গীতিকার টানে…

পার্থ কর
সহ-লেখিকা পম্পা গোস্বামী

প্রথম পর্বে অবকাশ পূরক শব্দ হিসাবে ‘না’-এর ব্যবহারের কথা উদাহরণসহ উল্লেখ করেছিলাম আমরা। আরেকটি শব্দের কথা না বললেই নয়— তা হল, ‘ভালো’।
রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন সংকলিত ময়মনসিংহ গীতিকার ৩৫ পৃষ্ঠায় এই ‘ভালো’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে ব্যাখ্যা আছে। সেখানে উল্লেখ করা আছে, এটি একটি অর্থশূন্য অবকাশপূরক শব্দ, যা মূলত ছন্দ রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়।
আমাদের এ পালাতেও শব্দটি আকচার ব্যবহৃত হয়েছে।
সরাসরি এবার মূল গীতে চলে যাচ্ছি—

।। বেহুলা লখীন্দরের পূর্বজন্ম ।।
গীত:

আলাই ঝিঙে তুলতি রাধে রে দংশালো কাল নাগে
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধের গুণে স্বামী বলে আনো ডেকে ওঝা রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধের গুণে শাশুড়ি বলে, খোলো অষ্ট গওনা রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধের গুণে স্বামী বলে ঝাড়ো আর এক মুষ্টি রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধের গুণে ননদী বলে পরাও দেড়ে গামছা রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধের গুণে দেওর বলে করো ঘরের বাহির রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধের গুণে ভাসুর বলে আনো লোকজন ডেকেরে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
পাড়ার লোকজন আসে ওই যে পাকায় সত্তাদড়ি রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধের গুণে শ্বশুর বলে আনো বাঁশ কাটে রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধের গুণে দেওর বলে ন্যাও ডগরার বিলি রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধের গুণে স্বামী বলে নেবো চাকদার ঘাটে রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?

(কথক: এরপর রাধের শব বেঁধেছেদে প্রস্তুত করা হয়।)

আরও পড়ুন: শিকড়ের খোঁজে

মূল স্মৃতিধর নমিতা গাইনের সঙ্গে আরেকজন স্মৃতিধর রেবা গাইন

গীত:
হরিবোল ব’লে ওই যে রাধেরে কান্ধে নেলে রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?

(চাকদার ঘাটে গিয়ে কী কী আনতে হবে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তারপর আবার গীত…)

রাধারে নামায়ে থুয়ে ওই যে গ্যালো ছুতোর বাড়ি রে—
ছুতোর বাড়ি যায়ে ওই যে চন্দন কাঠো আনে রে
চন্দন কাঠো থুয়ে ওই যে গ্যালো গওলার বাড়ি রে
গওলার বাড়ি যায়ে ওই যে ঘৃত কিনে আনে রে
ঘৃত আনে থুয়ে ওই যে গ্যালো তাঁতি বাড়ি রে
তাঁতি বাড়ি যায়ে ওই যে শাড়ি কিনে আনে রে।
[এখানে এক লাইন অন্তর ‘ও মোর রাধে…’ ধুয়ো হিসেবে চলতে থাকবে]

(এরপর শ্মশানে বসে স্বামী ভাবতে থাকেন, সবই তো আনা হল, আর কী কী করার বাকি আছে…)

স্বামী:
রাধার পদ কাটে নিয়ে বানাবো পায়ের খড়ম রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধার হস্ত কাটে নিয়ে বানাবো হাতের ছড়ি রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধার আঙ্গুল কাটে নিয়ে বানাবো হাতের কলম রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধার স্তন কাটে নিয়ে বানাবো হাতের ডালিম রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধার পিঠো কাটে নিয়ে বানাবো গাম্ভীর পিঁড়ে রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধার বুকো কাটে নিয়ে বানাব এক শারিন্দে রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধার দাঁতো কাটে নিয়ে বানাব হাতের কড়ি রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধার নাকো কাটে নিয়ে বানাব হাতের বাঁশি রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধার চোখো কাটে নিয়ে বানাব হাতের ভাঁটা রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
রাধার মস্তক কাটে নিয়ে বানাব হাতের করোয়াল রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?

(এরপর আগুন জ্বালানো, চিতা সাজানো, চান করানো, কাপড় পরানো, সিঁদুর পরানো, ঘি মাখানো, শাড়ি পরানো, ঢাকা দেওয়া ও শেষে চিতায় তুলে দেওয়ার অভিনয় হবে।)

হরিবোল হরিবোল বলে রাধেরে চিতায় তুলে দেলে রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
চিতা জ্বেলে দিয়ে স্বামী আগুনি ঝাঁপ দে’ প’লো রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?
ঝাঁপ দে’ প’ড়ে স্বামী বলে সহমরণে যাবো রে—
ও মোর রাধে আর কে আছে?

আসলে এই পালার উপজীব্য সবকিছু একেবারেই লৌকিক, গ্রাম্য। মাঠ-ঘাট, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড়… সব কিছুর সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকা জঙ্গলাকীর্ণ গ্রামের সরল মানুষদের সরলতর যাপন কথা রয়েছে পালার মধ্যে।
.
[অর্থ/ব্যাখ্যা/ব্যাকরণগত দিক: আলাই – বিপদ অর্থে, গওনা – গয়না অর্থে, চাকদার ঘাট – স্থান অর্থে, গওলা- গয়লা বা গোয়ালা, ডালিম – স্তন অর্থে ব্যবহৃত, শারিন্দে – মাছ ধরার যন্ত্র বিশেষ, ভাঁটা – গোলাকার কোনো বস্তু বোঝাতে, করোয়াল- পাত্র বিশেষ। তুলতি>তুলতে, ন্যাও>নাও, নেলে>নিলে, পলো>পড়লো]
(এরপর রাধে মরে বেহুলা হয়, তার স্বামী মরে হয় লখীন্দর। জলার এ পারে চান্দের বাড়ি, ওপারে মনসা এসে ডাকাডাকি করে।)

গীত:
।। মনসার অভিশাপ ।।

চিড়ে মুড়কি নিয়ে মনসা গ্যালো গাঙের ঘাটে রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
ঘাটে ভালো যায়ে মনসা চান্দেরে যে ডাকে রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?

‘কে ডাকলে চান্দো বলে চিনিতে না পারি রে—’
কেমনে রইবো গৃহবাসে হে?

“আমি তুমার শাশুড়ি চান্দো তুমি আমার জামাইরে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
শিগগির করে করো পার তুমার ভালো হবে রে—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?

ওই কথা না বলে মনসা সনেকারে ডাকে রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?

“কে ডাকিলে সনেকা বলিয়ে চিনিতে না পারি গো—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?

“আমি তুমার মাসিমা তুমি আমার বুনঝি গো—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
শীঘ্র ক’রে করো পারো তুমার ভালো হবে গো—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?

(ওরা দেবী মনসাকে না চিনেই পার করে… পার হয়ে প্রণাম ক’রে আশীর্বাদ চায় দু’জনে)

আরও পড়ুন: সেইসব স্মৃতিধর

তখন সন্ধ্যা, স্বামী রণজিৎ গাইনের সঙ্গে মূল স্মৃতিধর নমিতা গাইন

“দণ্ডবৎ হইগো মাসিমা আশীর্বাদো করো রে—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
“কী আশীর্বাদ করি চান্দো তুমার ছয় পুত মরুকরে—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?

(আশীর্বাদ শুনে চান্দ ভয়ে পালায়। এবার সনেকা এসে প্রণাম করে—)

“দণ্ডবৎ হইগো মাসিমা আশীর্বাদো করো গো—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
“কী আশীর্বাদ করব তুমার ছয় পুতো মরুক রে—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?

(সনেকাও কাঁদতে থাকে)
সনেকা:
“কী আশীর্বাদ করলে মাসি আমার কিসি ভালো হবে গো”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?

(সনেকা কাঁদতে থাকে। মনসা এবার তার ছেলেদের ডাকেন প্রণাম করার জন্য।)

“কে ডাকিলো নাতি বলে চিনিতে না পারি গো—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
“আমি তুমাদের আইমা হই তুমরা আমার নাতি গো—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?

“দণ্ডবৎ হই গো আইমা আশীর্বাদো করো গো—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?

“কী আশীর্বাদ করব তুমরা ছয়ো ভাই-ই মরো রে—”
কেমনে রইবো গৃহবাসে হে?

(সনেকা এবার আরও কাঁদতে থাকে। সে আবারও জিজ্ঞাসা করে—)

“কী আশীর্বাদ করলে মাসি আমার কিসি ভালো হবেরে—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
“আরন্দ পুজো করো সনেকা তাতি ভালো হবে রে—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
“কী কী সজ্জা লাগবে মাসিমা বলে দিয়ে যাও রে—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
“বেলে সিন্দুর, কাঁচা দুগ্ধ, আর ও রুম্বার ছড়া রে—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
কাঁচা হাড়ি, কাঁচা সরা, আরও কাঁচা বারি (ঘট) রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
কাঁচা ঘট, কাঁচা টাটি, আর ও সেজি পাতা রে—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
.
চাঁদ সওদাগরের কাহিনির সর্বাধিক প্রচলিত পালার সঙ্গে এই পালার মূল কাহিনি-কাঠামগত মিল থাকলেও ঘটনা পরম্পরা এবং প্রক্ষিপ্ত এবং বিক্ষিপ্ত বিভিন্ন ঘটনার সংযোজন এটিকে এক আলাদা মাত্রা দিয়েছে। তাই এটি নিজেই একটি স্বাধীন পালা যেমন হয়ে উঠেছে, তেমনি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আরো ছোটো-ছোটো অনেকগুলো পালা— যেগুলো স্বচ্ছন্দে একেকটি স্বাধীন গীতিকা হতে পারে।

[অর্থ/ব্যাখ্যা: পুজোর খুঁটিনাটি তথ্য লক্ষ্যণীয়। রুম্বা – কলা,
টাটি- কাঁচা মাটির খড়ি বা পাত্র, বারি – এখানে কাঁচামাটির ছোটো ঘট জাতীয়]

(এরপর ঘরে ফিরে সনেকা পুজোর আয়োজন করে। মনসা পুজোর কথা জানতে পেরে চান্দ ফিরে এসে দেখে রেগে যায়।)

গীত:
।। ছয় পুত্রের মৃত্যু ।।

“যে হাতে করি পুজো দেব শূলপাণি
সে হাতে পুজো দেব মনসা কানির?

(ঘটে লাথি মারে চান্দ, মনসা ভয় পেয়ে বাগানে লুকিয়ে থাকে। সব গুছিয়ে নিয়ে আবার পুজো করে। সকলে সারারাত জেগে থাকে। সেই ফাঁকে মনসা বিষ ঢালে সর্বত্র। ভোরে উঠে চান করতে যাবে)

গীত:
রান্নাঘরে যাইয়ে মনসা হাড়ি ঢুকঢুক করে রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
হাড়ি ঢুকঢুক ক’রে রে মনসা বিষ ঢালে দেলে রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
নুনের মালায় যায়ে রে মনসা বিষ ঢালে দেলে রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
তেলের ভাঁড়ে যায়ে রে মনসা বিষ ঢালে দেলে রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?

(সারারাত জেগে ছেলেরা চানে যাওয়ার আগে মায়ের কাছে তেল চায়। মা না জেনে রান্নাঘরের সেই বিষাক্ত তেল এনে দেয়।)

“বড্ড খিদে লেগেছে মাগো ভাতো ভালো দেও গো—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
“সারারাত জেগেছ বাবাগো চ্যানো করে আসো গো”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?

(ছেলেরা তেল চায়। মা রান্নাঘর থেকে সেই বিষাক্ত তেল এনে দেয়। তারা মাখে।)

গীত:
“কী তেল এনে দিলে মাগো মাথা জ্বলে গেলো রে—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?”
“টাটকা ঘানির তেলো বাবাগো তাইতো মাথা জ্বলে—”
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
চানো করতি যায়ে কতক পথে ঢুলে পড়ে রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
জলের ঘাটে যায়ে কত কমনি ঢুলে পড়ে রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
আসতি আসতি রাস্তায় কত কমনি ঢুলে পড়ে রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
বাড়ির কাছে আসে কত ঢুলে ঢুলে পড়ে রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
এক গ্রাসো দুয়ো গ্রাসো পাতে ঢুলে পড়ে রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
দু’এক গাল দিতি দিতি অমনি সবাই ঢুলে পড়ে রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
কান্নার সুর শুনে ভালো গ্রামের লোকজন ছোটেরে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
সবাই তখন কান্দতে লাগে চান্দ তখনও ফেরেনিগো—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
পাড়ার লোকজন আসে সবাই জোগাড়যন্তর করে রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
কালিদহে নেবে বলে সবাই বাঁধাছাঁদা করে রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
হরিবোল হরিবোল বলে সবাই কান্ধে তুলে নেলে রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?

(ওদিকে)
নেতো তখন চিন্তা করে, “কীভাবে ওদের বাঁচাব রে—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
জলে দিলি ওদের কারো আর বাঁচানো যাবে না—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?
উরা না বাঁচলি পরে পুজোও পাওয়া যাবে না—
কেমনে রইব গৃহবাসে হে?”
নেতো বলে, “পদ্মাদিদি বুদ্ধি কেনো হারো গো—
বুদ্ধি কেনো হারো?
ওই কালিদ’র জল দিদিগো এক চুমুকি তোলো গো—
বুদ্ধি কেনো হারো?
কালিদয়ে জল না পেয়ে মরা ফেলে যাবে গো—
বুদ্ধি কেনো হারো?
ফেলে গেলি তুমি তখন জিয়েল-শুঁটকি করবা গো—
বুদ্ধি কেনো হারো?”
শ্মশানযাত্রীরা এসে দ্যাখে কালিদয়ে নেইকো জল—
বুদ্ধি কেনো হারো?”
জল না পেয়ে তখন তারা মহাচিন্তায় পড়ে গো—
বুদ্ধি কেনো হারো?
ছ’ ভাইয়ের দেহ তখন তারা কাদায় শুইয়ে রাখে গো—
বুদ্ধি কেনো হারো?
নেতো-পদ্মর বুদ্ধি খাটে দেহ পেয়ে গ্যালো রে—
বুদ্ধি কেনো হারো?
পায়ে দড়ি বেন্ধে চালের বাতায় ঝুলিয়ে রাখে রে—
বুদ্ধি কেনো হারো?
(তারা)
মরলি পুজো পাবে না তাই জিয়েলশুঁটকি করে রে—
বুদ্ধি কেনো হারো?
[অর্থ/ ব্যাখ্যা…: শূলপাণি – শিব, যাতি> যেতে, আসতি> আস্তে , দিতি>দিতে, নেতো – নেতা (মনসার সাথী, বন্ধু, বোন, পরামর্শদাতা), উরা>ওরা, জিয়েল – জ্যান্ত (অর্থাৎ পরবর্তীতে আবার বাঁচিয়ে তোলার পরিকল্পনা)]

(এরপর চান্দ বাড়ি ফেরে, সব শুনে মনের দুঃখে বাণিজ্যে যেতে চায়।)

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদ জেলার সংবাদ-সাময়িক পত্রের দু’শো বছর

সংকলকের গ্রাম

।। চান্দের বাণিজ্য যাত্রা এবং ঔরসে লখীন্দরের জন্মস্বপ্ন পেয়ে পুনরায় ঘরে ফেরা ।।

গীত:
ছোপের বাঁশো কাটে চান্দো পরাইমাঝির বাড়ি গেলো রে—
শুনো আমার কথা।
“শুনো শুনো পরাইমাঝি শুনো আমার কথা রে—
শুনো আমার কথা।
আমি যাবো বাণিজ্যেতে ডিঙি করো সাজন রে—
শুনো আমার কথা।
চোদ্দো ডিঙে চোদ্দো মাজি ঘাটে ভালো আনো রে—
শুনো আমার কথা।

বাণিজ্যেতে চলিল চান্দো রে…..

ডিঙি সাজন ডিঙি সাজন ছ’বৌমা ঘাটে আসে রে—
বাণিজ্যেতে চলিল চান্দো রে।
ছয় বৌমা ছয় বৌমা বড় তড়কা বৌ গো—
বাণিজ্যেতে চলিল চান্দো রে।
“শুনো শুনো তড়কা বউ শুনো আমার কথা—
বাণিজ্যেতে চলিল চান্দো রে।
আমি যাবো বাণিজ্যেতে ভাত গুড়া দুই রাঁধো রে—
বানিজ্যেতে চলিল চান্দো রে।”
“শুনো শুনো শউরঠাকুর যায়ো না বানিজ্যেতে গো—
বাণিজ্যেতে চলিল চান্দো রে।
বারংবার বারণ করি যায়ো না বাণিজ্যেতে গো—
বাণিজ্যেতে চলিল চান্দো রে।
আমরা ছ’জায় রইছি বাবা চিন্তা না করিয়ো গো—
বাণিজ্যেতে চলিল চান্দো রে।
কেউ ভানবো ধান আর কেউ কুড়াবো কাঠো রে—
বাণিজ্যেতে চলিল চান্দো রে।
কেউ ধরাবো আখা আর কেউ রান্ধবো ভাতো রে—
বাণিজ্যেতে চলিল চান্দো রে।
বারেবারে বারণ করি যায়ো না বাণিজ্যেতে গো—
বাণিজ্যেতে চলিল চান্দো রে।”

“ওই না কথা শুনব তড়কা বউ যাবো বাণিজ্যেতে—
আমার পুষ্যাপুষ্যি যায় বাণিজ্যে।”
হাতে তৈলো নিলো চান্দো চানে যাবে ব’লে রে—
আমার পুষ্যাপুষ্যি যায় বাণিজ্যে।
“ওই না কথা কইয়ো চান্দো তৈলো হাতে ক’রে গো—”
আমার পুষ্যাপুষ্যি যায় বাণিজ্যে।
তৈলো মেখে চান্দো চানো ভালো ক’রে করে রে—
আমার পুষ্যাপুষ্যি যায় বাণিজ্যে।
চানো ক’রে আসে চান্দো সাজের ঘরে গ্যালো রে—
আমার পুষ্যাপুষ্যি যায় বাণিজ্যে।
সাজের কাপড় পরে চান্দো ভাত গুড়া দুই খালে রে—
আমার পুষ্যাপুষ্যি যায় বাণিজ্যে।

“শুনো শুনো তড়কা বউ শুনো আমার কথা—
আমার পুষ্যাপুষ্যি যায় বাণিজ্যে।
আমি যাব বাণিজ্যে তুমার শাউড়ি থাকল ঘরে রে—
আমার পুষ্যাপুষ্যি যায় বাণিজ্যে।
চানির সময় হলি তারে চ্যান করায়ে দিয়ো গো—
আমার পুষ্যাপুষ্যি যায় বাণিজ্যে।
খাওয়ার সময় হলি তড়কা ভাত গুড়াদুই দিয়ো গো—
আমার পুষ্যাপুষ্যি যায় বাণিজ্যে।
ঘুমির সময় হলি তড়কা শয্যে পেতে দিয়ো গো—
আমার পুষ্যাপুষ্যি যায় বাণিজ্যে।”

ওই না কথা কইয়ে চান্দো কাঁড়া হাতে করে গো—
আমার পুষ্যাপুষ্যি যায় বাণিজ্যে।
ডিঙিবরণ হবে তাই বউরা শাশুড়িকে নিয়ে আসে রে—
আমার পুষ্যাপুষ্যি যায় বাণিজ্যে।

ডিঙি বরণ করে সনেকা ডিঙি বরণ করে রে—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে। (২)
চান্দো বাজায়ে কাঁড়া ডিঙি ঘাটে বান্ধে রে—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
ডিঙি ছাড়ে চলতি থাকে সব পিছে প’ড়ে থাকে রে—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
এক বাগ ছাড়ায়ে চান্দো আরেক বাগে পড়ে রে—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
স্যাও না বাগ ছাড়ায়ে চান্দো আরেকবাগে পড়ে রে—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে। (২)
তিন বাগ ছাড়ায়ে চান্দো নৌকা বান্ধতে বলে রে—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
“এখনই নৌকা বান্ধতি বলো এত তাড়াতাড়ি কেন রে—”
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
“ডিঙি ভালো বান্ধো পরাই ডিঙি ভালো বান্ধো—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
বড্ড ঘুম আসতেছে মাঝি ডিঙি ভালো বান্ধো রে—”
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
ডিঙি বান্ধে পরাই মাঝি গাঙের সে এক বাগে রে—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
রান্ধা খাওয়া ক’রে চান্দো অমনি ঘুমায়ে পড়ে রে—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
ঘুমায়ে পড়ে রে চান্দো ঘুমায় ডিঙির পরে গো—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
ঘুমায়ে স্বপ্ন দ্যাখে চান্দো ছেলে হল ঘরে গো—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
স্বপ্ন দ্যাখে লখাই নামের ছেলে তার কোলে নাচে গো—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
স্বপ্ন ভাঙে ঘুম ভাঙে চান্দো জেগে ওঠে গো—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
জেগে উঠে চান্দো বলে ডিঙা মাঝি ফেরাও গো—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
মাঝি ছয়ো মাসের পথ আমার ছয় দণ্ডে ন্যাও রে—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
অবাক হয়ে মাঝিরা বলে তিন বাগ পেইরে আলাম গো—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
এখন আবার ফিরতি বলো এমন কথা কেন গো—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
চান্দো বলে শয়নে আমি স্বপ্নে ভালো দ্যাখলাম রে—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
আমার ঘরে লখাই সুন্দর খাটের খুরো ধ’রে নাচে রে—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
এই না শুনে মাঝিরা আবার ডিঙি ঘুরায়ে নেলে রে—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
এক বাগ ছাড়ায়ে চান্দো আরেক বাগে আসে রে—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
স্যাও না বাগ ছাড়ায়ে চান্দো আরেকবাগে আসে রে—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।(আগের মতো)
ঘাটে ভালো আসে চান্দো কাঁড়ায় বাড়ি দেলে গো—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
কাঁড়া শুনে সবাই ছোটে কী ব্যাপার হল গো—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
“কী ব্যাপার শ্বশুরঠাকুর ফিরে আসো আলে গো?”
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
“(আমি)
স্বপ্নে দেখি আমার কোলে লখাই সুন্দর নাচে গো—
বাণিজ্যেতে চললো চান্দো রে।
স্বপ্নে দেখি আমার ঘরে লখাই সুন্দর নাচে গো—
বাণিজ্যেতে চলল চান্দো রে।
দেখি খাটের খুরো ধ’রে লখাই সুন্দর নাচে গো—”

(এরপর ঘাট থেকে সবাই বাড়ি আসে। চান্দ বউমাদের বলে ক্ষার, খোল দিয়ে মাথা ঘষে চান করিয়ে তোমাদের শাশুড়িকে আমার ঘরে দাও।)

গীত:
“ও মা ঠাকরুন চ্যান ক’রে শ্বশুরের ঘরে যাও গো—
শ্বশুরের ঘরে যাও।”
“কী না কথা বললি তড়কা এই না বুড়ো বয়সে…
তোর নায়ের মাথা খায়ে রে।”
“ওই না কথা শুনব ঠাকরুন চ্যান করায়ে আনবো গো—
চ্যান করায়ে আনব।”
“শুনো শুনো তড়কা আমি ছয় ছেলের ওই শোকে রে
পাগল হয়ে যাব।”
“ওই না কথা শুনবো ঠাকরুন যাতি তুমার হবে গো—
যাতি তুমার হবেই।
একটা যদি দেওর হয় আমরা পিত্তিপালন করবো গো—
পিত্তিপালন করব।
[অর্থ/ ব্যাখ্যা: আখা – উনুন বা চুলা, কাঁড়া – ঢাক জাতীয় কিছু , ছোপের বাঁশ – ঝুঁকে পড়া বাঁশ, চ্যান> চান>স্নান (এখনও চ্যান শব্দ প্রচলিত)]

ক্রমশ…

কভার: প্রশান্ত সরকার

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *