‘ভালোবাসিবে বলে ভালোবাসিনে’

পৌষালী চক্রবর্তী

“I had an inheritence from my father
It was the moon and the sun
I can move throughout the world now
The spending of it is never done”

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘ফর হুম দ্য বেল টলস’ উপন্যাস থেকে উপরের উদ্ধৃতাংশটি নিয়ে শুরু হচ্ছে বুদ্ধদেব গুহর ‘কোয়েলের কাছে’ উপন্যাস। প্রকৃত প্রস্তাবেই তিনি বাংলা সাহিত্যের এমন এক ধারার উত্তরাধিকার বহন করেছেন, যা মূলধারার সাহিত্য জগতের থেকে একটু পৃথক; অনেকটাই কম ছুঁয়ে থাকা এক জগতের কথাকার তিনি। সে-পথে যাত্রায় তাঁর সমসময়ে তিনি এক সঙ্গীহীন রুহ। লাতেহার পাহাড়ের দিকে যে জানালা খুলে পালামৌ চিনিয়েছিলেন সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অথবা অরণ্যপ্রকৃতিকে ঐশী দর্শনের মহিমায় উত্তীর্ণ করে সাঁওতাল পরগনার সঙ্গে পাঠকের পরিচিতি ঘটিয়েছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব সেই অরণ্য পথেরই পথিক। কিন্তু তাঁর অরণ্যজীবন ‘আরণ্যক’-এর সেই ‘গভীর নির্জন পথের’ ঈশ্বরীপ্রতিম অস্তিত্বে নয়, এক প্রেমিকের দৃষ্টিতে, প্রেমিকের যাপনে মূর্ত। প্রকৃতি, অরণ্য, জঙ্গলের ঋতুবদল, তার স্পর্শ, শব্দ, গন্ধ শ্রীগুহ’র চিরস্থায়ী প্রেমিকা।

আরও পড়ুন: পূর্বমেঘের শস্যবাসনা

আর সেই অরণ্যপ্রকৃতির প্রেম প্রায়শই মিশে যায় নারীর প্রতি প্রেমে। কখনও সেই প্রেম অরণ্য-নির্ভর নরনারীর মধ্যেকার প্রেম, কখনও বা কর্মসূত্রে বা ট্যুরিস্ট হিসাবে কিংবা শিকারি হিসাবে বনে আসা শহরাগত রুহদের প্রেম। সেসব প্রেমে প্রান্তিক, স্থানীয় চরিত্রদের চিত্রণে অনেক সময়েই তিনি যে বিতর্কহীন ভূমিকা নিতে পেরেছেন, তেমনটা নয়, তবে সবার উপরে জাগ্রত থেকেছে তার প্রেমিক সত্তা। ‘কোজাগর’-এ তিনি লিখছেন—

‘‘আজ থেকে কোনও গাছপালার দিকে আর নৈর্ব্যক্তিক চোখে তাকাতে পারবো না। কোনো মানুষের মুখের দিকে, নারীর মুখের দিকে যেমন নৈর্ব্যক্তিক চোখে তাকানো যায় না; তেমন ওদের প্রতিও আর যাবে না। ওরা প্রত্যেকে যে আলাদা! আলাদা ওদের ব্যক্তিত্ব। ওরা ভালোবাসতে জানে, ওরা দূর থেকেও ভালোবাসতে পারে। ওরা দেখতে পায়, শুনতে পায়, ওদের মন আছে। হয়তো ওরা মানুষের চেয়েও ভালো। হয়তো আমাকে দুঃখ দেওয়া নারী জিন্-এর থেকেও অনেক ভালো। মেয়ের গাছেরা কি পৃথিবীর মেয়েদের মতোই দুঃখ দেয়? তেমনই নির্দয় হয় কি তারা?”

নিজস্ব পাঠ অভিজ্ঞতা থেকে জানি, তার ‘কোয়েলের কাছে’ গিয়ে ‘একটু উষ্ণতার জন্য’ অপেক্ষা করতে করতে আমাদের কিশোরীবেলা হেঁটে ঢুকে গেছে যুবতীরোদের দিকে। আবার ঋজুদার সঙ্গে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে কখন তার প্রেমে পড়ে গেছি। যে জীবনযাপন করা যায় না, যে চরিত্র হয়ে ওঠা যায় না শুধু মনোজগতের ‘হলুদ বসন্ত’র আলোয় চিরতরে হলুদ বনে হারিয়ে যাওয়া নাকচাবিটির সন্ধান জারি রাখতে হয়, তেমন আলোয় আলোকিত জগতের বাসিন্দা একদা শিকারি, অরণ্যমুগ্ধ মানুষ এই ঋজুদা। একটু ধরাছোঁয়ার বাইরে। ঋজুদা আর তার সঙ্গীসাথিরা যেন ‘চাঁদের পাহাড়’-এর শঙ্করের উত্তরসাধক। লবটুলিয়া, নারা বৈহার, ফুলকিয়া বৈহার হয়ে যে পথ চলে গেছে রিখটারসভেল্ডের দিকে সেই পথে জঙ্গলমহল থেকে আফ্রিকার অরণ্যে বাঙালি পাঠককে নিমগ্ন রাখেন এই আদ্যোপান্ত কলকাত্তাইয়া এই লেখক। ‘গুগুনোগুম্বারের দেশে’ বা ‘রুআহা’ শিকারকাহিনি ছাপিয়ে অরণ্য-বন্যপ্রাণ-অরণ্যচারী মানুষের মিথোজীবিতার আখ্যান। লেখার জগতে তাঁর পিতৃপুরুষের এই ‘আরণ্যক’ ঐতিহ্যকে স্বকীয়তায় আত্তীকরণ করেন বুদ্ধদেব।

আরও পড়ুন: সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৬)

কিশোর পাঠকরাও কি বয়ঃসন্ধি কাল পেরোননি ঋজুদা, বাবলি, কুর্চী,  টুঁই, পৃথু, যশোয়ান্ত, লালতি, সুমিতা বৌদি, পাটনের সঙ্গে? আর হ্যাঁ। তিনি ঠুঠা বাইগা-রও জন্মদাতা। বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবন থেকে দূরে তার কথা সাহিত্যের প্রেক্ষাপট- টাঁড়ভূমে, অরণ্যে, বন্যপ্রাণের ‘ক্বচিৎ কিরণে দীপ্ত’। শিকারে বা নিছক ভ্রমণে তিনি ঘুরেছেন ভারতের অরণ্যাণী, পৃথিবীর বহুপ্রান্তর। তথাপি নিতান্ত আটপৌরেয়ানা ছাড়িয়ে গড়ে ওঠা তার সেই ভুবনকে বড় আপন করে নিয়েছেন মধ্যবিত্ত বাঙালি পাঠক, পাঠিকা। তার কল্পবিশ্ব হাটচান্দ্রা, কিবুরু, রাইনা, সান্দুর খুঁজেছেন বাঙালি ট্যুরিস্ট। ম্যাকলাক্সিগঞ্জকে পাঠক খুঁজে ফিরবে চিরকাল এক বনজ্যোৎস্নায়, সবুজ অন্ধকারে।

অথবা তার ঋভু চরিত্র। কৈশোর পার করা জীবনের এই মনকেমনিয়া আখ্যান যেন লেখকের স্ব-কথন… আবার খেলা যখন এও তার আত্মজৈবনিক ছায়াপাত— এক ‘পুরিয়া ধানেশ্রী চোখ’এর মায়াকাজল পরে লেখকের সঙ্গে পাঠকও ঘুরতে থাকেন অলীক সাংগীতিক আবেশে।

পাঠকের এই অনুসন্ধানের সঙ্গে বারবার পুনরুজ্জীবিত হবেন লেখক, কারণ তিনি তো বলেন এক অনিঃশেষ অভিযাত্রার কথা, যা হওয়া যায় না অথচ মনে মনে বাসনা থাকে যে যাপনের প্রতি, সেইসব নিবিড় অনুভবের না ছোঁয়া কাহিনি বুনে যান তিনি। মাধুকরী’র পৃথু ঘোষ চেয়েছিল ‘‘বড় বাঘের মত বাঁচবে”। সেই ‘স্বরাট, সয়ম্ভর’ জীবনের প্রতি তিনি বারবার মোহগ্রস্ত করেছেন পাঠককে। কিন্তু তা আর হয় কই? জীবনের কাছে, সম্পর্কের কাছে, একান্ত অনুভবের কাছে অনিঃশেষ মাধুকরী পেতে রাখলেও ‘‘পথে চলতে বড় লাগে।/ চলতে বড়ই লাগে।”

আরও পড়ুন: অমরত্বের অন্বেষণ

সুগায়ক, পেশাদার জীবনে অত্যন্ত সফল চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এই কথাসাহিত্যিক যে অভিজাত জীবনযাপন করেছেন, তা এক সময়কালের এক যুগবিশেষের দলিল। ছবি আঁকাতেও পারদর্শী তিনি নিজের অনেক বইয়ের প্রচ্ছদ নিজে করেছেন। দূরদর্শনের কোনও এক বৈঠকী অনুষ্ঠানে তাঁর কণ্ঠে শোনা নিধুবাবুর টপ্পা আজও মনে আছে। অনন্তলোকের দিকে তাঁর যাত্রাপথ সহধর্মিণী প্রথিতযশা রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী ঋতু গুহর সঙ্গে সুরের যুগলবন্দির ‘অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনে’ ভরে থাক। সুবোধ সরকারের যথাযথ মূল্যায়নের অংশবিশেষ থেকে বলি— ‘‘নক্ষত্রের জন্ম হয় কম। নক্ষত্রের মৃত্যু হয় বেশি।”

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *