‘ক্যাপ্টেনে’র জন্মদিন

ইন্দ্রজিৎ মেঘ

“পাকিস্তান টিমে তো ‘রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেস’ আছেন, তাঁকে সামলাতে গেলে কী করবেন?” ২০০৪ সালে পাকিস্তানে টেস্ট ম্যাচের আগে এক তরুণ সাংবাদিক প্রশ্নটি ছুড়ে দিয়েছিলেন ভারত অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির দিকে। উত্তরে স্টেপআউট করে ‘বাপি বাড়ি যা’র ঢঙে সৌরভ বলেছিলেন— ‘‘কী আর করব, রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেসের চেন টেনে থামিয়ে দেব।” প্রেস কনফারেন্স উপস্থিত সবাই সৌরভের মেজাজটি টের পেয়ে হেসে উঠেছিলেন। হ্যাঁ, বাংলার ‘মহারাজ’ এমনই। তাঁর এই আত্মবিশ্বাসের ঝলক গোটা দলে দেখা গিয়েছিল সেই পাকিস্তান সিরিজে। ভারত প্রথমবারের মতো পাকিস্তান থেকে জিতে ফিরেছিল সিরিজ। আজ সৌরভের ৫০তম জন্মদিনে লেখার শুরুটা না হয় এভাবেই করলাম।

আরও পড়ুন: ফুটবল পরিসরে উপেক্ষিত দুই ইতালীয় ‘তরুণে’র গল্প

এবার বলব, ২০০৪ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে অ্যাওয়ে সিরিজের ঠিক একবছর আগে হয়ে যাওয়া ২০০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের কথা। দিনটি ছিল ২৩ মার্চ। স্পষ্ট মনে আছে, সকাল ৯টা বাজতে না বাজতেই আমাদের পাড়ায় ‘ধুম’ মেচেছিল। অনেকেই তখন বেরিয়ে পড়েছিল ঢাক-ঢোল নিয়ে। শুনে হাসবেন, পাড়ার কালী মন্দিরের ঢাক নিয়ে বেরোনো হয়েছিল। সকলের ধারণা ছিল জাগ্রত মন্দির যখন, ঢাকও নিশ্চিত জাগ্রত হবে। তাই উলটো দিকে যতই শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া থাকুক না কেন, ভারত ঠিক ‘দাদা’র নেতৃত্বে বাজি মারবেই। বিভিন্ন খবরের বাংলা চ্যানেলও ততক্ষণে বসিয়ে দিয়েছিল বিশ্বকাপ ফাইনালের চর্চার জন্য প্যানেল। মনে আছে, সেই প্যানেলে এসেছিলেন বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেটের সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সহ বহু প্রাক্তন ক্রিকেটারও। সকলের আশা ছিল, ঘা খেতে খেতে পিছিয়েপড়া বাঙালি সৌরভের হাত দিয়ে বিশ্বকাপ স্পর্শ করে শাপমুক্তি ঘটাবে। কিন্তু হল তার ঠিক উলটোটা। টসে জিতলেন সৌরভ, ব্যাট করতে পাঠালেন অস্ট্রেলিয়াকে। পিচ পড়তে যে কিঞ্চিৎ ভুল করেছিলেন সৌরভ, তা বোঝাই গিয়েছিল!

আরও পড়ুন: লেন্সের ভিতর থেকে বিশ্বজয় দর্শন: স্মৃতির সফরে শ্রেণিক শেঠ

প্রথম ওভারের প্রথম বলটি যখন জাহির খান করতে দৌড়চ্ছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল, থাক না ম্যাথু হেডেন, অ্যাডাম গিলক্রিস্টের মতো তাবড় ব্যাটসম্যান, কিচ্ছুটি করতে পারবেন না। অথচ প্রথম বলেই জাহির খান ওয়াইড করে বসলেন। পাশে বসা আমার বাবা বলে উঠেছিল, ‘‘আজ বোধহয় ম্যাচ গেল!” তাই-ই হয়েছিল। শ্রীনাথ-নেহরা-জাহির সমৃদ্ধ ভারতীয় পেস অ্যাটাক তখন অসহায় হয়ে গেছে দুই অজি বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যানের সামনে। হরভজন সিং গিলক্রিস্টকে তার মাঝে ফিরিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তাতে কাজের কাজ হয়নি। হেডেন আউট হতেই ক্রিজে নামেন ডেমিয়েন মার্টিন। অপরদিকে তখন অজি অধিনায়ক রিকি পন্টিং। দু’জন চুইংগামের মতো আটকে গেলেন ক্রিজে। অস্ট্রেলিয়া রান করল সাড়ে তিনশোর ওপর। এভারেস্ট সমান রান চেজ করতে নেমে অজি বলার গ্লেন ম্যাকগ্রার বলে পুল করতে গিয়ে শচীন আউট। সৌরভ নেমে ব্রেট লি-কে একটি ছয় হাঁকিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর ইনিংসও বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ফাইনালে বীরেন্দ্র সেহওয়াগ রান পেয়েছিলেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার রান এত বেশি ছিল যে, সেহওয়াগের রান যথেষ্ট ছিল না। ভারত হেরে গেল।

২০ বছর পর এক বাঙালির ওঠার স্বপ্ন সেদিন তছনছ হয়ে গিয়েছিল। পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে বিশ্বকাপ ট্রফির দিকে তাকানো সৌরভের মুখটা মনে পড়ে। সব পেয়েও কিছু যেন একটা না পাওয়া তখন গ্রাস করেছিল সৌরভ সহ প্রত্যেক ভারতীয়র মনে। মন সান্ত্বনা দিয়েছিল এই বলে যে, ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার দুঙ্গাও তো বিশ্বকাপ ট্রফিতে চুমু খেতে পারেননি। তা বলে কি তিনি তিনি বড় ফুটবলার নন!

আরও পড়ুন: দেশ, সীমান্ত এবং মিলখা সিংয়ের রূপকথা

এবার বলব, ২০০৩ বিশ্বকাপেরই ইংল্যান্ড ম্যাচের একটি ঘটনার কথা। বল করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়লেন আশিস নেহরা। সবাই যখন ভাবলেন, এই বাঁ-হাতি পেসার ড্রেসিংরুমে ফিরবেন শ্রুশ্রূষা নিতে, ঠিক তখনই দেখা গেল বিপরীত ছবি। চিকিৎসা-সেবা দিতে এগিয়ে আসলেন সেই সময়কার ভারতীয় ফিজিও অ্যান্ড্রু লিপাস। কিন্তু নেহরাকে যে বেশ কাহিল দেখাচ্ছে! সৌরভ দেখলেন, কিন্তু নাছোড় তিনি। বললেন, ‘‘তোমার ড্রেসিংরুমে ফেরা চলবে না।” দাদার একগুঁয়েমি দেখে তো সবাই অবাক। অসুস্থ নেহরাকে দিয়ে বল করবেন কীভাবে! কিন্তু দাদার দাদাগিরি তো আর ওইসবের ধার ধরে না। মনে আছে, সৌরভ সেদিন টানা বল করিয়েছিলেন আশিস নেহরাকে দিয়ে। নিট ফল ১০-২-২৩-৬। ভারত ম্যাচটি জিতেছিল। প্রেস কনফারেন্সে সৌরভ বলেছিলেন, ‘‘কি তাহলে ক্রিকেটটা ভালোই বুঝি বলুন?”

এই হল দাদা। যিনি দলে তরুণ রক্ত ঢোকানোর জন্য নির্বাচকদের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ লড়েন। একটা সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম যে, হরভজন সিংকে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সিরিজে দলে রাখার জন্য তিনি ধনুকভাঙা পণ করেছিলেন। ফর্মে ছিলেন না হরভজন। তাই নির্বাচকরা ‘টারবনেটর’-কে দলে জায়গা দিতে চাইছিলেন না। কিন্তু সৌরভ নাছোড়। নির্বাচকরা তখন জানিয়েছিলেন, হরভজন ফ্লপ হলে ক্যাপ্টেন্সি চলে যেতে পারে সৌরভের। তাতেও আপস করেননি মহারাজ। নাছোড়বান্দা ‘দাদা’র পছন্দের হরভজন জায়গা পেয়েছিল ভারতীয় দলে। বলে রাখি, এই সিরিজটি ছিল সৌরভের ক্যাপ্টেন্সিতে ঘরের মাটিতে প্রথম টেস্ট সিরিজ।

আরও পড়ুন: কপিল দেব ১৭৫:৩৮, ইতিহাস থেকে ক্রিকেট রূপকথা

২০০১-এর ১১-১৫ মার্চ। ম্যাচটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব জানি না। কারণ ম্যাচটিকে মহাকাব্যিক বা ঐতিহাসিক বললেও কম বলা হয়। তার থেকেও যদি বেশি কিছু থেকে থাকে, এই টেস্ট ম্যাচ সেটা। ম্যাচটি ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে বিশেষ এক জায়গা করে নিয়েছে। স্টিভ ওয়ার অস্ট্রেলিয়া তখন অশ্বমেধের ঘোড়ার মতো ছুটছে। ভারতে এসে মুম্বইয়ের প্রথম টেস্ট জিতে নিয়েছেন অজিরা। এহেন অস্ট্রেলিয়াকে হারাবে কে? ইডেনে ম্যাচ শুরুর আগে টসের সময় ঘড়ি ধরে ঠিক ৯ মিনিট বিপক্ষ অধিনায়ককে দাঁড় করিয়ে রাখলেন সৌরভ। পরে অবশ্য ‘দাদা’র যুক্তি ছিল স্টিভ তাড়াতাড়ি টস করতে চলে গিয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়া প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ৪৪৫ রানের বিশাল ইনিংস খেলেছিল। তবে প্রথম ইনিংসে হরভজন সিং হ্যাটট্রিক করে প্রথম ভারতীয় বোলার হয়ে উঠেছিলেন, যিনি টেস্টে প্রথমবার তিন বলে তিন উইকেট নিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন: ৪৭ বছর পরেও গাভাস্করের মনে অম্লান মাঠের মধ্যে চুল কাটার স্মৃতি

এরপর ব্যাট করতে নেমে মাত্র ১৭১ রানে গুটিয়ে যায় ভারত। ফলোঅন খেয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে নেমে ভারত খোঁচা খাওয়া বাঘের মতো খেলতে থাকে। সেই ম্যাচেই ভিভিএস লক্ষ্মণের ২৮১ এবং রাহুল দ্রাবিড়ের ১৮০ আজও মিথ। ভারত দ্বিতীয় ইনিংসে করেছিল ৬৫৭/৭। ভারত ডিক্লেয়ার ঘোষণা করার অজিরা তাদের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করেছিল। অবিশ্বাস্য ভাবে ম্যাচে ফিরেছিল ভারত। শচীন ব্যাট হাতে সুবিধা করে উঠতে না পারলেও দ্বিতীয় ইনিংসে নিয়েছিলেন ৩ উইকেট। প্যাভিলিয়নে ফিরিয়েছিলেন হেডেন, গিলক্রিস্ট ও ওয়ার্নকে। হরভজন সিং দুই ইনিংস মিলিয়ে নিয়েছিলেন ১৪ উইকেট। লক্ষ্মণ মহাকাব্যিক ২৮১ করে ম্যাচের সেরা হয়েছিলেন। টানা জেতার পর অজিদের এটাই ছিল প্রথম হার। আর সৌরভ নির্বাচকদের সঙ্গে হরভজনকে নিয়ে যে চ্যালেঞ্জটি লড়েছিলেন, তা হেলায় জিতেছিলেন চিরকালীন আপসহীন মানুষটি। আরও অনেককিছু বাকি রইল এ লেখায়, তাঁর প্রতি বঞ্চনা, কামব্যাক, অবসর নেওয়া, সিএবির মসনদ থেকে বিসিসিআইয়ের সভাপতি হওয়া সহ আরও বহুকিছু… ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির ফাইনালে লর্ডসের ব্যালকনিতে জার্সি ওড়ানোর আখ্যানও বাকি রইল। সেসব আলোচনা অন্য কোনও পরিসরে করব। কারণ সৌরভ নিয়ে লিখলে আস্ত একটা বই লেখা হয়ে যেতে পারে। তাই আপাতত আমার নটেগাছটি মুড়ালো। শুভ জন্মদিন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *