ছোটজনের বড় সাফল্য: খেল জগতের বৃত্তান্ত

অনিন্দ্য বর্মন

উইলিয়ামস বোনেদের মধ্যে প্রথম পেশাদার টেনিসে নাম করেন ভেনাস উইলিয়ামস। কিন্তু তাঁর বাবা, রিচার্ড উইলিয়ামস মনে করতেন ভেনাসের থেকে ১৫ মাসের ছোট সেরেনা একদিন ভেনাসের থেকেও বড় মাপের খেলোয়াড় হয়ে উঠবেন। হ্যাঁ, রিচার্ড উইলিয়ামস ঠিকই ভেবেছিলেন। ভেনাসের টেনিস জীবন সত্যিই অসাধারণ। ৭টি সিঙ্গল গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতেছেন। কিন্তু সেরেনা দিদিকে ছাপিয়ে ২৩টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতেছেন এবং তাঁকে সর্বকালের সেরা মহিলা টেনিস খেলোয়াড় মনে করা হয়। কৃতিত্বের দিক থেকে তিনি বহু পুরুষ খেলোয়াড়কেও পিছনে ফেলে দিয়েছেন। উইলিয়ামস বোনেদের মধ্যে যেটা সত্যি যে, ছোট বোন বেশি ভালো খেলোয়াড়, সেটা ক্রীড়াজগতে হামেশাই দেখা যায়।

আরও পড়ুন: শীতের সকালে ৩৬-এর বিভীষিকায় ‘৪২-এর গ্রীষ্ম’ মনে পড়ে গেল

মনে করুন বর্তমানের ক্রুনাল এবং হার্দিক পান্ডিয়া। ছোট হার্দিক দাদার থেকে অনেক বেশি সাফল্য পেয়েছেন। অথবা ইউসুফ এবং ইরফান পাঠান। ছোট ইরফান অনেক বেশি সফল। দাদা শ্যেন-এর থেকে অনেক বেশি সফল ব্রেট লি। ফুটবলে দাদা ফেডেরিকো ইগুয়াইনের থেকে অনেক বেশি সাফল্য লাভ করেছেন ছোট ভাই গঞ্জালো ইগুয়াইন। দাদা জর্ডন লুকাকু-র থেকে অনেক বেশি সফল ছোট ভাই রোমেলু লুকাকু।

আরও পড়ুন: অমল আলোয় ফুটবলার অমল গুপ্ত: কিছু স্মৃতি, কিছু কথা

খেল জগতে ছোটদের বাজিমাত— ঠিক এই বিষয়টি নিয়েই গবেষণা করেন ইউটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক উইলিয়ামস এবং টিম উইগমোর। তাঁদের নতুন বইয়ের নাম ‘দ্য বেস্ট— হাউ এলিট অ্যাথলেটিকস আর মেড’। এই বইটি অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় সব খেলাতেই দেখা গেছে যে বড় ভাই-বোনের থেকে ছোট ভাই-বোনের আধিপত্য অনেক বেশি। এমনকী বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণেও এই বিষয়টিকে সত্যি বলে ধরা হয়। ক্রীড়াজগতে এই বিষয়টির একটি মজার নাম আছে— লিটল সিবলিং এফেক্ট।

আরও পড়ুন: সত্যজিৎ ঘোষ: ফ্ল্যাশব্যাকে আশির দশকের কলকাতা ফুটবল দুনিয়া

অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডার ৩৩টি খেলা পর্যবেক্ষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে। এই গবেষণায় সেরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে অন্য খেলোয়াড়দের তুলনা করা হয়েছে। এবং দেখা গেছে অনেক ক্ষেত্রেই ছোট ভাই-বোনেরা বড়দের থেকে অনেক বেশি সাফল্য পেয়েছে। প্রথমত, এই খেলোয়াড়দের দু’টি ভাগে বিভক্ত করা হয়। এবং সেই অনুযায়ী সমান গড়ে তাঁদের ওপর পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণা চালানো হয়। দেখা যায়, যে পুরুষ এবং মহিলা, দুই ক্ষেত্রেই ছোট ভাই-বোনেদের সাফল্যের মাত্রা অনেকটাই বেশি। ২০১৪-এ, আমেরিকার মহিলা ফুটবল দলগুলির মধ্যে সমীক্ষা করে দেখা যায় যে ৭৫% খেলোয়াড়েরই বড় ভাই-বোন আছে, মাত্র ২০% খেলোয়াড়ের ছোট ভাই-বোন আছে এবং মাত্র ৫% খেলোয়াড় হল একক সন্তান। এর মধ্যে মেগান র‍্যাপিনো, মিয়া হ্যাম এবং অ্যালেক্স মরগান— যাঁরা বেশ পরিচিত নাম, তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের অন্যান্য ভাই-বোনেদের থেকে বয়সে ছোট। অ্যালেক্স মরগান অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডার ৩৩টি খেলা পর্যবেক্ষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে। এই গবেষণায় সেরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে অন্য খেলোয়াড়দের তুলনা করা হয়েছে। এবং দেখা গেছে অনেক ক্ষেত্রেই ছোট ভাই-বোনেরা বড়দের থেকে অনেক বেশি সাফল্য পেয়েছে। প্রথমত, এই খেলোয়াড়দের দু’টি ভাগে বিভক্ত করা হয়। এবং সেই অনুযায়ী সমান গড়ে তাঁদের ওপর পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণা চালানো হয়। দেখা যায়, যে পুরুষ এবং মহিলা, দুই ক্ষেত্রেই ছোট ভাই-বোনেদের সাফল্যের মাত্রা অনেকটাই বেশি। ২০১৪-এ, আমেরিকার মহিলা ফুটবল দলগুলির মধ্যে সমীক্ষা করে দেখা যায় যে ৭৫% খেলোয়াড়েরই বড় ভাই-বোন আছে, মাত্র ২০% খেলোয়াড়ের ছোট ভাই-বোন আছে এবং মাত্র ৫% খেলোয়াড় হল একক সন্তান। এর মধ্যে মেগান র‍্যাপিনো, মিয়া হ্যাম এবং অ্যালেক্স মরগান— যাঁরা বেশ পরিচিত নাম, তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের অন্যান্য ভাই-বোনেদের থেকে বয়সে ছোট।

আরও পড়ুন: পাগলা দাশু মারাদোনা

এমনকী এও দেখা গেছে যে, দুই ভাই-বোনই পেশাদার খেলার সঙ্গে যুক্ত, তবুও ছোটজনের সাফল্য বড়জনের থেকে বেশি। ২০১০-এ ফ্রাঙ্ক সুলোয়ে এবং রিচার্ড জিগেনহ্যাফট নামি বাস্কেটবল লিগে খেলা ৭০০ জোড়া ভাইয়ের ওপরে সমীক্ষা চালিয়েছিলেন। দেখা যায়, ছোট ভাইয়ের সাফল্যের হার প্রায় ২.৫ গুণ বেশি। এমনকী ছোট ভাইদের ম্যাচ খেলার সংখ্যাও বড়দের তুলনায় ২.৫ গুণ বেশি ছিল।

এই লিটল সিবলিং এফেক্টের প্রধান কারণ হয়তো যে ছোটরা তাদের বড়দের দেখে অনুপ্রাণিত হয় এবং তাদের ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এমনটাই ঘটেছিল বাস্কেটবল কিংবদন্তি মাইকেল জর্ডনের সঙ্গে। জর্ডন ভাইদের মধ্যে কনিষ্ঠতম ছিলেন মাইকেল। তাঁর বড় ভাই ল্যারি, যিনি তাঁর থেকে ১১ মাসের বড়, খুব ভালো বাস্কেটবল খেলোয়াড় ছিলেন। তাঁর কাছে মাইকেল কখনোই জিততে পারতেন না। মাইকেল ইএসপিএন-এর দ্য লাস্ট ডান্স শো-তে বলেছিলেন— আমার মনে হয় ল্যারি-র সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না নামলে, আমি আজকের এই সময় এসে পৌঁছতে পারতাম না। যাকে ভালবাসি, তার কাছে বারবার পরাজিত হওয়ায় মনের মধ্যে অন্যরকমের আগুন জ্বলে ওঠে। আমি বাবার কাছে নিজেকে প্রমাণিত করার জন্য বারবার ল্যারি-র সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতাম। আমি চাইতাম, বাবা আমার জেদ এবং খিদেটাকে বুঝুন। সেটা আমাকে আরও সাহসী করে তুলবে। তাই আমি ল্যারি-র থেকে আরও ভালো হওয়ার চেষ্টা করতাম।

এই একই জিনিস স্কটল্যান্ডের মারে পরিবারেও দেখা যায়। যখন বড় ভাই জেমি নামকরা ডাবল টেনিস খেলোয়াড় হয়ে উঠলেন, ছোট ভাই অ্যান্ডি তাঁকে ছাপিয়ে ৩টি সিঙ্গলস গ্র্যান্ড স্ল্যাম খেতাব জেতেন। তাঁদের মা জুডি মারে মনে করেন যে, বড় ভাইকে দেখেই অ্যান্ডি সাফল্যের চাবিকাঠি খুঁজে পেয়েছিল। ছোটবেলায় অ্যান্ডি বরাবর জেমি-র থেকে ভালো খেলার এবং তাঁকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। সবসময় তাঁর মাথায় জেমি-কে হারিয়ে আরও ভালো হওয়ার তাগিদ কাজ করতেন।

জেমি ও অ্যান্ডি মারে

মনের বিকাশের সঙ্গেই, বড় ভাই-বোনেদের বিরুদ্ধে লড়াই শারীরিক শক্তি বৃদ্ধিতেও সাহায্য করে। কথাটা হল যে, যখন পরিবারের একজনের কাছেই বারবার কেউ পিছিয়ে পড়ে, তার জেতার এবং এগিয়ে চলার খিদে আরও বেড়ে যায়। বড়রা সাধারণত তাদের শক্তি এবং সামর্থ্য দিয়ে জেতার চেষ্টা করে। কিন্তু ছোটরা তাদের নকল করতে করতে তাদের হারানোর নিত্যনতুন উপায়ও বের করতে সক্ষম। এর ফলে তাদের সৃজনশীলতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা এবং কৌশল বৃদ্ধি পায়। এবং তারা ধীরে ধীরে নিজেদের অক্ষমতাকে হারিয়ে আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অনেক সময় অজান্তেই, বড়রা ছোটদের উদ্দেশ্যে টিপ্পনী দিয়ে থাকে যা সময়ে সময়ে ব্যক্তিগত ত্রুটি শুধরে দিতে সাহায্য করে। বড়রা যে খেলায় নাম করেছে, ছোটরাও যদি সেই খেলা শুরু করে, তাহলে বড়দের থেকে শিক্ষা এবং প্রতিযোগিতা— উভয়ের সংযুক্তিকরণে ছোটদের সাফল্যের মাত্রা অনেক বেশি বেড়ে যায়।

ভাই-বোনেদের মধ্যে চলতে থাকা প্র্যাকটিস ম্যাচও অনেক সময় খেলোয়াড়কে সাহায্য করে। এই সমস্ত তথ্য লিটল সিবলিং এফেক্টকেই সমর্থন করে। বড়দের সমস্যা হল যে, খেলাটা শেখার জন্য তাদের মা-বাবার ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। কিন্তু বড়দের সঙ্গে খেলতে খেলতেই ছোটরা অনেক কিছু শিখে যায়। এই ক্ষেত্রে মা-বাবারাও একটা বড় ভূমিকা পালন করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মা-বাবারা ছোট সন্তানের প্রতি বেশি স্নেহপ্রবণ হয়ে থাকেন। সেই ক্ষেত্রে ছোটরা অন্যরকমের অনুপ্রেরণা পায়। এমনকী কোনও কারণে যদি কোনও প্রতিযোগিতামূলক খেলায় দুই ভাই অথবা দুই বোন মুখোমুখি হয়, তারা খেলার মধ্যেও একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আমাদের কলকাতা ময়দানে এরকম বেশ কিছু উদাহরণ মেলে। দু’টি অতি পরিচিত উদাহরণ দিই। স্নেহাশিস গাঙ্গুলি ও সৌরভ গাঙ্গুলি, আকবর এবং হাবিব।

কানাডিয়ান এবং অস্ট্রেলিয়ান অ্যাথলেটদের নিয়ে লেখা বইয়ের সহ-লেখিকা মেলিসা হপউড-এর মতে, ছোটরা জানে যে তাদের বড়রা ঠিক কী কী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল। যখন বড়দের সঠিক দিশা পাওয়ার জন্য লড়াই করতে হয়, ছোটরা তাদের বড়দের দেখে সঠিক পথ আগেই নির্ণয় করে নিতে পারে। খেলোয়াড়রা বড়দের থেকেই শিখে নেয় যে কোন পথে গেলে সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছনো যাবে। নরওয়ের ইংব্রিগস্টেন পরিবারে এমনই দৃষ্টান্ত আছে। এই পরিবারের ৩ ভাই-ই ইউরোপিয়ান ১৫০০ মিঃ রেসে সোনার পদক পেয়েছেন। সবথেকে ছোট জেকব ১৫০০ এবং ৫০০০ মিঃ, দু’ক্ষেত্রেই স্বর্ণপদক জয়ী দৌড়বিদ। বড়ভাই হেনরিক বলেন যে, ফিলিপ এবং জেকব আমাকে দেখেই শিখেছে। আমি জীবনে বহু ভুলের শিকার হয়েছি, বা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার ভায়েরা আমার মত ভুল করেনি। প্রত্যেক বছর আমরা একইভাবে প্র্যাকটিস করতাম এবং জেকব আমাদের দেখেই নিজের ভুল শুধরে নিতে পেরেছে।

বর্তমানে, হার্দিক, সেরেনা, জেকব এবং এঁদের মতো আরও অনেক খেলোয়াড়ই লিটল সিবলিং এফেক্টের এক জলজ্যান্ত উদাহরণ।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *