হয়ে উঠুন আপন প্রাণের লক্ষ্মীর পূজারি

তিতাস বন্দ্যোপাধ্যায়

মা দুগ্গা তাঁর চার ছেলে-মেয়ে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি রওনা দেন। মেনকা কোনও বছরই তাঁকে আটকে রাখতে পারেন না। নবমী নিশি পোহাতেই সকলের চোখ ছলছল করে। শূন্য মণ্ডপে চারদিনের ধুনোর গন্ধ, ফলের সুবাস ক্ষীণ হতে শুরু করার ক্ষণেই মা লক্ষ্মী আসেন। হাতে ধানের ছড়া, কাঁখে কলসি।

আরও পড়ুন: জনাইয়ের বাকসা গ্রামে…

ছোটবেলা থেকে শুনতাম—

‘কার্তিক ঠাকুর হ্যাংলা
একবার আসে মায়ের সাথে
একবার আসে একলা।’

কী আশ্চর্য ভাবুন, দুর্গার চার ছেলে-মেয়েই একা একা আসেন অথচ দোষ হয় কার্তিকের! তবে ভাই-বোনেদের মধ্যে লক্ষ্মী ঠাকরুনের আদরই মর্ত্যে সবচেয়ে বেশি! তাই তিনি থেকেই যান। আসলে মানুষই তাঁকে রেখে দিতে চায়। তিনি থাকলে গোলা ভরা ধান। সন্তানের পেটে ভাত। সারাবছর জুড়েই তাই তাঁর আরাধনা। কোজাগরী পূর্ণিমার আলোয় মা লক্ষ্মী দেখেন কারা কারা জেগে আছে। যারা জেগে থাকে তারা কৃপা লাভ করে। আমার মনে হয়, এই জেগে থাকার ঐশ্বরিক বিশ্বাসটুকু ছাপিয়ে যা আছে তা হল বোধ, অপচয় না করার বোধ। লাগামছাড়া জীবন, অহেতুক অর্থব্যয় থেকে বিরত থাকা উচিত এই কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া।

আরও পড়ুন: বিজয়া

লক্ষ্মীসরা

যাদের কিছুই নেই, রাস্তায় লুটোপুটি! ঘুপচি ঘরে সংসার। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কালো বস্তির পাঁচালি’ কবিতার—

“মাগো, এত ডাকি খিদের দেবতাটাকে
বেশি নয় যেন দু’বেলা-দু’মুঠো নুনমাখা ভাত রাখে—
তুই আর আমি দুঃখ ভুলবো, ভুলবো পেটের জ্বালা
খিদের দেবতা, সে কী একেবারে কালা?
বাছা রে, আমার অচ্ছুৎ, তাই যেভাবে যতই ডাকো
কোনও দেবতাই বস্তিতে আসে নাকো”

আরও পড়ুন: দেবী যাক বিসর্জনে

ধনদেবী লক্ষ্মী, নেপালের ঐতিহ্যবাহী রঙিন কাঠের ব্লক প্রিন্ট

এই লাইনগুলো যাদের জন্য লেখা, তাদের কাছে লক্ষ্মী হলেন ওই নুনমাখা ভাত। লক্ষ্মীর আদল তখন অপরূপা নারীমূর্তি থেকে হয়ে যায় সাদা ভাতের কণা! ঠিক যেভাবে ঈশ্বরী পাটনী অন্নপূর্ণার কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিল সন্তানের দুধেভাতে থাকার আশীর্বাদ।

তানজোর বড় মন্দিরের অভ্যন্তরের দেওয়ালে দেবী লক্ষ্মীর একটি চিত্রকর্ম

গ্রামের মানুষ লক্ষ্মীকে নিয়েই মেতে থাকে। ভাদ্র মাসে পুজো পান ভাদ্রলক্ষ্মী। আশ্বিনের সংক্রান্তিতে ‘ধান-ডাক’ হয়। এই সংক্রান্তি ডাক-সংক্রান্তি নামেই পরিচিত। আশ্বিন মাসে ধান গর্ভবতী হয়। ভালো ফসলের আশায় মানুষ ফসলভরা মাঠের ঈশান কোণে সমূল সড়কাঠি পুঁতে লক্ষ্মীর পুজো করে।

কার্তিক মাসে কালীপুজোর রাতে দীপান্বিতা লক্ষ্মীর পুজো করা হয়। পয়লা অগ্রহায়ণ ‘মুঠ আনা’ হয়। এও লক্ষ্মীর আরাধনা। ফসল ভরা মাঠের ঈশান কোণ থেকে ধানের গুচ্ছ কেটে শাড়ি জড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে আসে গৃহের কর্তা। লক্ষ্মী জ্ঞানে পুজো করা হয় ওই ধানের গুচ্ছকে।

কলকাতার ভারতীয় জাদুঘরের ভরহুত গ্যালারিতে লক্ষ্মীমূর্তি

অগ্রহায়ণ মাসের মাঝামাঝি ধান কাটা হয়। গরুর গাড়ি বোঝাই করে ধান আসে। নতুন চাল নিয়ে নবান্ন লক্ষ্মীর পুজোর আয়োজন হয়। এরপর আসে পৌষমাস। মাঠের সমস্ত ফসল গেরস্থের বাড়ি আসার মুহূর্তে, শেষ ফসলের গুচ্ছটিকে সযত্নে ‘দাওন’ হিসাবে আনা হয় এবং রেখে দেওয়া হয়। এতদিন ধরে চাষের কাজে যারা যুক্ত থাকে, তাদের সকলকে পেট ভরে খাওয়ানো হয়। এই খাওয়ানোর প্রথাকে ‘দাওন-ভোজ’ বলা হয়। ক্ষেতখামারে কাজ করা মানুষগুলো আনন্দে অধীর হয়ে ওঠে। ধানের গন্ধে, খাদ্যের গন্ধে উতলা হয় চারপাশ। চাল গুঁড়ো করে বানানো হয় পিঠে। এই পৌষমাস গ্রামের মানুষদের কাছে সবচেয়ে স্বচ্ছলতার মাস। প্রাণভরে তাই তারা ডাকে মা লক্ষ্মীকে। পৌষ সংক্রান্তিতে তাঁর পুজো হয়।

সাঁচিস্তূপে লক্ষ্মী

ছড়া কাটা হয়—

“পোষ আসছে গুড়িগুড়ি
পোষের মাথায় চালের ঝুড়ি
এসো পোষ যেও না
জন্ম জন্ম থেকো
আদাড়ে পোষ
পাঁদাড়ে পোষ
বড়ঘরের মেঝেয় বস।
পোষমাস লক্ষ্মীমাস না যেও ছাড়িয়া
ছেলেপুলে ভাত খাবে উদর ভরিয়া।”
গ্রাম্যজীবনের ছড়ায়, প্রবাদে ‘পৌষ’কে ‘পোষ’ বলা হয়।

বাঙালির ঘরের লক্ষ্মীপুজো

মানুষ যা চায়, যেভাবে আনন্দে থাকতে চায়, স্বচ্ছলতার সঙ্গে থাকতে চায়— সেসবই আসলে তার কাছে লক্ষ্মী। দেবত্বের গণ্ডি পার করে তাই বারবার সে একান্ত আপন জিনিসগুলোকে, সুস্থভাবে খেয়ে-পরে বাঁচার মাধ্যম, আয়ের মাধ্যমগুলোকেই লক্ষ্মী জ্ঞানে পুজো করে এসেছে। সঞ্চয় করতে চেয়েছে উত্তরাধিকারদের জন্য।

যেমন— যার জমি আছে, তার জমিটা লক্ষ্মী, যে তাঁত বোনে তার কাছে তাঁত বোনার যন্ত্রটি লক্ষ্মী!

আর যার কিছুই নেই, ধরা যাক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নগরলক্ষ্মী’ কবিতার ভিক্ষুণী সুপ্রিয়া, যে কিনা দুর্ভিক্ষের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও হাল ছাড়েনি। সবাই যখন পিছিয়ে এসেছিল সে জানিয়েছিল দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ করার কথা—

“কহিল সে নমি সবা কাছে—
শুধু এই ভিক্ষা পাত্র আছে।
আমি দীনহীন মেয়ে অক্ষম সবার চেয়ে,
তাই তোমাদের পাব দয়া
প্রভু আজ্ঞা হইবে বিজয়া।

আমার ভাণ্ডার আছে ভ’রে
তোমা সবাকার ঘরে ঘরে।
তোমরা চাহিলে সবে এ পাত্র অক্ষয় হবে,
ভিক্ষা-অন্নে বাঁচাব বসুধা—
মিটাইব দুর্ভিক্ষের ক্ষুধা।”

গজ-লক্ষ্মীর পাণ্ডুলিপি চিত্রকর্ম, আনুমানিক ১৭৮০ খ্রি.

তার ওই মনই হল লক্ষ্মী। অদম্য জেদ, প্রাণশক্তি নিয়ে অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর ওই মন পাক সবাই। মূর্তির লক্ষ্মী ছেড়ে হয়ে মানুষ হয়ে উঠুক আপন প্রাণের লক্ষ্মীর পূজারি।

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

  • অচিন্ত্য রায়

    সব বিষয় গুলোকে স্পর্শ করে গেলি তিতাস ,ভীষণ ভালো লাগলো, আশ্বিনের পর থেকেই তো কৃষকদের উৎসব শুরু হয়- সারকুড়পুজা, গো’পার্বন, সাঁঝপুজা, কুলকুলাতি, ঈতু, তোষলা, নবান্ন তারপর পৌষপার্বন চারমাস পরিশ্রমের পর এযেনও দীর্ঘ আনন্দময় একটা যুগ…

  • এভাবে কখনো জানতাম না, আজ যেন অনেক কিছুই জানলাম।
    ভালো লাগলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *