চন্দ্রাহত

তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়


পীঠ পত্তনের শব্দ আর জ্যোৎস্না-জাগরণ সমান্তরাল।
অর্চনার তলায় একটি কুঁজো পিয়ানো সোপ্রানোর অন্বেষণে
থমকে আছে। গান বিগ্রহ পর্যন্ত যেতে পারেনি জ্যোৎস্নায়।
পীঠ পত্তনের পর অঙ্গের আলাদা সত্তা চিনে যারা অধিক আকুল,
তারা ভক্ত নয়— এই বাক্য কখনও পুরনো হবে না। একটি মন্দির
যেন এমন শোকেই ক্রমশ চওড়া হয়ে ওঠে। পিয়ানো
কুঁকড়ে যায় একা। বিকট চাঁদের নাড়িতে কেউ গসপেল পেতে
খেতে বসেনি কখনও, কখনও সতী-অঙ্গের দ্যুতি সৌরবিকিরণের
আয়ু মুচড়ে দেয়নি। পীঠ পত্তনের শব্দ আর জ্যোৎস্না-জাগরণ
একসাথে হুড়মুড়িয়ে ডুবে গেল। একটি সোপ্রানো কতদূর
প্লুতস্বর পাঠাতে পারে চিনতে চিনতে, আমরা দেবীমাতার পথ পেয়েছি।


লিঙ্গ শিথিলতার মোহন-মুরতির কোনাকুনি একটি পাতকুয়ো
শোয়ানো রয়েছে। এখন রাত রুপোর ঢেকুর তুলে নিদ্রাকাঠ।
ঘুণ দু’জায়গাতেই বড় বেশি তোলপাড় জাগায়।
সতীপীঠে মাথা কুটে এসে পাড়ার এয়োরা তেল বোলাচ্ছে
বাঁটে। এভাবে মিনসে দাঁড়ায় না, জ্যোৎস্না দাঁড়ায়। ময়দা-ধবধবে
জ্যোৎস্না ভেতরে যায়, গোলাপি কান্দাহারে পূর্বতন পুতুলের
হাড় ছুঁয়ে ছুঁয়ে প্রার্থনা করে। প্রার্থনায় হাওয়ার আঙুল জেগে ওঠে।
পিয়ানোর ঘা স্পর্শ হতেই চন্দ্রিল রাত বেকসিন্‌স্কি’র সাদা…
পাতকুয়ো গলে গলে পারদ হয়ে যাচ্ছে, বড় বেশি উপাসনা হল।
লিঙ্গ শিথিলতার মোহন-মুরতির চারপাশে কিছু প্রণম্য বালক
হাততালি দিচ্ছে। এমন বিদঘুটে আওয়াজের দুয়ারে
কানে হাত চাপা দিয়ে বসে আছি আমরা। আঙুলের কানগুলি
কেউ এসে এবার তো পোড়াও।

আরও পড়ুন: পাঁচটি কবিতা


নিপুণ ছিলিম জাদুটোনা জানে। প্রতিটি টান পিতৃবৃংহণের মতো
বুকের কপাট দুলিয়ে দিচ্ছে। রাতের পাতালে শুধু জানলা দেখি
ধোঁয়ার তলায়। নিপুণ ছিলিম যেন প্রেমে শঙ্কু, আমাদের মাথাগুলো
খোলসা হয়ে যায়। দেখি ধ্বনি, শুনি বীজ— এত জাদু দিয়ে
রাত তবু দিনের অশ্ব হল না। কে গতি দেবে? পা ধোঁয়ার আঙরাখা
মাড়িয়ে বহুদিন বিকল। সহজ কোনো যান নেই অস্মিতাগামী।
আমরা শৈলী নির্মাণে ক্রমশ ডুবে যেতে যেতে আর
বস্তুর তাৎপর্য অবধি এগোতে পারি না। কিছুই থাকবে না, তবু
ছিলিমের বিদ্যা লিখে সান্ধ্য সরোবরে ভাসিয়ে দেওয়া। ভাসমান
গুণ যাবে গুণিনের নাভি অবধি। নাভির শিকড় গেছে পীঠ পত্তনের
ভূমি অবধি। এবার স্তম্ভনে তামাক দহনের স্বাদ ভুরভুর করবে।
কুঁজো পিয়ানো, ন্যাড়া পিয়ানো, ন্যুব্জ পিয়ানো জাদুটোনায়
বেজে উঠছে। পিতৃবৃংহণের অনুরূপ ধ্বনি কঁকিয়ে উঠছে সম্মোহনে।
একে অতীত ভাবো বা ভবিষ্যৎ… পরিত্রাণ নেই।


এই রাত্রিবাহিত বলশালী পশুসমূহের শিং যতই জলে ধৌত হোক,
তারা সর্বাধিক হিংস্র হবে না। হবে না মরণাতীত; গাছ শিকার
করতে করতে ক্রমশ কসাইশিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ফুলেফেঁপে
উঠবে। উঠবে হন্তারক টিলার কশেরুকায়। তাদের সমবেত
বার্তালাপ শ্রেষ্ঠ খাদক অবধি পৌঁছাবে না। রাতের কোনো
পরিবহণ পদ্ধতি এত হিমশীতল ক্রিয়ায় স্থায়ী হতে পারে না।
সুতরাং বলশালী পশুসমূহের জরা-লগ্ন পর্যন্ত অপেক্ষা উঁচিয়ে
আমরা বসে থাকব। শুভ্র কৃন্তকগুলি আড়ালে রাখব যাতে
চাঁদ লেগে চমকে না ওঠে। থাবা নীরব ক’রে এই আমাদের
জীবিকা ও প্রতিপালন। লঙ্গরের অপেক্ষায় কত যামিনী টপকে
গেল, গেল টপকে কৃষ্ণা প্রতিপদ। পঞ্জিকামতে সময়
চলে না আর, বরং বিপরীতে তার পা এগোতে কিংবা পিছোতে দেখি।
পিছিয়ে পিছিয়ে দেওয়ালে সময় ঠিকে যাওয়ার মুহূর্তেই
আমরা পশুগুলির শিং উপরে নেব; সফেদ তরল হু-হু ক’রে বেরিয়ে
পশুগুলি মাংস হয়ে যাবে। কসাইশিল্পে বিনিয়োগ এমন।

আরও পড়ুন: মেধাকাল


পীঠ পত্তনের শব্দ আর জ্যোৎস্না-নিমজ্জন বিপ্রতীপ।
একটি ভোরের জন্ম আমাদের ধর্মকর্ম পালটে দিতে পারে।
পীঠ পত্তনের আগের মুহূর্তেও আমরা টের পাইনি আদতে পূজ্য
কেউ থাকতে পারে। আমরা তার মুখ দেখি না, জিভ দেখি না।
শুধু একটি করে পিয়ানো উধাও হয়ে যায়, তার দু-এক পালকখণ্ড
পূজ্য দেবীর নাভিমূলে থমথম করে। এই আমিষ ঘটনার পাশে
আর সোপ্রানো মানায় না। চাঁদ কমে আসছে, রাত ফেটে গেল…
এই অবধি সন্তান বহন করে আমরা অববাহিকায় এসে
জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে রুপো হাতড়াচ্ছি। অথচ কিচ্ছু নেই, শুধু আমাদের
অনন্ত সন্তানসমূহ চন্দ্রাহত দেহ নিয়ে গাছ শিকারে এগিয়ে গেল।
পীঠ দেবী-অঙ্গ থেকে ক্রমশ সরে যাচ্ছে। এভাবেই
মাহাত্ম্য হারানো শুরু হয়। সিদ্ধিভুক গাছের নীচে আমরা
নতুন চাঁদের অপেক্ষায় তামস জগতে ব’সে
সন্তানদের গর্জন, পিয়ানো আর প্রলাপ শুনছি স্নেহের অছিলায়।

ছবি ইন্টারনেট

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *