শতাব্দী পেরিয়ে ভ্যাকসিনের ইতিকথা: স্মলপক্স-বিসিজি থেকে করোনার ভ্যাকসিনের দিকে ভারত

ড. মাল্যবান চট্টোপাধ্যায়

ভ্যাকসিন শব্দের সঙ্গে মানবসভ্যতা পরিচিত দীর্ঘদিন ধরেই। অনেক সময়ই তা হয়ে উঠেছে সংকটমোচনের হাতিয়ার। ভারতে তিন লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীকে চিহ্নিত করা হয়েছে যাদের দেওয়া হবে সেরাম ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়া এবং ভারত বায়োটেকের ভ্যাকসিন। ২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারি সারাভারতে শুরু সেই হাতিয়ারের প্রয়োগ। এমনই এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে দেখে নেওয়া যাক টিকাদানের ইতিহাসকে।

আরও পড়ুন: ছয় বিন্দুর জাদুকর

আঠারো শতকের শেষ দিকে যখন ইউরোপে একের পর এক রাজনৈতিক পালাবদল চলছে, ঘটছে ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) মতো ঘটনা, ঠিক সেই সময়ই ইউরোপে হাজির হয়েছিল স্মল পক্সের মতো ব্যাধি। ফরাসি বিপ্লবের ৯ বছরের মাথায় ১৭৯৮ সালে বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড জেনার প্রকাশ করেন তাঁর গবেষণাপত্র অ্যান ইনকয়ারি ইন্টু দ্য কজেজ অ্যান্ড এফেক্টস অফ ভেরিওলা ভ্যাকসিন। এর পরবর্তীকালে গো-বসন্তের বীজ নিয়ে টিকা তৈরি সূচনা হয় স্মলপক্স বা গুটি বসন্তের জন্য। সেই সময় থেকে শুরু করে সারাবিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে শুরু হয়েছে এই টিকার প্রয়োগ। তবে ইউরোপ-কেন্দ্রিক এই অতীত চর্চার সঙ্গে জুড়ে আছে রোগ প্রতিরোধের এশীয় এবং ভারতীয় দিকটিও।

আরও পড়ুন: ২০২০-র দশটি অত্যাশ্চর্য আবিষ্কার

ভারতীয়রা দীর্ঘকাল বসন্তের প্রতিষেধক ব্যবহার করত। শুধু ভারতীয় নয়, এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশে, যেমন পারস্য, তুরস্কে ওই টিকা দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। কোনও সুস্থ ব্যক্তির দেহের উপর একটু আঁচড় কেটে সেখানে বসন্ত গুটির পুঁজ মাখানো হত। তারপর ওই আঁচড় বসন্ত গুটিতে পরিণত হত। কিন্তু ব্যাধির বাহক (পুঁজ) অল্প হওয়ার জন্য সারাদেহে বসন্ত রোগ ছড়াতে পারত না। এরপর একক বসন্ত গুটিটা শুকিয়ে যেত। ওই ব্যক্তির আর কোনও দিন বসন্ত হত না। তার দেহে বসন্ত-প্রতিরোধী ব্যবস্থা গড়ে উঠত। ঠিক কবে থেকে প্রাচ্য দেশগুলিতে এভাবে টিকা দেওয়া শুরু, তা জানা নেই। তবে অষ্টাদশ শতকে এসে ইউরোপীয় ডাক্তাররা এটা লক্ষ করেন এবং লিপিবদ্ধ করেন। এরকম টিকার ঘটনা তুরস্কের রাজধানী ইস্তান্বুলে ১৭১৭ সালে ইংরেজ রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী লেডি মেরি ওরটলে মন্টেগু লক্ষ করেছিলেন। তাঁর স্বদেশে ফিরে যাওয়ার পর ইংল্যান্ডে বসন্ত রোগের মহামারি দেখা যায়। তখন লেডি মন্টেগু সব আপত্তি অগ্রাহ্য করে তাঁর সন্তানদের প্রাচ্যমতে বসন্তের টিকাও দিয়েছিলেন। সেই সন্তানেরা বসন্ত রোগ প্রতিরোধ করতে সমর্থ হয়। দেখতে দেখতে প্রাচ্য দেশের টিকা দান পদ্ধতি ইউরোপীয়দের আস্থাও অর্জন করেছিল। তবে কারও কারও ধাতের জন্য বা বসন্তের পুঁজ নিয়ন্ত্রণ না করতে পারার কারণে সুস্থ দেহে বসন্ত ছড়িয়েও যেত, এমনকী মৃত্যুও হত।

আরও পড়ুন: গণিত দিবসে রামানুজন ও তাঁর বন্ধুত্বের কথা

এডওয়ার্ড জেনার

এর পরে পরে অর্থাৎ ১৭৯৮ সালে এডওয়ার্ড জেনার বসন্তের টিকা আবিষ্কার করেন। জেনারের পদ্ধতিটা অন্যরকম ছিল। জেনার টিকা দেবার সময় গো-বসন্তের পুঁজ ব্যবহার করেছিলেন। গো-বসন্ত এক ধরনের মৃদু সংক্রামক ব্যাধি। এতে মানুষের বা গোরুর মৃত্যু হয় না, কয়েকদিন অসুস্থ হয় মাত্র। গো-বসন্তের পুঁজ দিয়ে টিকা নিলে মানবদেহে আসল বসন্ত আর হয় না, তবে গো-বসন্ত হতে পারে। বিলেতে গয়লাদের হামেশা গো-বসন্ত হত, তাদের আসল বসন্ত তেমন হত না। স্বাভাবিকভাবেই গো-বসন্তের পুঁজ আকস্মিকভাবে গয়লার দেহে ঢুকে যেত। আর এর থেকে গয়লার দেহে প্রতিরোধ তৈরি হত এবং বসন্ত হত না। এডওয়ার্ড জেনার এটা লক্ষ করেছিলেন। তিনি গয়লাদের জীবন অনুসন্ধান করে ব্যাপারটা বুঝতে পারেন। লাতিন ভাষায় গোরুকে Vacca বলা হয়। তাই জেনার তাঁর পদ্ধতির নাম দিলেন Vaccination.

ফ্রান্সে গুটি বসন্তের টিকাকরণ। ১৯০৫, সার্কা

জেনারের টিকা পদ্ধতি আবিষ্কৃত হওয়ার পর ইংরেজরা ভারতে তাদের অধীনস্থ এলাকায় জনসাধারণের মধ্যে বসন্তের টিকা দেওয়া শুরু করে। ইউরোপের মাটিতে স্মলপক্সের টিকা এসে গিয়েছিল আঠারো শতকের শেষেই কিন্তু ভারতে এসেছিল ১৮০২ সালে। ভারতের প্রথম টিকা পায় একটি ইউরোপীয় কন্যা তিনমাসে আনা ডাস্টহল। ১৮০৪ সালে কলকাতায় প্রথম গুটি বসন্তের টিকা দেওয়া হয়। অষ্টাদশ শতকে ডেনমার্কের চিকিৎসকেরাও ভারতে সক্রিয় ছিলেন। ইংরেজদের তুলনায় এদেশে ডেনমার্কের উপনিবেশ নামেমাত্র ছিল। এক সময় শ্রীরামপুরে তাদের উপনিবেশ ছিল। মাদ্রাজের দক্ষিণে করমনুলের উপকূলে ত্রাঙ্কুবার অঞ্চলে ডেনমার্কের উপনিবেশ ছিল। ত্রাঙ্কুবার শহরে একটা হাসপাতাল ছিল। ডেনমার্কের স্থানীয় প্রশাসন হাসপাতাল চালাত। ১৭৯৮ সালে শল্যবিদ টি. এল. এফ. ফালি নামে এক ডাক্তার এখানে ছিলেন। তাঁর লিখিত বিবরণ থেকে ত্রাঙ্কুবারের জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। অষ্টাদশ শতাব্দী ধরে ভারতে ইউরোপীয়দের আগমন বেড়েছিল। বলা বাহুল্য, এদের মধ্যে ইংরেজদের সংখ্যা সর্বাধিক ছিল। ১৭০০ সাল নাগাদ ভারতে হাজার তিনেক সাদা চামড়ার ইংরেজ ছিল। শতাব্দীর শেষ ৩০০০০-এর মতো হয়। সমুদ্রের বা নদীর বন্দরে এরা বসবাস করত, দেশের অভ্যন্তরে এদের কম হলেও দেখা যেত। সাহেবদের স্বাস্থ্যরক্ষার ব্যাপারটা নিয়ে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সব সময় চিন্তিত ছিল। বড় শহরের পাশাপাশি তারা ঢাকা, চট্টগ্রাম, হুগলি, বালেশ্বর, মসুলিপত্তনম, পুলিকট, পণ্ডিচেরি, পটনা, আগ্রা, দিল্লি, লাহোর, বুরহানপুর, প্রভৃতি শহরে যেখানে যেখানে সাহেবরা থাকত, সেখানে চিকিৎসা পরিষেবা তারা ইতিমধ্যেই তৈরি করেছিল। একবিংশ শতকের ভারতের করোনা ভ্যাকসিনের প্রসঙ্গ আলোচনা করতে গেলে অনেক সময় দেখা যায় যে, আঠারো শতকের শেষভাগ থেকে স্মল পক্সের ভ্যাকসিন নিয়ে যে পরিমাণ গুজব এবং আলোচনা শুরু হয়েছিল সেই একই ধরনের আলোচনা যেন আজও হয়ে চলেছে।

স্মলপক্সের ভ্যাকসিন যখন দেওয়ার সূচনা হয়েছিল, তখন কখনও কখনও কেউ ভয় পেয়েছিলেন। আজকের প্রেক্ষিতেও একই রকমই লক্ষ্য করা যায়। এটাকে অনেকটা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি বলা যেতে পারে। তবে স্মলপক্সের টিকা আবিষ্কার এবং তারপর থেকে এই রোগ নির্মূল হয়ে যাওয়ার যে সময়কাল, এর মধ্যে যে একটা বিস্তর সময়ের ব্যবধান আছে তা লক্ষ্য করার মতোই। আঠারো শতকের শেষভাগে যে টিকা আবিষ্কৃত হয়েছিল, সেই টিকা প্রয়োগ করে পৃথিবীতে স্মলপক্স মুক্ত করতে সময় লেগে গিয়েছিল বিশ শতকের শেষ দিক পর্যন্ত। অর্থাৎ সময়টা খুবই বেশি ছিল। ১৯৮০ সালে ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি ঘোষণা করতে পেরেছিল বিশ্ব স্মলপক্স মুক্ত। আজকের আধুনিক প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে মানুষ আশা করছে এই সময়কে কমিয়ে ফেলতে পারবে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই করোনা ভ্যাকসিন ব্যবহার করে এই বিপদকেও ও পৃথিবী থেকে দূর করতে পারবে। কিন্তু আজকের প্রেক্ষিতেও স্মল পক্সের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর থেকে আমরা বুঝতে পারি, করোনার প্রস্তাবিত ভ্যাকসিনের পরবর্তীকালের প্রতিক্রিয়া ভারতে এবং পৃথিবীতে কী হতে পারে, তা কিন্তু আগামীই বলবে।

স্মলপক্সের ক্ষেত্রে একটা দীর্ঘ সময় লেগেছিল রোগটিকে নির্মূল করতে। করোনার ক্ষেত্রেও তেমনটা যে হতে পারে, এই নিয়ে বিজ্ঞানীরা সাবধানবাণী দিয়েই যাচ্ছেন। তাঁরা বারবার বলছেন যে, এই ভ্যাকসিন যা ভারতে এসেছে বা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এসেছে তা অন্তিম ভ্যাকসিন নয় তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার অঙ্গ মাত্র। আজকে যেরকমভাবে করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে অনেকেই সন্দিহান, তেমনি আজ থেকে শতবর্ষ আগেও বলা যেতে পারে ভারতসহ পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে যখন স্মলপক্সের টিকা দেওয়া হচ্ছিল, তখনও একইভাবে মানুষ আতঙ্কিত হয়েছিল। অন্যদিকে, ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হয়েছিল ধর্মীয় বিষয়টি, কারণ যে গো-বসন্তের বীজ ব্যবহার করে স্মলপক্সের টিকা তৈরি করা হয়েছিল।

এটিকে গ্রহণ করতে অস্বীকার অনেকেই করায় অনেক সমস্যায় পড়েছিলেন তারা, যারা এই টিকা দেওয়ার উদ্দেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে কিছু অর্থ উপার্জন করছিলেন সেকালের ভারতে। ইচ্ছা-অনিচ্ছার বেড়া টপকাতে ১৮৯২ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা ভারত সরকার পাস করেছিল একটি আইন, কম্পালসারি ভ্যাক্সিনেশন অ্যাক্ট। আজকের করোনার প্রেক্ষিতেও অনেকেই টিকা গ্রহণ করবেন কিনা, এই নিয়ে সন্দিহান। কিন্তু ব্রিটিশ শাসকের মতো স্বাধীন ভারতের গণতান্ত্রিক সরকার বাধ্যতামূলক কোনও আইন চালু করবেন কিনা, তা নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়। মনে রাখা দরকার ব্রিটিশরাও যে এই আইনটি করেছিলেন, সেটিকে কিন্তু তারা অনেকটাই খাতা-কলমেই রেখে দিয়েছিলেন, বাস্তবে প্রয়োগ করার পূর্ণ সাহস তাদের ছিল না। উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের সূচনায় একদিকে যেমন টিকাকরণের বিষয়টি ছিল, অন্যদিকে ভারতের ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন। এসব মিলিয়ে জোর করে টিকা দেবার দিকে সেকালের সরকার এগোয়নি। এসবের মধ্যে দিয়েও কিছুটা দূরে এগিয়েছিল স্মলপক্সের টিকাকরণের বিষয়টি। যদিও এর মাঝে এসে গিয়েছিল প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘটনাগুলি, যা এই প্রক্রিয়াটিকে অনেকাংশে থমকে গিয়েছিল।

আজকেও যখন করোনার প্রস্তাবিত ভ্যাকসিনের প্রসঙ্গ উঠছে, তখনও অনেকের মনেই উঠে আসছে সেই ভীতি। এই নিয়ে আলোচনা চলছে সামাজিক মাধ্যম থেকে কাগজপত্র এবং রাজনীতিবিদদের মুখে মুখে। এ তো গেল ভারতবর্ষের মাটিতে টিকাকরণের সূচনা ইতিহাস। কোনও টিকা উৎপাদনের বিষয়টিতে এবার আমরা যদি তাকাই ভারতের মাটিতে, তবে দেখা যাবে ১৮৫০-এর আগে অবধি ভারতের মাটিতে টিকা উৎপাদন করা হত না, তা মূলত আসত লন্ডন থেকে। এই প্রেক্ষিতের বদল ঘটতে থাকে যখন ভারতের আরও একটা রোগের প্রকাশ প্রকট হয়― কলেরা। কলেরার পরিবেশের মধ্যে কাজ করার অনুমতি নিয়ে ভারতে আসেন এ-সময়ে ভারতে আসেন ওল্ডএমার হ্যাপকিন (১৮৯৩)। পরিস্থিতির কারণে তাঁকে ব্রিটিশ প্রশাসন প্লেগ নিয়ে কাজ শুরু করতে বলে, কারণ সেসময়ে প্লেগ মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। ১৮৯৭ সালে তিনি ভারতের মাটিতে প্লেগের টিকা উদ্ভাবন করেন। বলা যেতে পারে, ভারতে উৎপাদিত উদ্ভাবিত প্রথম টিকা ছিল এটি। তিনি বম্বেতে যে প্রতিষ্ঠানে এই কাজ করতেন, তার নাম পরবর্তীকালে রাখা হয় হ্যাপকিন ইন্সটিটিউট।

হ্যাপকিন

এই ইন্সস্টিটিউটের গুরুত্ব ভারতের টিকাকরণের ক্ষেত্রে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। তবে এই টিকা বিপদের মুখোমুখি করেছিল অনেককেই। এটি প্রয়োগ করার পরে দেখা গিয়েছিল পঞ্জাবের কিছু মানুষ মারা গিয়েছেন এবং পরবর্তীকালে গবেষণা করে জানা গিয়েছিল যে, এই মৃত্যুর পেছনে টিকার দোষ না থাকলেও রয়েছে টিকাকে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে গাফিলতির বিষয়টি। জানা গিয়েছিল যে, শিশিতে করে টিকা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল প্রয়োগের জন্য সেই শিশিটিই দূষিত হয়ে পড়েছিল, যা মৃত্যুর হেতু ছিল। অর্থাৎ টিকা আবিষ্কারই শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ নয়, সেই টিকা সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে এবং সুরক্ষাবিধি মেনে প্রয়োগ করাটাও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। প্লেগের টিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও প্রাথমিক এই বিপর্যয় আমাদের একটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টিকে আবদ্ধ করে থাকবে। কিছুদিন আগেই ২০২১-এর বর্ষবরণ নিয়ে আমরা যখন আনন্দে মুখরিত, তখন অনেক স্বাস্থ্যকর্মীরা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে টিকা কীভাবে দেওয়া হবে, সেই নিয়ে ট্রেনিং নিচ্ছিলেন। প্রয়োগজনিত গাফিলতি হেতু টিকার কার্যক্ষমতা নষ্ট যাতে না হয়, তারজন্যেই এই রকমের প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ শুধু টিকা উদ্ভাবনই নয়, তা প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ। আর এই ক্ষেত্রে প্লেগের কাল আর করোনাকাল একই সূত্রে গাঁথা।

ঔপনিবেশিক ভারতে ব্রিটিশরা তৈরি করেছিলেন একাধিক প্রতিষ্ঠান এবং সেগুলো অনেকটাই নিজেদের স্বার্থেই তারা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকটি স্বাধীনতার পরবর্তীকালে ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থেকে গিয়েছিল। তবে ভারতবর্ষের দীর্ঘকাল ধরে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করেছিল একটি রোগ তার নাম যক্ষ্মা। একে গুরুত্ব দিয়ে ভারত সরকার ১৯৪৮ সালে ব্যাপকভাবে প্রতিরোধক বিসিজি টিকা প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ঘটনাচক্রে ২০২১ সাল বিসিজি টিকার বিশ্বে প্রথম প্রয়োগের একশো বছর। বিসিজি টিকা প্রয়োগ কীভাবে করা হবে, তা নিয়েও করোনাকালের মতোই ভারতবর্ষে হয়েছিল একাধিক ‘ট্রায়াল’ এবং এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল ১৯৬৮ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে হওয়া ভারত সরকার-কৃত টিকা প্রয়োগের সমীক্ষামূলক ট্রায়াল।

এক্ষেত্রে এটি প্রমাণিত হয়েছিল যে, প্রাপ্তবয়স্কদেরকে এই টিকা দিলে খুব বেশি লাভ হবে না। বরঞ্চ শিশুদের ক্ষেত্রে এই টিকা দেওয়া শুরু হলে তা বেশি প্রভাবশালী হতে পারে। এর পরবর্তীকালে ভারত সরকার একাধিক গণ-টিকাকরণের কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন যেখানে পালস পোলিও টিকা, যক্ষ্মা এগুলিকে যুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে জুড়ে গিয়েছিল হামের টিকাও এই প্রক্রিয়ার মধ্যে। হয়তো আগামীতে এররকমভাবেই যুক্ত হয়ে যেতে পারে করোনার প্রস্তাবিত ভ্যাকসিনের বিষয়টিও। বিসিজি টিকার প্রয়োগ নিয়ে আমাদের দেশের সমীক্ষা যেমন নতুন পথ দেখিয়েছিল, তেমনি করোনার প্রস্তাবিত টিকাও আগামীতেও (যা দেওয়া শুরু হবে ১৬ তারিখ থেকে) নতুন দিশা দেবে, উন্মুক্ত করবে গবেষণারলব্ধ জ্ঞানের নতুন দিগন্তকে।

সহায়ক গ্রন্থ ও নিবন্ধ

১. Deepak Kumar, Science & the Raj: A study of British India, Oxford University Press, 1995.

২. মানস প্রতিম দাস, ভারতে টিকা ব্যবহারের ইতিহাস, শারদীয় জ্ঞান ও বিজ্ঞান, বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ, ২০২০।

৩. B. Pati & M . Harrison (ed.), The Social History of Health and Medicine in Colonial India, Routledge, 2009.

৪. অপারাজিত বসু, ভারতে বিজ্ঞান- প্রযুক্তি: মধ্যযুগের শেষ পর্বের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, কে পি বাগচি অ্যান্ড কোং, ২০১৭।

লেখক আসানসোল গার্লস কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *