাম ‘কালিকা’। জনৈক সাধক স্মরনাথ শর্মা উত্তরবাহিনী ব্রাহ্মণী নদীতটে স্বপ্নাদেশ অনুসারে দেবীর শিলামূর্তি খুঁজে পেয়েছিলেন। স্থানীয় রাজা উদয়নারায়ণ সাহা দেবীর সুবৃহৎ চারচালা মন্দির নির্মাণ করে দেন। মন্দিরের গঠনশৈলী দেখে একে সপ্তদশ শতাব্দীর স্থাপত্য বলেই সিদ্ধান্ত করতে হয়। এরপর পঞ্চত্বারিশৎ সতীপীঠ হিসেবে আর এক কালীঘাটের কথা উক্ত হয়েছে— “কালীঘাটে মুণ্ডপাতঃ ক্রোধীশো ভৈরব স্তথা/ দেবতা জয়দুর্গাস্যা নানাভোগ প্রদায়িণী।।” স্বভাবতই এই ‘কালীঘাট’ কলকাতার কালীঘাট নয়। দেবী এবং ভৈরবের নাম, দেবীর পতিত অঙ্গ কোনওটিই কলকাতার সঙ্গে মেলে না। তাহলে এ কোন কালীঘাট?  গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকায় এই পীঠের অবস্থান সম্পর্কে লেখা হয়েছে— “কালীঘাট: সতীর মুণ্ড পতিত হয়। দেবীর নাম জয়দুর্গা, ভৈরব ক্রোধীশ। কাটোয়া হইতে তিন মাইল ঈশান কোণে জুরনপুরে পীঠস্থান। কলিকাতা হইতে স্টিমার ভাড়া এক টাকা।” ‘শিবচরিতে’ও রয়েছে এই কালীঘাটের কথা। তবে সেখানে পীঠনায়িকা ও পীঠভৈরবের নাম পরিবর্তিত। দেব ও দেবী এখানে যথাক্রমে ‘চণ্ডেশ্বর’ এবং ‘চণ্ডেশ্বরী’ নামে খ্যাত। বর্তমানে আমরা নদীয়ার ভাগীরথী তীরে উদ্ধরণপুর মহাশ্মশানের সন্নিকটে বট, অশ্বত্থ, বেল, তমাল-বেষ্টিত জুড়ানপুরে ক্রোধীশ শিব মন্দিরের সাক্ষাৎ পাই। সেখানেই বটবৃক্ষমূলে একটি গোলাকার প্রস্তরখণ্ড দেবীর মস্তক জ্ঞানে পূজা পান। একটি অষ্টধাতুর জয়দুর্গা বিগ্রহও পূজিত হন। মাঘী পূর্ণিমায় দেবীর বার্ষিক পূজা হয়। নাটোরের রানি ভবানীর পোষ্যপুত্র সাধক রামকৃষ্ণ এখানে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। ‘বৃহন্নীলতন্ত্রে’ও রয়েছে এই কালীঘট্ট পীঠের কথা— “কালীঘট্টে মহাপীঠে কালী কলাত্মিকা তথা/ লিঙ্গাখ্যে ভৈরবী বিজ্য বিজয়া জাহ্নবীতটে।।”

আরও পড়ুন: সত্যি ভূতের গল্প ১

মালঞ্চের শ্যামাঠাকুরানি

এখানে অবশ্য দেবীকে কালী কলাত্মিকা নামে অভিহিত করা হয়েছে। অর্থাৎ সতীপীঠ হিসেবে পীঠাধিষ্ঠাত্রী কালিকা বা কালী বঙ্গদেশের তিনটি স্থানে রয়েছেন। কলকাতার কালীঘাট, বীরভূমের নলহাটি এবং নদিয়ার কালীগঞ্জ থানার জুড়ানপুর। তাহলে শাস্ত্রীয় বচন অনুসারে কালী বললেই কলকাতার কালীঘাটকে ধরতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। এ তো গেল সতীপীঠ হিসেবে কালীর কথা। এবার আমার কালীপূজার প্রচলন ও প্রবর্তন বিষয়ে প্রবেশ করব। সে ইতিহাস ও সন তারিখ সংবলিত প্রামাণ্য ইতিহাস নয়, জনশ্রুতি নির্ভর অনুমানভিত্তিক ইতিহাস। ইতিহাস রচনায় জনশ্রুতিকে পরোক্ষ উৎস হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। “নাহি অমূলা জনশ্রুতি”। সেই জনশ্রুতি বলে নবদ্বীপের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র প্রথম কার্তিক মাসের দীপান্বিতা তিথিতে কালীর মৃন্ময়ী প্রতিমার পূজা প্রচলন করেছিলেন এবং তাঁর নির্দেশ তাঁর রাজ্যে দশ হাজার কালীপূজা হয়েছিল। কৃষ্ণচন্দ্রের সময়কাল ১৭১০-১৭৮২ খ্রিঃ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দীপালির দিন কালীপূজার বিধান সর্বপ্রথম দৃষ্ট হয় কাশীনাথ তর্কালংকারের ‘কালীসপর্যাবিধি’ গ্রন্থে। এর রচনাকাল ১৭৬৮ খ্রিঃ। আবার অন্যমতে, ‘তন্ত্রসার’ রচয়িতা কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশকে বর্তমান কালীমূর্তির জনক রূপে ধরা হয়ে থাকে। তিনি শ্রীচৈতন্যের সমসাময়িক। এবং মজার ব্যপার তাঁর ৫১ পীঠের বর্ণনায় উপরোক্ত ৩টি কালীপীঠের কোনওটিরই নাম নেই।

আরও পড়ুন: মেদিনীপুরের আলুই-রায়পাড়ার শ্রীধর মন্দির

দাসপুরের আনন্দময়ী

এবার আমরা বাংলার প্রাচীন কালী মন্দির ও তার প্রতিষ্ঠা লিপিতে উল্লিখিত সালতামামি এক নজরে দেখে নেব। পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটালের মুক্তকেশী কালীর চাঁদনি (১৬৫৩), বীরভূমের বীরসিংহপুরের কালী মন্দির (১৭০২), হুগলি জেলার রিষড়ার সিদ্ধেশ্বরী কালীর নবরত্ন মন্দির (১৭০৪), খড়গপুরের মালঞ্চের শ্যামাঠাকুরানির আটচাল (১৭১২), হুগলির হরিপালের ঘটকদের কালী মন্দির (১৭৪২), বীরভূমের হাড়কাটা কালী (১৭৫১), বর্ধমানের অম্বিকা কালনার সিদ্ধেশ্বরী কালীর জোড়বাংলা (১৭৬৪), বীরভূমের আকালীপুরের গুহ্যকালী (১৭৭৩), চব্বিশ পরগনার বারাসত কুবেরপুরের বামামুক্তকেশীকালী (১৭৭৭), হুগলির বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী কালী (১৭৯৯), নদিয়ার কৃষ্ণনগরের ভবতারিণী কালী (১৮০৪), কলকাতার কালীঘাটের কালীর আটচালা মন্দির (১৮০৬), পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুরের আনন্দময়ী কালীর আটচালা (১৮১৬), হুগলির শেওড়াফুলির নিস্তারিণী কালী (১৮২৭) ইত্যাদি। এর থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে সহজেই উপনীত হতে পারি যে ষোড়শ শতাব্দীর শেষপাদ থেকে বঙ্গে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এবং মোটামুটিভাবে তা নদিয়া নরেশ কৃষ্ণচন্দ্রের কিংবদন্তির সময়কালের সঙ্গে মিলে যায়। কলকাতার কালীঘাট মন্দিরের নির্মাণ অনেক পরে। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে প্রাচীন কালী মন্দিরের অস্তিত্ব মিলেছে। তারপর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬৯৮ খ্রিঃ ১০ নভেম্বর গোবিন্দপুর, সুতানুটি ও ডিহি কলকাতা— এই তিনটি মৌজা সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের থেকে বার্ষিক ১৩০০ টাকার বিনিময়ে পাট্টা পায়। সে সময়ের মৌজা ডিহি কলকাতা ছিল আজকের এসপ্ল্যানেড থেকে বড়বাজার পর্যন্ত অঞ্চল। যাই হোক পরে ৫৫টি তৌজি গ্রাম নিয়ে ২৬০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে ভারতের রাজধানী শহর কলকাতার আত্মপ্রকাশ ঘটে।

আকালীপুরের গুহ্যকালী

নগরায়ণের ফলশ্রুতিতে কলকাতার কালী মন্দিরের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং বঙ্গের সমস্ত কালীমন্দিরের তুলনায় তার প্রভাব, প্রতিপত্তি ও প্রচার, প্রসার অত্যধিক জনপ্রিয়তা পায়। ব্রিটিশ পাদরি ওয়ার্ড সাহেবের বিবরণ থেকে দেবীর দৈনিক পূজার যে বহর জানা যায় তা সত্যিই রাজসিক। ৪ মন চাল, ১২ সের চিনি, ২০ সের সন্দেশ, ৫ সের ঘি, ৫ সের ময়দা, ৮০০ পাকা কলা, ১০ কোয়ার্ট দুধ, ৮-১০টি ছাগ। এই পরিমাণ কেবল সাধারণ পূজার সর্বনিম্ন আয়োজন। বিশেষ পূজার দিনে তা ৪০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেত। স্বভাবতই এই সময়েই ‘কালী কলকাত্তাওয়ালি’ এই প্রবাদ বাক্যের জন্ম হয়ে থাকবে। এর সঙ্গে প্রাচীনতা, শাস্ত্রীয় বচন, ইতিহাসের সেভাবে কোনও সম্পর্ক নেই। যা আছে, তা নিতান্তই অর্থনৈতিক। যাই হোক ঐতিহাসিক কাল বিচারে বঙ্গের কালী মোটেও প্রাচীন নয়। দশম শতাব্দীতে অসমে রচিত ‘কালিকা পুরাণে’ বাংলার কোনও কালীর কথাই উক্ত হয়নি। পক্ষান্তরে সেখানে কালীকে কেরলের লোকপ্রিয় দেবী হিসেবেই বর্ণনা রয়েছে— “কেরলে কালিকা প্রোক্তা কাশ্মীরে ত্রিপুরা মতা/ গৌড়ে তারেতি সংপ্রোক্তা সৈব কালোত্তরা ভবেৎ।।” পরবর্তীকালে বঙ্গদেশে তন্ত্রশাস্ত্র সমূহ রচিত হলে পর এই প্রদেশে কালীর আধিপত্য সূচিত হয়। তন্ত্রশাস্ত্রের উদ্ভব মূলত বঙ্গদেশ। এ সম্পর্কে প্রকীর্ণ একটি শ্লোকে এর সাক্ষ্য পাওয়া যায়— “গৌড়ে প্রকাশিতা বিদ্যা মৈথিলে প্রকটীকৃতা/ ক্বচিৎ ক্বচিন্মহারাষ্ট্রে গুর্জরে প্রলয়ং গতা।।” অর্থাৎ তন্ত্রশাস্ত্র গৌড়ে প্রকাশিত, মিথিলায় প্রকটীকৃত, মহারাষ্ট্রের কোন কোন স্থানে প্রকাশিত হয়ে গুজরাতে বিলয়প্রাপ্ত হয়েছিল। তাই তন্ত্রশাস্ত্রে বাংলার বহু সতীপীঠের নাম পাওয়া যায় যা পুরাণে অনুক্ত। একাদশ শতাব্দীর তন্ত্রগ্রন্থ রুদ্রযামলে পীঠসংখ্যা মাত্র ১০টি। বঙ্গের কোন পীঠের নাম নেই। পরবর্তীতে ‘কব্জিকা তন্ত্রের’ সপ্তম পটলে এসে পীঠসংখ্যা ৪২। সপ্তদশ শতকের ‘পীঠনির্ণয়ে’ এসে পীঠের সংখ্যা ৫১। অষ্টাদশ শতকের ‘শিবচরিতে’ এসে আরও ২৬টি পীঠের সংযোজন হল, যা উপপীঠ হিসেবে সমাধিক খ্যাত। ভারতচন্দ্র ৫১ সতীপীঠের কথা বললেও ৪২টির বিবরণ দিয়েছেন। যাইহোক বর্তমানকালে বঙ্গদেশে যে, দেবী কালিকার প্রাধান্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা এখানকার কালী মন্দিরের সংখ্যাধিক্য থেকে সহজেই অনুমান করা যায়। তাই ‘বঙ্গদেশে চ কালিকা’— এই বাক্য কতটা প্রাচীন সে বিষয়ে সন্দেহ থাকলেও বঙ্গের কালী প্রাধান্যকে অস্বীকার করবার উপায় নেই।।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *