ভোজপুরি বিতর্ক: হিন্দি জাতীয়তাবাদ এবং আরও কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা

ড. মাল্যবান চট্টোপাধ্যায়

আজ হিন্দি দিবস, যা নিয়ে একদিকে গর্ব আর অন্যদিকে ক্ষোভ― এই দুই নিয়েই ভারত। হিন্দুস্থানি ভাষা লেখা হবে কোন লিপিতে? এই নিয়ে বিতর্ক শুরু সেই ঔপনিবেশিক কাল থেকেই। শেষমেশ সংস্কৃত ভাষার লিপি দেবনাগরীকেই গ্ৰহণ করা হয়। এই লিপি গ্রহণের ক্ষেত্রে ছিল রাজনীতি আর ব্রিটিশদের ভাবনা। ব্রিটিশরা বিশ্বাস করতেন বিভাজনের নীতিতে। হিন্দুস্থানি ভাষায় কথা বলা লোকজনের মধ্যে বিভেদ আনতে দেববাগরী লিপিকে চাপানোর চেষ্টা শুরু হয়, হারিয়ে যেতে থেকে আগে ব্যবহৃত বহুল প্রচলিত লিপি কাইথি। এমনটাই দেখিয়েছেন আলোক রাই তাঁর ‘হিন্দি ন্যাশনালিজম’ গ্রন্থে। হিন্দি দিবসে দেখা যাক এই বইটির অন্দরমহল। হিন্দি এমনই একটি ভাষা, যার লিখিত রূপ আর মৌখিক রূপের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। মূলত উত্তরপ্রদেশের কিছু অঞ্চলের মৌখিক ভাষাকে মান্য, লিখিত হিন্দি হিসাবে চালানো হয় আর এই সূত্রে হারিয়ে যেতে থাকে আঞ্চলিক ধারাগুলি। বর্তমানে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, এই আঞ্চলিক ধারাগুলি স্বীকৃতির দাবির নিরিখেই। আলোক রাই এদের কথাও বলেছেন তাঁর গ্রন্থে। তাঁর মতে, হিন্দি আসলে বেঁচে থাকবে তখনই, যখন সে তার স্থানীয় বৈচিত্র্যগুলিকে আপন করতে পারবে। কিন্তু এই বৈচিত্র্যকে দূরে সরিয়ে সংস্কৃত-ঘেঁষা এক হিন্দি চাপানোর শুরু ব্রিটিশদের হাত ধরেই, যে ধারাবাহিকতা আজও বিদ্যমান। এই ইতিহাসই খুঁজেছেন আলোক রাই।

আরও পড়ুন: ‘লেখকেরা বড় অভিমানী, তাঁদের আত্মমর্যাদাবোধ একটু বেশি প্রখর’: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

উত্তরভারতের মধ্যভাগে এক দীর্ঘ সময়কাল ধরে হিন্দুস্থানি ভাষাকেই লেখা হত ফার্সি লিপিতে। যা পড়ার ক্ষেত্রে অনেকেরই অন্তরায় হত লিপি। এখানেই আসে সাহেবদের কথা। বিহারের ক্ষেত্রে হিন্দুস্থানি ভাষাকে দেবনাগরী লিপিতে লেখার প্রবক্তা কিন্তু মূলত একজন সাহেব। যার উদ্দেশ্য ছিল অন্য কিছুই। তিনি অ্যান্তনি ম্যাকডোনাল্ড। যাঁর হাত ধরে বিহারের হিন্দুস্থানি ভাষাকে শুধুমাত্র সংস্কৃত ভাষার লিপি দেবনাগরীতে লেখা শুরু হয় ১৮৭০-৮০ এই সময়পর্বে। এর পিছনে মূল ভিত্তি ছিল ব্রিটিশ ভেদনীতি। আলোক রাই গুরুত্ব দিয়েছেন এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে ওপরই। ১৮৫৭ সালের ব্রিটিশ বিরোধী যে কার্যক্রম সিপাহিরা নিয়েছিলেন, সেক্ষেত্রে পরাজিত মুসলিম শাসকদের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তাই এর পরে ভারতীয় জীবনে মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে ব্রিটিশরা কমাতে তৎপর হলেন। এরই অঙ্গ হিসেবেই হিন্দুস্থানি ভাষার লিপিকে ফার্সি থেকে বদলে দেবনাগরী করার কথা উসকে দেন সাহেবরা… যে ভাষার সঙ্গে সনাতন ব্রাহ্মণ্যবাদী ভাবনার যোগাযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। এর সঙ্গে জুড়ে আছে অ্যান্তনি ম্যাকডোনাল্ডের কূটনীতি। আলোক রাই মহাফেজখানা ঘেটে দেখান যে, ১৮৯৭ সালে এই সাহেব একটি রিপোর্টে লেখেন মুসলিমদের ভারতীয় প্রেক্ষিতে গুরুত্ব বৃদ্ধি ব্রিটিশদের জন্য বিপদের।

আরও পড়ুন: শুধুমাত্র একটি কবিতা নয়

তাই প্রশাসনের ক্ষেত্রে মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণকে কমাতে ফার্সি লিপিকে সরিয়ে দেবার মাধ্যমে ঘুরপথে মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ কমিয়ে দেয়। উল্টোদিকে এর বদলে সংস্কৃতকে লিপি হিসেবে হিন্দুস্থানি ভাষার জন্য আনার মাধ্যমে হিন্দুদের কাছে একটা বার্তা দেওয়াটাই যে অ্যান্তনি সাহেবের অন্যতম লক্ষ্য ছিল, তা স্পষ্টতই উল্লেখ করেছেন আলোক রাই। এভাবেই তৈরি হয়েছিল হিন্দুস্থানি ভাষায় কথা বলা জনগোষ্ঠীকে ভেঙে দেবার চক্রান্ত। কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। যেহেতু সেই সময়ে হিন্দির অনেকগুলি কথ্য রূপ ছিল। এই সমস্যায় পড়েছিলেন বেনারস কলেজের অধ্যক্ষ জেমস আর ভ্যালেন্টাইন। ১৮৪২ সালে তিনি এটা উল্লেখ করেছিলেন যে, হিন্দুস্থানি ভাষার কোনও একটা মান্য রূপ নাই। তাই তাঁর পক্ষে হিন্দিতে ছাত্রদের সঙ্গে বাক্যালাপে অসুবিধা হচ্ছিল। কারণ ছাত্ররা তাদের নিজেদের ডাইলেক্ট ব্যবহার করত। যার মধ্যে ছিল ব্রজভাষা, কনউজি, আওয়াধি ভাষা, খড়ি বোলি ইত্যাদি। এর মধ্যে থেকে খড়ি বোলিকেই মান্য লিখিত হিন্দির স্থান দেওয়া হয়। কিন্তু কেন? এর হেতু কি ছিল? এখানেই সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন আলোক রাই।

আরও পড়ুন: অন্যমনস্কতার রঙে ভোরের আলোড়ন

ব্রজ ভাষা বা আওয়াধি ডায়লেক্ট খুবই শ্রুতিমধুর ছিল, কিন্তু তা ছিল কাব্যিকতায় আচ্ছন্ন। কিন্তু খড়ি বোলি খুবই পরিশীলিত বাহুল্য বর্জিত ছিল। সম্ভবত, এটি সাহেবদের জন্যও ছিল সহজপাচ্য। এই প্রেক্ষিতে হিন্দির সঙ্গে হিন্দু ভাবনাকে জুড়ে দেওয়া হয় সুকৌশলে। এমন ভাবনায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে ভারতেন্দু হরিশ্চন্দ্র। যিনি দেবনাগরী লিপি হিন্দিভাষা ও হিন্দু পরিচয়কে জুড়তে চেয়েছিলেন। যদিও এই নীতিতে পুরোপুরি বিশ্বাস করেননি প্রেমচাঁদ। তিনি হিন্দিস্থানি ভাষার অখণ্ড সত্তাকেই আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলেন। তিনি শুধু দেবনাগরী লিপি নয়, জানতেন ফার্সি লিপিও। কিন্তু ততদিনে ফার্সি লিপি ব্যবহার করে হিন্দুস্থানি ভাষাকে দ্বিখণ্ডিত করে উর্দুর বিকাশ শুরু হয়ে গেছে আলাদা ভাষা রূপে। তাই আগের অখণ্ড হিন্দুস্থানি ভাষার পরিচিতি কমতে থাকল আর উঠে আসতে থাকল দেবনাগরী লিপিযুক্ত হিন্দি ভাষা। ১৯০০ সালে আজকের উত্তরপ্রদেশে ব্রিটিশরা কাজের ভাষার স্বীকৃতি দেয়। এর পরেই দেবনাগরী লিপি নির্ভর হিন্দির বিকাশ শুরুর ফলে হারিয়ে যেতে থাকে কাইথি লিপির মতো লিপিগুলি, যা এক কালে লেখা হত। যেহেতু হিন্দু আর হিন্দির মধ্যে একটা সেতু তৈরি হয়েছিল, তাই অনেক স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিও দেবনাগরী লিপি নির্ভর ও সংস্কৃত-ঘেঁষা হিন্দিকেই প্রচার করতে থাকেন জাতীয়বাদের হাতিয়ার হিসাবে। জন্ম নেয় হিন্দি জাতীয়তাবাদী ভাবনা, কোথাও যেন মুসলিম সমাজ এই এক হবার ভাবনাটার সঙ্গে আর নিজেদের মেলাতে পারলেন না। এটাই উদ্দেশ্য ছিল সাহেবদের। বিহারের দ্বারভাঙার মহারাজা লক্ষ্মীস্বর সিং হিন্দিকে প্রচার করলেন নিজেদের পরিচিতি হিসেবে। কিন্তু তিনি যে ভাষাকে প্রচার করেছিলেন ছাপাখানার সাহায্যে বই প্রকাশের মাধ্যমে, তা কিন্তু কোনওভাবেই সাবেক বিহারের ভাষা ছিল না, ছিল উত্তরপ্রদেশের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল এর মুখের ভাষা ‘খড়ি বোলি’। এভাবেই ভোজপুরি, মৈথিলীর জায়গায় বেড়ে উঠতে থাকে খড়ি বোলির চারাগাছ। মহারাজা অত্যন্ত সচেতনভাবেই দারভাঙাতে ছাপাখানা তৈরি করেন। কিন্তু সেখানে মিথিলাক্ষর লিপির বদলে দেবনাগরী লিপিতেই মৈথিলী ভাষার বই ছাপাতে থাকেন। এভাবে স্থানীয় একটি সজীব ভাষা হারাতে থাকে তার লিপি, আধুনিকতার ছাপাখানায় এসে। এর সূত্র ধরেই বাংলা থেকে বিহারকে আলাদা করার ক্ষেত্রে নিজেদের একটা আলাদা পরিচিতি খুঁজে পেয়েছিলেন বিহারবাসী নেতারা। তাঁদের কাছে হিন্দি হয়ে উঠেছিল তাদের সমষ্টিগত পরিচয়। কিন্তু এই ভাবনায় অচ্ছুৎ হয়েই থেকে গেল ভোজপুরি, মুখের ভাষা রূপে। এই ইতিহাসের সন্ধান দিয়েছেন আলোক রাই। বর্তমান প্রেক্ষিতে যখন বিহারবাসী আবার সচেষ্ট হয়েছে নিজেদের স্থানীয় ভাষাগুলোকে বাঁচাতে, তখন বিহারবাসী মানুষজনের মধ্যে আবার শুরু হয়েছে সেই পুরনো অস্তিত্ব খোঁজার লড়াই। তাঁদের উপলব্ধিতে উঠে আসছে হিন্দির সূত্রেই তাঁরা তাঁদের নিজেদের সংস্কৃতিকে আর বাঁচাতে পারছেন না। কারণ বিহারের সংস্কৃতি ঠাঁই পাচ্ছে খড়ি বোলি-কেন্দ্রিক আজকের দেবনাগরী লিপিভিত্তিক হিন্দিতে। এই সমস্যার কথাও কিছুটা ছুঁয়েছেন আলোক রাই। বর্তমানে হিন্দি ভাষাবিদরা যেভাবে ভোজপুরি, রাজস্থানি, মগধি ভাষাগুলিকে ডায়লেক্ট হিসেবে উপস্থিত করছেন, তা কতটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য, তা নিয়ে ভাবতে শেখায় এই বই। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, ভোজপুরি ভাষাকে এখন স্বীকৃতি বিহার সরকার দিয়েছেন, স্কুলে কলেজে নিয়োগ করা হচ্ছে এই ভাষার শিক্ষক, যা হারিয়ে গিয়েছিল দ্বারভাঙার জমিদারদের হাত ধরেই।

আরও পড়ুন: অক্সিজেন সংবেদন

কিন্তু ভারতীয় সংবিধান এখনও মান্যতা দেয়নি এই ভাষাকে। যার মূলে বোধ হয় এখনও কাজ করছে দেবনাগরী লিপি ও খড়ি বোলি উপর ভর করে হিন্দি নামক একটি ভাষার ছাতার তলায় এক হবার মনোভাব। কিন্তু অন্য সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে কতদিন বাঁচবে বা সজীব থাকবে হিন্দি। এই প্রশ্ন তুলেই বইটি শেষ করেছেন আলোক রাই। প্রশ্ন রেখে গেছেন হিন্দির অধ্যাপক, ভাষাবিদদের প্রতি, যাঁরা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সজীব ও প্রাণবন্ত ভাষাগুলিকে হিন্দির ডায়লেক্ট বলেছেন অনেকটা ব্রিটিশদের অনুসরণ করেই।

গ্রন্থের নাম: হিন্দি ন্যাশনালিজম
লেখক: আলোক রাই
প্রকাশক: আরিয়েন্ট ব্যাকশোয়ান
প্রথম প্রকাশ: ২০০১
পুনর্মুদ্রিত: ২০০২, ২০০৭, ২০১৮, ২০২১।

● লেখক আসানসোল গার্লস কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *