Latest News

Popular Posts

বাংলাবাজার, কবিতা, ঈর্ষাবিশ্লেষণ ওরফে পঙ্কিলতা-চর্চা

বাংলাবাজার, কবিতা, ঈর্ষাবিশ্লেষণ ওরফে পঙ্কিলতা-চর্চা

তন্ময় ভট্টাচার্য

(১)

বহু বছর আগের কথা। এক বান্ধবীকে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলাম আমার একটি বই, সঙ্গে সমসাময়িক আরও কয়েকজনের কবিতার বই। অন্যের ভালো কবিতা পাঠককে পড়াতে আমার ঈর্ষাবোধ বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি কোনোদিনই। অথচ সেদিন কী যে হল! বান্ধবীটি আমার বইটি বাদ দিয়ে, বাকিদের বই সুন্দর করে সাজিয়ে, ছবি তুলে প্রকাশ্যে আনলেন। এবং, ব্রহ্মতালু জ্বলে উঠল আমার। উত্তর হিসেবে জন্ম নিল একটি কবিতাই—

‘বিখ্যাত কবিদের ঘাড়ধাক্কা দিয়ে নামিয়েছি
তোমার বিছানা থেকে। আর যদি কোনোদিন দেখি,
রক্তারক্তি হবে। সমস্ত ছেঁদো কথা—
                     কীসের প্রতিভাবান! কে পূর্বসূরি!

আমার তুলনা তোকে করতে দেব না মুখপুড়ি’

কি প্রচণ্ড ক্রোধ ও অধিকারবোধ মিশে আছে এ-লেখায়, আজও টের পাই। অথচ কবিতা হিসেবে অত্যন্ত দুর্বল; নিছক মানসিক সংকীর্ণতা ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাই না এতে। লেখার সময়েও বোধহয় টের পেয়েছিলাম এ-খুঁত। সেহেতু নামকরণ ‘সাইকো’। আমি কি শিরোনামে নিজের হীন মানসিকতাকেই আড়াল করতে চাইছিলাম? আমার নিজেরই বন্ধুবান্ধব, সমসাময়িক কবিতা-লিখিয়েদের ঈর্ষা করছিলাম, তখনও-কাছের-হয়নি এমন এক নারীকে কেন্দ্র করে?

খানিক প্রসঙ্গান্তরে যাই। অপর কবির প্রতি কেন জন্মায় এই ঈর্ষাবোধ? পাঠক হিসেবে যে-ঈর্ষা, তা সুস্থ। কারোর লেখা পড়ে বিস্মিত হওয়ার, চমকে ওঠার, মনে-মনে নত হওয়ার ও ‘আমি যদি এমন লিখতে পারতাম’-গোছের অনুভূতিকে পবিত্র বলেই মনে করি। আমাকে তা মুগ্ধ করে, সমৃদ্ধও; আজীবন শিখতে-শিখতে এগিয়ে চলার এই পথে কোনো দোষ দেখতে পাই না।

তাহলে কোন ঈর্ষা আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে, ভেতরে-ভেতরে অস্থির করে তোলে? তা কবিতা-কেন্দ্রিক নয়, বরং কবিতার বাইরের অন্য-অন্য বিষয়। হতে পারে খ্যাতি ও পুরস্কার। হতে পারে নারী। আর-যাই হোক, কবিতা নয়।

আর, যদি লেখার মধ্যেই ঢুকে পড়ে ঈর্ষা, হিংসা ও ক্ষোভ? যদি কবিতাই ধারণ করে এই-এই অনুভূতিগুলি? এমন উদাহরণও দুর্লভ নয়। সেই কত বছর আগে অরণি বসু লিখেছিলেন— ‘…তারাও কি কবি নয়? যত কবি রণজিৎ দাশ?’ প্রচ্ছন্নে অমলিন ঈর্ষা। এমন ঈর্ষা তো প্রায়ই উঁকিঝুঁকি দেয় বিভিন্ন বইয়ে। কখনও তা অপরের সাফল্যকে কেন্দ্র করে, কখনও কোনো নারীকে কেন্দ্র করে। কোথাও-কোথাও সাফল্য ও নারী উভয়ে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। নিজস্ব নারীর কাছে নিজেকে ‘প্রমাণ’ করার মরিয়া চেষ্টা কবিকে হিংস্র করে তুলছে, অথবা বিষণ্ণ। অন্যদের তুলনায় নিজের অপ্রাপ্তি কবিকে ক্ষুব্ধ করছে। কবি ভাবছেন, তাঁকে গুরুত্ব দিল না প্রতিষ্ঠান, সমসময়। প্রবলভাবে আক্রমণ করছেন প্রতিষ্ঠানকে, বাংলাবাজারকে।

আরও পড়ুন: হয়তো কিছু বলার নেই তবুও কিছু একটা বলতে হয়

কিন্তু এই আক্রমণের কারণ কী? কেনই-বা প্রতিষ্ঠানকে বা তথাকথিত ‘সফল’ কবিদের বেছে নিচ্ছেন তিনি লক্ষ্য হিসেবে? এর কারণ হিসেবে স্বাভাবিকভাবে যা মনে আসে, তা হল ‘স্বপ্নভঙ্গ’। সেই কবি লেখালিখির শুরুর দিনগুলোয় হয়তো ভেবেছিলেন, তিনিও প্রতিষ্ঠানের অংশ হবেন, তাঁকেও পুরস্কৃত করা হবে, ডাকা হবে ঝলমলে কবিতাসভায়। বড় প্রকাশনা থেকে বই হোক, স্বপ্ন ছিল তারও। অথচ দিনে-দিনে সে-স্বপ্ন ভেঙেছে। কবি বুঝেছেন, নিজে ভালো লিখলেও প্রতিষ্ঠানের নেকনজরে পড়ার আশা ক্ষীণ। বুঝেছেন, শুধুমাত্র লেখা দিয়ে কিছু হওয়া মুশকিল। দেখছেন, তাঁর থেকেও ‘দুর্বল’ কবিতা-লিখিয়েরা সাফল্যের সিঁড়িগুলি ভেঙে অনায়াসে উঠে যাচ্ছে ওপরে, আর তিনি পড়ে রইলেন আগেকার জায়গাতেই। ফলে, কয়েক বছর কাটতে-না-কাটতে, রাগ জন্মাচ্ছে প্রতিষ্ঠানের প্রতি, প্রতিষ্ঠানের স্নেহধন্য লিখিয়েদের প্রতি। ওদিক থেকে প্রাপ্তির আশা নেই বুঝে, কবি বেছে নিচ্ছেন ভিন্ন পথ। আক্রমণ করছেন প্রতিষ্ঠানকে, তার কবিদের। দেগে দিচ্ছেন ‘ভেড়ার পাল’ বলে। সেইসঙ্গে, নিজের নতুন পথটিকেই ধ্রুব মেনে, ভেতরে-বাইরে মহিমান্বিত করে, হয়ে উঠছেন সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান, যে-প্রতিষ্ঠানের রাজাও তিনি, প্রজাও।

হয়তো অতি-সরলীকরণ হয়ে গেল এই চিন্তা। হতে পারে, যে-সমস্ত কবিতা প্রতিষ্ঠান-কর্তৃক বন্দিত হয়, কবি সেই ধাঁচে লিখতেই চাননি। গোড়া থেকেই সচেতনভাবে অন্য পথে হেঁটেছেন। সেই চলার পথে কবির অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমা পড়েছে প্রত্যাখ্যান, উদাসীনতা। তাঁর সমসাময়িকরা যখন কোনো-কোনো বিশেষ মহিরুহের ‘আনুকূল্য’ পেয়ে মঞ্চে-মঞ্চে ঘুরছে, তিনি নিজে তখন নিজের লেখার প্রতি আস্থা রেখে একটেরে। অন্যদিকে, কিছু অযাচিত ঘটনা দেখে কবির মন বিষিয়ে উঠছে। দেখছেন, নারী হওয়ার সুবাদে অতিরিক্ত গুরুত্ব পাচ্ছে কেউ কেউ। আমাদের আলোচ্য কবিটি পুরুষ বা নারী যে-ই হোন, মনের মধ্যে গড়ে-তোলা সন্দেহের ধাঁচে ফেলে দিচ্ছেন প্রত্যেক নারীকেই। যাচাইয়ের কোনো মানদণ্ড না-রেখেই। আর, চুঁইয়ে-চুঁইয়ে তাঁর কবিতাচর্চাতেও এসে মিশছে বাংলাবাজারের বিভিন্ন ঘটনা। কখনও উচ্চকিত হয়ে, কখনো-বা প্রচ্ছন্নে। কবিতা ধারণ করছে সেইসব ইঙ্গিত।

(২)

প্রথমদিকে আমার একটি লেখা ‘সাইকো’ সম্পর্কে সন্দেহপ্রকাশ করেছিলাম, নিজেকে আড়াল করতেই এমন নামকরণের বর্ম কিনা। ২০২১ সালের এপ্রিলে পৌঁছে, বুদ্ধদেব হালদারের কবিতার বইও শিরোনামে ঠাঁই দিল সেই শব্দকেই— ‘সাইকো’। কেন? বুদ্ধদেব কি জানতেন, বইয়ের ভেতরের লেখাগুলো তথাকথিত সুস্থ-মস্তিস্কের ভাবনাচিন্তার ফসল নয়? নাকি তিনি সচেতনভাবেই ধাক্কা দিতে চেয়েছেন পাঠককে; চেয়েছেন, চারপাশের এই সুবাসিত-ফুলেল সাহিত্যজগতের মধ্যে এক সাইকো উঠে দাঁড়াক, চিৎকার করে বলে দিক যা-কিছু সত্যি? কবিতার আড়ালে প্রশ্ন ছুঁড়ুক প্রতিষ্ঠানের দিকে— ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়?’

বুদ্ধদেবের ‘সাইকো’-তে হাত-ধরাধরি করে রয়েছে নারী-কবিতা-বাংলাবাজার। একান্ত নারীটি, যে ছেড়ে গিয়েছে, তার কাছে নিজেকে প্রমাণ করার অদম্য তাগিদ। এ-চরিত্রও তো বিরল নয়। কবিতার মধ্যে দিয়ে নিজস্ব নারীটিকে অমর করে দেওয়ার বাসনা তো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কবিরা পুষেই চলেছেন! তবুও বুদ্ধদেব ব্যতিক্রম। তিনি আক্রমণের মধ্যে দিয়ে অমর করতে চাইছেন তাঁকে। কখনো আবার সটান চেয়ে-বসায়। ফলে, জান্তব হয়ে উঠছে প্রত্যেকটা লেখা। নিজের দুঃখ-কষ্ট-অভিমান-প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ভানহীনভাবে ঢেলে দিচ্ছেন কবিতার শরীরে, নারীর যোনিতে। ছিঁড়ে দিচ্ছেন বাংলাবাজারের খোঁপায় জড়ানো জুঁইয়ের মালা।

পঙ্‌ক্তি ধরে-ধরে অহেতুক আলোচনা না-করে, বুদ্ধদেব হালদারের ‘সাইকো’ বইটি থেকে কিছু কবিতাংশ দেখে নেওয়া যাক পরপর—

১। …ভেস্তে দিয়েছি বাংলা কবিতার চিরাচরিত আদত। তুমি কি কখনও আর ভালোবাসবে না আমায়? তুমি কি চাইবে না বাংলা সাহিত্যে আরও দু-একটা নতুন কবিতা লেখা হোক?
২।
…বাঙালি কবিরা আমাক নিয়ে ভীষণ লজ্জিত। সুর তাল কিছুই নেই আমার অনুভূতিতে। …আমার কি আরও কিছুটা সংযমী হওয়া প্রয়োজন? মঞ্চের উপর ব্যাঙগুলোকে পিষে ফেলছি পায়ে, এবং কবিতা পড়ার বদলে হেগে নেমে যাচ্ছি আমি। বলো, তোমরা কি আমায় অনুকরণে সমর্থ?
৩। .
..সেই সমস্ত লোক, যাদের শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণাটুকু নেই তারা যখন আমার লেখা পড়ে বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত উদ্‌বিগ্ন হয়ে ওঠেন, তখন তাদের প্রত্যেককেই স্রেফ খানকির ছেলে বলে ডাকতে ইচ্ছে করে।
৪।
…বিগত দশকের রুগ্‌ণ পঙক্তি বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে যারা পেয়ে গেছেন একাধিক সরকারি পুরস্কার, তাদের কাব্যসাধনার প্রতি আমি ভীষণই শ্রদ্ধাশীল। এবং প্রকৃতই লজ্জা পাচ্ছি নিজের লেখালিখি নিয়ে। হাসুন, কবিগণ, হাসুন।
৫।
…এই যে বেশ কিছু কাগজ, যাতে আমি লিখে রেখেছি তোমার নাম, এসব আমি বিক্রি করে দিতে চাই সেই সমস্ত তরুণদের কাছে, যারা আবহমান বাংলা কবিতার প্রতি খুবই বিরক্ত। এবং যারা চায় কবিতা সম্পর্কে প্রচলিত মিথ ভেঙে বেরিয়ে আসতে।
৬।
…তোমার বিরহ লইয়া আমি গবেষণামূলক লিপিকাব্য লিখিব। হিমেল পৌষ রাতে ডিপ্রেশনে গুমরে তোমার বৃদ্ধ পিতা আমায় ফোন করিয়া খিস্তি করিবে— ‘এসব কবিতা লেখার চেয়ে বান্টু ধরে ঘুমিয়ে পড়া ভালো।’
৭।
একদিন এই পশ্চিমবাংলার সমস্ত কবি আমার বিরুদ্ধে মামলায় যাবে। অভিযোগ— বাংলা কবিতায় যা-হোক খুশি লিখে দারুণ পাঠকপ্রিয়তা অর্জন। …প্রিয় কবি, আপনারা কেন বোঝেন না, আপনাদের কাটা আঙুল বাংলাসাহিত্যে আর কোনো কাজে লাগে না এখন।
৮।
…আমি কাল সারারাত ভেবেছি। সম্পর্ক কীসে টেকে? যৌনতায়? নাকি টাকায়? আমার বইয়ের প্রকাশক ফোন করেছিলেন। কয়েকটি বই বিক্রি হয়েছে আমার। এবং তিনি জানিয়েছেন, কেউ কেউ আমার কবিতা পছন্দ করছেন।
৯।
বাংলা কবিতার ফাটকাবাজিতে আমি খুব একটা বিশ্বাসী নই। ফলত এই ইঁদুরসাহিত্য আমাকে খুব একটা টানে না। আমি অনেক বিখ্যাত কবির বই পুড়িয়ে ফেলতে ইচ্ছুক।
১০।
…হে প্রভু, বাংলা কবিতা যেন হাজারবছর এই বিষণ্ণতা মনে রাখে। যেন কখনোই না ভোলে কবিদের হাতে আমি বহুবার খুন হয়েছিলাম এই পশ্চিমবাংলায়।

কেন বুদ্ধদেবের এত কবিতাংশ উদ্ধৃত করলাম? কারণ একটাই। আমরা যে-ধাঁচ বা প্রবণতা নিয়ে এতক্ষণ কথা বলছি, বুদ্ধদেব সেই ধারার একজন উল্লেখযোগ্য কবি। আর, কবি ও পাঠকের মাঝখানে নিজের টীকা-টিপ্পনী সাজিয়ে পাঠককে প্রভাবিত করতে চাইনি। আপনারা সরাসরি পড়ুন, বুঝুন কবির আগুন ও আক্রমণ।

এদিকে, পড়তে-পড়তে আমার মনে একটা সন্দেহ উঁকি দিচ্ছে, আর, সেই সন্দেহের সূত্রে আমিও বুদ্ধদেবের আক্রমণের লক্ষ্য। তা হল, এগুলি কতটা কবিতা, আর কতটাই-বা ব্যক্তিগত ভাষ্য? কবিতাংশ পড়ে পাঠকের পক্ষে সে-বিচার করা অনুচিত, কিন্তু বইটি একাধিকবার সম্পূর্ণ পড়ে আমার মনে হয়েছে, এ-লেখাগুলি পরিকল্পিত, অ্যাজেন্ডাভিত্তিক। বুদ্ধদেব যেন আগে থেকেই জানতেন, তিনি এমন লিখবেন, এমনই লিখতে চান। পরিকল্পনা করে কি কবিতা হয়? এ-প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে মনে। আর, যদি পরিকল্পিত না-ই হয়, যদি বুদ্ধদেব স্বতঃস্ফূর্তভাবেই লিখে থাকেন কবিতাগুলি, তাহলেও আমার আলোচনার প্রসঙ্গ ক্ষুণ্ণ হয় না এতটুকু।

কেন এমন লিখলেন বুদ্ধদেব? লেখালিখির প্রাথমিক দিনগুলিতে তাঁর সঙ্গে ঘটে-যাওয়া ‘অবিচার’-এর শোধ নিচ্ছেন? তাঁর মনে কি তীব্রভাবে বসে গেছে গতানুগতিক বাংলাবাজারের প্রতি অনীহা? ছয় দশক আগে হাংরিরাও এভাবে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলেছিলেন। কিন্তু বুদ্ধদেবের চলন তার থেকে আলাদা। তিনি প্রত্যাখ্যাত হয়ে, তারপর প্রত্যাঘাতে নেমেছেন। তিনি একা, কিন্তু জানেন, আরও অনেক এমন ‘একা’ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে চারপাশেই। বুদ্ধদেব তাদের নিয়ে দল গড়তে চান? কবিতার মধ্যে দিয়ে সাহিত্যজগতের বিরুদ্ধে তাঁর এই জেহাদ আমাকে বিচলিত করছে ঠিকই, তবে তার থেকেও বেশি মুগ্ধ করছে তাঁর অস্ত্রব্যবহার ও ভণিতাহীন প্রকাশ।

(৩)

পরবর্তী কবির কাছে যাওয়ার আগে, আরেকবার উঁকি দিই বাংলাবাজারে। একজন কবির মনোজগতে বাড়তে-থাকা এই ক্ষোভ কতটা জায়েজ? ক্ষোভ কি শুধু প্রত্যক্ষ বাংলাবাজার ঘিরেই আসে? প্রচ্ছন্নে আরও কত স্তর লুকিয়ে থাকতে দেখেছি কতজনের মনে! কারোর কবিতার প্রশংসা করলে, আড়ালে অন্যজন এসে কৈফিয়ত চান, কেন করলাম। তথ্যপ্রমাণ দিয়ে বোঝাতে চান, প্রশংসার যোগ্যই নন সেই কবি। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কানাকানি-চুলোচুলি তো রয়েইছে! ‘আমি পাচ্ছি না, অথচ অন্য কেউ পেয়ে যাচ্ছে’— এই চিন্তা ভেতরে-ভেতরে ঘুণ ধরিয়ে দেয় কতজনের, তাও তো দেখেছি! অভিমানে, রাগে, ঘৃণায় লেখালিখিও ছেড়ে দেন কেউ-কেউ। কেউ আবার মুখ ফিরিয়ে নেন সাহিত্যজগতের সীমাবদ্ধতা ও কূটালাপে তিতিবিরক্ত হয়ে। ‘দূর থেকে ভাবতাম, যাঁরা লেখেন, তাঁরা না-জানি কত উদার মনের, কত বিস্তৃত; কাছে এসে দেখছি অন্য-অন্য শিল্পমাধ্যমের তুলনায় আরও সংকীর্ণ ও জটিল এই জগত’— এমন মন্তব্যের সামনে আমিও কি গুটিয়ে যাইনি মনে-মনে? বক্তার এই আঙুল তোলা কি আমার প্রতিও নয়?

আরও পড়ুন: হাসান আজিজুল হকের মুক্তিযুদ্ধ

অতি-সম্প্রতি এক তরুণ বাঙালি কবির বিখ্যাত সাহিত্য পুরস্কার পাওয়া নিয়ে দেখেছি সেই চোরাস্রোত। প্রকাশ্যে অভিনন্দন জানাচ্ছেন অনেকেই, আড়ালে বয়ে চলেছে সেই কবির অযোগ্যতার চর্চা। কীভাবে ঠিক-ঠিক সিঁড়ি ভেঙে, কাদের তৈলমর্দন করে পুরস্কার হাসিল করলেন কবিটি, তা হয়ে উঠছে আলোচনার বিষয়। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, সেই আলোচনায় আমিও অংশ নিয়েছি কখনও-কখনও। কেন-না তখনও সেই কবির পড়া কোনো কবিতাই আমাদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেনি; মনে হয়নি, পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য তিনি। আলোচনায় উঠে আসছে আরও কতজনের নাম, যাঁদের বই সত্যিই পুরস্কৃত হতে পারত। বলাই বাহুল্য, এ-আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা প্রায় কেউই পুরস্কৃত বইটি পড়িনি।

কয়েকদিন পর, কলেজ স্ট্রিটে সেই বইটি চোখে পড়ল। দু-এক পাতা দেখে, চমকে উঠে কিনে ফেললাম। পড়তে-পড়তে অগাধ বিস্ময়। এবং, লজ্জিতও হতে হল নিজের কাছে। কবিটি তৈলমর্দন করে পুরস্কার পান বা না-পান, এ-বইকে অযোগ্য বলা চলে না। এর থেকেও ভালো বই হয়তো পুরস্কৃত হতে পারত, কিন্তু বইটি পড়ার পর ধুয়েমুছে গেল আগেকার যাবতীয় ক্ষোভ। নাহ্‌, অপাত্রে যায়নি সেই পুরস্কার।

কী হত, যদি প্রবল বিদ্বেষবশত বইটি কোনোদিন না-ই পড়তাম? আগেকার ধারণা পুষে রেখেই, সারাজীবন ওই কবি ও পুরস্কারটিকে অভিযুক্ত করে যেতাম। পড়েছি এবং ধারণা বদলেছে। অনুমানের ওপর নির্ভর করে আগাম বিচার করে ফেলার প্রবৃত্তিও কি বদলাল খানিকটা? কে জানে!

তবে, তার চেয়েও বড় যে-প্রশ্ন নিজের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হল, কেন মাথা ঘামালাম ওই বিষয়ে? কে পুরস্কার পেল বা না-পেল, তাতে আমার কী! শুদ্ধ কবিতাচর্চার ক্ষেত্র থেকে তো যথেষ্ট দূরত্বে দাঁড়িয়ে এসব প্রসঙ্গ! আমিও কি মনে-মনে ওই পুরস্কারের প্রত্যাশা করছিলাম? সম্ভবত না। আমার বর্তমান কবিতার বইটির জন্য যে-কোনো পুরস্কারই আমি প্রত্যাখ্যান করব (দিচ্ছেই-বা কে! আমিও কি মনে-মনে বাকিদের মতো নিজেকে যোগ্য ভেবে বসছি?)। কেন-না জানি, এর থেকেও হাজার গুণে ভালো অনেক বই যোগ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হয়, হয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। তাহলে, নিছক অবিচারের জন্যই এই ক্রোধ? ভালো বই, ভালো লেখার প্রতি ভালোবাসা থেকে? নাকি এসব কিছুই নয়, নেহাত সংকীর্ণমনা হয়ে জড়িয়ে পড়ছি এই-এই বিষয়ে, ছুঁয়ে থাকতে চাইছি সমসময়ের উত্তেজনা?

(৪)

কবিতার আলোচনায় ফিরি। বুদ্ধদেবের বইটির মাস তিনেক আগে, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে বেরিয়েছিল সুব্রত মণ্ডলের ‘চিকনি শাকের ক্ষেতে’ বইটি। বুদ্ধদেবের মতো আক্রমণাত্মক নন সুব্রত; তাঁর ক্ষোভ নেই, আছে অভিমান। মঞ্চের প্রতি, সাহিত্যজগতের প্রতি, নারীর প্রতিও। সেইসঙ্গে, যে অগ্রজ তাঁকে প্রশ্রয় দিয়েছেন, কবিতার আড়ালে ধন্যবাদ জানাতেও ভোলেননি সুব্রত। তাঁর এই চরিত্রই আলাদা করেছে তাঁকে বুদ্ধদেবের থেকে।

সুব্রত-র কয়েকটি কবিতাংশ দেখে নেওয়া যাক—

১। লেখার জগতে আসিয়া মূলত এই জানিয়াছি যে এখানে সকলেই সকলের জন্য ভীষণ ভাবেন। সকলেই সকলের উপর নির্ভর করিয়া যাপনের তৈল চিত্র আঁকিতে সক্ষম হইতেছেন। অঙ্গুলি হেলান দিয়া প্রাচীন প্রস্তর যুগের কাসুন্দি ঘাঁটিয়া তুলিয়া আনিতে সক্ষম হইতেছেন।
২। …আমি চাই না আমাকে নিয়ে কোনো বড় মনের কবি তার ওয়াল নোংরা করুক। কোনো সৎ প্রকাশক ইহজন্মে যেন আর কোনোদিন না কবিতা চেয়ে বসে। পৃথিবীর সকল মঞ্চ আমাকে পরিত্যাগ করিয়া ছুঁড়িয়া ফেলুক গভীর অন্ধকারের দিকে।
৩। …হে উত্তরের অরণ্যদেব, প্রিয় দত্তবাবু আমার সমস্ত স্পর্ধা আপনাদের চরণে দিলাম।
৪। …আমার কোনো শ্যামলকান্তি নেই। আছে শুধু চারপাশ জুড়ে ভ্যাপসা রোদ্দুর আর ছেঁড়া ছেঁড়া নীলবর্ণ মেঘ। দত্ত সাহেবের টুপির মতো কিছু উত্তম আশীর্বাদ।
৫। আমি চাই না আমাকে কোন সাহিত্যসভাতে ডাকা হোক। কোনো ম্রিয়মাণ জীর্ণ সম্পাদক শীতের সকালে চিকনি শাকের মতো একটি চনমনে কবিতা চেয়ে বসুক।
৬। এই যে এত এত পুরস্কার, নতুন বইয়ের মলাট, এর মধ্যে আমার প্রতিভা নিয়ে তোমার সন্দেহ হচ্ছে জানি। এত বড় বড় সাহিত্যসভাতে আমার ডাক না পাওয়াতে তোমার স্কিন এলার্জিতে খসখসে হয়ে উঠছে।
৭। …শুধু শুধু সাহিত্যের অজুহাত আর বাড়িয়ে দিও না। ওই ঘটি ভরা যৌবনে সাহিত্য দেয়নি তোমাকে এমন কোনো জিনিস নেই।
৮। ওই সাহিত্যসভা আমার আর ভালো লাগে না। রাশি রাশি টাকা খরচ করে কী হবে বলো? শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে এক ফ্রেমে থাকলে তুমি কি আমাকে ঈশ্বর ভাববে?
৯। যদি কোনোদিন মঞ্চে না যাই! যদি এই জীবনে দেশে লেখা না পাঠাই! মৃত্যুর শেষ রাতেও কি আমাদের মিলন অপূর্ণ থেকে যাবে?

সুব্রত-র বইটি পড়লে মনে হয়, ওঁর অভিমান শুধুই সাহিত্যজগতের ওপর নয়। প্রিয় নারীদের ওপরও, যাঁরা কবিকে তথাকথিত সাফল্য-অসাফল্য দিয়ে বিচার করে দূরে সরে গেছেন। সুব্রত এখানে প্রতিনিধি-মাত্র। বিভিন্ন কবির লেখায়, ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হয়ে কত নারীই তো কাছে আসেন! তারপর, জাগতিক দাঁড়িপাল্লায় বিচার করে, মোহভঙ্গ হলে, সরেও যান। এই আসা-যাওয়ার পথের সাক্ষী হয়ে থেকে যায় কিছু কবিতা। কখনও নারীটির অনুযোগের ছলে, কখনো-বা আত্মকথনের আড়ালেই সুব্রত সাজিয়েছেন তাঁর বইটি। কবিতাংশগুলি পড়লে বেশ বোঝা যায়, যে-যে নারী তাঁর কাছে এসেছিলেন, চলেও গেছেন, তাদের প্রতি অভিমানের ছায়া ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে সাহিত্যজগতের ওপরেও। যদি সমসময়ের একজন ‘মঞ্চসফল’ কবি হতেন সুব্রত, যদি পুরস্কার ও ক্ষমতাশালী অগ্রজদের স্নেহস্পর্শ তাঁকে ঘিরে থাকত সবসময়, সেই দ্যুতিতে নারীরাও তাঁকে ছেড়ে যেতেন না— এমনই ইঙ্গিত ফুটে ওঠে ওঁর লেখায়। অন্যদিকে, আরেকটি মারাত্মক কু-ইঙ্গিতও করেছেন তিনি। ‘ওই ঘটি ভরা যৌবনে সাহিত্য দেয়নি তোমাকে এমন কোনো জিনিস নেই।’ যেন তাঁর উদ্দিষ্ট ব্যক্তিটি (নারী) লেখার জোরে নয়, নিজের যৌবনের জোরেই জায়গা করেছেন সাহিত্যজগতে। তিক্ততা যা-ই হোক, কবিতায় এমন প্রসঙ্গ আনা কি সত্যিই বাঞ্ছনীয়? অভিযোগ করতে-করতে কোথাও কি সীমা অতিক্রম করে ফেলছেন সুব্রত? ব্যক্তিগত আক্রোশ মুদ্রিত হচ্ছে বইয়ে। তা-ও হতে পারত, যদি তাতে কবিতাধর্ম থাকত। সুব্রত কি ক্রোধে আচ্ছন্ন হয়ে সেই বৈশিষ্ট্য থেকেও বিচ্যুত হলেন এখানে?

অন্যদিকে, সমসময়ের অন্য-অন্য ‘মাপকাঠি’গুলিও সুব্রত-র লেখায় ধরা পড়ছে স্পষ্ট। শঙ্খ ঘোষের বাড়িতে যাননি বলে যেন তাঁর গুরুত্ব কমে গেছে। তেমনই, দেশে লেখা পাঠাননি বলে (এখানেও কবিজনোচিত আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট। যেন পাঠালেই মুদ্রিত হত, নেহাত পাঠাননি বলেই…) অপূর্ণ থেকে যেতে পারে প্রিয় নারীটির সঙ্গে মিলনও। সাহিত্যজগৎ-কে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে সবকিছু। আবার, ‘দত্তবাবু’ ও ‘দত্তসাহেব’-এর আড়ালে সুব্রত কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন অগ্রজ কবি উত্তম দত্ত-কে, যিনি তরুণ সুব্রত-কে সাহস জুগিয়েছেন, প্রশ্রয় দিয়েছেন বারবার। বইটি উৎসর্গ করাও উত্তম দত্ত-কেই। এভাবেই, একজন তীব্র সংবেদনশীল কবিকে চিনতে পারি ‘চিকনি শাকের ক্ষেতে’ বই থেকে, যিনি একইসঙ্গে অভিযোগের আঙুল তুলতে ও ধন্যবাদ জানাতে কার্পণ্য বোধ করেন না। তাঁর স্বতঃস্ফূর্ততার প্রকাশ ছড়িয়ে বইজুড়ে। আর তা আছে বলেই, অভিমান-অভিযোগগুলিও এত জ্যান্ত, রক্তঘামমাখা।

(৫)

এই প্রসঙ্গ ধরেই অন্য একটি চিন্তা উঁকি দিচ্ছে মাথায়। সুব্রত বা বুদ্ধদেব— দু’জনেই সাহিত্যজগতকে আক্রমণ করেছেন। কখনো-বা নারীকে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো কবিকে উদ্দেশ্য করে কবিতা চোখে পড়েনি। মনে পড়ছে, কমবয়সের চপলতা ও ঔদ্ধত্যে তেমন স্খলন ঘটেছিল আমার নিজেরই। কেন? তাঁর হঠাৎ-খ্যাতিকে আমি কি ঈর্ষা করছিলাম? অযোগ্য হয়েও মঞ্চসফল— এমন গোঁসা কি ঠাঁই পেয়েছিল মনে? দিনে-দিনে আমাকে ভুল প্রমাণ করেছেন তিনি। আর যাই-হোক, কলমে দুর্বলতা নেই তাঁর। আজ ভুল স্বীকার করলেও, গ্রন্থিত লেখাকে অস্বীকার করতে পারব কি আর! রইল—

‘তোমার খ্যাতির পাশে আমাকে কি মানাবে এখন
সব দুঃখ জড়ো করে ছেঁড়া জামা আউলা যুবক
আগের মতোই যদি সটান হাজির হতে চাই
তুমি কি ভুরুর খোপে অভিনয় শিখেছ দারুণ
কিছু না-বুঝেই যারা মহা রঙ্গে হাততালি দেয়
ভাবে কী নিখুঁত হল অথচ ভাবাতে গেলে চুপ
আমিও তেমন ছলে মিঠি হেসে জানতে উৎসুক
তোমার খ্যাতির পাশে তুমি কি আদৌ ধরে যাও’

আরও পড়ুন: বোর্ডিং যখন বোরিং নয়: নন্টে ফন্টে আর নারায়ণ দেবনাথের গল্প

এইমাত্র একটা ফোন এল। প্রবাসের একটি সাহিত্য পত্রিকার কর্মকর্তারা আমাকে আমার সার্বিক লেখালিখির জন্য পুরস্কার দিতে চান। শোনামাত্র যে-অনুভূতি চেপে ধরল আমায়, তা সংকোচ। আমি কি সত্যিই পুরস্কৃত হওয়ার যোগ্য? কয়েক অনুচ্ছেদ আগেই লিখেছি, বর্তমান কবিতার বইটির জন্য কোনো পুরস্কার নিতে পারব না নীতিগত কারণেই। অথচ অন্যান্য বেশ-কিছু কাজ করেছি, যেগুলি পুরস্কৃত হলে আমার পরিশ্রম স্বীকৃতি পাবে, আমিও দ্বিধান্বিত হব না। কল্পনায় ভেসে উঠছে সুব্রত-বুদ্ধদেবের তর্জনী। নিজেকে বারবার মাপার চেষ্টা করছি যোগ্যতার মানদণ্ডে। সমসাময়িক কবিদের মুখ, যাঁদের সত্যিই শ্রদ্ধা করি, মনে পড়ছে একের পর এক। ক্ষমা চাইছি তাদের কাছে। আর-কেউ জানতে পারছে না সেসব।

‘প্রিয় লেখা, তোমাকে সন্দেহ করি।’ বন্ধুসুন্দর পাল লিখেছেন। ওঁর এই কবিতা-পঙ্‌ক্তি বর্তমান পরিস্থিতিতে চেপে ধরছে আমায়। এখন থেকে আমার বাকি লেখায় মিশে থাকবে অপরাধবোধ। নিজেকে প্রশ্ন করতে-করতে চলব, এতক্ষণ যা লিখলাম, তার সঙ্গে দ্বিচারিতা করছি কিনা। এই পুরস্কারপ্রাপ্তির খবর ও তা স্বীকার করা আমাকে ভেতরে-ভেতরে কাঠগড়ায় তুলছে। নিজেকে সন্দেহ করছি। এদিকে, এর পরবর্তী যে-বইয়ে উঁকি দেব ভেবে রেখেছিলাম, তা বন্ধুসুন্দরেরই। বইয়ের নাম ‘তোমাকে সন্দেহ করি’। ২০২২ সালে, কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত।

বুদ্ধদেব বা সুব্রত-র মতো চঞ্চল নন বন্ধুসুন্দর। নন উচ্চকিতও। তিনি সাধক। কোনো মান যদি থেকেও থাকে, শান্ত স্বরে ইঙ্গিতমাত্র দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন নিজেকে। বন্ধুসুন্দর কাউকে দায়ী করেন না, কারোর দিকে আঙুল তোলেন না। বোধের অতল থেকে স্বগতোক্তি তুলে এনে, লিখে রেখে দেন। রাখেন এবং এগিয়ে যান। বাংলাবাজারের ক্ষোভ-জটিলতা-ঈর্ষা-মনখারাপে আটকে পড়া ওঁর স্বভাবধর্ম নয়। কবিতাংশও বহন করে সেই ইঙ্গিতই—

১। দিনান্তে তোমাকে লিখছি, এই ভেবে যে, বাংলা সাহিত্য তোমার বাম স্তনের থেকে দু’জন্ম ছোটো বলে এ লেখার অমর্যাদা কোরো না।
২। …তোমাকে লিখছি, বাংলা সাহিত্য। তোমাকে লিখছি, অভাবের মা, আরও উঁচু হও, যেমন করে সন্তান মুখ বাড়িয়ে স্তনপান করে…
৩। …কিন্তু বিশ্বাস করো, জীবন ও মরণ, বাংলা কবিতার বীর্য তোমাদের আজীবন দেবী বানাতে চেয়েছিল এবং এখনও সেই চেষ্টাটুকুই করে যাচ্ছে… তুমি তাদের চেষ্টাটুকুকে ক্ষমা করে দেবে না?
৪। …শুধুমাত্র দুধের গন্ধ ভুলে গিয়েছে বলে বাঙালি কবিদের এভাবে তরলের অহংকার দেখিয়ে তাদের করুণা কোরো না।
৫। …তোমাকে সোপান ভেবে যারা শ্রেণিসংগ্রামের কথা তোমার শরীরে লিখে দিতে এসেছিল, তারা সবাই পরাস্ত হয়ে কবি হয়ে গেছে।
৬। …আর, আমি মৃত কবিদের নিয়ে আড়ালে ষড়যন্ত্র করি, কীভাবে আরও একটা প্রেমের কবিতাকে তোমার মতো শ্রেণিসংগ্রামের কারণ করে তুলে এই বাংলাবাজারে ছেড়ে দেওয়া যায়!
৭। …এই অতিরঞ্জিত বাংলা কবিতার বাজারে আমি তোমাকে একটা শাদা থান কাপড় ছাড়া আর কিছুই দিতে পারলাম না বলে দুঃখ করো না।
৮। …আমাকে তুমি ভূমিষ্ঠ করো, আমার মুখে তুলে দাও তোমার স্তনের বৃন্ত। আমি চুষে চুষে খেয়ে ফেলি বাংলা কবিতার সব শাদা রং। আমি জানি, তোমার গর্ভ থেকে যতবার আমি জন্ম নেব, ততবার আমাকে তুমি কবি ছাড়া আর কিছুই হতে দেবে না…

আমার বোঝায় কি ভুল হল কোথাও? মনে হচ্ছে, যে-ধরনের কবিতা বা যে-প্রবণতার কথা আলোচনা করছি এ-গদ্যে, বন্ধুসুন্দরের লেখা তার সঙ্গে খাপ খায় না কিছুতেই। হয়তো সূক্ষ্ম মিল রয়েছে, কিন্তু তা এতই ক্ষীণ যে, এড়িয়ে যাওয়া যায়। বন্ধুসুন্দর প্রেমিক। তাঁর নারীটি কি রক্তমাংসের কেউ, নাকি কবিতার মতোই স্পর্শাতীত? কবি সেই নারীর ধ্যান করছেন। তাঁকে আবাহন করছেন, আলিঙ্গনও। মৃদু শাসনে ঠোনা মারছেন গালে। বাংলা সাহিত্য বা বাংলা কবিতা তাঁর কাছে আক্রোশের বিষয় নয়, আদরের অস্ত্র। বন্ধুসুন্দরের নারীও বাকিদের মতো স্বার্থে জড়ানো নয়। কবি জানেন, যা-ই হয়ে যাক, সেই নারী তাঁকে ছেড়ে যাবে না। মান করবে, মুখ ফেরাবে, কিন্তু দিনের শেষে কবিই তার সর্বস্ব। কবির মঞ্চসফলতা, বাংলাবাজারের খ্যাতিতে সে-নারীর কিছু যায়-আসে না। ফলে, তার কাছে কবিসুলভ আবদারও জানানো যায় নিঃসংকোচে। বন্ধুসুন্দরের নারীটি একইসঙ্গে বন্ধু ও সুন্দর। কবিতার মতোই…

(৬)

আর পাঠক? দীর্ঘ এই গদ্যে যাঁদের অপাঙ্‌ক্তেয় করে রাখলাম, অথচ যাঁরা না থাকলে সব মিথ্যা, তাঁরা কী ভাবেন? ব্যক্তি-কবি, না কবিতার কবি— কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তাঁদের কাছে? ব্যক্তির ভিতরে উঁকি দিলে অনেকক্ষেত্রেই অনেক পাঁক উঠে আসে। অথচ লেখায় তাঁরা ভিন্ন মানুষ। শিল্পকে কি ব্যক্তি দিয়ে বিচার করা আদৌ উচিত? ঘুরপাক খায় এসব কথাও। স্পষ্ট উত্তর পাই না। আমি চাই, পাঠক শুধুমাত্র লেখার সঙ্গে বোঝাপড়া করুন; কবির জীবনে উঁকি দিলে মোহভঙ্গ হওয়া অসম্ভব নয়। বাংলাবাজারের অজস্র জটিলতার খবর পাঠক রাখেন না। এই না-রাখা যে কী আশীর্বাদী! নইলে আরও সংকীর্ণ হয়ে যেত সাহিত্যজগৎ! ইতিমধ্যেই অধিকাংশ পাঠকই নিজেই কবিতালেখক! বাইরে যে-ক’জন আছেন, তাঁরা চিরজীবী হোন। তাঁরা না-থাকলে কীসের বাংলাবাজার, কীসের খ্যাতি, কীই-বা পুরস্কারের সাফল্য! কুয়োর মধ্যে ঘুরে-ঘুরে ফুরিয়ে যাওয়ার এই জগতে বাইরের ওই পাঠকরাই আমাদের সাহস।

আরও পড়ুন: প্রতিমার শেষ মাস

ঠিক তখনই নীলাঞ্জন দরিপা লেখেন, ‘তুমি কি একাই, ভাবো, কবিতা লেখো না বলে জমাও ইশারা?’ তাঁর এই প্রশ্ন যেমন নারীর প্রতি, পাঠকের প্রতিও কি নয়? কবিতা না-লেখা প্রত্যেক মানুষ নিজের মধ্যে এত কবিতা লুকিয়ে রাখেন যে, কবিতার চর্চাকারীরা অনেকসময় তার থই পায় না। নীলাঞ্জন হয়তো বলতে চেয়েছেন, ইশারা লিখে ফেলেও কবি নিঃস্ব নন; অনেক না-বলা ইঙ্গিত বাকি থাকে এরপরেও। এই ইঙ্গিত, এই ইশারা একেকজনের কাছে একেকরকম। চিন্তার গতিবিধি, যাপন, পরিপার্শ্ব নির্ধারণ করে দেয় সবকিছু। কারোর কাছে ইশারা আত্মগত, কারোর কাছে বহির্মুখী। এই অভিমুখ কবিকে ঠেলে দেয় ব্যক্তিগত চেতনাপথে। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বোধ, নাকি শিল্পের অনাবিল আনন্দ— কোনদিকে ঝুঁকে থাকবেন কবি, হদিশ দেয় ভেতরের না-লেখা এইসব ইশারাসমূহ। বাকি আলোড়ন তো চলছে, চলবেই। সেসব থেকে দূরত্বে থাকা বা না-থাকা দিয়ে লেখার মান নির্ধারিত হয় না। নির্ধারিত হয় কবির মন। বাংলাবাজার। হাতছানি। গিলতে চেওয়ার চেষ্টা। এই কুয়োয় ঝাঁপ দেওয়া— একজন কবির পক্ষে এও কি আত্মহনন নয়?

কতবার মরে, বেঁচে উঠে, আবার মরেছি— পালাতে-পালাতে মরছি, ভাবি!

বাংলাবাজার, কবিতা, ঈর্ষাবিশ্লেষণ ওরফে পঙ্কিলতা-চর্চা

চিত্রণ চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *