বিমানবন্দর না সবজি-মান্ডি?

কল্যাণ গৌতম

বিমান আমার ক্লাসমেট। বিমান শাণ্ডিল্য। ও থাকত বৈতনিক ছাত্রবাসে, আমি অবৈতনিক বালকাশ্রমে। রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র আমরা দু’জনেই। ছাত্রাবাসে তার ছিল বাগান করার শখ। আর আমি প্রেয়ার-হলে ঘুমিয়ে শাস্তি উপভোগ করতাম বাগান রচনার কাজ করে। এইভাবে হস্টেলে আর আশ্রমে আমরা বেড়ে উঠলাম শ্রীরামকৃষ্ণের দুই মালি-সহচর হয়ে।

আরও পড়ুন: আলু নিয়ে আলুথালু

জানি না, সে জন্মে ওর মানিক রাজার বাগিচার কথা মনে আছে কিনা! “মানিক রাজার আম্রকাননে/ কে ওই শিশু খেলে ফুল্ল আননে”— মন্দিরে গাইলে মনে হত আমিও উনিশ শতকের চারের দশকে পৌঁছে গেছি কামারপুকুর গ্রামের আনাচে-কানাচে। বিমানেরও কী তাই হত!

আরও পড়ুন: গোলপাতা চাষ ও গোল গুড় উৎপাদন হতে পারে সুন্দরবন উপকূলের বিকল্প কর্মসংস্থান

২০১৯ সালের ৪ জুলাই যেদিন নতুনভাবে তৈরি করা মানিক-রাজার উদ্যান উদ্বোধন হল, সেদিন ছুঁয়ে দিলাম ওকে…। বাগান রচনার পূর্বাপরে ওকে ডাক পাঠাল আমার অন্তরাত্মা। আমি ঠাকুরের ডাক পেয়েছি, ভাই, তুমিও এসো; আরও আসছেন মিশ্র দাদা, আরও অনেক পরিচিত দাদা-ভাই; তাদের কথা পরে লিখব অবসর পেলে।

আরও পড়ুন: নবানে কার্তিক ও কার্তিকের কৃষি সম্পৃক্ততা

গদাই ডাক দিয়েছে, ওর খেলার আম-বাগান চাই। কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ কর্তৃপক্ষ বাগানের কিয়দংশ উদ্ধার করে মহারাজরা আমাদের বাগান-বিন্যাসের দায়িত্ব দিয়েছেন। কী কী জাতের আমগাছ থাকবে, কত দূরত্বে রোপণ করা হবে, সাথী ফসল থাকবে কিনা— ইত্যাদি। এ তো তাঁরই লীলাখেলা! রহড়ার মন্দিরে ওই গানটি যখন গেয়েছি, না জানি কতবার স্বপ্ন দেখেছি, আমিও বালক গদাধরের খেলার সাথি! মানিক রাজার আমের শাখায় শাখায় কত না চড়ে বেড়িয়েছি!

যাত্রাপালার অভিনয় হয়েছে গাছের তলে তলে! গানে কথায় অভিনয়ে সে এক ঐশী লীলাক্ষেত্র! “আমারেও নাও/ তোমার খেলায়/ ভাইরে গদাই/ ধরি দুটি পায়।” যিনি ‘সব হয়েছেন’, তিনি শুনেছেন বালকবেলার কথা। কথা রেখেছেন তিনি। আর ওই কবিতাটি আমি সেদিনই ছিঁড়ে কুটিকুটি করে দিয়েছি, ‘কেউ কথা রাখেনি’। কথায় বিশ্বাস থাকা চাই, সত্য সম্পর্ক চাই, ঐশী অনুভব চাই, নইলে সবই শুষ্ক-জ্ঞান— ভস্ করে জ্বলে ওঠে!

বিমান শাণ্ডিল্য আজ ভারতীয় রেলের পদস্থ আধিকারিক; চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ চত্বরে তার প্রশস্ত বাংলো। সেখানে নানান ছন্দে তার উদ্যান রচনা করিয়ে নিয়েছি বলা ভুল হবে, আসলে তিনিই করাচ্ছেন। বিমানের কী শৈশব দিনের ওই ছড়াটি মনে আছে? সুখলতা রাওয়ের লেখা “বাগানের ভারী শখ/ আমাদের বঙ্কু-র/ বিচি পেতে জল দেয়/ বার হয় অঙ্কুর/ অঙ্কুর বেড়ে বেড়ে/ হয়ে যায় গাছ যত/ শাক সীম লঙ্কা/ ঢ্যাঁড়স বেগুন কত!”

ওকে বলেছি বিমানবন্দর পত্তন করতে হবে, ভাই; যা Bird’s View-এর মতোই লাগে দূর থেকে। ছবির বাগান। ‘বন্দর’ মানে মানুষের মেলা, শিক্ষাসত্র। ‘নরেন শিক্ষে দিবে’ যেমন কথা— পুষ্টিবাগানে বিমানবন্দর পত্তন করবে শাণ্ডিল্যের-পুত্র, তেমনই তো কথা!” ‘আপনি আচরি ধর্ম অপরে শিখাইবে।’ বাংলার গৃহে গৃহে পুষ্টিবাগান রচিত হোক; আমি রোজই বলি; রোজই করাই। ভারতের নানান বিমানবন্দরে নামার আগে বন্দরের পাশে নারকেল-আম-লিচুর বাগান দূর থেকে যেমন বোধ হয়, তেমনই লালচে-বাদামি মাটিতে কেয়ারি তৈরি করে বিমানও এঁকেছে বাঁধাকপি, ফুলকপি, গাজরের নৈকট্যের ছবি!

প্রকৃতি দেবতারই কাব্য! এ কাব্য ধানক্ষেতের আল বেয়ে চলতে গিয়ে ঘনকৃষ্ণ-মেঘমণ্ডলের মাঝে ইতিউতি হাওয়ায় বলাকার ধবল-পাখায় দেখেছিল গদাই, সেদিন আমরাও ছিলাম সবাই, তার চিরসাথী হয়ে। আমরা কেউই গদাধর-চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন নই। প্রকৃতিকে, মানুষকে ভালো না বাসলে দেবতাকে ভালোবাসা যায় না। বিমানের সবজি-মান্ডি তেমনই এক প্রকৃতি-মূর্ছনা! মরশুমে মরশুমে ঋতুবৈচিত্র্যে উদ্যান-রচনার যত ছবি আঁকে ‘বঙ্কু’, অনায়াসে তা পাঠিয়ে দেয় কল্যাণ মঠের বঙ্কিমচন্দ্রে। ভুল বললাম; কল্যাণ মঠ বাস্তবে নেই; আছে আমাদের মানস-সরোবরে। আপন সরোবরে স্নান করে যেও, আপন উদ্যানের ফসল কেটো; রাশি রাশি ভারা ভারা।

লেখক কৃষি বিশেষজ্ঞ ও প্রাবন্ধিক

Facebook Twitter Email Whatsapp

5 comments

  • অপূর্ব।
    কিছু বলার ভাষা নেই ❤️

  • ভালো লাগলো বেশ।চেতনা এক আলোই,,তার সর্বত্র ঠাকুর,,।মিশন মিশে আছে,,দেখা,শোনা,বিচার সর্বত্রই। ছবি আর লেখা দুইই চমৎকার। খুব ভালো

  • যদি দৃষ্টি শুদ্ধ হয়,যদি জীবনদর্শন পবিত্র হয়,এ অনুভূতি আসে।সর্বত্র ঠাকুর,,এতো মিশন অনুগ্রহ এ লেখার অন্তরে। খুব ভালো,, খুবই

  • Susanta Kumar Saha

    Excellent endeavor by Kalyan. Wonderfully described, he has a very good hand in writing.
    Biman has always been a lover of gardening and under the guidance of Kalyan, it’s just superb.
    Congratulations to both of you.

  • বিমানের বাগান বেঁচে থাক!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *