ছিন্নপত্রের পরশপাথর

হিন্দোল ভট্টাচার্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা নিয়ে এত লেখা এবং এত গবেষণা হয়েছে যে, নতুন করে হয়তো তেমনভাবে বলার কিছু নেই। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার ক্ষেত্রে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিন্নপত্রের সঙ্গে আমার একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। অসংখ্য রবীন্দ্রজিজ্ঞাসু এবং রবীন্দ্রগবেষকদের এড়িয়ে গিয়ে আমি বরং আমার নিজের কথাই একটু বলতে পারি।

এমনিতেই রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রগুলি আমার কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চিঠির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্ব, আমার মতে, তাঁর নিজের মনের ভিতরেই সংগঠিত হওয়া একপ্রকার সন্দর্ভ। সেক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রাপক যদি এবং সঙ্গী যদি তিনি পেতেন, তাহলে তো সেই কথাবার্তা অনেক বেশি জমে উঠত নিশ্চিতভাবেই। আবার, যদি তিনি সেই মাপের সঙ্গী নাও পেতেন, তাহলেও, নিজের মনের ভিতরে নানা অনুভূতিমালার সঙ্গে তার নিত্য যোগাযোগের এক সেতু আপনা থেকেই তিনি তৈরি করে ফেলতেন। ফলে, ছিন্নপত্রের অসংখ্য চিঠির বক্তব্যের মধ্যে যেন বা বীজ লুকিয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের অন্য কোনও কবিতার পঙ্‌ক্তির, অন্য কোনও গানের চিত্রকল্পের অথবা অন্য কোনও প্রবন্ধের সারবত্তার।

আরও পড়ুন:­ রবীন্দ্রনাথ ও শিক্ষা

একজন শিল্পী তো আসলে সবসময়ই তাঁর ভাবনাকেই খুঁজে বেড়ান। আর রবীন্দ্রনাথ সেই মাপের শিল্পী, যিনি নিজেই কান পেতে বসে থাকতেন প্রকৃতির মধ্যে। কখন সে আসে, কখন সেই বারতা আসে, আর তিনি পরশপাথর খুঁজে পাওয়ার আনন্দকে পেয়ে যান। হ্যাঁ, এই অপ্রত্যাশিতভাবে বোধ বা জেনের জগতের সন্ধান পাওয়ার মধ্যে একপ্রকার ক্ষণস্থায়িত্ব তো আছেই, কিন্তু যে ‘ক্ষণ’ রয়েছে, তা তো চিরকালীনতার হাতছানি দিয়ে যায় শিল্পীকে। অনেকে একে এপিফ্যানি বলেন, বা কেউ কেউ বলেন কবিতার মুহূর্ত। কিন্তু যাই বলা হোক না কেন, জেন সন্ন্যাসীদের সেই জেনপ্রাপ্তির ঘটনাটি শিল্প বা কাব্যের ক্ষেত্রে যে অনিবার্য, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

‘ছিন্নপত্রাবলী’ আমার মতে, রবীন্দ্রনাথের অন্তর্ভ্রমণের অন্তর্জগৎ। তার মধ্যে যেমন আছে ক্ষণিক মুহূর্তকে চিরকালীনতার মধ্যে ধরে রাখার নৈপুণ্য, তেমনই আছে, তাঁর ভাবনার ও দর্শনের শাঁস-মহলের সংগীত। বহু গোপন কথা যেন বা অত্যন্ত সহজে তিনি ধরে ফেলছেন। কিন্তু এই সহজে ধরার জন্য অন্তর্গত সংলাপের এক জগতের প্রয়োজন হয়। আর রবীন্দ্রনাথ ছিন্নপত্রাবলীর চিঠিপত্রে সেই সংলাপের মধ্যেই যেন বা অবগাহন করতেন। যেমন, একটি চিঠিতে তিনি লিখছেন, “আমাদের কাছে আমাদের প্রতিদিনের সংসারটা ঠিক সামঞ্জস্যময় নয়― তার কোনো তুচ্ছ অংশ হয়তো অপরিমিত বড়ো, ক্ষুধাতৃষ্ণা ঝগড়াঝাঁটি আরাম-ব্যারাম খুঁটিনাটি খিটিমিটি এইগুলিই প্রত্যেক বর্তমান মুহূর্তকে কণ্টকিত করে তুলছে, কিন্তু সংগীত তার নিজের ভিতরকার সুন্দর সামঞ্জস্যের দ্বারা মুহূর্তের মধ্যে যেন কী-এক মোহমন্ত্রে সমস্ত সংসারটিকে এমন একটি পার্‌স্‌পেক্‌টিভের মধ্যে দাঁড় করায় যেখানে ওর ক্ষুদ্র ক্ষণস্থায়ী অসামঞ্জস্যগুলো আর চোখে পড়ে না― একটা সমগ্র একটা বৃহৎ একটা নিত্য সামঞ্জস্য-দ্বারা সমস্ত পৃথিবী ছবির মতো হয়ে আসে এবং মানুষের জন্ম-মৃত্যু হাসি-কান্না ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমানের পর্যায় একটি কবিতার সকরুণ ছন্দের মতো কানে বাজে। সেইসঙ্গে আমাদেরও নিজ নিজ ব্যক্তিগত প্রবলতা তীব্রতার হ্রাস হয়ে আমরা অনেকটা লঘু হয়ে যাই এবং একটি সংগীতময়ী বিস্তীর্ণতার মধ্যে অতি সহজে আত্মবিসর্জন করে দিই। ক্ষুদ্র এবং কৃত্রিম সমাজ-বন্ধনগুলি সমাজের পক্ষে বিশেষ উপযোগী, অথচ সংগীত এবং উচ্চ অঙ্গের আর্ট মাত্রেই সেইগুলির অকিঞ্চিৎকরতা মুহূর্তের মধ্যে উপলব্ধি করিয়ে দেয়― সেইজন্যে আর্ট মাত্রেরই ভিতর খানিকটা সমাজনাশকতা আছে― সেইজন্যে ভালো গান কিংবা কবিতা শুনলে আমাদের মধ্যে একটা চিত্তচাঞ্চল্য জন্মে, সমাজের লৌকিকতার বন্ধন ছেদন করে নিত্য-সৌন্দর্যের স্বাধীনতার জন্যে মনের ভিতরে একটা নিষ্ফল সংগ্রামের সৃষ্টি হতে থাকে–সৌন্দর্যমাত্রেই আমাদের মনে অনিত্যের সঙ্গে নিত্যের একটা বিরোধ বাধিয়ে দিয়ে অকারণ বেদনার সৃষ্টি করে।” (২১ নম্বর চিঠি, কলকাতা ২ মে)।

আরও পড়ুন: অন্তরতর

ছিন্নপত্রের এই চিঠিটিকে যদি বলি রবীন্দ্রনাথের কবিতার ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন, তাতে মনে হয় না কেউ আপত্তি করবেন। শিল্প বা নন্দনতত্ত্ব-র সার কথাগুলি যেন রবীন্দ্রনাথ এই চিঠিতে বললেন। কিন্তু তিনি কি কাউকে বললেন? প্রশ্ন আসে তাঁর এই চিঠি কি তাঁর নিজের মনের সঙ্গেই সংলাপ? যেন বা তাঁর ভাবনাকেই তিনি অনেকটা স্পষ্টভাবে দেখতে চাইছেন, আর তাই এই কথাগুলির অবতারণা। ছিন্নপত্রাবলী যে রবীন্দ্রনাথের লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক সন্দর্ভ, তার  প্রমাণ হিসেবে আরও একটি চিঠির কথা বলতে পারি। যেমন— “প্রকৃতির সঙ্গে গানের যত নিকট সম্পর্ক এমন আর কিছু না–আমি নিশ্চয় জানি এখনি যদি আমি জানলার বাইরে দৃষ্টি রেখে রামকেলি ভাঁজতে আরম্ভ করি তা হলে এই রৌদ্ররঞ্জিত সুদূরবিস্তৃত শ্যামলনীল প্রকৃতি মন্ত্রমুগ্ধ হরিণীর মতো আমার মর্মের কাছে এসে আমাকে অবলেহন করতে থাকবে। যতবার পদ্মার উপর বর্ষা হয় ততবারই মনে করি মেঘমল্লারে একটা নতুন বর্ষার গান রচনা করি… কথা তো ঐ একই–বৃষ্টি পড়ছে, মেঘ করছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কিন্তু তার ভিতরকার নিত্যনূতন আবেগ, অনাদি অনন্ত বিরহবেদনা, সেটা কেবল গানের সুরে খানিকটা প্রকাশ পায়।” ( সাজাদপুর, ২৬ সেপ্টেম্বর,১৮৯৫)।

ভাবনা এবং শিল্পের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক তো আছেই। কবির ব্যক্তিত্ব এবং কবির মন দু’টিরই বিবাহ হয় যে কবিতায় বা সাহিত্যে, সেই সাহিত্যই সময়ের কাছে এক স্পষ্ট এবং সৎ অভিপ্রায়কে তুলে ধরে। প্রকৃতির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যে গভীর সম্পর্ক, তা ছিন্নপত্রের এই চিঠিগুলির মধ্যে দিয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের অস্তিত্বের মধ্যে সিংহভাগ জুড়ে যে প্রকৃতির অস্তিত্ব, যে প্রকৃতির মধ্যেই তিনি ঔপনিষদিক দর্শনের বিস্তার খুঁজে পান, যে প্রকৃতির মধ্যেই তাঁর পরমকল্যাণময় ঈশ্বরের ভাবনা রূপ পায়, তা যেন এই সব চিঠিগুলির আবহের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে একটি চিঠির কিছু অংশ এখানে তুলে ধরছি আবার, “…সূর্য আস্তে আস্তে ভোরের বেলা পূর্ব দিক থেকে কী এক প্রকাণ্ড গ্রন্থের পাতা খুলে দিচ্ছে এবং সন্ধ্যায় পশ্চিম থেকে ধীরে ধীরে আকাশের উপরে যে-এক প্রকাণ্ড পাতা উলটে দিচ্ছে সেই বা কী আশ্চর্য লিখন― আর এই ক্ষীণ পরিসর নদী আর এই দিগন্তবিস্তৃত চর আর ঐ ছবির মতন পরপার ধরণীর এই উপেক্ষিত একটি প্রান্তভাগ― এই বা কী বৃহৎ নিস্তব্ধ নিভৃত পাঠশালা…।”

আরও পড়ুন: মানকচুর জিলিপি ও রবীন্দ্রনাথ

আমি যে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে চাইছি না, এ-কথা আগেই বলে রাখি। কারণ রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কোনোরকম সিদ্ধান্তে আদপেই আসা যায় না। তিনি এমন একজন ক্ষ্যাপা, যিনি পরশপাথর যেমন খুঁজছেন, তেমনই  পরশপাথরের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিজেই নির্লিপ্ত হয়েও যাচ্ছেন। ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’ এই পঙ্‌ক্তিটি তাঁর কাছে কেবল পঙ্‌ক্তি হিসেবেই থাকছে না, তাঁর জীবনের এক অন্যতম রাস্তা হয়ে উঠছে। অথবা এই চিঠিগুলির মধ্য দিয়ে আমরা তাঁর জীবন এবং ভাবনাপথ সম্পর্কে কিছুটা হলেও জানতে পারছি। যে সমষ্টিগত চেতনার এক অংশ হিসেবে বা যৌথ চেতনার এক অংশ হিসেবে তিনি প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকতেন, সেই যৌথ চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অবস্থাতেই তিনি আবহমান অবচেতনার মধ্যে ডুব দিতেন। তাই প্রকৃতির এক সামগ্রিক চেতনা তাঁর কাছে ধরা দিত। আরেকটি চিঠিতে তিনি লিখছেন, “কর্মক্লিষ্ট সন্দেহপীড়িত বিয়োগশোককাতর সংসারের ভিতরকার যে চিরস্থায়ী সুগভীর দুঃখটি, ভৈরবী রাগিণীতে সেইটিকে একেবারে বিগলিত করে বের করে নিয়ে আসে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যে যে-একটি নিত্যশোক নিত্যভয় নিত্যমিনতির ভাব আছে, আমাদের হৃদয় উদ্‌ঘাটন করে ভৈরবী সেই কান্নাকাটি মুক্ত করে দেয়― আমাদের বেদনার সঙ্গে জগদ্‌ব্যাপী বেদনার সম্পর্ক স্থাপন করে দেয়। সত্যিই তো আমাদের কিছুই স্থায়ী নয়, কিন্তু প্রকৃতি কী এক অদ্ভুত মন্ত্রবলে সেই কথাটিই আমাদের সর্বদা ভুলিয়ে রেখেছে― সেইজন্যেই আমরা উৎসাহের সহিত সংসারের কাজ করতে পারি। ভৈরবীতে সেই চিরসত্য সেই মৃত্যুবেদনা প্রকাশ হয়ে পড়ে; আমাদের এই কথা বলে দেয় যে, আমরা যা-কিছু জানি তার কিছুই থাকবে না এবং যা চিরকাল থাকবে তার আমরা কিছুই জানি নে।“

কিন্তু ছিন্নপত্রবলী বহুবার পড়ার পরেও এই গ্রন্থকে আমি কোনও বিশেষ ধরনের লেখার মধ্যে রাখতে অপারগ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবনাজগতের সমস্ত দিগন্ত যেন এই চিঠিগুলির মধ্যে খণ্ডে খণ্ডে ভেসে ওঠে। ছিন্নপত্র একজন পাঠককেও জাগ্রত রাখে। ছোট দুঃখের শোক থেকে নিয়ে যায় বড় দুঃখের আকাশে। মূর্ত থেকে বিমূর্তে এবং বিমূর্ত থেকে মূর্তে। একান্তে কেউ ছিন্নপত্র পাঠ করলেই তিনি শুনতে পাবেন হালকা হালকা নদীর আবহ, দূরে দূরে পাখির ডাক, সুদূর থেকে বয়ে আসা হাওয়ার স্পর্শ এবং রবীন্দ্রনাথের মৃদু গলার স্বর। যেন তিনি আপনাকেই কথাগুলি বলছেন, কিন্তু স্বগত সংলাপে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *