মেদিনীপুরের গড় হরিপুরে শতায়ু পূর্ণ করা রামচন্দ্র মন্দির

চিন্ময় দাশ

মেদিনীপুর জেলার দক্ষিণতম এলাকার গ্রাম গড় হরিপুর। থানা দাঁতন। সেখানে এক জমিদার তাঁর পিতা-মাতার স্মৃতিতে একটি মন্দির স্থাপন করেছিলেন। এই পরিবারের জমিদারি গড়ে উঠেছিল ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ প্রথার সুবাদে। আসলে জরির ব্যবসা ছিল জমিদার মাইতি পরিবারের। শুনতে জরি, কিন্তু খুব বড় মাপের ব্যবসা।

ভারতের অন্যান্য কোনও কোনও অংশের মত, পূর্বকালে বাংলাতেও জরির ব্যবহারের প্রচলন ছিল সমাজে। জরির কদর আর ব্যবহার ছিল উল্লেখ করবার মতো। জরি বসানো কাপড়কে বলা হত— জরিপট্ট বা জরিবস্ত্র। হিরে-জহরতের মতো ‘জরি-জহরত’ শব্দটিও শোনা যেত খুব। ভারতচন্দ্র, হেমচন্দ্র, রঙলাল প্রমুখ বাঙালি কবিদের রচনায় জরির উল্লেখ পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন: একদা রাজার হাতে গড়ে ওঠা মেদিনীপুরের চন্দ্রকোণার রঘুনাথ মন্দিরের চেহারা আজ বড়ই করুণ

এগার-বারো পুরুষ আগের কথা। এই জরির ব্যবসা থেকে অর্থবান হয়ে উঠে জনৈক ভগবান চন্দ্র মাইতি বড় মাপের একটি জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিশাল আকারের গোটা কাকরাজিত পরগনাটাই (বর্তমান দাঁতন থানা) কিনে নিয়েছিলেন তিনি। পরে মাইতি বংশ ‘চৌধুরি’ খেতাব পেয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকার থেকে।

আরও পড়ুন: সুধীন-শ্যামল জুটি এবং বাঙালিয়ানায় মোড়া জিঙ্গল বেল

ভগবান চন্দ্রের অধস্তন কয়েক পুরুষ পরে, মাইতিবংশের জনৈক প্রবোধচন্দ্র মাইতি এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। সম্প্রতি শতবর্ষ আয়ু পূর্ণ হল এটির। মন্দিরের দেওয়ালে লাগানো একটি ফলক থেকে জানা যায়, বাংলা ১৩২৬ সনে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রবোধ চন্দ্রের পিতা চৌধুরি রাধাচরণ মাইতি তাঁর ১০ বছর পূর্বে, ১৩১৬ সনে গত হয়েছিলেন। ১৩২৬ সনে তাঁর মাতৃদেবী চৌধুরানি রাসমণি দেবী গত হন। সেই বছরেই পিতা-মাতার স্মৃতিতে প্রবোধচন্দ্র মাইতি এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন।

আরও পড়ুন: মহামানব যিশু খ্রিস্ট, মানবপ্রেমের ঘনীভূত রূপ

আদিতে মাইতি বংশ ছিলেন শৈব। পূর্বকাল থেকে সিদ্ধেশ্বর শিবের বড় আকারের একটি এক-রত্ন মন্দির ছিল জমিদারদের। পরে চৈতন্যদেবের গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রভাবে বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করেন তাঁরা। প্রবোধচন্দ্রও মন্দির নির্মাণ করে, তাতে রঘুনাথ নামিত শালগ্রাম শিলাই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

আরও পড়ুন: বিশ্বজনীন ক্রিসমাস উৎসবের কিছু অভিনব উদ্‌যাপন

দালান রীতির পূর্বমুখী মন্দির। সারা পৃথিবীতে দালান-রীতির মন্দির প্রথম গড়া হয়েছিল গ্রিসের এথেন্স নগরীতে, জ্ঞানের দেবী এথেনা-র জন্য। ভারতবর্ষে প্রাচীনতম দালান-মন্দিরের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে মধ্য প্রদেশের, সাঁচি স্তূপের পার্শ্ববর্তী, পাথরে নির্মিত একটি মন্দিরকে।

রামচন্দ্রের এই মন্দির ইটের তৈরি। সামনে তিন খিলানের দ্বারযুক্ত একটি অলিন্দ। তার পিছনে এক-দ্বারী গর্ভগৃহ। দু’টিরই গড়ন আয়তাকার। মাথায় সমতল ছাদ। সেই ছাদের ভার বহন করছে সামনের স্তম্ভগুলি। দালান রীতির সৌধ হলেও মন্দিরের সামনের দেওয়ালের মাথায়, আলসের উপর, শীর্ষক নির্মিত হয়েছে। সেখানে পর পর বেঁকি, আমলক, কলস ও বিুষ্ণচক্র স্থাপিত।

টেরাকোটা ফলকে অলংকৃত করা হয়েছিল মন্দিরটিকে। সামনের দেওয়ালটি ফলক দিয়ার মোড়া। কার্নিশের নীচ বরাবর সমান্তরাল এক সারি এবং দু’দিকের কোণাচলগ্ন দুই সারিতে মোট ৩৬টি ফলক। ফলকগুলিতে মোটিফ হিসাবে বিুষ্ণর দশাবতার, কৃষ্ণের বাল্যলীলা ইত্যাদি পৌরাণিক বিষয়ই প্রধান। ফলকগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফলক হল— মহাপ্রভুর একটি ষড়ভুজ মূর্তি। এছাড়া, সামাজিক বিষয়ের একটি ফলক আছে— গাভী দোহন।

সাক্ষাৎকার
সর্বশ্রী তাপস কুমার মাইতি, দেবাশীষ মাইতি, দেবকুমার মাইতি— গড় হরিপুর।
সমীক্ষা-সঙ্গী
শ্রীমতী অনিতা মুর্মু, শিক্ষিকা— কলকাতা।
পথ-নির্দেশ
মেদিনীপুর-কাঁথি রাস্তায় এগরা কিংবা জাহালদা। সেসব জায়গা থেকে ট্রেকার বা টোটো চেপে হরিপুর বাজার। জমিদার মাইতিদের পাড়া বাজার থেকে সামান্য দূরে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *