অন্যধারার লিটল ম্যাগাজিন চিন্তায় এগিয়ে ‘চিন্তা’

ধীমান ব্রহ্মচারী

অন্যধারার লিটল ম্যাগাজিন চিন্তায় এগিয়ে চিন্তা। একথা বলতে কোনও দ্বিমত বা দ্বিধা থাকে না। যদিও হঠাৎ করে কোনও পত্রিকা, সে যদি লিটল ম্যাগাজিন হয় তাহলে অনেকটা ভেবেই সেকথা বলতে হয়। সম্প্রতি বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের আসরে ‘চিন্তা’ পত্রিকার নাম বেশ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। এই পত্রিকার একটা ছোট্ট ট্যাগ লাইন আছে, ‘সাহিত্য ও মেধা চর্চার অনন্য স্বর’— এই বক্তব্যই অনকেটা পরিষ্কার করে দেয় পত্রিকার মূল লক্ষ্য বা অভিমুখ। পত্রিকাটির সম্পাদক রাহুল দাশগুপ্ত। এছাড়াও তিন সহ-সম্পাদক নিয়ে তৈরি তিনশো পাতার বেশি একটা লিটল ম্যাগাজিন।

আরও পড়ুন: ‘অবন ও রবি’ স্বয়ং

আসলে লিটল ম্যাগাজিনই একজন কবি ও লেখকের যথার্থ মূল্যায়ন করার প্রথম ধাপ। এই পর্বেই একজন তরুণ কবি বা গল্পকার নিজেদের উজাড় করার বা প্রকাশ করার অন্য এক স্বাদ পান। তাছাড়াও এই লিটল ম্যাগাজিন মূলত আন্দোলন। আর এই আন্দোলনের যোদ্ধারা হলেন পত্রিকার পাঠক থেকে কবি ও লেখক, আর কাণ্ডারি হলেন পত্রিকার সম্পাদক। সুতরাং কত প্রাসঙ্গিকভাবেই বাংলার কত গুরুত্বপূর্ণ পত্রপত্রিকা প্রকাশ হচ্ছে। অনেক পত্রিকা তাঁদের নিজস্বতা বজায় রেখেই একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক পত্রপত্রিকা মুখ থুবড়ে পড়ছে। অর্থাৎ প্রতিনিয়ত এই বিভিন্ন পত্রপত্রিকাগুলো তাঁদের রূপ-আকার ও আকৃতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন করছে। এখন শুধুমাত্র এককভাবেই কোনও কবি, গল্পকার বা সমাজ-সাহিত্যের বিষয় নিয়েই, বিষয়ভিত্তিক পত্রিকার গুনগত মান পাচ্ছে বৃদ্ধি। বিভিন্ন গবেষণায় সেই পত্রিকা কাজেও আসছে অনুসন্ধিৎসু পাঠকের। সামগ্রিক এই পর্বের কিছু কিছু দিক নিয়েই একটা পূর্ণাঙ্গ পত্রিকার অবয়বে প্রকাশ হয়ে আসছে রাহুল দাশগুপ্ত সম্পাদিত পত্রিকা ‘চিন্তা’।

আরও পড়ুন: সিসিফাস ও স্বচ্ছতার পাঠান্তর

সম্প্রতি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের মধ্যে একটা মানসিকতার পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে, যা হল পত্রিকার কলেবর। আজকের প্রায় সব প্রথম শ্রেণির (পাঠক চাহিদার শীর্ষে) লিটল ম্যাগাজিনের পাতার সংখ্যা বাড়ছে। ‘অনুষ্টুপ’ (সম্পাদক- অনিল আচার্য/কলকাতা), ‘দিবারাত্রি কাব্য’ (আফিফ ফুয়াদ/দঃ ২৪ পরগনা), ‘কবতীর্থ’ (উৎপল ভট্টাচার্য/কলকাতা), ‘ভাষানগর’ (সুবোধ সরকার/কলকাতা), ‘চৌরঙ্গী’ (শুভঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়/জয়নগর-দঃ ২৪ পরগনা), ‘দর্পণ’ (দেবজ্যোতি কর্মকার/করিমপুর-নদিয়া), ‘দাহপত্র’ (কমল কুমার দত্ত/চন্দননগর-হুগলি), ‘শতানিক’ (নিত্যরঞ্জন দেবনাথ/চুঁচুড়া-হুগলি) ‘কোরাস’ (রাজদীপ সেন চৌধুরী/দমদম-উঃ ২৪ পরগনা)… এভাবে বলতে গেলে বড় একটা সংগ্রহ ও ফর্দ তৈরি হয়ে যাবে। আসলে এই বিরাট বিরাট পত্রিকাগুলো তাদের শ্রমে ও পরিচর্যায় নিজেদের একটা সাহিত্য দিক ও কৃষ্টির ইতিহাস রচনা করে ফেলেছে। আজকের দিনে যেকোন লিটিল ম্যাগাজিন প্রিয় মানুষ বা পাঠক এই পত্রপত্রিকাগুলোর নাম জানান না, তা হতেই পারে না। কিন্তু এত কিছুর সত্ত্বেও আরও অনেক পত্রিকার প্রতিনিয়ত জন্ম, প্রকাশ সবটাই এগোচ্ছে। বিষয় থেকে গুণগত মানের দিকে ঝোঁক বাড়ছে পাঠক থেকে কবি-লেখকদেরও।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৩)

আর এই পর্বেই পাঠকের নজর কাড়ছে ‘চিন্তা’ পত্রিকা। যার দ্বিতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশিত হয় ২০২০’র পুজোয়। যে সংখ্যায় সম্পাদক একটা ভাবনা বা বিষয়কে তুলে ধরেছেন আমাদের কাছে। বর্তমানে আমাদের প্রকাশনা সংস্থার ভূতপূর্ব পরিবর্তন এবং পাশাপাশি অত্যাধুনিক মেশিনে ছাপার কাজ হওয়ায় পত্রিকার ছাপার মান  বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলস্বরূপ যেমন পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রচার ও প্রসার। ফলত, পত্রিকা পাঠের একটা অন্য দিক খুলে গেছে। যাইহোক, ২য় বর্ষের ‘চিন্তা’ পত্রিকার বিষয় নিয়ে একটু আলোকপাত করলে সহজেই আমরা বা বাঙালি পাঠক হিসেবে বেশকিছু দিক পাব।

প্রথমত, যেকোনও পত্রিকার মূল কথা কিন্তু সম্পাদকীয়তে সম্পাদক নিবিড়ভাবেই ব্যক্ত করেন। সেক্ষেত্রে সম্পাদক ও তাঁর সাহিত্যের চরাচর অনেকটা সাবলীল হতে হয়। যেকোনও পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ থেকেই যায়, যা হল, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে অন্যান্য পত্রপত্রিকার কাজ ও গতিপ্রকৃতি। এই সার্বিক আলোচনা সম্পাদকীয়তে সম্পাদক করেছেন। তিনি লিখেছেন: …‘‘যখনই শিক্ষিত ও উচ্চমানের সাহিত্যিকেরা সম্পাদনা বা প্রকাশনায় এসেছেন, তখনই সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে তার সুফল পাওয়া গিয়েছে। বহু গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যারচনার আত্মপ্রকাশের পথ প্রশস্ত হয়েছে। বাংলার ভাষা ও সাহিত্যেও বুদ্ধদেব বসু থেকে সুবোধ সরকার, মণীন্দ্র গুপ্ত থেকে পবিত্র মুখোপাধ্যায়, দেবেশ রায় থেকে অমরেন্দ্র চক্রবর্তী, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় থেকে সমীর রায়চৌধুরী— যখনই সম্পাদনা বা প্রকাশনার দায়িত্ব নিয়েছেন, তখনই তা অন্যরকম কিছু একটা হয়ে উঠতে চেয়েছে। এঁদের দেখার বা আবিষ্কারের চোখই আলাদা।”—এই চিন্তার ফলপ্রসূ যদি সবসময় বাংলা সাহিত্যকে আগলে আগলে নিয়ে যায়, তাহলেই সর্বাংশে প্রযোজ্য। অর্থাৎ আমরা খুব সহজেই বলি, ‘বাংলা সাহিত্যের আঁতুড়ঘর লিটল ম্যাগাজিন’, তাহলে সেই ঘর বা ক্ষেত্রকে সব সম্পাদকদের খুব গুরুত্ব দিয়েই বিচার-বিবেচনা করতে হবে।

আরও পড়ুন: ইমারজেন্সি এবং কিশোর কুমার: পুরনো বিতর্ক নতুন করে দেখা

একজন কবির কবিতা, গল্পকারের গল্প বা লেখকের উপন্যাস, তাঁর কতটা প্রিয় বা গুরুত্ব যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে পাঠকের উপজীব্য হওয়ার বিষয়। বর্তমানে বাংলার লিটল ম্যাগাজিন সংখ্যা লক্ষাধিক। এইরকম একটা ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে, নিবিড় পাঠক হওয়াটাও ভীষণ জরুরি বিষয়। আবার এই একই সম্পাদকীয়তে সম্পাদক প্রকাশনার কথাও বলেছেন আরও বেশ কিছুটা অগ্রসর হয়েই। …‘‘কিছুদিন আগে একজন জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকের ষাট-সত্তর দশকের পশ্চিমবঙ্গের পটভূমিতে লেখা একটা উপন্যাস পড়ছিলাম। অল্প বয়সের প্রেম ও রাজনীতি মিশিয়ে জমজমাট একটা উপন্যাস। এরকম লেখা তো মানুষের ভালো লাগাই স্বাভাবিক। কিন্তু একজন ফ্রানৎস কাফকা বা মার্সেল প্রুস্তের লেখার সঙ্গে এই লেখার তফাত আছে। কাফকা বা প্রুস্ত সম্পূর্ণ একটা অন্য বিশ্ব রচনা করেছেন। এই চেনা দুনিয়াকে দেখার ও আবিষ্কার করার নতুন চোখ সৃষ্টি করেছেন তাঁরা। আন্তর্জাতিক বাজারে সেই লেখার দাম আছে।”—একথা তিনি আলোচনা করেছেন নবীন কবি বা লেখকের সঙ্গে প্রকাশকদের বই তৈরির ব্যাপার নিয়ে। যারফলে, উঠে আসা কবি বা লেখকদের সঠিক মূল্যায়ন অনেক সময় ব্যাহত হচ্ছে। একজন সাধারণ লেখক বা কবি তাঁর শিল্প সৃষ্টির জন্য যেমনভাবে খুঁজে নেবেন তাঁর চিন্তাভাবনা থেকে সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, যা অনেকটা পাঠক সমাজে প্রভাব ফেলবে, পাঠক সমাজে আলোড়িত হবে। সম্ভাবনা এক্ষেত্রে অনেক কম দেখা যাচ্ছে ইদানীং।

আরও পড়ুন: বদ্যিনাথের সংসার: মতি নন্দীর একটি অগ্রন্থিত গল্প

দ্বিতীয়, এই পত্রিকায় গল্প ও উপন্যাসের আধিক্য বেশ বেশি। সাধারণত, বাংলার মূল পাঠক কিন্তু কবিতার। কিন্তু তারও পাশাপাশি, গল্প বা উপন্যাসের ক্ষেত্রে ‘চিন্তা’র পরিকল্পনা অনন্য। এই পত্রিকার মধ্য দিয়ে বর্তমানে গল্পকার থেকে ঔপন্যাসিক তাঁদের সমকালীন সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিস্তার অনেকটা আহরণ করে উঠতে সক্ষম হচ্ছেন। যা যেকোনও পত্রিকা গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে একটা শুভ লক্ষণ। এই সংখ্যায়, ‘বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়’ ও ‘শুভঙ্কর গুহ’র উপন্যাস দু’টো লিটল ম্যাগাজিনের পাঠকদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা সাহিত্যপাঠ। পাশাপাশি, গল্পকার ও একঝাঁক তরুণ কবির কবিতা পাঠককে খুব সহজেই কাছে আনে।

এই পর্যায়ের পরও ‘চিন্তা’র তৃতীয় বর্ষ ও তৃতীয় সংখ্যা প্রকাশের মুখে। প্রথমেই চিন্ময় গুহ, সুব্রত চৌধুরী, নীলাঞ্জন হাজরা-সহ আরও অনেকের গদ্য রচনা। পরেই রয়েছে সাক্ষাৎকার পর্ব, যেখানে মুখোমুখি হয়েছেন প্রশ্নকর্তারা সুবোধ সরকার, হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেনের মতো কবি ও লেখকদের। এই পর্বে আগের মতোই রয়েছে গল্প-কবিতাগুছ-কবিতা-দীর্ঘ কবিতা-ধারাবাহিক গদ্য-উপন্যাস। প্রায় এবারও পাতার কলেবর অনেক, প্রায় সাড়ে তিনশো। এভাবেই এই অতিমারি অতিক্রান্ত সময়ের মুখে চিন্তা প্রকাশের পথে। যা সাহিত্যপ্রেমী পাঠক ও মানুষের কাছে বড় একটা প্রত্যাশা।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *