ব্রজেন দাস: দ্য কিং অফ চ্যানেল

Brojen Das

মিত্রাংশু ব্যানার্জ্জী

সময়টা ১৯৯৭ সালের নভেম্বর মাস। ঢাকায় তখন বেশ ঠান্ডা পড়ে গেছে। সুইমিং ক্লাবগুলো প্র্যাক্টিস বন্ধ করে দিয়েছে মাসের প্রথম থেকেই। তার মধ্যে সন্ধেবেলার আলো-আঁধারিতে এক যুবক সাঁতার প্র্যাক্টিস করে চলেছেন এক মনে। সেই প্র্যাক্টিস থেমেছিল টানা ৫০ ঘণ্টা পরে। কিন্তু তাতেও যেন তার মন ভরছিল না। কেউ বুঝতে পারছিলেন না কেন এই যুবক কোন অদম্য জেদ নিয়ে ওই ঠান্ডা জলের মধ্যে প্র্যাক্টিস করে যাচ্ছেন। ১৯৫৮ সালের ২৭ মার্চ। তার লক্ষ্যকে সামনে রেখে সেই যুবক নেমে পড়লেন আরও কঠিন প্র্যাক্টিসের জন্য। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা থেকে মুন্সিগঞ্জের ধলেশ্বরী-পদ্মা ও মেঘনা নদী হয়ে চাঁদপুর পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৫ মাইল তিনি সাঁতরে পাড়ি দিয়েছিলেন। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে তা ছিল এক অসম্ভব এবং দুঃসাহসিক ঘটনা। জানতে ইচ্ছে করছে কি কে এই অদম্যপ্রাণ মানুষ?

আরও পড়ুন: নয়া প্রটোকল আমেরিকার: ম্যাচের আগে জাতীয় হকি লিগের প্রত্যেক খেলোয়াড়কে করোনা টেস্ট

বুলটিস কাপের গ্রুপ ছবিতে একদম নীচের সারিতে বাঁ দিকে ব্রজেন দাস

তিনি আর কেউ নন বিখ্যাত বাঙালি সাঁতারু ব্রজেন দাস। যিনি ছিলেন ইংলিশ চ্যানেল পার করা প্রথম বাঙালি, প্রথম এশীয়ও বটে। আর আজ তাঁর ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। আজ চেষ্টা করব কালের নিয়মে ধুলো পড়ে যাওয়া এই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানুষটির সম্বন্ধে কিছু গল্প বলতে।

পঞ্চমবার চ্যানেল টপকে ডোভার তটে

অনেকেই হয়তো বলবেন যে, তিনি ছিলেন স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান তথা পরে বাংলাদেশের নাগরিক। কিন্তু আমার কাছে তিনি সবার আগে একজন বাঙালি এবং এপার বাংলা হোক আর ওপার বাংলা বাঙালির পরিচয় একটাই সে একজন বাঙালি। আর সবথেকে বড় কথা খ্যাতির চরম সীমায় পৌঁছেও তিনি নিজেকে বাংলাদেশি নয়, বাঙালি বলেই পরিচয় দিয়ে এসেছেন। তার গল্প শুধু সাঁতারের গল্প নয়, তার গল্পে পরিপূর্ণভাবে মিশে রয়েছে জাতীয়তাবোধ। বিংশ শতকের শুরু থেকেই যে স্পোর্টস ন্যাশনালিজম এর জন্ম ঘটেছিলো। ব্রজেনের ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার ইতিহাসও তারই ফসল।

আরও পড়ুন: বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সরব বার্সেলোনা

ফ্রান্সের উপকূলে প্রথমবার চ্যানেলে নামার আগের মূহূর্তে

১৯২৭ সালের ৯ ডিসেম্বর। মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরের অন্তর্গত কুচিয়ামোড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ব্রজেন দাস। সেখানেই প্রাথমিক স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে ১৯৪৬ সালে ঢাকার কেএল জুবিলি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইএ এবং বিএ পাশ করেন তিনি। ছেলেবেলা থেকেই সাঁতারের পারদর্শী ছিলেন ব্রজেন। তাঁর সাঁতারের হাতেখড়ি ঘটেছিল বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা ধলেশ্বরী নদীতে। মাঝেমধ্যেই সাঁতরাতে সাঁতরাতে না সময়ের ঠিক থাকত, না দিকের। ধলেশ্বরী থেকে তিনি পৌঁছে যেতেন উত্তাল বুড়িগঙ্গায়। সেখানেও চলত সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া একটা দামাল ছেলের বেঁচে থাকার আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। ১৯৪৪ সালে গ্রামের বাড়ির এক বিশাল পুকুরে অবিভক্ত ভারতের বিখ্যাত সাঁতারু প্রফুল্ল ঘোষ এর সঙ্গে এক প্রদর্শনী সাঁতারে অংশ নিয়ে তিনি নিজের সক্ষমতা অনুভব করতে পেরেছিলেন। তখনই বুকে সাঁতারু হয়ে ওঠার বীজ বপিত হয়। ১৯৫২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সাঁতার প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে তিনি প্রথম হন।

১৯৪৭এ দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে পরিকল্পনাগত সাঁতারের কোনও ব্যবস্থাই ছিল না। শিক্ষাজীবন শেষে ঢাকা ফিরে গিয়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ক্রীড়া ফেডারেশনকে বার্ষিক সাঁতার প্রতিযোগিতা চালু করতে উদ্বুদ্ধ করেন। বলা যায় তারই অনুরোধে ১৯৫৩ সালে বাংলাদেশ আয়োজিত হয়েছিল এক বিরাট সাঁতার প্রতিযোগিতা। শুধু ৫০ ঘণ্টার টানা সাতারই নয়, ১৯৫৭ সালের ১৬ আগস্ট ঢাকা স্টেডিয়ামে ১৫ ঘণ্টা ২৮ মিনিটে ২৬ মাইল সাঁতার কেটে তিনি আরও একটি রেকর্ড তৈরি করেছিলেন। তাঁর সাঁতার কাটার স্টাইল সবার মনজয় করেছিল। তাঁর সম্পর্কে বলতে গিয়ে মর্নিং নিউজ পত্রিকায় লেখা হয়… Style has a peculiarity in it. He makes the body float and whats up the speed by rolling the body. This time has some advantages. The wave thus created gives a streamish trend water and the obstruction is less.

দেশের মধ্যে তখন ব্রজেনের মতো ভালো সাঁতারু আর দু’টো নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকারের থেকে বারবার তার ভাগ্যে জুটেছে লাঞ্ছনা এবং বঞ্চনা। ১৯৫৬ সালের নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে আয়োজিত অলিম্পিক গেমসে পাকিস্তান থেকে যে সাঁতারু দল পাঠানো হয়েছিল, ব্রজেন দাসের নাম তাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি আর এই বঞ্চনা থেকেই তার মনে জন্ম নিয়েছিল এক অদম্য জেদের। তিনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার। পরবর্তীকালে প্রায় পঁচিশ বছর পরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করতে না পারার দুঃখ মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, (ভাষাগত জটিলতা এড়াতে ভাষার কিছু রদবদল করেছি।) …১৯৫৫ সালে পাকিস্তান জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১০০ ২০০, ৪০০ এবং ১৫০০ মিটার ইভেন্টে আমি অংশগ্রহণ করেছি এবং সবেতেই প্রথম স্থান অধিকার করেছি। ইতিপূর্বেই আমার সুনাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পুরো পাকিস্তানে। সাঁতারে আমি একমেবোদ্বিতীয়ম। পরের বছর অস্ট্রেলিয়ায় অলিম্পিকের আসর। পাকিস্তান থেকে বিভিন্ন বিভাগে খেলাধুলার দল গঠন করা হল। বিশেষ করে গতবছর যাঁরা চমৎকার পারফরম্যান্স করেছেন, তাঁদেরকেই বিশ্ব অলিম্পিকে সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্বভাবতই আমার নিশ্চিত ধারণা আমি সাঁতার দলে থাকবই। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আমাকে দলভুক্ত করা হল না পরিবর্তে পশ্চিম পাকিস্তানের সাঁতারুদের নেওয়া হল। আমার মন ভেঙে গেল, তথাপি কিছু করার বা বলার নেই। তবে আমার মনের দারুণ জেদ চাপল। কিছু একটা করার প্রবল ইচ্ছে হল। সাঁতারে চমকপ্রদ এমন একটা কিছু করতে হবে, যাতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের টনক নড়ে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম। কিন্তু কী করি! দিন কেটে যায় রাত হয়, রাত কেটে হয় দিন। একদিন রোজকারের মতো খবরের কাগজ পড়ছিলাম। কলকাতার কোন এক পত্রিকা পড়তে পড়তে হঠাৎ এক জায়গায় চোখ আটকে গেল। খবরটা খুব মন দিয়ে বারবার পড়লাম। কেন-না কোন এক সাঁতারু চারবার প্রচেষ্টা চালিয়েও ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অথচ তাঁকে নিয়ে ঢালাওভাবে লেখা হয়েছে। আমার মনে এটা দারুণভাবে দাগ কাটল। তাছাড়া ইংলিশ চ্যানেলের নাম আগে কখনও শুনিনি। ভাবলাম এইটা অতিক্রম করতে পারলেই বোধহয় কিছু একটা করা যাবে। তাৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম আমাকে এটা অতিক্রম করতেই হবে। অথচ তখনও এর সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না ফলে দারুণভাবে খোঁজখবর নিতে লাগলাম এবং শেষে খবর পেয়ে গেলাম সেই ব্যক্তির, যিনি চার বার ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি ভারতের লোক। আমি ভারতে গেলাম এবং সেখানে গিয়ে চ্যানেল সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারলাম। এবং সেখান থেকেই আমার সংকল্প আরও দৃঢ় হয়ে উঠলো। আমি তখন তদানীন্তন ক্রীড়াঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তি এস এ মহাসিন ভাইয়ের শরণাপন্ন হলাম। তাকে আমার মনোবাসনার কথা খোলাখুলি বলতেই তিনি যেন আকাশ থেকে পড়লেন এবং আমাকে এব্যাপারে ভাবার জন্য আরও কিছুদিন সময় নিতে বললেন। কিন্তু আমার মনে তখন জেদ চেপে গেছে। এ জেদ শুধু সাঁতারের জেদ নয়, এ জেদ বাঙালি হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের মুখে সজোরে চপেটাঘাতের জেদ। পশ্চিম পাকিস্তানিরা প্রতিটি ক্ষেত্রে ছলে বলে কৌশলে বাঙালিদের পিছিয়ে রাখছে এর মাঝেই আমাদের জাগতে হবে, কিছু করে দেখাতে হবে যাতে তারা বুঝতে পারে বাঙালিদেরও প্রতিভা আছে। আমার দৃঢ় সংকল্পের কথা বুঝতে পেরে উনি রাজি হয়ে গেলেন এবং আমাকে চ্যানেল অতিক্রমের যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিতে উঠে পড়ে লাগলেন। অস্বীকার করব না সেই সময় সাংবাদিক বন্ধুরা আমার জন্য যথেষ্ট করেছিলেন। অদম্য উদ্যমের সঙ্গে আমি প্র্যাক্টিস করে যেতে থাকি। আর অপেক্ষা করতে থাকি সঠিক সুযোগ ও সময়ের। আর একদিন সত্যিই চলে আসে সেই সুযোগ। ১৯৫৮ সালে হঠাৎই দেখি আয়োজিত হতে চলেছে বিলি বাটলিন’স চ্যানেল ক্রসিং সুইমিং কম্পিটিশন। আমি পাখির চোখ করি তাকেই।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য ১৯৫৮ সালের ১৯ মে, ব্রজেন ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার আগে নিজেকে আরও ভালোভাবে যাচাই করার জন্য তিনি নেপেলস থেকে ক্রাপি আইল্যান্ড পর্যন্ত ৩৩ কিলোমিটারের এক দূরপাল্লার সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেন এবং তৃতীয় স্থান অধিকার করেন।

আবার ফিরে আসি তাঁর বর্ণনায়।… ৮ আগস্ট রাত পৌনে দু’টো। এখনও শিহরণমূলক সেদিনের কথা মনে পড়লে মনে হয় যেন এই তো সেদিনের কথা। গভীর অন্ধকার, সামান্য দূরের জিনিসও দেখা যায় না। চারিদিক কুয়াশার আবরণের ঢাকা। কনকনে ঠান্ডা জল। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছেন ঢেউয়ের প্রবল উচ্ছ্বাস। পরিবেশ কেমন যেন গা ছমছমে। আমার সঙ্গে মোট ২৩টি দেশের ৩৯ জন সাতারু অংশগ্রহণ করেছে এই প্রতিযোগিতায়। সামনে ২১ মাইলের দীর্ঘ পথ। তবে জোয়ার-ভাটার কারণে আমাকে পাড়ি দিতে হবে ৩৫ মাইল। বিধাতাকে স্মরণ করে জলে নামলাম। আমার সঙ্গে সঙ্গে বোটে করে চলেছেন চ্যানেল কমিটি পর্যবেক্ষক দল। আগে চ্যানেলের শুধু নামই শুনেছিলাম, এখন সাঁতরাতে গিয়ে বুঝতে পাড়লাম চ্যানেল আসলে কি জিনিস! বরফের কুঁচির মতো ঠান্ডা জল যেন চামড়া ভেদ করে অস্থি-মজ্জায় গিয়ে আঘাত করছে। একটা কথা বলতেই হয়, সেদিন আবহাওয়ার আনুকূল্য না থাকলে আমার পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব হত না। সাধারণত চ্যানেলে আবহাওয়া থাকে উন্মত্ত, উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে পড়লে বাঁচা দুঃসাধ্য ব্যাপার। যাহোক কপাল ঠুকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে থাকলাম। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা সংগ্রামের পরে অবশেষে অতিক্রম করি ইংলিশ চ্যানেল। সময় লেগেছিল ১৪ ঘণ্টা ৫২ মিনিট। তখন যে কি আনন্দ-উচ্ছ্বাস বলে বোঝানো যাবে না। একজন বাঙালি হিসেবে আমার গর্বে বুক ফুলে যাচ্ছে। কারণ আমিই প্রথম বাঙালি হিসেবে চ্যানেল অতিক্রম করেছি। আমি আমার বিশ্বাসকে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছি। এই আমার আনন্দ, এই আমার সার্থকতা। একজন বাঙালি সাঁতারুর পক্ষে আমার এই কাজ কখনোই সাধারণ বলে মনে করি না। দেশ ও জাতি যদি এর থেকে সামান্যতমও উপকৃত হয় তবে আমি নিজেকে ধন্য মনে করবো।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, ইংল্যান্ডের সমুদ্রতটে পৌঁছনোটা তার পক্ষে মোটেও সহজ ছিল না। উপকূলের কাছে ব্রজেন দাস আকস্মিকভাবেই সামুদ্রিক স্রোতের সম্মুখীন হন। দোভার বন্দরের নিকটবর্তী এসে ব্রজেন ভূমি স্পর্শ করার উপযুক্ত একটি স্থানের সন্ধানে উত্তাল তরঙ্গের দোলায় কলার ভেলার মতো একবার ডুবছেন একবার ভাসছেন। উপকূল থেকে তিন মাইলের দূরত্ব তাকে অতিক্রম করতে দীর্ঘ তিন ঘণ্টার প্রচণ্ড সংগ্রাম করতে হয়।

কিন্তু মজার কথা হল, প্রাথমিকভাবে পাকিস্তান সরকার তাঁর ইংলিশ চ্যানেল অভিযানের জন্য কোনও আর্থিক সাহায্য বা অনুপ্রেরণার কাজ না করলেও ব্রজেন যখন প্রথম বাঙালি প্রথম এশীয় হিসেবে ইংলিশ চ্যানেল সফলভাবে অতিক্রম করে দেশে ফিরে আসেন, তখন পাকিস্তান সরকার নির্দ্বিধায় সেই সফলতাকে পাকিস্তানের সফলতা বলে প্রচার করতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আজম খান তাঁকে ‘বাঙাল কা সের’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তবে এখানেই থেমে থাকেননি ব্রজেন। ইংলিশ চ্যানেলের সঙ্গে তাঁর যেন নিবিড় প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তিনি ৬ বার ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি জমান এবং ৬ বারই সফলতা অর্জন করেন। এর মধ্যে প্রথম দু’বার ছিল বুলটিশ ইন্টারন্যাশনাল ক্রশ চ্যানেল সুইমিং রেস, আর শেষ চারবার ব্যক্তিগত উদ্যোগে অতিক্রম। শেষবার ১৯৬১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ১০ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটে তিনি চ্যানেল অতিক্রম করেন যা ছিল ২০০৭ সাল‌ পর্যন্ত সবথেকে কম সময়ের রেকর্ড। পরবর্তীতে বুলগেরিয়ার পিটার স্টয়চেভ যা ভেঙে দেন। তাঁর সময় লেগেছিল ৬ ঘণ্টা ৫৭ মিনিট। ২০১২ সালে আবার তাঁকে হারিয়ে তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছেন ট্রেন্ট গ্রিমসে। তিনি সময় নিয়েছিলেন ৬ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট। ১৯৬১ সালে ছ’বার চ্যানেল ক্রস করার সুবাদে তাঁকে ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথ বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করেন। এই সময়েই তিনি ব্রজেনকে মজা করে বলেছিলেন “তুমি তো ইংলিশ চ্যানেলকে নিজের বাথটবে পরিণত করেছ।” ব্রজেন দাস ১৯৬৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল ম্যারাথন সুইমিং হল অফ ফেমে সম্মানীয় সাঁতারু হিসেবে নিজের জায়গা করে নেন। তাঁর খ্যাতির ঝুলি এখানেই ভর্তি হয়নি। ১৯৮৬ সালে চ্যানেল সুইমিং অ্যাসোসিয়েশন অফ দ্য ইউনাইটেড কিংডম তাঁকে লেটোনা ট্রফির মাধ্যমে ‘কিং অফ চ্যানেল’ উপাধিতে ভূষিত করে। এছাড়াও পাকিস্তান সরকারের তরফ থেকে তাকে ১৯৬০-এ প্রাইড পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড এবং বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১৯৭৬ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার এবং ১৯৯৯ সালে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে (মরণোত্তর) সম্মানিত হয়েছিলেন।

কিং অফ চ্যানেল উপাধিতে ভূষিত হচ্ছেন ব্রজেন

আদ্যপান্ত বাঙালি, সাধাসিধে এই মানুষটি ১৯৯৭ সালে আজকের দিনে পরলোক গমন করেছিলেন। তাঁর ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এই লেখাটিই হোক তাঁর প্রতি বাঙালির বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

তথ্যসূত্র
১। ক্রীড়া পত্রিকা ‘হারজিত’ আগস্ট ১৯৮৫।
২। ডেইলি বাংলাদেশ।
৩। কালের কণ্ঠ
৪। দেশে বিদেশে
৫। দৈনিক ইত্তেফাক
৬। Das, Brojen- Channel Swimming Dover.
৭। Brojen Das-Longswims Database.

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *