ছাঁকনি

রাহুল দাশগুপ্ত

বাবা হওয়ার পর থেকেই এই এক নতুন সমস্যা শুরু হয়েছে উৎসবের। কিছুতেই কোনও শিশুর দুঃখ সইতে পারে না সে। ট্রেনে, বাসে, রাস্তায় বা অন্য কোথাও কোনও শিশুকে কষ্ট পেতে দেখলেই তার বুক মুচড়ে ওঠে। সেদিন মেট্রো থেকে বেরোতেই দেখল, ফুটপাথে ছেঁড়া কাপড়ের উপর সর্বাঙ্গে কালিঝুলি মেখে একটি দুধের শিশু শুয়ে আছে। আর তাকে পাহারা দিচ্ছে ওঁর তিন বছরের মেয়ের বয়সি একটি বাচ্চা ছেলে। দেখেই ওর বুকের ভেতরটা এমন মুচড়ে উঠল যে, চোখে পর্যন্ত জল এসে গেল। অটোয় উঠে যতবার ও অন্যমনস্ক হতে চেষ্টা করল, ততবারই শিশু দু’টির মুখের বদলে ভেসে উঠল নিজের মেয়ের মুখ। নিজের মেয়েরই একটি মুখ যেন শুয়ে আছে। আর তাকে পাহারা দিচ্ছে আর একটু বেশি বয়সের সেই একই মুখ!

আরও পড়ুন: জেরুসালেম

উৎসবকে কে যেন চুপিচুপি কেবলই বলে যেতে লাগল, আমার মেয়ে, ওই জায়গায় যদি আমার মেয়ে থাকত! ওরা তো ওরই মতো দু’টি শিশু। আর দ্যাখো, কি দুর্ভোগই না ওদের পোহাতে হচ্ছে…

উৎসবের পাশেই বসে ছিল কলেজে পড়া দু’টি মেয়ে। হঠাৎ ও লক্ষ করল, অবাক হয়ে তারা ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চশমার ফাঁক দিয়ে জল গড়িয়ে নামছে আর সে দিকেই কৌতুকের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওরা। সেই দৃষ্টি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার সময় উৎসবের মনে হল, কেন আমারই এ রকম হয়? আর কারও তো হয় না? সবাই দেখছে ওই শিশু দু’টিকে। কারও তো কিছু হল না! শুধু আমার বুকই মুচড়ে উঠল। চোখ জলে ভেসে গেল। আমার কি কোনও মানসিক রোগ হল? আমি কি কোনও মনের ডাক্তারের কাছে যাব? কয়েকদিন পর আবার একটা ঘটনা ঘটল। লোকাল ট্রেনে চেপে যাচ্ছিল উৎসব। ওর যেমন স্বভাব, অর্থাৎ অন্যমনস্ক ভাবেই। হঠাৎ একটি শিশুর কান্নার আওয়াজে যেন হুঁশ ফিরে এলো। পাশে তাকিয়ে দেখল, একটি শিশু হাত-পা ছুড়ে প্রচণ্ড কাঁদছে আর ওর বাবা-মা তাকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। আসলে যেদিকে ওরা বসেছে, সেই জানলা দিয়ে রোদ ঢুকে যেন পুড়িয়ে দিচ্ছে সব। সেই রোদ একটি শিশু সহ্য করে কী করে?

আরও পড়ুন: লকডাউনে বাদাবনের বাঘ

হঠাৎ বুকের ভেতরটা আবার প্রচণ্ডভাবে মুচড়ে উঠল উৎসবের। শিশুটির দিকে তাকিয়েই দেখতে পেল নিজের মেয়ের মুখ। কে যেন চুপিচুপি বলে উঠল, আহা, ওই জায়গায় যদি আমার মেয়ে থাকত! আমি সহ্য করতে পারতাম না। আর এখনই বা সহ্য করছি কী করে! কী কষ্টই না পেয়ে চলেছে শিশুটি! কী দুর্ভোগই না সহ্য করতে হচ্ছে ওকে…

উৎসব সিট ছেড়ে উঠল না। সেই সাহসই হল না ওর। শুধু আতঙ্কে হিম হয়ে গেল ওর গোটা শরীর। চোখের জলটুকুও যেন শুকিয়ে গেল। নিজেকে সে ফিসফিস করে বলেই চলল, একজন মানসিক ডাক্তার। আমার একজন মনের ডাক্তার প্রয়োজন… একদিন উৎসবের সঙ্গে ওর স্ত্রী দীপিকার খুব ঝগড়া হল। আবার মিটমাটও হয়ে গেল কিছুক্ষণ পরে। দীপিকা খুব কাঁদল কিছুক্ষণ। আর উৎসব তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। কিন্তু উৎসবের মেয়ের মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে গেল। থম মেরে গেল সে একদম। সে দিন উৎসবই মেয়েকে স্কুলে দিতে গেল। ওর মেয়েকে গেট দিয়ে ঢুকতে দেখে হাসিমুখে স্কুলের আন্টিরা এগিয়ে এলো। উৎসবের মেয়ে কিন্তু একটু হাসলও না। নিঃশব্দে তাকে স্কুলের সিঁড়ি দিয়ে উঠে যেতে দেখে আবারও উৎসবের বুক মুচড়ে উঠল।

ফেরার পথে বারবার সেই দৃশ্যটা ওর চোখের সামনে ভাসতে লাগল। সিঁড়ি দিয়ে নিঃশব্দে মেয়ে উঠে যাচ্ছে। একটু পরেই সিঁড়ির বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল। অথচ মুখে একটুও হাসি নেই। একবারও পিছন ফিরে তাকাল না। যেন গোপন কোনও ব্যথায়, অভিমানে থমথম করছে সেই মুখ।

অথচ গতকাল রাতেই জোন বায়েজ-এর গলায়, ‘গুয়ানতানামেরা’ গানটি শুনতে শুনতে খিলখিল করে হেসেছে এই মেয়ে। সারা শরীর দুলিয়ে দুলিয়ে নেচেছে। আর তার চোখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলেছে, তোমার চোখের ভেতরটা কালো কালো লাগছে কেন গো? হাসতে হাসতে উৎসব বলেছে, তুমি ফুঁ দাও, তা হলেই সাদা হয়ে যাবে। মেয়ে ফুঁ দিয়েছে আর বলেছে, হ্যাঁ, এবার একটু সাদা হয়েছে। আজ সেই মুখে ব্যথার একটা জমাট ছায়া ভারী হয়ে চেপে বসে আছে। কে যেন ফিসফিস করে বলে উঠল উৎসবকে, এর জন্য তুমিই দায়ী। একমাত্র তুমি। তুমিই ওকে কষ্ট দিয়েছে। একটা নিষ্পাপ শিশুকে। এ-কাজ তুমি পারলে কী করে?

সারাদিন মনখারাপ হয়ে রইল উৎসবের। চোখ খোলা থাক আর বন্ধ, থেকে থেকেই ভেসে ওঠে সিঁড়ি দিয়ে মেয়ের উঠে যাওয়ার দৃশ্যটি। আর তখনই মন অশান্ত হয়ে ওঠে। বুক মুচড়ে ওঠে। তীব্র অনুতাপে ভরে যায় সারামন। এই দৃশ্যটির স্রষ্টা সে। সে ঝগড়া না করলে কোনওদিন এই দৃশ্যটির জন্ম হত না।

আরও পড়ুন: শূর্পণখা: রাক্ষসী নয়, নারী

সে দিন ফিরে এসে আবার মেয়ের হাসিমুখ দেখতে পেল উৎসব। স্কুলে গিয়ে মন ভালো হয়ে গেছে তার। ‘বাবা, বাবা’ করতে করতে তার দিকে ছুটে আসতে লাগল মেয়ে। আর উৎসব স্পষ্ট দেখল, মেয়ে ছুটে যাচ্ছে। একটা সিঁড়ির দিকে। আর নিঃশব্দে, থমথমে মুখে সেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাচ্ছে।

মেয়েকে কোলে নিয়ে আঁকড়ে ধরতে ধরতে উৎসব দেখতে পেল, সিঁড়ির বাঁকে কেউ অদৃশ্য হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, এই দৃশ্যটি তার জীবনে আর কখনও মুছে যাওয়ার নয়…

কয়েক দিন পর আবার একটা ঘটনা ঘটল। দীপিকার সঙ্গে সঙ্গম করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো সরে এলো উৎসব। তার পর দু’হাতে মুখ ঢেকে বলল, পারব না, আমার হবে না… দীপিকা অবাক হয়ে জানতে চাইল, এ কী হল তোমার? কী যা-তা বলছ?

করুণ গলায় বলে উঠল উৎসব, আমি স্পষ্ট দেখছি দীপিকা, মা সব দেখছে…

দীপিকা অবাক হয়ে উৎসবের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঘরের আলো জ্বালে। আর সেই আলোয় দেখে, কালাে হয়ে গেছে উৎসবের মুখ।

উৎসব ভাঙা গলায় আবার বলে, মা সব দেখছে দীপিকা। মায়ের ছবিটা এ ঘর থেকে সরাতে হবে। স্টাডি রুমে সরিয়ে দেব। বরং ওই ঘরেই ছবিটা মানাবে বেশি। মা তো পড়াশুনো খুব ভালোবাসত।

কী হয়েছে তোমার বলো তো? দীপিকা একটু সরে এসে জানতে চায়।

আমার সব সময়ই মনে হয়, মা যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে, সব লক্ষ রাখছে। সেই দৃষ্টির সামনে এসব করা যায় না দীপিকা…

সত্যিই ব্যাপারটা ক’দিন ধরেই খুব ভাবাচ্ছে উৎসবকে। ওদের শোবার ঘরে ওর অকালমৃত মায়ের একটা ছবি আছে। হঠাৎ কিছু দিন হল, সেই ছবিটা যেন জ্যান্ত হয়ে উঠেছে। বেশ পরিপাটি করে ওদের সমস্ত ক্রিয়াকলাপের দিকে নজর রাখছে। পছন্দ হলে মুখে একটা প্রসন্ন ভাব ফুটে উঠছে। আর অপছন্দ হলে মুখটা কেমন জানি একটু কঠোর হয়ে উঠছে।

কিছু দিন ধরেই এরকম চলছে। আর তার পর থেকেই উৎসবের মন অনুতাপে ভরে গিয়েছে। কেবলই সে নিজেকে বলেছে, মা তা হলে সবই খেয়াল রাখছে! আর আমি কী না করেছি ঠিক তার চোখের সামনে! একজন সন্তান হয়ে এ কাজ আমি কীভাবে পারলাম? কেন আগে খেয়াল করিনি, ঘরে মায়ের ছবিটা আছে, আর সেই ছবির ভেতর থেকে সব সময়ই সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে?

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)

দীপিকা বলল, কিন্তু আগে তো কখনও তোমার এসব কিছু মনে হয়নি?

উৎসব কিছুটা বিভ্রান্তের মতো বলল, এখন হচ্ছে। খুব বেশি করেই হচ্ছে। মায়ের ছবিটা এ ঘরে থাকলে আমি কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারব না…

দীপিকা উৎসবের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, কী হয়েছে তোমার? তার চেয়ে বরং এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই তোমাকে।

উৎসব ক্লান্ত স্বরে বলে, আমিও তাই ভাবছি। তার পর একটু চুপ করে থেকে বলে, জানো, মাত্র একুশ বছরে মারা গিয়েছে আমার মা…

জানি তো! দীপিকা বলে।

মা তার আয়ুটা আমাকে দিয়ে গিয়েছে। আর তাই আমি আজও বেঁচে আছি! না হলে কবেই… ওপরের সিলিংয়ের দিকে চোখ তুলে তাকায় উৎসব।

এবার আবার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় দীপিকা। তার পর বলে, কী যা-তা বলছ? তোমার আয়ু তোমার নিজের নয়? ওটা তোমার মায়ের দেওয়া…

ঠিক তাই। বলেই এবার হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে উৎসব। তারপর বলে, আর সেই মায়ের সামনে আমি কী করেছি দীপিকা! কী হবে আমার!

উৎসব, উৎসব, দীপিকার গলায় কেমন একটা ব্যাকুলতা ফুটে ওঠে এবার। তার পর সে বলে, তোমার কিচ্ছু হবে না, কিচ্ছু হয়নি, আমরা তো আছি…

একটা অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকে উৎসব। বাঁকের কাছে গিয়ে একবার থমকে দাঁড়ায়। নিজেকেই প্রশ্ন করে, কেন এলাম এখানে? একজন নব্বই বছরের বৃদ্ধার কাছে কেন এলাম? বার্ধক্য আমার সহ্য হয় না! কষ্ট হয় আমার। কিন্তু আবার সে এগোতে থাকে। বাঁক পেরিয়ে সোজা উঠে দরজার পাশে কলিংবেল টেপে।

বৃদ্ধা বিছানায় শুয়েছিলেন। উৎসবকে দেখে বালিশে ঠেস দিয়ে উঠে বসেন। উৎসব তার আসার কারণ জানায়। ওর গবেষণার একটি অধ্যায় যে বিষয় নিয়ে, তার ওপর বৃদ্ধার একটি প্রামাণ্য বই আছে। সেই ব্যাপারেই বৃদ্ধার একটা সাক্ষাৎকার নিতে চায় সে। বৃদ্ধা অনর্গল কথা বলে চলেন। আর হঠাৎ হঠাৎ করে চুপ করে যান। কখনও তার ভুরু কুঁচকে যায়। কখনও সারামুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ে। কখনও যেন চোখ বুজে ধ্যান করতে থাকেন। ঢোক গেলেন দু-একবার। কথা বলার সময় তাঁকে আর বৃদ্ধা বলে মনে হয় না। তিনি যেন কিশোরী হয়ে যান। ঝরনার মতোই তখন তাঁর সহজ, স্বচ্ছন্দ গতি। আর অসম্ভব পরিমিতিবোধ। বাড়তি বা মামুলি একটা কথাও নয়।

একটু একটু করে মুগ্ধতার রেশ ছড়িয়ে যেতে থাকে উৎসবের সারামনে। আর সেইসঙ্গে একটু একটু মনখারাপও যেন!

নিজের মনে মনে সে বলে, কী বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিটি কথা! কী স্বচ্ছ প্রতিটা ভাবনা! গোটা উপস্থিতি থেকে যেন মেধার বিচ্ছুরণ ঘটছে! অমন তীব্র আকর্ষণ বোধ করছি কেন? অত মনখারাপ হয়ে যাচ্ছে কেন?

বৃদ্ধা একাই থাকেন। মেয়ে-জামাই বিদেশে থাকে। তারা তবু যোগাযোগ রাখে। ছেলে বহুকাল আগেই আলাদা হয়ে গিয়েছে। মায়ের কোনও খবরই নেয় না। যে মেয়েটি বৃদ্ধার দেখভাল করে, প্লেটে সাজিয়ে অনেক খাবারদাবার নিয়ে ঢোকে। সে দিকে দেখিয়ে বৃদ্ধা বলে ওঠেন, এবার তুমি খেয়ে নাও।

উৎসবের মনে হয়, ওর গলায় যেন অনেকটা বেদনা আটকে আছে। সে বেদনা সুখের না দুঃখের, তা সে কিছুতেই বুঝতে পারে না। শুধু গলাটা ভারী হয়ে থাকে। বৃদ্ধাকে সে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। আবার তাঁর অনুরোধ রাখতে গিয়েও খুব বেগ পেতে হয় তার। কিছুটা খেয়ে বাকিটা সরিয়ে রেখে বলে, আর পারছি না।

ঠিক আছে, আমি তোমায় আর জোর করব না। বৃদ্ধার সারাগালে আবার হাসি ছড়িয়ে পড়ে। তার পর একটা জোরে শ্বাস টেনে বলেন, তোমার সঙ্গে কথা বলতে এত ভালো লাগছে কেন জানি না। বহু দিন কারও সঙ্গে কথা বলতে এত ভালো লাগেনি।

উৎসব ফিসফিস করে বলল, আমারও।

হঠাৎ ওর মনে পড়ে গেল, জঁ পল সার্ত্রের একটা কথা। জঁ পল সার্ত্র বলেছিলেন, দু’জন পুরুষ মানুষের মধ্যে কথাবার্তা শেষপর্যন্ত মুদির স্তরে নেমে আসে। উচ্চস্তরের কথাবার্তা হতে পারে একমাত্র নারী-পুরুষের মধ্যেই। কিন্তু তাই বলে একজন নব্বই বছরের বৃদ্ধা? আর সে তো একজন ত্রিশ বছরের যুবক! হাস্যকর ব্যাপারই বটে একটা!

কিন্তু মুগ্ধতার রেশটা যে কিছুতেই কাটানো যাচ্ছে না। কী আছে এই বৃদ্ধার মধ্যে? কী সেই জাদু? বৃদ্ধা আবার বলেন, তোমাকে আমার এত ভালো লেগেছে! খুব আবেগপ্রবণ শোনায় তাঁর গলা।

উৎসব এবার চমকে ওঠে। তা হলে ভালো লাগাটা তার একার নয়? সে লাজুক মুখে চুপ করে বসে থাকে। হঠাৎ বৃদ্ধা বলে ওঠেন, তুমি এত পড়াশুনো করেছ, আমিও অত পড়িনি। খুব ভাবপ্রবণ লাগে তাঁকে।

আরও পড়ুন: অতিমারি: স্পর্শ, বৌদ্ধিক মুদ্রা ও শ্রুশ্রূষা

না, সে কী! শিউরে উঠে বাধা দিতে চায় উৎসব। নিজেকে সে বলে, এই তা হলে কারণ! আর বৃদ্ধাকে নিজের ভালো লাগার কারণটাও বুঝতে পারে সে, ব্যাপারটা তা হলে এই! মেধা, মেধাই আমাকে এই ভাবে চুম্বকের মতো আকৃষ্ট করেছে।

উৎসবের মনে পড়ে, কিছু দিন আগেই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গার্সিয়া মার্কেসের একটা উপন্যাস সে শেষ করেছে। উপন্যাসটির নাম, ‘অফ লাভ অ্যান্ড আদার ডেমনস’। সেই উপন্যাসে একটি বাক্য ছিল। বাক্যটি এই রকম, ‘যৌনতা একটা মেধার ব্যাপার।’ কথাটা খুব নাড়া দিয়েছিল ওকে। এখন সেই বাক্যটিকে নিজের মতো করে পাল্টে যেন ও স্বীকারোক্তি করে উঠল, প্রেমও একটা মেধার ব্যাপার। আর যৌনতা তো প্রেমেরই অংশ। আবার যৌনতা ছাড়াও প্রেম হতে পারে। তীব্র আকর্ষণ হতে পারে। পারে, যদি মেধা থাকে। মেধা সব পারে…

উৎসব এবার চলে যাবে বলে উঠে দাঁড়াল। বৃদ্ধা হঠাৎ তার দু’হাত এগিয়ে দিলেন। উৎসব মাথাটা ঝোঁকাতেই তিনি উৎসবের কপালের ঠিক মাঝখানে একটা চুমু খেয়ে দিলেন। তার পর বললেন, আবার কবে আসবে? বয়স তো কম হল না! চলে যাওয়ার আগে অন্তত আর একবার এসো…

মুখ ঘুরিয়ে দরজার দিকে যেতে গিয়েও হঠাৎ একবার পিছন ফিরে তাকাল উৎসব। কে যেন পেছন থেকে টান দিল আর ও ঘাড় ফেরাতে বাধ্য হল। আর বৃদ্ধার দিকে তাকাতেই ও খুব অবাক হয়ে গেল। দেখল, বৃদ্ধা ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। যদিও বৃদ্ধার মুখের বদলে রয়েছে ওর তিন বছরের মেয়ের মুখ! কী আর্তি আর ব্যাকুলতা সেই মুখে! স্নেহ ও মমতায় ভরে গেল ওর মন।

বাইরে বেরিয়েও উৎসবের মনে হল, তার কপালটা ভিজে রয়েছে। মনটা খুব ভারী হয়ে গিয়েছে। বুকটা মাঝেমাঝেই মুচড়ে উঠছে। হঠাৎ নিজের জীবনের এক ব্যর্থ প্রেমের কাহিনি মনে পড়ে গেল উৎসবের। তখনও ওর জীবনে দীপিকা আসেনি। কলেজে পড়ে। মেয়েটি ওর মেধায় তীব্রভাবে আকৃষ্ট হয়েছিল। আর ও আকৃষ্ট হয়েছিল মেয়েটির যৌনতায়। যদিও ব্যাপারটা কেউ-ই ঠিক বুঝতে পারেনি। যৌনতাকে ও মেয়েটির মেধা বলে ভুল করেছিল। আর মেয়েটি ওর মেধাকে যৌনতা বলে ভুল করেছিল। ব্যাপারটা মোটেই শেষপর্যন্ত ধোপে টেকেনি।

মেধাকে এর আগে কখনও এত স্পষ্টভাবে দেখতে পায়নি উৎসব। তাহলে কি এই মেয়েকেই সে সারাজীবন ধরে খুঁজে বেড়িয়েছে? এই সেই মেয়ে? এমনভাবে সে ধরা দিল, যখন সে পুরোপুরি নাগালের বাইরে? এই মেধাবী, বুদ্ধিমতী মেয়েটির সঙ্গে কয়েক জীবন কাটাতে পারত সে…

বাড়ি ফিরেও অন্যমনস্ক হয়ে রইল উৎসব। দীপিকা বিরক্ত হয়ে জানতে চাইল, কী হলটা কী? অমন গোমড়া মুখে বসে আছ কেন?

উৎসব আমতা আমতা করে বলল, আমি খুব বিপদে পড়েছি…

মানে? দীপিকা ঝাঁঝিয়ে উঠল, তুমি এক নব্বই বছরের বৃদ্ধার বাড়িতে গিয়েছিলে না? সেখানেও বিপদ?

আমাকে মনের ডাক্তারের কাছে নিয়ে চলো দীপিকা। হঠাৎ মরিয়া হয়ে বলে ওঠে উৎসব, আমি আর পারছি না…

কী হয়েছে তোমার? কী করেছে সেই বৃদ্ধা?

আমি জানি না দীপিকা। তবে কিছু একটা হয়েছে…

তোমার লক্ষণ তো ভালো নয়। ঝাঁঝিয়ে ওঠে দীপিকা, কারও প্রেমে-টেমে পড়েছ নাকি?

উৎসব আমতা আমতা করে বলে, ঠিক তা নয়! তবে ওই রকমই… মানে? নব্বই বছরের এক বৃদ্ধার? আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে দীপিকা।

উৎসব এখন অ্যাসাইলামে।

ঘটনাটা ঘটেছিল এই রকম। হঠাৎ এক রাতে উত্সবের মেয়ে দুঃস্বপ্ন দেখে ধড়মড় করে জেগে ওঠে। যদিও সে ঠিক কী দেখেছে সেটা ব্যাখ্যা করে বলতে পারে না। তখনও ওরা আঁচ করতে পারেনি, ঘটনা কোন দিকে গড়াচ্ছে। পর দিন একইভাবে দুঃস্বপ্ন দেখে চমকে জেগে ওঠে দীপিকা। ক্রমে এই দুঃস্বপ্ন মহামারির মতো ছড়িয়ে যেতে থাকে। প্রথমে পাশের বাড়ি, তার পর গোটা পাড়া, শেষপর্যন্ত পুরো শহরের মানুষ এক দিন দুঃস্বপ্ন দেখে চমকে জেগে ওঠে।

উৎসব শেষে বাধ্য হয়েই বলে, তুমি ওদের খবর দাও দীপিকা। আমাকে এবার যেতে হবে।

নিরুপায় দীপিকা ফোন করে। শহরের প্রধান মনের ডাক্তারকে ফোন করে জানায়, আমার স্বামী, উৎসবই, এই সব কিছুর জন্য দায়ী। হয়তো আগেই ওকে আপনাদের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। আমার মেয়ে তা হলে কিছুতেই প্রথম দুঃস্বপ্নটি দেখত না। আপনারা তো কাগজে দেখেইছেন, আমার মেয়ের থেকেই ব্যাপারটার শুরু। হ্যাঁ, আমার স্বামী খুব বিপন্ন। যদিও ওই আমার মেয়ের মনে এই মহামারির বীজ পুঁতে দিয়েছিল…

আরও পড়ুন: প্যানকেকগুলি

তার পরই অ্যাম্বুলেন্স এসে তুলে নিয়ে যায় উৎসবকে। মেয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে বলে, সাবধানে যেও বাবা। স্টাডি রুমের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় উৎসব দেখে, ওর মায়ের ছবিতে মালা দেওয়া। সেখান থেকে সারাঘরে সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। উৎসব অবাক হয়ে তাকালে, দীপিকা বলে, আজ ওঁর জন্মদিন।

তুমি মনে রেখেছ?

প্রতি বছরই রাখি। তার পরই দীপিকা ফুঁপিয়ে ওঠে।

হাসপাতালের বেডে শুয়ে ঘোরের মধ্যে হঠাৎ উৎসবের মনে পড়ে যায় সেই বৃদ্ধার একটা কথা। বৃদ্ধা বলেছিলেন, মানুষের জীবনে কখনও কখনও খুব বিরল মুহূর্ত তৈরি হয়। বেদনা, বেদনার জন্ম দেয় তারা। খুব সংবেদনশীল মানুষেরাই এটা পারে। আর একটা নকল ও মামুলি জীবনের মধ্যে থাকতে থাকতে তখনই তার ঘোর ভেঙে যায়। সে তখন আসল জীবনকে দেখতে পায়। তার খুব কষ্ট হয়। বুক মুচড়ে ওঠে। ওই বিরল। মুহূর্তগুলো আসলে তার মধ্যে একটা ছাঁকনির কাজ করে… কিন্তু সেই লোককে কেউ পছন্দ করে না। সবার চোখেই সে সন্দেহজনক হয়ে ওঠে। সবাই তাকে বাতিল করে দিতে চায়। সবাই তাকে শাস্তি দিতে চায়…

আমিই তা হলে দুঃস্বপ্নের কারণ! স্বগতোক্তি করে ওঠে উৎসব। তার পর গভীর স্বস্তিতে ঘুমের ভেতর তলিয়ে যেতে যেতে ভাবে, যাক, অন্তত কাল থেকে ওরা আর কোনও দুঃস্বপ্ন দেখবে না!

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *