বিশকরমের বিশরকম

পার্থ কর

— কোথায় চললি?

— মাঠে।

— কেন রে?

— জানিস না! আজ সেই মেশিন পুজো না?

— ও বিশকরম পুজো?

— হ্যাঁ যাবি তো চ, না হলে পোসাদ পাব না।

— চ চ, কী পোসাদ দেবে রে?

— আরে ওই শসা, তরমুজ, বাতাসা আর খই মুড়ি কিছু থাকতে পারে। আম তো শেষ… চ তো গিয়েই দেখি।

এ হল আমাদের নলা আর বিশের কথোপকথন, একইসঙ্গে তাদের পা চলে মাঠের দিকে। সীমান্তবর্তী উত্তর চব্বিশ পরগনার এ অঞ্চলে বিশ্বকর্মা পুজো মানে অনেকাংশেই ‘মেশিন পুজো’। মেশিন বলতে মূলত মাঠে সেচের জন্য ব্যবহৃত ডিজেল-চালিত ইঞ্জিন। আর যেগুলো সরকারি কারেন্ট চালিত, সেগুলো মোটর। কেউ যদি মেশিনের জলের ধারায় চান করে এসে বলে ফেলে, মোটরে চান করেছি, তাহলে বড়রা খুব হাসাহাসি করেন।

এঁকেছেন অর্পণ নন্দী

মেশিন পুজোর মেশিন মানে সেলাই কল, ধানকল, তেলকল… এইরকম যন্ত্রপাতিও বোঝায় বটে।

যাহোক, ওই জলতোলা মেশিনগুলো ফাঁকা মাঠের মাঝেমাঝেই একেকটা বড় তেলের টিনের ড্রাম দিয়ে কায়দা করে ঢাকা থাকে। তার একটা কাটা অংশ দিয়ে সংযোগকারী নলসহ একপাশে বেরিয়ে থাকে একটা টিউকল।

ওই টিনের ঢাকার উপরে সাজানো হয় পূজার অর্ঘ্য, নৈবেদ্য। ঠাকুরমশাই ছাতা মাথায় কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে নামো নামো করে বলতে থাকেন মন্ত্র—

ওঁ বিশ্বকর্মন্ মহাভাগ সুচিত্রকর্মকারক্ ।

বিশ্বকৃৎ বিশ্বধৃক্ ত্বঞ্চ রসনামানদণ্ডধৃক্।।

মেশিনের মালিকের যদিদং অর্ধেকাংশ ও উত্তরাধিকারী আত্মটুকরোগুলো সবান্ধব একটু দূরে ভিড় করে। পুরুতমশায়ের বড় তাড়া। তা গাঁয়ে নয় নয় ক’রে অন্তত পঞ্চাশটা মেশিন, তাছাড়া বেশ কয়েকটা মোটরসাইকেল, পুনুর মায়ের সেলাইকল, তারপর ধরো মল্লিকদের ধানকল— সেখানেও আয়োজন কম নয়। বিট্টুর বাপের আবার বাজারে সাইকেলের দোকান আছে, সেখানেও যেতে হবে। কিন্তু এই পচা ভাদরের যা তাপ, তাতে রোদ বেড়ে যাবার আগে মাঠের মেশিনগুলোর পুজো সেরে ফেলতে হবে।

— হ্যাঁরে, এই বিশকরম কোন দেবতা রে?

— কেন জানিস না! যনতরপাতির দেবতা।

— তাই! সে আবার কেমন! দুনিয়ায় সব যন্ত্রপাতি উনি বানিয়েছেন নাকি?

— তা নয় তো কি! বাবা তো বলে, এই পৃথিবী, স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালের সবকিছু তিনি তৈরি করেছেন।

— হ্যাঃ, আমাদের পাড়ার রবিকাকার কামারশালায় সেদিন একটা দা তৈরি করতি দিলাম, তাই এই তিনদিন লাগাল! আর এই দুনিয়ার সবকিছু… ধুর ধুর, যতসব গুল!

— ছি ছি, ঠাকুর হয় না! ওর’ম বলতি আছে!

— আরে ভূগোল পড়িসনি, আমাদের এই পৃথিবীর মতো আরও কত কত গ্রহ-নক্ষত্র তারা, আরও কী কী সব বলে… সারা আকাশে রয়েছে! তুই ভাবতি পারচিস, এত জিনিস একা…

— ওই জন্যিই তো দেবতা রে! তোর বিশ্বাস না হয় পুরুতকাকুরে জিজ্ঞেস কর।

— না বাবা, তুই কর। এখন পুজো করতি এয়েচে, কী বলতি কী বলবে!

এদিকে পুজো চলে, একসময় শেষও হয়। পুরুতমশাই তাঁর ঝুলতে থাকা কাছা তুলে কোমরে গুঁজে পায়ের কাদা ঘাসে মুছে উঠে আসেন সবুজ আলে। 

তখনই নলা জিজ্ঞাসা করে, পুরুতকাকু, দেখো না, বিশে বিশ্বাসই করছে না যে, বিশকরম ঠাকুর দুনিয়ার সবকিছু বানান।

— তা করবে কেন! বিশকরম বানাবে কেন, ওদের পাড়ার রোবে কামার বানিয়েছে সব! সর সর— এখনও পঁচাশ জায়গায় যাতি হবে।

নলার বাবাও এক ধমক দেয়, যা, পোসাদ নিয়ে সব বাড়ি যা। এখন ঠাকুর মশাইকে জ্বালাস না তো।

নলা বিশের কানেকানে ব’লে, আরে ছাড়, সন্ধেবেলা তো আজ পড়া নেই। দেবেনদাদুর কাছে সব জিজ্ঞেস ক’রে নেবো।

এঁকেছেন ইন্দ্রজিৎ মেঘ

এই দেবেনদাদু গাঁয়ের চলমান উইকিপিডিয়া। চিত্রাঙ্গদার নামকরণের কারণ থেকে ম্যানহাটন প্রোজেক্টের মিস মোবোতা— সব খবরই তাঁর কাছে পাওয়া যায়। যে যা-ই জানতে চা’ক না কেন, বুঝিয়ে বলাতে তাঁর ধৈর্যের কোনও অভাব নেই। নিজে সংস্কৃতের শিক্ষক ছিলেন, সদ্য অবসর নিয়েছেন— তাই অখণ্ড অবসর তাঁর এখন। ওপার বাংলার যশোহর সংলগ্ন এই এলাকা যশুরে উপাভাষায় সমৃদ্ধ। সঙ্গে আঞ্চলিক উচ্চারণরীতি মিশে এক মিশ্র বিভাষার সৃষ্টি করেছে। তাই একই ব্যক্তি একই বাক্যে একই ক্রিয়াপদের বহু ট্যারাব্যাঁকা রূপ ব্যবহার ক’রে বসেন। দাদুও ব্যতিক্রম নন। এলাকার মানুষকে বোঝানোর সময় এখানকার ভাষাই ব্যবহার করেন, কিন্তু তার মধ্যে বইয়ের কথাবার্তা ঢুকে পড়ে নিজস্ব রূপ ও উচ্চারণেই।

*

এদিকে ততক্ষণে দলটি মাঠের সবুজের পটে রঙিন এক ছোপ যেন। এদিকে সূর্য তখন ঝলমল ক’রে উঠেছে, ধানের পাতায় চিকন সবুজ, গোড়ার জলে খলসে তেচোখো খেলে বেড়াচ্ছে, পাট কাটা প্রায় শেষ— খালে-বিলে তার পচানো ও ধোয়া চলছে। পাটকাঠি আঁটি বেঁধে রোদে সার ক’রে দাঁড় করানো রয়েছে। পুব আকাশ যেখানে মাটিতে মিশেছে ব’লে বিশ্বাস করে নলা, পবা, বিশেরা— সেখানে দু-তিনটে তুলোট মেঘের পোঁচ— দেখলেই মনে পড়ে যায়, আজ ভাদ্র কাল আশ্বিন।

এঁকেছেন অর্পণ নন্দী

— হ্যাঁ রে নলা, এখন কী করবি বাড়ি গিয়ে?

— জানিস, আজ সেইইই… শহরে সবাই খুব ঘুড়ি উড়োয়, জানিস?

— তাই! কেন রে?

— কে জানে! আজ নাকি ঘুড়ি উড়োতে হয়!

সবশেষের শসার কচি টুকরোটা কচমচ করে চিবোতে চিবোতে নলা বলে।

— কিন্তু ওদের সব ঘুড়ি কির’ম জানিস?

— কির’ম?

— আরে সেই বলে না, চিলেঘুড়ি? তাই। কী বিশ্রী, লেজ নেই, বোঁচা!

— ও! সেই যে বাদল একবার একটা বানিয়েছিল? 

— হ্যাঁ, সে তো উড়ছিলই না! ওরা আবার তা নিয়ে কাটাকাটি খেলে, সুতো দিয়ে পেঁচিয়ে টেনে টেনে আরেকজনের ঘুড়ি কেটে দেয়, আর চেঁচিয়ে ওঠে ‘ভোকাট্টা’।

— তুই কী ক’রে জানলি এতসব?

— আরে গতবার এই পুজোয় পিসির বাড়ি গেছিলাম না সোনারপুরে, তাই। আমি তো উড়োতেই পারলাম না!

— ধুর ধুর, আমাদের ঘুড়ির সঙ্গে ওরা পারে! যা হাইটে তুলে দেব না, দেখতিই পাবে না।

এঁকেছেন ন্দ্রজিৎ মেঘ

ওরা এগিয়ে আসে গাঁয়ের দিকে। ঠাকুরমশায়ের পিছুপিছু গেলে আরও প্রসাদ পাওয়া যাবে জানে, কিন্তু বাবা জানলে কান টেনে বাড়িতে নিয়ে আসবে। তাছাড়া আজকাল মেশিনের পুজো অনেকে নিজেরাই করছে। তাদের নিজেদের মধ্যেই প্রসাদ খাওয়াখায়ি চলে। মাঠ থেকে বাড়ির বয়স্ক ও বাচ্চাদের জন্যও অল্পকিছু ফেরে। অবশ্য মাঝরাস্তায় পরিচিত-অপরিচিত কাউকে দেখলে দুব্বো আর কাঠমল্লিকা লাগা দু’টুকরো ফল যে তাঁরা তাদের কোশকরা হাতে তুলে দেবেন না— এমন নয়।

বিশের মামাবাড়ি বর্ধমান। তার অত পুজোটুজোতে মতি নেই, খোঁজখবরও রাখে না। সে কেবল একটা পুজোই বোঝে— পেটপুজো। শেষ বাতাসাটা চিবোতে চিবোতে হঠাৎ সে বলে ওঠে,

— হ্যাঁ রে নলা! মনে পড়েছে! আমি একবার বর্ধমানে মামাবাড়ি গেছিলাম বিশকরম পুজোয়! ওকেনে রান্না পুজো হয়! আগেরদিন রেঁধে রাখে সব, গাদাগাদা রান্না! ওহ্! কী খাওয়া কী খাওয়া।

— তাই নাকি! তা কী কী খেলি?

— অত কি মনে আচে! তবে সবরকম। পুজোর দিন রাঁদবে না বলে আগের দিনের পান্তাভাত, আর মাছ মাংস, সবজি, তরকারি, টক, পায়েস… ওহ্ কত কী!

— চ, ঘুড়ি ওড়াইগে, ভালোই হাওয়া দিচ্ছে। ও পাড়ার শানু কাল আমারডার চেয়েও উপরে উঠিয়ে দিয়েছে! আরও পনেরো হাত সুতো কিনিচি কাল রাতেই বাবারে লুকোয়ে, আজ দেখি শানু কী ক’রে পারে!

— আর দু’জায়গায় পোসাদ খেয়ে গেলি হতো না?

— আরে ওকেনেও কত জায়গায় পুজো হচ্ছে, খেয়ে নিস। আর আমার ঘুড়ির জুতডা বেঁধে দিবি ভালো ক’রে।

— সুতো কোনডা কিনিচিস? মোটাডা তো? তা’লে মাঝের জুত টান ক’রে দিবানে, আর পেট নেবে না। তারপর দেকচি শানুরে!

এঁকেছেন অর্পণ নন্দী

এ অঞ্চলের ঘুড়ি চিলে ঘুড়ি নয়। ছেলেরা নিজারাই বাঁশের শলা, খবরের কাগজ বা নিজেরই পুরনো অঙ্ক খাতার পৃষ্ঠা আর বলগাছের আঠা বা আটার আঠা দিয়ে আয়তকার ঘুড়ি বানায়। উপরের দিকের আড়ের কাঠিটি দু’পাশে ইঞ্চি দু’য়েক ক’রে বেরিয়ে থাকে। কোনাকুনি, মানে গণিতমতে কর্ণ বরাবরও শক্ত নির্মেদ কাঠি বাঁধা হয়, যারা ঘুড়ির ঠিক ভরকন্দ্রে পরস্পর গুণচিহ্ন এঁকে যায়। মাথার ওই বেরিয়ে থাকা কাঠির দু’পাশে ও মাঝখানের বিন্দুতে মোট তিনটে সুতো বেঁধে তাদের মাথা একত্রিত ক’রে গিঁট দিয়ে গণিতমতে একটা সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ তৈরি করা হয় যার মাঝখানের সুতোটি তুলনামূলক ছোটো। এটাই মাঝের ‘জুত’। এটা যত ছোট হবে সুতোয় তত টান পড়বে আর সুতো বাতাসে কম ঝুলবে— মানে, কম ‘পেট নেবে’। কিন্তু নলাপবীয় ভাষায় এতে ‘খুব রিকস্’, কারণ হাওয়া বাড়লেই সুতো ছিঁড়ে যেতে পারে। আবার মাঝের জুত বড়ো হলে লম্বা সুতোও ঝুলেটুলে একশা, ঘুড়ির বেশি উপরে উঠবেই না। কিন্তু সুবিধা হলো বাতাস বাড়লেও ঘুড়ি সহজে কাটবে না।

এইসব ঘুড়ির আকার অনুযায়ী সুতোর মাপ ঠিক হবে। সুতোয় কচাগাছের আঠা ছাড়াও আরও অন্যান্য গাছের আঠা মাখানো হত। এসব মাঞ্জা নয়, সুতোকে শক্ত করা মাত্র। এ ঘুড়িতে কোনও কাটাকাটি খেলা হয় না, হয় উচ্চতার খেলা। যারা আরও দক্ষ, তারা বানায় ‘ডাকঘুড়ি’। ওই উপরের আড়কাঠিটির সঙ্গে ওরই মাপে একটা ছোট্ট ধনুকসম পাতলা চটার টুকরো সুতো দিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। তারপর আতাগাছের ছালের নিচে যে সাদা আরেকটা ছাল থাকে, তা তুলে নিয়ে তা দিয়েও ধনুকের গুণ পরিয়ে দেওয়া হয়। এতে ঘুড়ির মাথাটি পিছন দিকে ধনুকের মতো কিছুটা বেঁকে থাকে। কিন্তু গুণ খুব কড়া করা হয় না, তাতে ঘুড়ি অনেকটা বেঁকে গিয়ে আর উড়তে চাইবে না। আতার ‘ছোটা’র বদলে নাইলনের সারের বস্তার ওই চ্যাপ্টা সাদা ফিতেসম সুতোও চলে, তবে ওটা দিয়ে ডাকঘুড়ি বানানোয় ছেলেমহলে কোনও ওস্তাদি নেই।

এঁকেছেন অলক্তা মাইতি

ওই ফিতেটিতে বাতাস ধাক্কা খেয়ে খেয়ে একটানা তীব্র ঝিঁঝিঁর ডাকের মতো আওয়াজ হবে, বোঝা যাবে ঘুড়ি একখান উড়ছে বটে। কোনও কারণে শব্দ বন্ধ হলেই বুঝতে হবে, কেটে গেছে, নইলে প’ড়ে গেছে।

নলার ঘুড়ির মাঝের জুতে আজ টান দেওয়া হবে। শানুর চেয়ে সুতোর দৈর্ঘ্য কম হলেও আজ সে শানুর উপরে উঠে যাবেই।

দুপুরের আগে একপ্রস্থ আর দুপুরে খেয়েদেয়ে কোনওরকম ভরদুপুর পার ক’রেই সন্ধেতক চলবে ঘুড়ি ওড়ানো। তবে এই পুজোয় ঘুড়ি ওড়ানো এই দিককার গাঁয়ে নেহাতই কাকতালীয়। এখানে ঘুড়ি ওড়ে কেবল চৈত্র বৈশাখে, ফাঁকা মাঠে।

আরেকটা মজার খেলা ছিল ঘুড়িতে খবর পাঠানো। একটা খবরের কাগজ থেকে হাতের তালুর মাপে গোল ক’রে একটা অংশ কেটে তার মাঝে সুতো ঢোকার মতো ফুটো করা হয়। উড়ন্ত ঘুড়ির সুতোকে ওই ছিদ্র দিয়ে ঢোকাতে হবে। কিন্তু ওই ছোট্ট ছিদ্র দিয়ে তো লাটাই ঢোকানো সম্ভব নয়! তাই একটি বিশেষ কৌশল নেওয়া হয়। কাগজটির পরিধির যোকোনও একটা জায়গা থেকে আলতো করে মাঝের ছিদ্র পর্যন্ত ছেঁড়া হয়, বৃত্তমতে সেটা যেন শিশুর হাতে আঁকা, গোল্লা পাওয়া এক আঁকাবাঁকা ব্যাসার্ধ। তারপর টানটান হাওয়ায় থাকা সুতোটি ওই ছেঁড়া দিয়ে কেন্দ্রে পৌঁছে যায়, যেন সুতোয় ফুল গাঁথা হল। ছেঁড়া আঁকাবাঁকা হওয়ায় সুতো আর বেরোবার পথ পায় না, উপরন্তু ততক্ষণে হাওয়া কাগজটিকে সুতো বরাবর ঘুড়ির দিকে ওড়াতে থাকে। সে এক দেখবার মতো দৃশ্য। কিছুটা উপরে উঠতেই সুতোকে আর দেখা যায় না, কেবল দেখা যায় একটা গোলাকার কাগজ যেন হাওয়ায় ডিগ্রি ষাটেক কোণ ক’রে ভাসতে ভাসতে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে।

এঁকেছেন অর্পণ নন্দী

একে এই শানুনলীয় ভাষায় “খবর পাঠানো” বলে।

শেষমেশ ওই কাগজ পৌঁছে যায় ঘুড়ির বুকে সেই জুতের কাছে। এতে ‘খুব রিকস্’, ওই কাগজ যদি জুতের সঙ্গে জড়িয়ে যায় তবে ঘুড়ি গোত্তা মেরে প’ড়ে যাবে তক্ষুনি।

এদিককার মাঠে-ঘাটে এখন পাট পচার গন্ধ, পাটকাঠি শুকানোর শ্বেত-শুভ্র দৃশ্য। বাঙালির পাব্বনের এই মাসে পাটের এক বিরাট ভূমিকা রয়েছে। এই যে সামনে মহালায়া, আর তারপরেই দুগ্গা পুজো— এর আত্মস্বজন বাচ্চাকাচ্চা-বায়না আর শখ আহ্লাদের খরচ বেশিরভাগটাই এই পাটই জোগাবে। পুজোর আগে তাই চাষিরা তক্কে তক্কে থাকেন, দাম একটু উঠলেই পাট ‘ছেড়ে দেবেন’ তাঁরা। অনেক সময় মহাজনের কাছ থেকে পাটের জন্য অগ্রিম দামও নিয়ে থাকেন তাঁরা পুজোর খরচ চালানোর জন্য। সেক্ষেত্রে পরে দাম বাড়লেও চাষি তা পাবেন না বলেই চুক্তি থাকে।

আকাশ ঘন নীল আর মেঘে তুলো লেগেছে মানেই মেঘবালিকা সাবালিকা হয়ে উচ্ছ্বাস সংবরণ ক’রে গম্ভীরা হয়েছেন— এমত ভাবা বড় ভুল। পুজোর আগে আগে তা-ও ধরো দু’তিন বার তার কান্না পাবে। আর সে কি যেমনতেমন কান্না! সারাদিন মুখগোমড়া ক’রে ইনিয়েবিনিয়ে কান্না। নিঃশব্দে বুকের পাঁজরগলানো কান্না— তার মধ্যে একটা ক্ষণের জন্যও একটু আলোহাসি দেখা যায় নাকো!

তখন নলা পবা বিশেদের ভয় হয়, পুজোও বুঝি এমন ভিজে যাবে! তা যায়ও দু’একবার, কমিটির ‘সব্য’রা তখন অষ্টমী দু’দিন আর নবমী দেড়দিন করার জন্য পুরুতমশাইকে পাকড়ে ধরেন। তারপর কোথা দিয়ে কী হইয়া যায়— দেখা যায় বিভিন্ন অজুহাতে ত্রয়োদশীতে গিয়ে বিসর্জন হচ্ছে।

যাক সেসব।

কারণ ওদিকে দ্যাখো নলা আর বিশে সন্ধেয় হাজির দেবুদাদুর দরবারে!

এঁকেছেন ইন্দ্রজিৎ মেঘ

— বিশকরম কি যা তা দেবতা রে! শুনলে তো বোমকে যাবি রে!

— তাই তাই? বলো বলো!

— তোরা রামের কতা শুনিচিস তো? সেই যে হরধনু ভঙ্গ ক’রে  সীতেরে বে ক’রে নিল…

— হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠাম্মার মুকে শুনিচি কত!

— তা ওই হরধনু বানালো কিডা জানিস?

— কিডা? বিশরকম ঠাকুর?

— বিশরকম না বিশকরম! হ্যাঁ তিনি না তো কে!

— অ দাদু, হর মানে তো শিব, তা সেডা রামের কাচে এলো কী ক’রে?

— লে! সেতো বিরাট এক গপ্পোরে! সে কি শুনার ধৈর্য আচে তুদের?

— গপ্পো শুনবো না বলো কি! শুনতিই তো আইচি দাদু। বলো বলো..

— শোন, বিশ্বকর্মার এক মেয়ে সজ্ঞার বে হয়েচিলো সূয্যিদেবের সঙ্গে। তা সে কি সুয্যির তাপ স’তি পারে! তখন বিশ্বকর্মা তাঁর শানচক্র দিয়ে সূয্যির ওই তাপের অংশের আটভাগের একভাগ কেটে ফ্যালে।

— বাপরে! কী শক্তি!

— আরে পাগলা, তার কি আর আমাদের মতো ছোটাছুটি করে কাজ করতি হয়! তাঁর হাত-পা-মুখ মাথা সর্বত্র ব্যাপিয়া রয়েছে। ধর ঘরের মাঝখানে তুই কিছু জিনিসপত্র নিয়ে গেড়ে বসিছিস। তোর কাছে কেউ এটাওটা চাইছে, যেন সবজি বাজারে সবজি বিক্রি করছিস তুই… একটু টুকটাক হাত চালিয়েই কাজগুলো করে দিতি পারবিনে?

— তা পারব।

— তা আমাদের বিশ্বকর্মার কাছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এইসব কাজকর্ম করাও ঐ টুকটাক কাজের মতোই। ও কিছুই না।

— বাহ দারুণ বললে তো দাদু! তা যাক তারপরে সেই গল্পটা বলো, সূর্য কেটে ফেলার…

— তা কেটে তো ফেললেন, টুকরোটা যাবে কোথায়? পড়বি না পড়, সে এসে পড়ল পৃথিবীর ঘাড়ে। কী করা যায়, কি করা যায়… টুকরোটা নিয়ে অমনি তাঁর মাথায় বুদ্ধি খেলে গেলো, সেই জ্বলন্ত টুকরো থেকে তিনি বানিয়ে ফেললেন দেবতাদের সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র।

— বাব্বা! সেইজন্য বোধহয় ওদের অস্ত্রশস্ত্রে অত তেজ, না?

— হুম, তারপর শোন। একই সময়ে তিনি দু’খানা একইরকম ধনুকও বানিয়ে ফেললেন। একটা দিলেন শিবকে, তাঁর নাম পিনাক। আরেকটা দিলেন বিষ্ণুকে, মানে নারায়ণকে। শিবকে দিয়েছিলেন ত্রিপুর নামক এক বদমাশ অসুরকে বধ করার জন্য। এদিকে জানিস তো, আমাদের প্রধান দেবতা তিনখানা— ব্রহ্মা, বিষ্ণু আর শিববাবা।

এদিকে শিব আর বিষ্ণুর কাছে একই রকম ধনুক দেখে ব্রহ্মা ভাবলেন, যাই, এঁদের মধ্যে কে শক্তিশালী একটু পরখ ক’রে আসি। দিলেন দু’জনের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে।

— অ্যাঁ! সে কী! সে তো ভয়ংকর অবস্থা হবে!

— হ্যাঁ তাই হতি যাচ্চিল আর কি! কিন্তু হঠাৎ কী ক’রে যেন দৈববাণী হল— এ যুদ্ধে ভয়ংকর পরিণতি হবে। সেজন্যিই দু’জনেই সে ধনুক পরিত্যাগ করলেন। শিব পৃথিবীতে ফেলে দিলে সেই ধনুক কুড়িয়ে পেলেন আমাদের রামচন্দ্রের বাপ দশরথের পূর্বপুরুষ দেবরথ। সেটাই পরে চ’লে গ্যালো দশরথের হাতে।

— আরেকটা?

—  আরেকটা বিষ্ণু দিয়ে দিয়েছিলেন ঋচিক মুনিকে। তাঁর থেকে পরবর্তীতে পান তাঁর পৌত্র বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম।

— সে ধনুকের কি নাম ছিল?

— সে ধনুকডার নাম ছিল শার্ঙ্গ। তবে আরকেটা মত শোনা যায় যে, শিব আর নারায়ণের যুদ্ধের শুরুতে  নারায়ণ ‘হুং’ মন্ত্র উচ্চারণ করতেই শিব এবং তাঁর পক্ষের সব দেবতা অসাড় হয়ে যান, অনেকটা ঠিক প্যারালাইসিসের মতো! তখন স্বাভাবিকভাবেই ব্রহ্মা নারায়ণকে জয়ী ঘোষণা করেন। সেই রাগে আমাদের শিববাবা তাঁর ধনুক ছুড়ে ফেলেন পৃথিবীতে।

— সে যা হোকগে, তারপর বলো।

— পরশুরামও তাঁর ওই ধনুক নিয়ে রামের সঙ্গে পাঙ্গা নিতে গিয়েছিলেন। রামকে নাকি বলেছিলেন ওই ধনুকের গুণ পরাতি।

— সে আবার কী!

— লে! ধনুকে টান ক’রে ছিলা বাঁধিসনি বুঝি!

— বেঁধেছি তো কত!

— ওটাই তো গুণপরানো! ধনুকের বডি শক্ত হলি গুণ পরানো কেমন কঠিন হয় জানিস তো!

— সে আর জানিনে! কদিন আগে তো পবা পায়ের ফাঁকে চেপে ছিলা লাগাচ্ছিলো, ছুটে গিয়ে খুব খারাপ জাগায় যা লাগা লেগেছিল না, হি হি হি…

— তালেই বোঝ, ওইরকম ভয়ংকর ধনুকেও রাম গুণ পরিয়ে ছেড়েছিল!

— তা হোক, তুমি বিশকরমের কতা বলো আরও।

— এ সবও তাঁরই কতা তো।

— এত জোয়ান দেবতা, তা উনার বাপমা কারা ছিল দাদু?

— শোন, সেই বলে না, নানা মুনির নানা মত? সেই হয়েছে অবস্তা! কোথাও বলা আছে, ব্রহ্মার নাভি থেকে তাঁর জন্ম। আবার ভবিষ্যপুরাণে বলা আছে, অষ্টবসুর সাত নম্বর যিনি, মানে প্রভাষ— তাঁর আর বরবর্ণিনীর ছেলে তিনি।

— বড়বরনিনি?

— হুম, তিনি হলেন আবার দেবগুরু বেস্পতির বুন। আবার এ-ও প্রচলিত আছে যে বিশ্বকর্মার মা হলেন যোগসিদ্ধা বা বরস্ত্রী, যিনি নাকি বেস্পতির মেয়ে।

— ইয়ে, দাদু ও থাক তা’লে, বরঙ বিশরকম ঠাকুরের অন্য গপ্পো বলো।

 — তাও তো বেস্পতি কে, তা এখনও বলিনি। আচ্ছা বলছিস যখন সে গপ্পো না’য় পরেই হবে। তা তুরা কি জানিস, তিনি এই সারাদুনিয়া জুড়ে কত কী বানিয়েছেন?

— না, বলো তো। এই বিশে, মন দিয়ে শোন।

— এই যে আমাদের দেবদেবীর যত অস্ত্রশস্ত্র, সব— তাঁদের যত বাহন, মানে যে যা চড়ে ঘুরে বেড়ান আরকি, সেসব… তারপর ধর ঋষি অগস্তের ঘরবাড়ি, সেই কৈলাসে মা লক্ষ্মীর ক্যাশিয়ার কুবেরবাবুর সমস্ত প্রাসাদ, স্বর্গের সমস্ত কনস্ট্রাকশন, তারপর মহাভারতের ইন্দ্রপ্রস্থ, হস্তিনাপুর, দ্বারকা.. সব তাঁর হাতেই নাকি তৈরি।

—বাবা কত কী !

— তাছাড়া আমাদের এই এলাকার একটা ভাসান গানে আমি পেয়েছি, চাঁদ সদাগর গিয়ে সাঁতালি পর্বতে লক্ষ্মীন্দরের লোহার বাসর গড়ে দেবার জন্য কত অনুনয়বিনয় করছে!

— দিল?

— হ্যাঁ, দিল তো! কিন্তু মনসার ভয়ে ফুটোও রাখতে হল!

— ও সেই বেহুলার গপ্পো?

— হুম। তারপর ধর সেই যে রাম-রাবণের যুদ্ধের সময়ে সমুদ্রের উপর ব্রিজ বানিয়ে ফেলল— কিডা বলতো? তোর নামের সঙ্গে খুব মিল আছে নলা।

— ওহো, হ্যাঁ, ঠাম্মার মুখে শুনিচি, নলবানর! কিন্তু সে তো বানর!

— বানর হলি হবে কী, তিনি কিন্তু আসলে বিশ্বকর্মার ছেলে। না হলি আর অত বড় ইঞ্জিনিয়ার হয়!

— কিন্তু বিশ্বকর্মার ছেলে বানর হবে কী ক’রে? 

— আসলে বিশ্বকর্মার এক মেয়ে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। তাই নিয়ে একটা ঝামেলায় পড়ে গিয়ে কেস খেয়ে অভিশপ্ত হয়ে বিশ্বকর্মা বানর হয়ে গিয়েছিলেন কিছুদিন। তাই সে তার সেই সময়কার সন্তান হয়েছিল বানর।

— বাপরে বাপ! দেবতা বটে একখান! আচ্ছা দাদু বিশ্বকর্মা তাহলে এসব জিনিসপত্র বানানোর দেবতা?

— না, তিনি কিন্তু কমবেশি কৃষিরও দেবতা। কারণ তাঁর বানানো জিনিসপত্র দিয়েই তো কৃষিকাজ চলে। তারপর শ্রাবণ-ভাদ্র বর্ষায় ফসল ফলে ওঠে জোরদার, ভাদ্রের শেষ দিকে ফসল ঘরে ওঠার মতো হয়ে যায়, তাই একরকম ঠাকুরকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য ভাদ্রের শেষ দিনটিরে বেছে নেওয়া হয়। তাই কৃষকরাও শামিল হয় এই পুজোয়।

— তাহলে তো আর কিছু বাকি থাকলো না দাদু, সব কাজেই দেখছি তেনার হাত আছে।

— হ্যাঁ তা একরকম বলতে পারিস। তাহলে আরেকটি ছোটো গল্প শুনে রাখ এই ফাঁকে। বিশ্বকর্মা আরেকবার অভিশপ্ত হয়ে মর্ত্যে ব্রাহ্মণ ঘরে জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁরই অভিশাপে অভিশপ্ত ঘৃতাচীর সঙ্গে বিবাহের ফলে তাঁদের নয় সন্তান হয়। তাঁরা নয় শিল্পে পারদর্শী হয়ে ওঠে। কী কী শোন— পুষ্প শিল্প, লোকশিল্প, মৃৎশিল্প, অলংকার শিল্প, শঙ্খশিল্প, বয়ন শিল্প, কাংসশিল্প এবং দারুশিল্প।

— মানে পোস্কার বোঝা যাচ্ছে, সব শিল্প ওঁদের গুষ্টিরাই তৈরি করেচে,  না দাদু?

— দাদুরে, ভাষা তো আমিও তুদের মতোই বলি, তাও এট্টু শুদ্দু করে বলার চেষ্টা করতি হবে, বুঝলি? গুষ্টি শুনতি বড্ড খারাপ লাগে, আসল শব্দডা হল গোষ্ঠী।

— হি হি হি, ওই হল! অ দাদু, এবার পালাব, তার আগে বলো, শহরের লোকজন আজ ঘুড়ি কেন ওড়ায়? 

— আর বলিসনে, একেনেও সেই নানা মুনির নানা মত। তবে সবচেয়ে প্রচলিত যেটা তা হল, পুরাণ মতে বিশ্বকর্মা হলেন দেবতাদের ইঞ্জিনিয়ার। মোটামুটি ১৮৫০ সাল থেকেই বঙ্গদেশে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন হয়। তখনকার দিনের বেশ কিছু ধনী ব্যক্তি নিজের অর্থ-প্রতিপত্তি দেখানোর জন্য ঘুড়ির সঙ্গে টাকা বেঁধে আকাশে উড়োতেন। এমনও শুনা যায় অনেক রাজা-জমিদার নাকি টাকা জুড়েজুড়ে আস্ত ঘুড়ি বানিয়ে আকাশে ছেড়ে দিতেন। তাছাড়া আগেই তো বললাম, বিশ্বকর্মা দেবতাদের আকাশ-রথগুলোও বানাতেন। তাই বলা চলে বিশ্বকর্মার ওই উড়ন্ত রথকে স্মরণ করতি গিয়েই, তাঁর পুজোর দিন ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন শুরু হয়।

— ও! ঘুড়িগুলোও তো একেকটা যন্তরই, না দাদু?

— হ্যাঁ, তা নয়তো আর কী। যা এবার পালা, নইলে তোদের বাপমা এবার আমারেই তেড়ে আসবে।

— হ্যাঁ দাদু, যাই। কিন্তু তার আগে বলো, এই যে এতো এতো ঠাকুর দেবতা, আর তেনাদের গল্প, সব সত্যি?

— সত্যি বা মিথ্যে— কোনওটা বলার সাহসই আমার নেইরে ভাই।

— সেটা আবার কী রকম!

— দ্যাখ, যা আছে কিনা জানিনে, তা নেই বলি কী ক’রে? একে বলে শূন্য অবস্থান।

— সেটা আবার কির’ম কতা হল!

— মানে, কোনও কিছু আছে, সেটা যেমন বিশ্বাস করি না, তেমনি সেটা যে নেই, তাও বিশ্বাস করি না।

— দূর দূর! সব গুলিয়ে যাবে। যাই, পালাই।

— সেই ভালো, পড়াশুনা ক’রে বড় হলে সব বুঝতি পারবি।

এঁকেছেন ইন্দ্রজিৎ মেঘ

সেই রাতে তাদের আর ঘুমই আসতে চায় না। ঘুড়ির খেলায় শানুকে আজ মাত ক’রে দিয়েছে নলা ওরফে নলিনী। বিশে অন্তত সাত জায়গা থেকে ভরপেট প্রসাদ খেয়ে দুপুরে ভাতই খায়নি। তাদের দু’জনের চোখে এই দ্বিবিধ সদ্যসুখস্মৃতির উপরে মেদুর হাত বোলাচ্ছিল দেবেন দাদুর আজকের গল্পগুলো। শেষ রাতে তারা কখন ঘুমিয়ে পড়ে টেরও পায় না। কিন্তু ঘুমোলে কি আর দেখা যায় না?

যায়, ঠিকমতো দেখলে অনেক বেশি বেশি দেখা যায়।

এই দ্যাখো না আমাদের বিশে ওরফে বিশ্বনাথবাবু দেখছেন, তাঁর পাড়ার রবি কর্মকার পুরুতমশাইকে সেই দাখানি নিয়ে উদোম তাড়া করেছে। পুরুতমশায় কাছা ধ’রে আল দিয়ে দৌড়াচ্ছেন। ধানক্ষেতের ধারে ওদিকে শানু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, তার ঘুড়ির আবার চারটা হাত।

হঠাৎ যেন একটা হাতির ডাক শুনতে পাওয়া গেল! তার মনে পড়ে গেল দেবুদাদু বলেছিলো, বিশকরম ঠাকুরের বাহন হল হাতি।

এরপরই হঠাৎ চারিদিকে অন্ধকার হয়ে গেল। বিট্টুর বাবার সাইকেলের দোকানে রাখা একটা ছোট্ট আকারের বিশ্বকর্মা ঠাকুরের কার্তিকহেন মূর্তির মতো অসংখ্য ছোট ছোট জীবন্ত বিশ্বকর্মা ঠাকুর হাতির পিঠে চলেছে, সমস্ত পথ ধ’রে, অলিগলিতে। একজন চলেছে তাদের পাড়ার কামারশালায়, কয়েকজন মাঠের জল তোলা মেশিনের দিকে, কেউ কল টিপে জল তুলছে, কেউ পুনির মা’র সেলাই কলটা মেরামত করে দিচ্ছে। আরেকজন বিশ্বকর্মা বিশেরই ভেঙে যাওয়া সাইকেলের ক্যারিয়ারটা ঠিক করে দিচ্ছে। অন্ধকারের মধ্যে এরকম অসংখ্য ছোট-ছোট আলোর মূর্তি যেন ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।  প্রতিটি কলকারখানায়, কৃষকের চাষের যন্ত্রপাতি রাখার ঘরের দিকে, সেলাই মেশিনে, সাইকেলে, এমনকী প্রতিটি গৃহস্থ ঘরের কোণে কোণে রাখা দৈনন্দিন কাজের সমস্ত জিনিসপত্রের দিকেও সেই আলোককণাগুলো এগিয়ে চলেছে।

বিশের ঘুম ভেঙে যায়। নিস্তব্ধ রাতে বাইরে ঠান্ডা হয়ে আসা ভোরপূর্ব অন্ধকারে তখন শারদশিশিরে ভিজে উঠেছে ধানের পাতা, পরিষ্কার আকাশে আগামী আশ্বিনের আলো।

ঋণস্বীকার: রামায়ণ, মহাভারত, বিভিন্ন পুরাণ, সমার্থ শব্দকোশ, উইকিপিডিয়া, বন্ধুপ্রতিম দিদি তুষ্টি ভট্টাচার্য।

প্রচ্ছদ ছবি অনিশা বসাক

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *