ইছামতীতে বিসর্জন বসিরহাটের ঐতিহ্য: করোনায় পড়ল ছেদ

অতনু বসু

“ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ?/ ঠাকুর যাবে বিসর্জন।” ষষ্ঠীতে বোধনের পর থেকে সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী তিনদিন অনেক আনন্দের পর আসে বিজয়া। বাঙালির প্রাণের উৎসবের শেষদিন। মানুষের মনখারাপের দিন কারণ এবার যে মায়ের কৈলাস ফিরে যাওয়ার দিন। তাই সিঁদুরে রাঙিয়ে মাকে বিদায় দিতে প্রস্তুত সকল বাঙালি। উত্তর চব্বিশ পরগনার সীমান্ত শহর বসিরহাটের সকল জনগণ কিন্তু এই বিদায়বেলাকেও আনন্দময় করে রাখতে চান। তাই তাদের কাছে এই বিসর্জন অনুষ্ঠান ও যেন এক উৎসব। বসিরহাটের কোল ঘেঁষে যাওয়া ইছামতী বক্ষে নৌকা নিয়ে বিসর্জন বসিরহাটের এক ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন: দেবী যাক বিসর্জনে

বসিরহাটের স্থানীয় বাসিন্দারা তো বটেই, এমনকী দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন এই ঐতিহ্যের সাক্ষী হতে। আমরা চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর বিসর্জনের শোভাযাত্রা বা কাটোয়ার কার্তিক লড়াইয়ের কথা জানি। বসিরহাটের ইছামতীতে ভাসান এক ঐতিহ্য।

বসিরহাটের সকল ছোট বড় পুজো কমিটি তাদের প্রতিমা নদীর পাড়ে উপনীত করেন। প্রত্যেক পুজো কমিটি নৌকা ভাড়া করে তাদের প্রতিমা নৌকায় তোলেন। নৌকায় কমিটিগুলির ব্যানারও টাঙানো হয়। এরপর শুরু হয় নদী প্রদক্ষিণ। পুজো কমিটির নৌকা ছাড়াও নদীতে দেখা যায় অনেক পারিবারিক নৌকা, যারা নিজেদের উদ্যোগে উৎসবের শেষ আনন্দ নিতে নিজখরচে নৌকা ভাড়া করে নদীতে নেমে পড়েন। ইছামতী ফিরে পায় প্রাণ। আনন্দের জোয়ার আসে নদীবক্ষে। সারাদিন ধরে চলে নদী প্রদক্ষিণ। কেউ কেউ আনন্দের বহির্প্রকাশ করেন নৌকা থেকে নদীবক্ষে লাফিয়ে পড়ে। এক নৌকা থেকে অপর নৌকায় লজেন্স ও মিষ্টি বিতরণের মাধ্যমে হয় শুভেচ্ছা বিনিময়। নদীর পাড়, বাড়ি, হোটেল আর দোকানের ছাদে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। কলকাতা থেকেও বহু মানুষ প্রতি বছর এখানে আসেন এই ঐতিহ্যের সাক্ষী হতে।

তবে ইছামতীতে বিজয়া শুধু যে মানুষের আনন্দের জন্য, তা নয়। এ হল এক সৌভ্রাতৃত্বের প্রতীক। সকল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই উৎসবে যোগদান করেন। নদীবক্ষে ভাসমান নৌকাগুলির মাঝিভাইরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন এই একটি দিনের জন্য। এদের অনেকেই মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত। এনারা প্রত্যেকেই এই উৎসবে মেতে ওঠেন। পুলিশ প্রশাসন প্রতিবার এই উৎসবকে সুষ্ঠুভাবে পালন করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে এবং তাদের নৌকা সর্বক্ষণ নদীবক্ষে টহল দেয়।

যাই হোক বেলাশেষে ধীরে ধীরে যখন সূর্যদেব অস্তমিত প্রায় তখন নদীবক্ষে শুরু হয় আতশবাজি প্রদর্শনী। এরপর শুরু হয় প্রতিমা নিরঞ্জনের পালা। তখন পুজো কমিটির নৌকাগুলি প্রতিমা নিয়ে সাতপাক ঘুরে আচার সম্পূর্ণ করে তাদের প্রতিমা বিসর্জন দেন। এরপর ব্যথিত চিত্তে ‘আসছে বছর আবার হবে’-কে আঁকড়ে ধরে দর্শনার্থীরা পা বাড়ায় তাদের বাড়ির পথে। পুজো কমিটির সদস্যরাও আগামী বছরের ভাবনা নিয়ে ফিরে যায় নিজপথে। গোটা বসিরহাট অপেক্ষায় থাকে পরের বছরের।

তবে এবছর কোভিড-১৯ নামক মারণ ভাইরাসের আক্রমণে আমরা দিশেহারা। এবছর বসিরহাটের ইছামতীতে দেখা গেল না চিরপরিচিত বিসর্জনের দৃশ্য। করোনার কারণে বসিরহাট পৌরসভা এবং পুলিশ প্রশাসন মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, এবছর বন্ধ থাকবে ঐতিহ্যপূর্ণ এই বিসর্জন। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, ইছামতীর পাড় থেকে জলে বিসর্জন দেওয়া হবে দুর্গা প্রতিমাকে। বিএসএফ থেকে জানানো হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশের কেউই জিরো পয়েন্ট থেকে বেরিয়ে ঢুকে আসতে পারবেন না। কয়েকটি মাত্র নৌকা প্রতিমা নিয়ে ইছামতীতে নামবে। সেই নৌকায় লোক ওঠার ক্ষেত্রকেও করা হয়েছে সীমিত। যে নদীর পাড়ে প্রতিবছর বহু মানুষ আসেন, বিসর্জন দেখার সেই ঐতিহ্যে ছেদ পড়ল এবার।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: মৌসুমী নাথ, রাহুল গুহ দাস

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *