নীল ফিতের জুতো

দীপ্তেন্দু  জানা

গলায় তুলসীর মোটা মালা। মাথায় তেল  জবজবে পরিপাটি চুল। সত্যেন্দ্র ওরফে সত্য ওরফে সোতু জুতো সারাই করে। হাওয়াই চটির ফিতে বদলায়… স্যান্ডেলে তালি-তাপ্পি দেয়… সেলাই করে আর বুট জুতো ঘষে-মেজে পালিশ করে চকচকে চিকনাই করে তোলে। শুধু যে জুতো নিয়েই কারবার ঠিক তা নয়, সোতু সিক ভাঙা ছাতাও মেরামত করে।

পাকাপোক্ত কোন দোকান নেই সোতুর। ফুটপাথেই একটা কাঠের বাক্স আর জুতো সারানোর সাজসরঞ্জাম নিয়ে বসে পড়ে সে। মাথার উপর পেল্লাই একটা ছাতা টাঙিয়ে। তবে মাস দেড়েক হল দোকান গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। কি এক নতুন রোগ এসেছে। করোনা। দেশজুড়ে তাই লকডাউন। রোজই হাজার হাজার লোক মারা যাচ্ছে পৃথিবীজুড়ে। প্রাণের ভয়ে ইঁদুরের মতো গর্তে লুকিয়ে পড়েছে সব মানুষজন। কে যে কখন এই ছোঁয়াচে রোগের খপ্পরে পড়ে বলবার জো-টি নেই।

সোতুও ঘরেই রয়েছে এই ক’দিন। ঘর বলতে ছিটেবেড়ার। শহর থেকে একটু দূরে। পরিবার বলতে হেঁশেল আর গোয়াল সামলানো ঝগড়ুটে বউ আর কলেজে পড়া এক মেয়ে। মেয়ে সাইকেল চড়ে গ্রামেরই এক বাড়িতে টিউশন পড়াতে গেছে। বউ গোবর চটকে ঘুঁটে দিচ্ছে ছিটেবেড়ার দেওয়ালে। সতু বসে বসে ছিপ ফেলছে তারই ঘর লাগোয়া মণ্ডলদের পুকুরে।

মাছ টোপও গিলছে। ফাতনাও নড়ছে। কিন্তু তখন থেকে একটা মাছও ধরতে পারেনি সোতু। মাছগুলো বোধ হয় বুঝতে পেরেছে সোতুর বয়স হয়েছে। তাছাড়া ধরবেই বা কী করে? মাছ ধরায় কি মন আছে তার! ফাতনার বদলে তার চোখের সামনে শুধুই ভেসে উঠছে সেই দু’খানি পা।

আরও পড়ুন­: কাঙ্ক্ষিত আঁধারে

পাকা গম রঙের ধবধবে দু’টি পা। ধুয়ে যাওয়া আলতার হালকা দাগ পা দু’টিকে আরো মোহময়ী করে তুলেছে। মেয়ে বড় হওয়ার পর থেকে কতদিন যে সোতু তার বউয়ের সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমোয়নি তার হিসেব নেই। কিন্তু যেদিন বছর পঞ্চাশের সোতু প্রথম দেখেছিল পা দু’খানি লকডাউনের ঠিক আগেটায়, সেদিন থেকে তার মরে যাওয়া শরীরে আবার বিদ্যুতের জোয়ার বইছে। 

“কি মাছ ধরেছ বাবা?” মেয়ের ডাকে হুঁশ ফেরে সোতুর। “নারে কিছুই ধরতে পারিনি”, বলতে বলতে ছিপ গুটিয়ে উঠে পড়ে সোতু। সেই জুতো জোড়ায় আবার হাত বোলাতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করছে ছুঁয়ে আদর করতে। সারানো কোথাও বাকি রয়ে গেল কি না দেখতে হবে। ঘরে ফিরে জুতো সারানোর কাঠের বাক্সটা টেনে বের করে সে। কিন্তু প্লাস্টিকের ব্যাগে মোড়া সেই জুতো জোড়া খুঁজে পায় না সে। সে চেঁচিয়ে ওঠে, “কালই তো  জুতো জোড়া সারিয়ে রেখেছিলাম এখানে। গেল কোথায়?” সোতুর গলা পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে তার বউ। বউকে দেখতে পেয়ে সোতু আবার জিজ্ঞেস করে, “এখানে এক জোড়া জুতো সারাই করে রাখা ছিল। কোথায় গেল জানো কিছু?” খ্যারখ্যারে গলায় সোতুর বউ বলে ওঠে, “জুতোর খবর আমরা কি তা জানি? তুমিই জানো!”  

“দোকান খুললেই জুতো জোড়া খোদ্দেরকে ফেরত দিতে হবে। জানো না? জুতো যদি না পাই সবক’টাকে জুতোপেটা করে ছাড়ব।” মেজাজ গরম হয়ে ওঠে সোতুর। তখনই সোতুর মেয়ে কলতলা থেকে চান সেরে এসে বাবাকে জিজ্ঞেস করে, “এই জুতোগুলো?” মেয়ের পায়ে নীল ফিতেওয়ালা সেই জুতো জোড়া দেখে মেয়ের গালে ঠাস করে চড় বসিয়ে দিল সোতু, “এই জুতো তুই কেন পরেছিস মুখপুড়ি? খোল। খুলে ফেল বলছি।” মেয়ের পায়ের দিকে আর তাকিয়ে থাকতে পারে না সোতু। জুতো জোড়া পুকুরের জলে ছুড়ে দিয়ে সোতু ঘরে ঢুকে খিল এঁটে দিল। 

কী থেকে কী হল বুঝতে পারল না সোতুর বউ আর তার মেয়ে। বন্ধ দরজার দিকে তারা শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *