প্রকৃতি ও পরিবেশে ভারসাম্য রক্ষার আহ্বান

সঞ্জিতকুমার সাহা

১৯৭২-এ সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে জুনের ৫ থেকে ১৬ পর্যন্ত যে ঐতিহাসিক পরিবেশ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, তারই প্রেক্ষিতে, ১৯৭৪ সাল থেকে, বিশ্বজুড়ে ৫ জুন দিনটিতে সাড়ম্বরে পালিত হতে থাকে পরিবেশ দিবস। উদ্দেশ্য, পৃথিবীর সমস্ত দেশের মানুষকে একসঙ্গে সচেতন করা, সকলকে একসঙ্গে জানানো যে এই পৃথিবী আমাদের সকলের। পৃথিবী একটাই। সুতরাং একে রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের। সেদিকে লক্ষ্য রেখে, ১৯৮৭ সাল থেকে প্রতিবছর বিশেষ কোনো এক ভাবনাকে কেন্দ্র করে ৫ জুন দিনটিকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে উদ্‌যাপন করা হয়ে থাকে। সেজন্য রাষ্ট্রসংঘর পরিবেশ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত দেশগুলি আলোচনার মাধ্যমে একেকবার একেক দেশ মূল ভাবনার আয়োজক দেশ হয়। ২০১৮-তে ভাবনা ছিল, বিশ্বকে প্লাস্টিক মুক্ত করো। সে-বছরে ভারত ছিল আয়োজক দেশ। ২০১৯-এ ছিল বাতাসে দূষণ মুক্ত করার আহ্বান। আয়োজক দেশ ছিল চিন। ২০২০ সালে আয়োজক দেশ ছিল কলোম্বিয়া। ভাবনা ছিল, প্রকৃতির জন্য সময়। ২০২১ সালের ভাবনা, পরিবেশে ভারসাম্যর উদ্ধার। আয়োজক দেশ পাকিস্তান। আয়োজক দেশ পাকিস্তান হলেও পৃথিবীর সমস্ত দেশেই এই একই বিষয়ে উদ্‌যাপন করা হবে।

আরও পড়ুন: অতিমারি: স্পর্শ, বৌদ্ধিক মুদ্রা ও শ্রুশ্রূষা

এবারের ভাবনা থেকে স্পষ্ট যে, প্রকৃতি-পরিবেশে ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে। সে তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। জলে, স্থলে, অন্তরিক্ষে সর্বত্র পরিবেশে অবক্ষয় লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রায়শই আমেরিকার ‘হেলথ এফেক্টস ইনস্টিটিউট’ এবং ব্রিটিশ কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ‘ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যুলুয়েশন’-এর যৌথ উদ্যোগে বিভিন্ন বিষয়ে সমীক্ষা হয়। কিছুদিন আগে এক সমীক্ষায় প্রকাশ পেয়েছিল চিন ও ভারতে প্রতি দশ জনে মাত্র একজন নির্মল বায়ু এলাকায় বাস করেন। দিনে দিনে তা আরও কমে আসছে। বর্তমানে ৯০ শতাংশ মানুষই শুদ্ধ বাতাস গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শুধুমাত্র দূষিত বায়ুর কারণে বছরে ৭০ লক্ষ মানুষ মারা যান। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় ৮০০ জন অথবা প্রতি মিনিটে ১৩ জন করে মারা যাচ্ছেন। এর অধিকাংশই আবার অনুন্নত, আধা-উন্নত ও উন্নতশীল দেশের মানুষ। সুতরাং দূষিত বাতাস যে বর্তমানে মানুষের জীবনে এক সংকটপূর্ণ অবস্থা তৈরি করেছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ দূষিত বাতাস সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যের বিপর্যয় ঘটায়।

আরও পড়ুন: পোকেমনের দুনিয়ায় আপনাকে স্বাগত

বায়ুদূষণের কারণ তো অনেক। তার মধ্যে অন্যতম অরণ্য নিধন। যদি গাছ পর্যাপ্ত পরিমাণে না থাকে, তাহলে বিপদ অনেক দিক থেকেই। যেমন বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বাড়তে থাকে, কমতে থাকে অক্সিজেনের পরিমাণ। অক্সিজেন জীবকুলের জন্য প্রাণদায়ী। তার অভাব ঘটলে জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে। সেজন্যই বোধহয় এখন শ্বাসকষ্ট ঘরে ঘরে। শুধু তো শ্বাসকষ্ট নয়, অ্যাজমা, হাঁপানি, হার্টের অসুখ, শ্বাসনালির সংক্রমণসহ নানারকম জটিল ব্যাধি দেখা দিতে পারে। দিতে পারে কী, দেয়ও, দিচ্ছেও। শুধু তো গাছ না থাকার জন্য বাতাসে কার্বনের পরিমাণ বাড়ছে তা তো নয়, মানুষের নিত্যপ্রয়োজনে বেড়েছে কল-কারখানা, বেড়েছে জীবাশ্ম জ্বালানিতে চলা গাড়ির সংখ্যাও। এসবের ফলেও বাতাসে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের বিষাক্ত গ্যাসের পরিমাণ। সঙ্গে ভাসমান ধূলিকণাও। চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীদের মতে, বাতাসে ভাসমান কণার পরিমাণ যদি সহনশীল মাত্রার চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তবে তা রীতিমতো চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময়ে বায়ুর বিষাক্ত উপাদান ফুসফুস থেকে সারা শরীরেই ছড়িয়ে পড়ে। তখন শুধু শ্বাসরোগ নয়, হৃদ্‌রোগও হতে পারে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে সূক্ষ্ম ধূলিকণার মাত্রা হওয়া উচিত ১০০ মাইক্রগ্রাম। কিন্তু বায়ুদূষণের কবলে পড়া দেশগুলিতে এই মাত্রা তিন গুণ বা তার চেয়েও বেশি। এই তালিকায় সব প্রথমেই রয়েছে চিন। তারপরেই ভারত। এরপরে যথাক্রমে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। সুতরাং এশিয়া মহাদেশেই এর প্রকোপ বেশি। কিন্তু কী কী কারণে আজ এই অবস্থা?

আরও পড়ুন: মুঘল দরবারে আম

প্রথমেই বলা দরকার, এই দেশগুলির কোনোটাই উন্নত দেশ নয়। বরং বলা যায়, অত্যধিক জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ। আর এই বিপুল সংখ্যক মানুষের নিত্যচাহিদা মেটাতে একদিকে যেমন বন ধ্বংস করতে হচ্ছে তেমনি কৃষি ও শিল্পে নজর দিতে হয়েছে। শিল্পের মধ্যে পরিবহণ শিল্পকে প্রাধান্য দেওয়ায় যেমন জল, মাটি, জঙ্গল ধ্বংস হচ্ছে তেমনি জীবাশ্ম জ্বালানীর খরচও বেড়েছে অত্যধিক। জীবাশ্ম জ্বালানির জন্য নির্গত ধোঁয়ায় বাতাস দ্রুত দূষিত হয়ে পড়ছে। পরিবহণ থেকে নির্গত ধোঁয়ায় মিশে থাকে কার্বন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড, সূক্ষ্ম কণিকা সিসাসহ নানা রাসায়নিক যৌগ— যা বাতাসে মিশে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে বহু রকম বিঘ্ন ঘটায়। ফি-বছর পরিবহণজনিত দূষণের কারণে ৪ লক্ষ মানুষ মারা যান। এ ছাড়াও আমাদের মতো কৃষিপ্রধান দেশে যাবতীয় কৃষিজ বর্জ্য পোড়ানো হয় খোলা মাঠে। ইদানীং ন্যাড়া পোড়ানোরও প্রবণতা বেড়েছে। শুধু কৃষি বর্জ্য নয়, পৌর বর্জ্যও একেবারে উন্মুক্ত স্থানে দিনের পর দিন ফেলে রাখা হয়। এর ফলে মিথেনের মতো ক্ষতিকর গ্যাসও বাতাসে মেশে। অথচ এসব থেকে যেমন উন্নত মানের জৈব সার তৈরি করা সম্ভব তেমনি বিকল্প শক্তিরও উৎপাদন করা যায়। এছাড়া আজও কয়লা, কাঠ, শুকনো পাতাপুতি জ্বালিয়ে ছোট্ট বদ্ধ ঘরে এখনও আমাদের দেশে কয়েক কোটি মানুষ রান্নাবান্না করেন। শুধুমাত্র এই ধরনের ব্যবস্থাপনার শিকার হয়ে মারা যান অসংখ্য মানুষ। এদের অধিকাংশই মহিলা।

আরও পড়ুন: স্মৃতিতে সুন্দরলাল

শুধু অরণ্য নিধনের ফলে যে আমাদের স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে তাই নয়, জীববৈচিত্র্যেও তা মারাত্মক আকার নিয়ে থাকে। একটা উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হবে। যেমন, বাঁকুড়া-পুরুলিয়া-ঝাড়গ্রামে হাতির লোকালয়ে ঢুকে পড়ার ঘটনা আকচার। একইভাবে জলপাইগুড়ি-কোচবিহারের তরাই অঞ্চলেও হাতির উৎপাতে মানুষের বসবাস করাও একই কারণে দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে। একইরকম ঘটনা সুন্দরবনের জঙ্গল লাগোয়া বসতিতে, সেখানেও মাঝেমধ্যেই বাঘের হানার সংবাদ শোনা যায়। অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে বন্য প্রাণীর সংঘাত ক্রমবর্ধমান। এটাও তো আমাদের কাম্য নয়।

পরিবেশে ভারসাম্য রক্ষায় যেমন শুদ্ধ বাতাস একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তেমনি বিশুদ্ধ জলও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলের উৎসগুলির দিকে যদি তাকানো যায় তাহলে দেখা যাবে, প্রাকৃতিক প্রায় সমস্ত জলাধারই আজ দূষিত। নদীগুলি প্রায় মৃত। পুকুর ডোবার জলও বিষাক্ত। বিষাক্ত ও দূষিত জলে যে সবজি ও মাছ উৎপন্ন হয় পরীক্ষাগারে দেখা যাচ্ছে, তাতেও বিষ। এর কারণও নানাবিধ। তার মধ্যে অন্যতম, কৃষিতে ব্যবহৃত অধিক মাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার। এর ফলে যেমন মাটি ও জল দূষিত হচ্ছে তেমনি এই জলের সেচে যেসব খাদ্যসামগ্রী উৎপাদন হয় তাও ব্যবহারের অনুপযুক্ত।

জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করায় জমিরও উর্বরতা ও গুণমান দিনে দিনে কমছে বা কোথাও কোথাও একেবারেই হারাচ্ছে। ফলে দেশের খরা মানচিত্রে প্রতি বছরেই যুক্ত হচ্ছে হেক্টরের পর হেক্টর জমি। সারা পৃথিবীর অবস্থা এক। বিশ্বে প্রতি মিনিটে ২১ হেক্টর জমি বন্ধ্যা হচ্ছে, ঊষর হচ্ছে। অন্যদিকে, হু-হু করে বাড়ছে মানুষের সংখ্যা। যত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে ততই প্রয়োজন হবে প্রকৃতি ধংসের, অরণ্য নিধনের। পুকুর ডোবা জলাশয় বোজানোর। আর যতই এসব হতে থাকবে, ততই একাধিক বিপদ আমাদের সামনে এসে হাজির হবে। প্রকৃতি ও পরিবেশে ভারসাম্য বিনষ্ট হবে। প্রকৃতি-পরিবেশে ভারসাম্য নষ্ট হলে শুধু মানুষ নয়, জীববৈচিত্র্যও ধংস হবে। পরিবেশ প্রতিকূল হলে জীবের ধ্বংস ও বিনাশ অবশ্যম্ভাবী।

আরও পড়ুন: ‘উন্নয়নবিরোধী’ এক প্রকৃতিপ্রেমিক মানবদরদি সুন্দরলাল বহুগুনা

তাই এবছরের পরিবেশ দিবসের আহ্বান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্য বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন আলোচনায় যেমন স্থান পাচ্ছে সমস্যার দিকগুলো তেমনি সমাধানেও আমাদের এগিয়ে আসতে হবে সম্মিলিতভাবে। সেজন্য এ মুহূর্তে দরকার প্রচুর গাছ লাগানো, প্রাকৃতিক উৎসগুলিকে যৌথ উদ্যোগে রক্ষা করা। এছাড়াও বাতাস এবং সূর্যালোককে শক্তির উৎস হিসাবে কাজে লাগানো। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ বিষয়ে তৎপর হয়ে এগিয়ে এসেছে। যেমন ডেনমার্কের উইন্ড মিল। সমুদ্রের ঝোড়ো হাওয়াকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। আমাদের দেশও সৌরালোককে কাজে লাগিয়ে উদাহরণ তৈরি করেছে। উদাহরণ হয়েছে জলপ্রপাতকে কাজে লাগানোর বিষয়টিও। কিন্তু সবই দু’টি একটি প্রচেষ্টার মধ্যে সীমিত। এখনও ব্যাপকতা লাভ করেনি। শুধু তাই নয়, স্থানীয়ভাবে মানুষের মনে এখনও সেভাবে পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হয়নি। ফলে ভুগতে হচ্ছে আমাদের সকলকেই। এ বছরের পরিবেশ দিবসের মূল ভাবনাকে তাই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে ভূখণ্ডের অন্তত এক তৃতীয়াংশকে অবশ্যই অরণ্যাবৃত রাখতে হবে। কারণ অরণ্যই পারে একমাত্র বিশুদ্ধ বাতাস উপহার দিতে, বাতাসে অক্সিজেনের জোগান দিতে এবং কার্বন ডাইঅক্সাইডকে বাতাস থেকে শুষে নিতে। এছাড়াও অরণ্য মানে জীববৈচিত্র্যের আধার। কত কত পাখি, জন্তু-জানোয়ার ও কীটপতঙ্গের যে আশ্রয়স্থল তা গুনে শেষ করা যাবে না। প্রতি বছর অরণ্য ধ্বংসের কারণে কত যে জীব আশ্রয়চ্যুত হচ্ছে তাই নয়, পৃথিবী থেকেও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীকে আমাদের সকলের জন্য নিরাপদ বাসযোগ্য করে তুলতে হলে এখন আমরা যেভাবে চলছি তার পরিবর্তন করতেই হবে। ভোগবাদ থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের প্রকৃতিকে ভালোবেসে, প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে থাকার সংকল্প গ্রহণ করতে হবে। সেজন্য আমাদের জীবনযাপনকে করে তুলতে হবে পরিবেশ বান্ধব। পৃথিবীকে টেকসই ও স্বাস্থ্যকর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে একটাই পথ, তা হল— প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষায় জোর দেওয়া ও একে টিকিয়ে রাখা। এর কিন্তু কোনো বিকল্প নেই।

লেখক পরিবেশ বিষয়ে বিভিন্ন দৈনিক, সাময়িক পত্রপত্রিকা, আকাশবাণীর নিয়মিত লেখক ও শিশু সাহিত্যিক। নির্বাহী সম্পাদক : সবুজ পৃথিবী।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • সঞ্জিতকুমার সাহা

    আপনাদের প্রচেষ্টার মাধ্যমে পাঠক কিছুটা সচেতন হলে সমাজের ভালো হবে। শুভ উদ্যোগ। সফল হোক। উদ্যোক্তাদের অনেক শুভেচ্ছা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *