গাছের মতো বাদলকাকা

গৌতম দে

খেজুর গাছ। নারকেল গাছ। সুপুরি গাছ আর বাদল শেখ মানুষটি। মনে হত একই। একক। কিছুতেই আলাদা করতে পারতাম না।

আমাদের কাছে সে শুধুই ছিল বাদলকাকা। কখনওবা অজান্তেই বাদলকাকা ডেকে আহ্লাদিত হতাম।

—বাবা বাদলকাকা এসেছে।

এক অপার্থিব আনন্দ আমাদের পাঁচ ভাইবোনদের মধ্যে ছিল। বাদলকাকা হাসত। সেই হাসিতে নিষ্পাপ শিশুর সারল্যতা ঝরে পড়ত। তখন বুঝতাম না। এখনও সেই স্মৃতিতে স্পষ্ট দেখতে পাই। যা আজও অমলিন। বাদলকাকা ঘরের দাওয়াতে বসে চা খেতেন। আমাদের বাড়িটি ছিল পাকা। পাকা বলতে ইট আর ঘেষের গাঁথনি। দু’কামরার বাড়িটি যখন বানানো হয়েছিল, তখন দেখতাম উঠোনে টাল দেওয়া ঘেষের ভিতর চুন মিশিয়ে পচানো হচ্ছে। রাজমিস্ত্রিকে জিজ্ঞেস করাতে বলেছিল এই কথা। তারপর বলেছিল, এই দিয়ে তো বাড়ির ইট গাঁথতে হবে। তখন এখনকার মতো সিমেন্টের চালু প্রথা ছিল না। আশপাশের বাড়িগুলো চুন, সুড়কি আর মাটি দিয়ে ইটের গাঁথনি ছিল। বাইরে থেকে বোঝার উপায় ছিল না। আমাদের বাড়ির দাওয়াটি ছিল মাটির। মা গোবরন্যাতা দিয়ে প্রতিদিন ঝকঝকে করে রাখত। সেই দাওয়াতে বসে বাদলকাকা বাবার সঙ্গে চা খেতেন। পাঁচটা নারকেল গাছ, কুড়ি-বাইশটার মতো সুপারি গাছ আর একটি খেজুর গাছ ছাঁটতে হবে। কখনও বা গাছের ফল পেড়ে দেওয়ার জন্য ডাক পড়ত। এছাড়াও অনেক সাধারণ গাছ ছিল আমাদের বাড়িতে।

আরও পড়ুন: আবার সত্যি ভূতের গল্প

বাদলকাকা যখন আমাদের বাড়িতে আসত, তখন আমি হাঁ করে বাদলকাকার পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। দু’পায়ের গোড়ালির আকার ছিল অদ্ভুত রকমের। বর্ষার মেঘের মতো ঠেলে উঠেছে মাংসপিণ্ড দুই পায়ের পাতার মাঝ বরাবর। সেই মাংসপিণ্ডর গায়ে গভীর ফাটল। কীভাবে হল হয়তো বাদলকাকা জানে। আমি দেখতাম। আমার আগ্রহ দ্বিগুণ বেড়ে উঠত। কাকাকে কোনও দিন জুতো পরতে দেখিনি। সেই আদুল পায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করতাম— তোমার ব্যথা লাগে না?

—না।

বাদলকাকা অবলীলায় বলত— ব্যথা লাগলেও আমায় এই কাজ করতে হবে। তখন মনে হয় না তেমন কিছু…। বুঝতে পারতাম গাছ ঝাড়ানো তাঁর পেশা। এটা তাঁকে করতেই হবে। না হলে সংসার অচল।

শীত আসার আগেই বাদলকাকা আমাদের বাড়িতে আসত। তারপর খেজুর গাছের দিকে তাকিয়ে বলত—দাদা এবার তো গাছ ঝাড়ান দিতে হবে। রেডি করতে হবে। উত্তরের হাওয়া যেভাবে বইছে এবার তাড়াতাড়ি শীত ঘরে ঢুকে পড়বে…।

বাবার উত্তরের অপেক্ষায় থাকত না। কাজে নেমে পড়ত বাদলকাকা।

তখনও টালিগঞ্জের এই তল্লাট প্রকৃত গ্রাম ছিল। প্রচুর পুকুর ছিল। ভরা বর্ষায় সেইসব উপচানো জল রাস্তার দুই পাড়ের নর্দমায় বিপুল স্রোত নিয়ে ধু-ধু ধানজমির দিকে ধেয়ে যেত। পাড়ার অনেকের সঙ্গে আমরা নেমে পড়তাম মাছ ধরতে। বাড়ির মশারিটা জাল হয়ে উঠত। বাড়ির কালভার্টের ওপর দিয়ে মশারি নামিয়ে দিতাম। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রচুর মাছ ধরা পড়ত সেই মশারির জালে। পুঁটি খোলসে ল্যাদোস মৌরলা কুচো চিংড়ি পাকাল… এই প্রজাতির সব মাছ। মাঝেমধ্যে কাতলা মৃগেল রুইও জালে উঠত।

আরও পড়ুন: শাক তোলার গান

আর ছিল প্রচুর প্রজাতির গাছ। আঁশফল। ফলসা। ডেওয়া। গাব। কত ধরনের যে ফলের গাছ ছিল, তা পেটপুরে খেয়েও শেষ করা যেত না। ছিল ধু-ধু ধানজমি আর হোগলাবন। আর ছিল পালা করে শিয়ালের ডাক। শিয়াল ডাকলেই অমনি কুকুরের হল্লা।

তো যা বলছিলাম, সেই বাদলকাকা দু’পায়ের পাতায় দড়ির ফাঁস লাগিয়ে হনহন করে উঠে যেত গাছের মাথায়। কোমরের পিছন দিকে লোহার আংটায় ধারালো হেঁসো। সেই হেঁসোতে রোদ পড়ে পিছলে যেত।

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *