সুন্দরবনের উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রবিন্যাসের প্রাথমিক ধারণা এবং ম্যানগ্রোভস রিস্টোর

সমীরণ মণ্ডল, লাহিড়ীপুর (সাহেবঘাট), গোসাবা

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং ভারতের দক্ষিণ-পূর্বে সুন্দরবন, যার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ও পূর্বে বলেশ্বর নদ। পশ্চিমে গঙ্গাসাগরের হুগলি নদী থেকে পূর্বে মিরসরাইয়ের ফেনী নদী পর্যন্ত যার ঐতিহাসিক সীমানা ছিল এবং আয়তন হওয়ার কথা ছিল ১৬৭০০ বর্গকিলোমিটার। কিন্তু বর্তমান সীমানা সীমায়িত হয়ে পশ্চিমে সপ্তমুখী নদী থেকে পূর্বে বলেশ্বর নদ পর্যন্ত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে আন্তঃস্রোতীয় প্রবাহের ফলে প্রাকৃতিকভাবে উপরি স্রোত থেকে পৃথক হওয়া পলি দ্বারা গড়ে উঠেছে ও উঠছে সুন্দরবন ব-দ্বীপ। উনিশ শতকের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত সময়েও গঙ্গাসাগরের হুগলি নদী থেকে মিরসরাইয়ের ফেনী নদী পর্যন্ত ম্যানগ্রোভের ঘন জঙ্গলে আচ্ছাদিত ছিল। বর্তমান যার সীমায়িত সীমানা ১০,০০০ বর্গকিলোমিটার ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়ে রয়েছে। এটিই বিশ্বের বৃহত্তম একক ম্যানগ্রোভ জঙ্গল বলে স্বীকৃত।

আরও পড়ুন: বৃহত্তর সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ প্রান্তিক মানুষের সহজ পুষ্টিকর খাদ্যের চাহিদা পূরণ করেছে

বর্তমান মোট বনভূমির আয়তন ৪১৪৩ বর্গকিলোমিটার, আয়তন সহ বালি চর ৪২ বর্গ কিলোমিটার এবং নদী-খাঁড়ি-খাল ১৮৭৪ বর্গোকিলমিটার। সুন্দরবন দ্বীপের উপরে রয়েছে অসংখ্য জলধারা এবং জলের নিচে মাটির দেওয়াল ও কাদা চর। সমুদ্র তল থেকে সুন্দরবনের উচ্চতা ০.৯ মিটার থেকে ২.১১ মিটার ক্ষেত্রবিশেষে। উদ্ভিদ ও প্রাণী বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে বালিচর, দ্বীপ জুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা খাল, জলের নিচের মাটির দেওয়াল, আদি ব-দ্বীপিয় কাদা, সঞ্চিত পলি, সামুদ্রিক গঠন প্রক্রিয়া, সৈকত, মোহনা, স্থায়ী ও ক্ষণস্থায়ী জলাভূমি এবং মাটির স্তূপের জৈবিক উপাদান সহ স্রোতের গতি, ব্যাষ্টিক ও সমষ্টিক স্রোতচক্র এবং সমুদ্র উপকূলবর্তী বিভিন্ন মরশুমে পরিবর্তনশীল স্রোত দ্বারা সুন্দরবনের গঠন প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। নিম্নাঞ্চলের পলি প্রাথমিকভাবে সঞ্চিত হয় বর্ষার সময় বঙ্গীয় ব-দ্বীপ পুরোপুরি ডুবে গিয়ে এবং বর্ষার সময় সমুদ্র ও নদীগুলোর চরিত্র সহ ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘটনার প্রভাবে, সমগ্র সুন্দরবনকে দক্ষিণের সমুদ্র সৈকত অঞ্চল, মধ্যাংশ এবং উত্তর-পূর্বের তৃণভূমি অঞ্চল হিসাবে ভাগ করে নিলে, দেখা যাবে উত্তর-পূর্বের মিষ্টি জলের সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমের নোনা জলের মিশ্রণ ঘটা এই সুন্দরবাঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে তিন প্রকার উদ্ভিদ জন্মায় জলে লবণের পরিমাণ, মিষ্টি জলপ্রবাহের মাত্রা এবং ভূপ্রকৃতি অনুযায়ী।

আরও পড়ুন: ধ্বংসের দোরগোড়ায় সুন্দরবন: ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও আজকের বিতর্ক

নদীপাড় থেকে কাদাময় তীরের দীকাঞ্চলে কেওড়া (সোন্নারেসিয়া অ্যাপেটালা, সোন্নারেসিয়া ক্যাসিওলারিস) এবং ওড়া (সোন্নারেসিয়া গ্রাফিথি), বড় নদীগুলোর তীরবর্তী অঞ্চলে গর্জন (রাইজোফোরা মিউক্রোন্যাট, রাইজোফোরা এপিকুলেটা), ঝামটি গরান (সেরিওপস ডেকান্ড্রা), মঠ গরান (সেরিওপস ট্যাগাল), কাঁকড়া (ব্রুগুইয়েরা জিমনোরাইজ, ব্রুগুইয়েরা সেক্সাংগুলা, ব্রুগুইয়েরা সিলিনড্রিকা, ব্রুগুইয়েরা পারভিফ্লোরা), গড়িয়া (ক্যান্ডেলিয়া ক্যান্ডেল), ছোট্ট ছোট্ট খাল ও খাঁড়ির তীরবর্তী অঞ্চলে কেওড়া, ধুঁদুল (জাইলোকার্পাস গ্রানাটাম), বাইন (অ্যভিসিন্নিয়া অফিসিনালিস, অ্যভিসিন্নিয়া অ্যালবা, অ্যাভিসিন্নিয়া ম্যারিনা), খলসি (অ্যাজিসেরাস করনিকুলেটাম), ডাবুর (সারবেরা ম্যাংঘাস, সারবেরা অডোলাম), ঝামটি গরান ও হেতাল সহ কালি লতা (পেন্টান্ট্রোপিস ক্যাপেনসিস), বাওলে লতা (সারকোলোবাস গ্লোবোসাস, সারকোলোবাস ক্যারিন্যাটাস) পশুর লতা ইত্যাদি, সরু খাল ও খাঁড়ির তীরবর্তী অঞ্চলে মূলত গোলপাতা জন্মায় (নিপা ফ্রুটিক্যানস)।

আরও পড়ুন: সুন্দরবনে কংক্রিট নদীবাঁধ নাকি প্রাকৃতিক বাঁধ, জোর চর্চা

কাঁকড়া গাছ

সুন্দরবনের মধ্যবর্তী অংশে তুলনামূলক উঁচু জমিতে সুন্দরী গাছের জঙ্গলে কেয়া (প্যান্ডানাস ওডোরেটিসিমাস) ও হরগোজা (অ্যাকান্থাস ইলিসিফোলিয়াস) সহ জাত বাইন (অ্যাভিসিন্নিয়া অফিসিনালিস), কাল বাইন (অ্যাভিসিন্নিয়া অ্যালবা) এবং গেঁওয়া (এক্সোকারিয়া অ্যাগালোচা) সাধারণ নিন্ন বনভূমি ও সুন্দরী গাছের জঙ্গলের মাঝখানের অংশে পাওয়া যায়। সুন্দরী (হেরিটিয়েরা ফোমিস) গাছের জঙ্গল মূলত বাংলা দেশের বনাঞ্চলে দেখা যায় কিন্তু ভারতীয় সুন্দরবনে মাঝখানের দিকে এর উপস্থিতি পাওয়া গেলেও যেতে পারে। তবে সুন্দরী আর এক প্রজাতি হেরিটিয়েরা লিট্রোরালিস অপেক্ষাকৃত বেশি লবণ সহ্য করতে পারায় ভারতীয় সুন্দরবনের পূর্বদিকে খুব অল্প সংখ্যায় পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন: সুন্দরবন ভ্রমণের জায়গাসমূহ

মঠ গরান, ছবি:-প্রবীর দীপু।

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে গত দশ বছরে ২১৫৫ বর্গকিলোমিটার জঙ্গল থেকে ৪৩ বর্গকিলোমিটার কমে ২১১২ বর্গকিলোমিটার এসে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া ’৭০-এর দশকে বহির্বিশ্বে চিংড়ির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরবনের হাজার হাজার একর জঙ্গল ধ্বংস করে পুঁজিবাদীদের হাতে তুলে দেওয়ার ফলে জঙ্গলে ব্যাপ্তি কমেছে এবং বর্তমান সেই সমস্ত ফিশারির জন্য হওয়ার নদীবাঁধের ক্ষতির কারণে বহু জায়গায় সাইক্লোনে বাঁধ ভেঙে ভেসে যাচ্ছে সাধারণ জনগোষ্ঠী এছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে আজ এক-তৃতীয়াংশে এসে ঠেকার ফলে প্রভাব পড়ছে পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ুতে। সুন্দরবনকে খেয়ে খোদ কলকাতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কলকাতার যে অঞ্চলের পিনকোড ৪৯ এবং ৫০, তা আসলে সুন্দরবনের অংশ ছিল। কলকাতা বাঁচানো মানে কি কলকাতার আয়তন আরও বৃদ্ধি? বরং আমাদের ভাবা উচিত, সুন্দরবন বাঁচাও এবং কলকাতার আয়তন হ্রাস করো। ম্যানগ্রোভ রিস্টোর হোক সুন্দরবনকে ফিরিয়ে দিতে। তাহলেই বাঁচব সবাই।

আরও পড়ুন: ভেষজ বিজ্ঞানে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভের ব্যবহার

ম্যানগ্রোভ রিস্টোর হলে সুন্দরবনের সাধারণ জনগোষ্ঠী তার সুফল পাবে এভাবে— ১) কেওড়া ও বাইনের প্রজাতিগুলো রোপণ করার ফলে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির অন্যান্য লতা-গুল্ম এমনিতেই জন্মাবে।

২) সৃষ্ট জঙ্গলের গাছ থেকে পাতা ও বীজ ঝরে পড়ে প্রাকৃতিকভাবে নতুন জঙ্গল সৃষ্টির সহায়ক হবে। পচাপাতা ও ফল মাছের খাদ্য বৃদ্ধি করে মৎস্য বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করবে।

৩) বিভিন্ন হারিয়ে যাওয়া পাখি ফিরে এসে বাস্তুরীতিকে মধুর কাকলীতে সমৃদ্ধ করবে। হারিয়ে যাওয়া বা সংক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া বন্যপ্রাণীরা ফিরে আসবে পাবে খাদ্য ও বাসস্থান।

৪) চরের সেই সমস্ত জঙ্গলে মাছেদের আনাগোনা বাড়বে এবং মৎস্যজীবী পরিবার উপযুক্ত মাছ সংগ্রহের মাধ্যমে জীবিকা টিকিয়ে রাখতে পারবেন। এক কথায় গরিব মানুষ ও মৎস্যজীবীদের জীবিকার শর্ত তৈরি হবে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • সঞ্জিতকুমার সাহা

    সমীরণের লেখায় মাটির গন্ধ।‌‌ খুব ভালো হয়েছে। লেখকের ফোন নম্বর পেলে যোগাযোগ করতাম।

    আমার ফোন নম্বর : ৯৮৩০২৮৩৯৫৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *