লখিন্দরের জন্ম

পার্থ কর
সহ-লেখিকা পম্পা গোস্বামী

ময়মনসিংহ গীতিকার অন্তর্গত মহুয়া পালার প্রথমের বন্দনাগীতিতে আছে ‘ভানুশ্বর’ শব্দটি। প্রণম্য ড. দীনেশচন্দ্র সেন পাদটীকায় লিখেছেন, ভানুশ্বর= ভানুর ঈশ্বর (শিব?)।
বন্ধনীতে জিজ্ঞাসা চিহ্ন, অর্থাৎ তাঁর সংশয় ছিল।
দীনেশচন্দ্রের উল্লেখ থেকে যা বোঝা যায় তা হল, ভানুশ্বরের ব্যাসবাক্য হিসাবে তিনি নির্ধারণ করেছেন— ভানুর ঈশ্বর= ভানুশ্বর। ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস। যেমন দিল্লির ঈশ্বর= দিল্লিশ্বর।

আমরা জানি, কর্মধারয় সমাসে পরপদের অর্থ প্রধান হয় এবং বিশেষ্য ও বিশেষণ বা এইরকম ভাবাপন্ন পদের মধ্যে যেকোনও দুই রকম পদের সমন্বয়ে সমাসবদ্ধ শব্দ তৈরি হয়। আবার তার মধ্যে সাধারণ কর্মধারয় সমাসে ভানুশ্বর-এর ব্যাসবাক্য হয়— যিনি ভানু তিনি ঈশ্বর। এক্ষেত্রে সমাস ও সন্ধির নিয়ম যেমন মান্যতা পাচ্ছে, তেমনই গীতিকার বন্দনাগীতিতে ঈশ্বর হিসাবে সূর্যদেবকেও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হচ্ছে।
আমাদের আলোচ্য এই পালার বন্দনাগীতে ভানুশ্বরের স্থলে রয়েছে ‘উদয় ভানু’ শব্দটি। এই শব্দটিতে পরিষ্কার যে, এখানে উদীয়মান সূর্যেরই বন্দনা করা হয়েছে।
একই আঞ্চলিক পরিবেশে পারস্পরিক প্রভাবযুক্ত দু’টি পালাতে এইরকম তুলনীয় শব্দের মিল থাকাই স্বাভাবিক। এই পালায় প্রযুক্ত উদয় ভানু নিশ্চয়ই ময়মনসিংহ গীতিকার ভানুশ্বর। তাই এই যুক্তিতে ভানুশ্বর বলতে আসলেই সূর্যদেবকে বোঝানো হয়েছে— এই আমাদের নিশ্চিত ধারণা।

আরও পড়ুন: গীতিকার টানে…

কথকের গাঁয়ের ঠাকুরের থান। ছবি লেখক

*
এবারে মূল পালায় ফিরি—
গতপর্বে চাঁদ লখাইয়ের জন্ম-স্বপ্ন দেখে বাড়ি ফেরে এবং বউমারা তাদের শ্বাশুড়িকে শ্বশুরের স্বপ্ন অনুযায়ী আবার সন্তান নিতে উৎসাহিত ও প্ররোচিত করতে থাকে।
ভোমোরা সমস্ত ব্যবস্থা করে এবং চাঁদ শোনে কার আবার মিলন ঘটে এরপর কেটে যায় বেশ কিছুদিন, বোঝা যায় সনেকা গর্ভবতী হয়েছেন। তখন বউমাদের মধ্যে নানারকম ব্যস্ততা শুরু হয়। বড়বউ ছোটবউকে বলে দৈবককে ডেকে আনতে। ছোটবউ বড়বউকেই উল্টে অনুরোধ করে। সেইমতো বড়বউ দৈবকের বাড়িতে ডাকতে যায়। কারণ জিজ্ঞাসা করলে বড় বউ তাকে জানায়, “আমার শাশুড়ির বমি হচ্ছে, হাত গুনাপড়া ক’রে দেখতি হবে কেন এরকম হচ্ছে।”
দৈবক আসে।

।। লখিন্দরের জন্মপূর্ব প্রস্তুতি।।

গীত:

দৈবক এলো ভালো হল আমাদের বাড়ি গো,
গুনাপড়া করে দেখো আমারও শাশুড়ির গো—
দৈবক এলো ভালো হলো..
দৈবক বলিলো গুনায়ে—
তুমার ঘরে জন্ম নিবেন স্বর্ণ লক্ষিন্দর গো—
দৈবক বলিল গুনায়ে।
একো মাসো হলি সনেকার মাটিতে শুতি ইচ্ছা হয়
দৈবক বলিল গুনায়ে।
একো মাসো গেলো সনেকার। দুয়ো মাসো হয় রে—
দৈবক বলিল গুনায়ে।
অঞ্চল পেতে শাশুড়ি সদাই মাটিতে শুতি চায় গো
দৈবক বলিল গুনায়ে।
তিনো মাসো হলি সনেকার খাবড়া খাতি ইচ্ছা হয়—
দৈবক বলিল গুনায়ে।
তিনো মাসো গেলো সনেকার চারো মাসো হয়—
দৈবক বলিল গুনায়ে।
আখার পিঠি হুঁকোর গুল তাইতে দিয়ে সর্ষের ফুল
সখী মোরে এনে দ্যাও খাই।
বরবটি আর কলুই শিম ইলশে মাছের জুড়া ডিম—
সখী মোরে এনে দ্যাও খাই।
চারো মাসো গেল সনেকার পঞ্চ মাসো হয়—
দৈবক বলিল গুনায়ে।
পঞ্চ মাসো হলি সনেকার পঞ্চপ্রাপক পায়—
দৈবক বলিল গুনায়ে।

এরপর বড়বউ ছোটবউকে আদেশ করে, “ওই ব্রাহ্মণ বাড়ি যায়ে (>যেয়ে>গিয়ে) পঞ্চামৃত্ত ক’রে এনে দে।” ছোটবউ, মেজোবউ কেউ রাজি না হ’লে বড়বউ নিজেই যায়, পঞ্চামৃত (পঞ্চ অমৃত) ক’রে আনে। অন্যান্য বউরা জিজ্ঞাসা করে যে, এই পঞ্চামৃত কীভাবে করে… তখন বড় বউ তার উত্তর না দিয়ে বলে, “তুরা জোগাড়যন্তর কর, শান্তিজল করতি হবে। গঙ্গাজলটল সব নিয়ে আয়, আশের পাতা, বাঁশের পাতা শিয়ালের গু তিন ন্যাতা…”
অতঃপর এসব দিয়ে শান্তিজ্বল ক’রে খাওয়ায়।

গীত:
পাঁচো মাসো গেলো সনেকার ছয়ো মাসো হয়—
দৈবক বলিল গুনায়ে।
ছয় মাসো গেল সনেকার সাতো মাসো হয়—
দৈবক বলিল গুনায়ে।
সাতো মাসো হলি সনেকার সাত… হয়—
দৈবক বলিল গুনায়ে।

এবার সাধের অনুষ্ঠান করার পালা। বউরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বড়বউ ছোটো বউকে বলে, “পাড়ায় ব’লে আয়, হাঁড়ি লাগবে। পালমশাইয়ের বাড়ি যাতি হবে, কারণ মেটে হাঁড়ি চাই। এদিকি তাঁতি বাড়িতেও যেতে হবে, কারণ কাপড় আনতি হবে।”
ছোটবউ পালমশাইয়ের বাড়ি গিয়ে ডাকে, “ও পালমশাই ভাই, বাড়ি আছো?”
— আছি, কী ব্যাপার?
— ব্যাপার হচ্ছে, আমার শাউড়ির সাধ দেব। হাঁড়ি-কড়াই গড়িয়ে দিতি হবে, পায়েস রান্না করব।

গীত: (চৌপদি)
কে ডাকলে ভাইসকলরা ব’লে ছিদেম পাল—
বোশেখ মাসে চাক ঘোরে না হয়েছে বেতাল।
কে ডাকলে ভাইসকলরা ব’লে ছিদেম পাল?
ও প্রাণ কুমোরনী তুই ক্যান করোস দেরি? রাজবাড়িতে বায়না পাইছি করিস না দেরি।

মা গেছে মোর ম’রে কে দেবে মোর কাদা ছেনে? আপনার কাদা আপনি ছেনি কীসের অপমান!
কে ডাকলে ভাইসকলরা….

শালাসুমুন্দি গেছে ম’রে, কে দেবে মোর কাদা ছেনে?
আপনার কাদা আপনি ছেনি কীসের অপমান!

ও প্রাণ কুমোরনী তুই ক্যান করোস দেরি?
রাজবাড়িতে বায়না পাইছি করিস না দেরি।

ও কুমোর হতচ্ছাড়া ভারতছাড়া,
আমা বিনে হয় না কি তোর কাদা ছানা!(২)

কুমোরনী রাগ করে। বলে, এত কাদা আমি ছেনতি পারব না— আমার এই রাঙা পায় কাদা ছেনতি পারব না। কুমোর বলে, তুমি রাগ কোরো না, রাজবাড়িতে অনেক টাকা পাবো, তোমারে লরি লরি শাড়ি, আলতা, সিঁদুর, গওনা এনে দিবানে। তুমি কাদা ছেনে দ্যাও।
এরপর দু’জনে ‘হেন্নো হেন্নো’ রব ক’রে কাদা ছেনে। চাকে বসে হাড়িসরা সব গ’ড়ে দেয়।
এরপর ছোটোবউ তাঁতির বাড়ি যায়।
—তাঁতি ভাই বাড়ি আছো?
— কেন?
— আমার একখানা সাধের শাড়ি লাগবে। বুনে দিতি হবে।
— ও মা, (মাকে) রাজবাড়িতে শাড়ি বুনে দিতি হবে, দেবো?
মা সম্মতি দেয়। ছেলে পুনরায় জিজ্ঞাসা করে, মা, বউ আজ কার কাছে শোবে?
— আমার কাছে।
আমি বোনবো না আর ত্যানা
আমি ছিঁড়ে বানায় ত্যানা।

আবার জিজ্ঞাসা করে, মা, বউ আজ কার কাছে শোবে?
— কেন, তোর দিদির কাছে।
— আমি বোনবো না আর ত্যানা
আমি ছিঁড়ে বানায় ত্যানা।
—এ ঝিঙে কিডা রাঁধলে? খাওয়া যায় না!
— তোর দিদি।
— খুব খারাপ, খাওয়া যাচ্ছে না! আর মুলো?
— তোর বউ।
— (হাতে তালি দিয়ে)
হায়রে মুলো তুলো তুলো।
হায়রে মুলো তুলো তুলো।
ও মা, আজ বউ কার কাছে শোবে?
— তোর কাছেই।
— (আনন্দে)
আমি ছেঁড়ব না আর ত্যানা
আমি মন দে’ বুনি ত্যানা।
এরপর শব্দ ক’রে ক’রে কাপড় বুনে দেয়।
এরপর বাড়ি ফিরে সাধের অনুষ্ঠান শুরু হয়। উলু, শঙ্খ, পায়েস রান্নার অভিনয় চলে।

আরও পড়ুন: শিকড়ের খোঁজে

This image has an empty alt attribute; its file name is Lakhindar-2-1024x628.jpg
গীতিকার দেশ। ছবি লেখক

গীত:
সাতো মাসো হয় সনেকার আটো মাসো হয়—
দৈবক বলিল গুনায়ে।
আটো মাসো….. (একই)
নয় মাসো হয় সনেকার দশো মাসো হয়—
দৈবক বলিল গুনায়ে।
তুমার ঘরে জন্ম নিল স্বর্ণ লখিন্দর—
দৈবক বলিল গুনায়ে।

একদিন সনেকার প্রসববেদনা ওঠে। বউরা দাইমাকে ডাকতে যায়।
— ও মা রশি….
— কিডা ডাকছিস রে?
— সরে আসো সরে আসো, তুমার কপালে শুকনো হলদি ঘষি ঘষি… আমাদের বাড়ি এট্টু যাতি হবে। আমার শাশুড়ির প্রসববেদনা উঠেছে, তুমারে নিতি হবে।
— আমি নিকে করব না করব না করবো না…
— তুমারে নিকে করতি হবে না, তুমি…
— এই বুড়ো বয়সে আমি নিকে করবো না…

গীত: (দ্বিপদী)
দাইমা দাইমা ব’লে ডাকলে আমায় কে?
অতি সুখে শুয়ে আছি গোলদুয়োরে।
দাইমা দাইমা ব’লে ডাকলে আমায় কে?
অতি সুখে শুয়ে আছি ছাই গাদাতে।
দাইমা দাইমা ব’লে ডাকলে আমায় কে?
অতি সুখে শুয়ে আছি কচুবাগানে।

— না না, তুমারে যাতি হবেই। সুখ-দুঃখ সবার আছে, যাতি তুমার হবেই।

গীত:

একবার ওঠে একবার বসে দাইমা ধরি চালের বাতারে—
‘দাইমা, দাইমা’ ব’লে আমার প্রাণ কাঁদে রে (২)
কোথায় আছো দরদী দাইমো গো, হেঁটে আসো তুমি—
“দাইমা, দাইমা” বলে আমার প্রাণ কান্দে রে।

দাইমা যায়, কাপড় দিয়ে ঘিরে আঁতুড়ঘর তৈরি হয়। ছেলে হয়। উলু-শঙ্খধ্বনি হয়। এরপর ডাক্তার আনতে হবে। বউরা দাইমাকে নাড়ি কেটে দিতে বলে। বাঁশের চোঁচ আনা হয়। কাটা হয়, বাচ্চা কাঁদে। দাইমা বলে, একটু বেকায়দা জায়গায় লেগে গেছে, তাই কাঁদছে। ঘুঁটের ছাই আর হলদি আনতে বলে। বউরা বলে, তুমি কি ছাগল ছাড়াতি এয়েছো যে এইসব চাচ্ছো!
এরপর পরামানিকের বাড়ি যাওয়া
— পরামানিক ভাই বাড়ি আছো?
(ঐ বউ—) না।
— কোথায় গেছে?
— মেয়ের বাড়ি।
— কবে আসবে?
— পরে।
বউরা যেতে গিয়ে ফিরে আসে। পায় না। একটু পরে আবার এসে—
— কোথায় গেছে?
— ওই পাশে একটু ঘুরতি গেছে।
— তিনবার আসলাম, তাও পাচ্ছিনে!
— খানিক পরে এসো।
খানিক পরে আবার এসে ডাকে। তখনও পরামানিক বাড়ি নেই।
— তুমি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছো কেন? তোমার পিছনে কী?
— ভুরোর বস্তা।
— কই সরে এসো দেখি!
বউরা লাঠি দিয়ে বস্তাটা খোঁচাতে গেলে পরামানিকের বউ ঘুরে ঘুরে বাধা দেয়।
— তুমি এইরকম করছ কেন! ও কি ঢাকার মধ্যে?
— ও হচ্ছে বেরেশ।
— কী করে?
— নাচে।
— নাচাও দেখি। কী করলি নাচে?
— তা ধিনা ধিন, তা ধিনা ধিন ধিনা ধিন তা করলি নাচে। তখন বউরা তা ধিনা ধিদ বলতে থাকলে পরামানিকের বউ বলে,
— তুমি কলি নাচবে না, আমি বললি নাচে।
— এই কথা শুনে সবাই সে বস্তাটাকে পেটাতে থাকে। পেটাতে পেটাতে নিয়ে যেতে চায় বাড়ির দিকে। পরামানিকের বউ তখন বলে, আমারেও নিয়ে যাতি হবে। তখন বস্তার মধ্যে থাকা পরামানিককে পিটাতে পিটাতে বউকে সহ নিয়ে যাওয়া হয় রাজবাড়িতে। আসলে বস্তার মধ্যে পরামানিকই লুকিয়ে ছিল। চান্দের বাড়ি পৌঁছে বস্তা খুলে সে মরার ভান করে।

[দৈবক – জ্যোতিষ, খাবড়া – মাটি, আখা- উনুন, পিঠি – পাশে বা ওপরে, গুনায়ে > গুনে, ত্যানা – কাপড় বিশেষ। বেরেশ – কাজের লোক (গায়েনের কথানুযায়ী), নাগর (তবে আমাদের অনুমান)। বাতারে – বাঁশের শালা বা বাখারি জাতীয়]

আরও পড়ুন: সেইসব স্মৃতিধর

থানের সামনে কথক ও সঙ্গীগণ। ছবি লেখক

।। লখিন্দরের জন্মোত্তর পালা।।
গীত:

অবিচারী দেশে এসে আমার
নাপিত মেরে ফেলে দেছে গো।
তুমরা কিছু আমারে সাহায্য করো,
আমার নাপিত বাঁচায়ে আনি গো।

(পালার মধ্যেই সত্যিকার ভিক্ষা করা শুরু করে নাপিতানী। বেশ কিছু টাকা-পয়সাও উঠবে এখান থেকে। দর্শকদের মধ্যে থেকে কিছু সাজানো দাতা-দর্শকও থাকে। এরপর ওই টাকার ভাগ নিয়ে গণ্ডগোল হবে মধ্যে নাপিত ও নাপিতানীর মধ্যে। দু’জনেই দাবি করে, টাকা তার। নাপিত বলে, সে মরার অভিনয় করেছে তাই তার দাবি বেশি। আর নাপিতানী বলে, সে কেঁদেছে, অভিনয় করেছে বলেই সাহায্য পেয়েছে। অবশেষে তারা সমান দুই ভাগ করে মিটমাট করে নেয়। এরপর তারা খেউরি করে দিয়ে চলে যায়। সবশেষে আসে ডাক্তার। থার্মোমিটার দেয়, ইঞ্জেকশন দেয়, অবশেষে টাকা নিয়ে চলে যায়।
এরপর আসে হিজড়ারা।

(ছন্দে কথপোকথন)
— তুমাদের এদিকে কার বাড়ি বাচ্চা হয়েছে?
— জানিনে।
— শুনলাম চান্দ সদাগরের বাড়িতি?
— তাও পারে হতি।
— কোন দিকি বাড়ি?
— কতি পারিনে।
ঠিক আচে, আমরা খুঁজে নিবানে।
— শোনো, ওই দিকিরি বাড়ি। আমাদের কত বোলো না য্যানে।

তারা চান্দের বাড়ি পৌঁছায়— বাড়ির লোক জানায়, কই আমাদের বাড়িতে তো হয়নি!
এরপর হঠাৎ ক’রে বাড়ির ভিতর থেকে বাচ্চা কেঁদে ওঠে। তখন হিজড়ারা বলে, বাচ্চা আমাদের কাছে নাচাতি দে, নইলি অভিশাপ দেব। ওরা রাজি হয়ে যায়।
এরপর “তেল দে বু, তেল দে” ব’লে’ হিজড়ারা বাচ্চা নাচিয়ে যায়।

হিজড়াদের গান:
১.
ও দিদি লো, খুকা হয়েচে না খুকি হয়েচে? (২)
ছেলের পিসি মেয়ের পিসি খবর পেয়েচে,
ঢাক-ঢোল নিয়ে তারা নাচতি এয়েচে।
ও দিদি লো, খুকা হয়েচে না খুকি হয়েচে?

তিন কড়ি টাকা নেব আরও তাঁতের শাড়ি,
মা ষষ্ঠী বর দিক
বছর বছর এসে যেন গান শোনাতে পারি।
আমি নারীও না পুরুষও না যাযাবর গো বাপ…
আমার এই মানব জনম এক অভিশাপ।
ও দিদি লো… নাচতি এয়েচে।


পিরিতিরই এত জ্বালা
আগে আমি জানতাম না।
পিরিত কইরা এত জ্বালা সই,
(ও সই) আগে আমি জানতাম না!
আমপাতা জোড়া জোড়া,
(ও সই) তেঁতুলির পাতার বিছানা,
পিরিতিরই এত জ্বালা
আগে আমি জানতাম না,
(ও সই) আগে আমি জানতাম না।

মাছ কাটলাম গুটা গুটা সই,
(ও সই) তাতে দিলাম ফুলবড়ি…
সেজে দেওর খেয়ে বলে—
এ কী স্বাদের তরকারি!

আমপাতা জোড়া জোড়া,
(ও সই) তেঁতুলির পাতার বিছানা,
ছোট দেওর শুয়ে বলে—
এ কী স্বাদের বিছানা! (২)
পিরিতিরই… জানতাম না।

{হাতের চুড়ি হাতে রইলো সই,
(ও সই) সিন্দুর পরা হলো কই(না)}
পিরিতিরই… জানতাম না।

দুকানের আয়না দুকানে রইল সই,
(ও সই) আয়না কিনা হল না—
পিরিতিরই… জানতাম না।
[দিকি> দিকে, নাচাতি> নাচাতে, দুকান>দোকান, গুটা>গোটা]
.
কুমোরনি বা নাপিতানির মতো বেশ কিছু মূল পালা বহির্ভূত প্রক্ষিপ্ত পালা যুক্ত হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্যই দর্শকদের মনোরঞ্জন করা অর্থাৎ মূল পালার একঘেয়েমি কাটাতেই এসব ছোট ছোট কাহিনির সংযোজন। তাই এর মধ্যে আধুনিক বাংলার ছাপও লক্ষ করা যায়।

ক্রমশ…

প্রচ্ছদ চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *