‘বসন্তে-বসন্তে তোমার কবিরে দাও ডাক’

পারমিতা ভট্টাচার্য

মনে পড়ছে, ১৯৯৫ সালে দোল উৎসবের ঠিক সাতদিন পরে ২৩ মার্চ কাব্য জগতের এক নক্ষত্র খসে পড়েছিল শান্তিনিকেতনে। পলাশ আবিরের আঘ্রাণ শান্তিনিকেতনের বাতাসে, ধূলিকণায় তখনও সতেজ। ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাব’— সত্যিই তো, প্রতি বসন্তের জাগরণে কবির এই আহ্বান অনুরণিত হয় আমার চেতনায়। বসন্তের ফুলে ফুলে ভরা শান্তিনিকেতনেই তিনি হয়তো সত‍্যিই চিরমুক্তির ডাক শুনতে পেয়েছিলেন।

আরও পড়ুন: বনের দোল, মনের দোল

মধ্যমণি কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। Dey’s publishing/via Facebook.com

বসন্ত এলেই আমাদেরও মনের গতি শান্তিনিকেতনের দিকেই ছুটে চলে, বসন্তোৎসবে সবার রঙে রং মেশানোর এই খেলায় মেতে উঠতে ইচ্ছে করে। কোনও বসন্তপঞ্চমীতে এই ঋতু উৎসবের সূচনা হয়েছিল কবি-পুত্র শমী ঠাকুরের হাত ধরে আর তার কিছুদিন পরেই প্রয়াত হন শমীন্দ্রনাথ। সন্তান শোকের এই তীব্র দহনে দগ্ধ হয়েও কবির সৃষ্টির রসদে কিছু অভাব দেখা দেয়নি। শোক, তা যে একান্তই ব্যক্তিগত। বিশ্ব-প্রকৃতির মহাযজ্ঞে তা নিতান্তই তুচ্ছ। সেই সত্য ঋষি-কবির উপলব্ধিতে যেভাবে বেজেছিল, তা বোধহয় আর কারো মধ‍্যে এমন করে বেজে ওঠেনি। শমীন্দ্রনাথের উৎসাহে আয়োজিত বসন্তোৎসবই ক্রমে দোলযাত্রার দিনে পালিত হতে শুরু করে।

ছোট্ট শমী

শান্তিনিকেতনে আমার বেড়ে ওঠা বা পড়াশোনা বা সংগীতচর্চা কোনোটাই হয়ে ওঠেনি। তবুও আমাদের অধিকাংশের মননে, চেতনায় স্থানটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বিশেষত শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবের সঙ্গে। সেখানকার উৎসবের পরিবেশ আর তার সম্পূর্ণ আমেজ ধরা পড়ে নাচ-গান-নাটক প্রভৃতির মধ্যে। ব্যক্তিগতভাবে শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবে আমার কখনও যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কিন্তু সোশ‍্যাল মিডিয়ার কল্যাণে কত বসন্ত উৎসবে নাচ-গানের আসরের দর্শক হয়েছি।

বসন্ত উৎসব হবে, আর গানে গানে তা পালিত হবে না, এ যে অসম্ভব। আমার মনে পড়ে, কলকাতার একটি প্রখ্যাত বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবের আমেজে মন ভরে থাকত। দোলের সপ্তাহখানেক আগে থেকেই সেই স্কুলে প্রাতঃকালীন প্রার্থনায় একের পর এক রবীন্দ্রসংগীত বেজে উঠত পিয়ানোয় আর কচিকাঁচাদের কলকণ্ঠের ঝরনায় রবীন্দ্রসংগীতের মাধুরী ছড়িয়ে পড়ত স্কুল প্রাঙ্গণ জুড়ে। বিশ্বভারতীর কয়েকজন বিশিষ্ট শিক্ষক সারাবছরই সেই স্কুলে যাতায়াত করতেন। আসতেন বসন্তদা। কথাকলির ছন্দে ছন্দে শেখাতেন ‘সব দিবি কে, সব দিবি পায়, আয় আয় আয়’, ‘এবেলা ডাক পড়েছে কোনখানে।’ আসতেন সুজিতদা, মণিপুরি নাচের ভঙ্গিমায় শেখাতেন ‘ওরা অকারণে চঞ্চল’, ‘সহসা ডালপালা তোর উতলা যে…’, ‘আজ কী তাহার বারতা পেল রে’ প্রভৃতি নানা গানের সঙ্গে নাচ। আজকের বিখ্যাত সংগীত শিল্পী সাহানা বাজপেয়ী, কিছুদিন এসে ছোটদের বড় কাছের হয়ে উঠেছিলেন, শিখিয়েছিলেন ‘ওরে গৃহবাসী…’। আর আসতেন সন্দীপদা… কত যে গান করাতেন বাচ্চাদের! সমস্ত স্কুল শান্তিনিকেতন আশ্রমের এক ছোটখাটো সংস্করণ হয়ে উঠত। গানে গানে ভরে উঠত বসন্তের সকালগুলো। দোলের আগে বা পরে অনুষ্ঠান হত। শান্তিনিকেতন আশ্রমের মতো সাজে সেজে মঞ্চে নাচ-গানের এক অপূর্ব আয়োজন হত।

আরও পড়ুন: রানাঘাটে রঙের উৎসব

দোল উৎসব উপলক্ষে গানের প্রসঙ্গে ছোটবেলার এক সুখস্মৃতি আজও সজীব। ভোরবেলা কলকাতার নানা অঞ্চলে প্রভাতফেরি বেরোত। রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্র-নৃত্যই তার প্রধান অবলম্বন ছিল। এভাবেই গানে গানে আনন্দমুখর হয়ে উঠত কলকাতা। কিন্তু বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এই সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রিত রঙে সারাদেহ রঞ্জিত করে রং খেলায় মেতেছে শহরবাসী। যদিও অরগ্যানিক নানারকম রং বা আবিরও আজকাল সহজলভ্য।

হাতে অযাচিত সম্পদ আসার ফলে তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা অধিকাংশই নানা নামিদামি ব্র্যান্ডের গাড়ি বা বাইক ব্যবহার করে। সেইসব যানবাহনে সওয়ার হলেই তারা নিজেদের গতিশীল নায়ক ভাবে। আমার পাড়া লেক মার্কেট অঞ্চলে এখন দেখি না আর ছোট বাচ্চারা সমবেত হয়ে দোল খেলছে। বরং এরকম গতিশীল নায়কদের দেখি, যারা সর্বাঙ্গ নানা রঙের আস্তরণে ঢেকে আচমকা কোনও অশ্লীল বাক্য বা অশ্লীল ভঙ্গি ছুড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল। এরকমও দেখেছি, গাড়ি থামিয়ে রাস্তায় নেমে মদ্যপ অবস্থায় কদর্য ভাষা ও আচরণে নিজেদের ‘সংস্কৃতি’র পরিচয় দিচ্ছেন। অবশ্য এই ধরনের রঙিন সংস্কৃতিরই এখন রমরমা। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েও অরাজকতার পরিচয় পাই… বিষণ্ণ হয় মন।

কলকাতার বিশেষ কিছু জায়গায় অবশ্য অনেক সংস্থার আয়োজনে নাচ-গানের মাধ্যমে বসন্ত উৎসব পালিত হয়। যেমন— মোহরকুঞ্জ, আইসিসিআর, ইজেড সিসি, ছোট-বড় নানা আবাসন প্রভৃতি। বিভিন্ন নাচ বা গানের স্কুলও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দোলের সন্ধ্যাকে নাচ-গানের মূর্ছনায় ভরিয়ে তোলে। দূরদর্শনে সকাল থেকে বিশ্বভারতীর নানা অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হতে থাকে। রবীন্দ্র-ভাবনার এত পরিশীলিত পরিবেশন ওখানকার ছাত্রছাত্রীদের যে, তা বলাই বাহুল্য। সাম্প্রতিক অতিমারির প্রকোপ ও নানান রাজনৈতিক জটিলতায় সেই অনুষ্ঠান গতবছর থেকে বন্ধ।

অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে শুকনো পাতার রাশ আর শিমুল-পলাশের আলিঙ্গনে ফেলে আসা দিনগুলির পদধ্বনি অনুরণিত হয়। ‘কে গো তুমি, আমি শিমূল/ কে গো তুমি, কামিনী ফুল।/ তোমরা কে বা? আমরা নবীন পাতা গো, শালের বনে ভারে ভারে।’ হয়তো সেখানে সন্ধ্যাবেলার দখিন হাওয়ায় সুর ভাসে— ‘দখিন হাওয়া, জাগো জাগো, জাগাও আমার সুপ্ত এ প্রাণ।’ সমস্ত আশ্রম প্রাঙ্গণ জুড়ে ছড়িয়ে-পড়া জ্যোৎস্নার আলোয় ধ্বনিত হয়, ‘ও চাঁদ তোমায় দোলা দেবে কে…’ এস্রাজের করুণ সুরে হয়তো গান ধরেন কোনও প্রাক্তনী— ‘এতদিন যে বসেছিলেম পথ চেয়ে আর কাল গুনে, দেখা পেলেম ফাল্গুনে।’ নাঃ, গতবছর ও এবছরে দেখা আর পেলাম না। সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির কালো দাগ লেগেছে বিশ্বভারতীর গায়ে। তাই সুদিনের অপেক্ষায় দিনযাপন।

অতিমারির দাপটে গতবছর ও এবছর সমবেত হয়ে দোল উদ্‌যাপিত না হলেও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে অসংখ্য মানুষজন দোলের বিশেষ দিনটিকে তাঁদের নিজ নিজ প্রতিভার মাধ্যমে বরণ করে নিচ্ছেন বা নিতে চলেছেন। ঘরে বসে অনুষ্ঠানগুলি দেখতে মন্দ লাগে না।

আমার খুব ছোটবেলার স্মৃতি। কোনও একবছর দোলের দিন সন্ধ্যায় পূর্ণিমার সত্যনারায়ণ পুজোর নিমন্ত্রণ পেয়ে এক পরিচিতের বাড়ি গিয়েছিলাম। পুজোর শেষে শুধু আবির দিয়ে সবাই রং খেলছিলেন। আগেকার সেই ফ্যাকাসে গোলাপি রঙের চন্দনা আবির। তারপর সেখানে বসেছিল কীর্তনের আসর। সেইসময় শুধু সুরের জাদুতেই মুগ্ধ হয়েছিলাম।

রবীন্দ্রনাথের গানের প্রসঙ্গে যাঁর গানের কথা স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়ে, তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুলের গানেও বসন্তের রঙিন উপস্থিতি। ‘ব্রজগোপী খেলে হোরি’, ‘বসন্ত মুখরিত আজি’, ‘আসে বসন্ত ফুলবনে’, ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’—এমন কত যে গানে ডালি ভরে দিয়েছিলেন তিনি। একসময় আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে নিয়মিত বাজত এরকম কত গান।

বাংলা আধুনিক গানেও বসন্তের আহ্বায়ক অমূল্য কিছু গান আজও সুখশ্রাব্য। এই গানটি যেমন, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের কথায় ও সুরে ‘কেউ বলে ফাল্গুন, কেউ বলে পলাশের মাস, আমি বলি আমার সর্বনাশ।, ‘তোমার সঙ্গে দেখা না হলে, ভালোবাসার দেশটা আমার দেখা হত না। ‘সুরের আর কথার মেলবন্ধনে গানগুলি হৃদয়ের সম্পদ হয়ে উঠেছে। মনে পড়ছে, সুমন কল্যাণপুরের মধুর কণ্ঠে গাওয়া দু’টি গান— ‘মনে করো আমি নেই, বসন্ত এসে গেছে/ কৃষ্ণচূড়ার বন্যায় চৈতালি ভেসে গেছে।’ অথবা ‘রঙের বাসরে যদি ভুলের আগুন লেগে যায়,/ কী হবে গো বলো দেখি মনভ্রমরার।’

আসলে বাংলা আর বাঙালি যেখানে হাত রেখেছেন সেখানেই সোনা ফলেছে। শচীন কত্তার বসন্তের চিরসবুজ গানগুলো যেমন— ‘শোনো দখিন হাওয়া, প্রেম করেছি আমি’, ‘খুলিয়া কুসুম সাজ শ্রীমতী যে কাঁদে’, ‘বর্ণে গন্ধে ছন্দে গতিতে হৃদয়ে দিয়েছ দোলা/ রঙেতে রাঙাইলে মোরে, এ কি তবে হোরি খেলা’, ‘এই মহুয়া বনে, মনের হরিণ হারিয়ে গেছে, খুঁজি আপন মনে’, ‘নতুন ফাগুনে যবে ধরা চঞ্চল’, ‘নিশীথে যাইও ফুলবনে, ও ভ্রমরা। ‘এরকম কথা ও সুরে গাঁথা মালা আজকাল দুর্লভ। এইভাবে বাসন্তী রঙে রঙিন হয়েছে বাংলা গানের জগৎ। কত কবির লেখনী সুধা দান করেছে অকৃপণ হাতে। অতিমারির আবহে গৃহবন্দি আমাদের দিনগুলি এরকম বসন্তের নানা গানেই ভরে উঠুক না হয়।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *