চিন্তা ও দুই কবি

সুবীর রায়

চিন্তা প্রকাশনীর দু’টি কবিতার বই সদ্য পড়া শেষ করলাম। বইদু’টি পড়ে আমার যা মনে হয়েছে, তা-ই আমি লিখছি।

কবি দীপ্তেন্দু জানা, তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘শামুকের হাঁটার শব্দ’। কবি তাঁর কাব্যগ্রন্থকে তিনটি ভাগে সাজিয়েছেন কবিতাদের। সমগ্র বইটিতে প্রচুর কবিতা স্থান পেয়েছে। কবি বইটির মুখবন্ধেই জানিয়েছেন এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতা লেখা হয়েছে ২০১৭-২০২০ এই সময়কালের মধ্যে। মুখবন্ধটি পড়তে গিয়ে প্রথমেই যে জায়গায় আমার চোখ যায়, কবি এই কাব্যগ্রন্থের ‘মুখবন্ধ’-কে ‘প্রলাপ’ শিরোনাম দিয়েছেন। কেন? বইটির ভিতরে যাবার আগেই আমার এই প্রশ্নটি প্রথম মাথায় আসে। প্রলাপ কেন? তার উত্তর কবি দেননি যদিও, তবুও ভাবতে গিয়ে নিজের মতো করে উত্তর তৈরি করে নিয়েছি। নিতে হয়েছে। নইলে এগোনো সম্ভব হচ্ছিল না। কবিতা কী? এই আত্মজিজ্ঞাসা দিয়ে শুরু করে তার উত্তর কবি নিজেই দিয়েছেন। এবং জানিয়েছেন, ‘তবুও যা লিখছি তা কি কবিতা হচ্ছে?— নিজের লেখার প্রতি এ-জিজ্ঞাসা, এ-সংকোচ কোনোদিনই আমার যাবার নয়।’ আমার মনে হয়েছে এই সংকোচই ‘প্রলাপ’ শব্দের ব্যবহারের একটি কারণ। এবার ঢোকা যাক কাব্যগ্রন্থের ভিতরে। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে কবি শব্দের পাশে শব্দ বসিয়ে যে চিত্র বুনতে চেয়েছেন কখনো-সখনো যেন হঠাৎ করেই নিজেই তা ভেঙে দিতে চাইছেন। হঠাৎ করেই সব কেমন ওলোট-পালোট হয়ে যাচ্ছে। যেমন ‘প্রেমের কবিতা’ শীর্ষক সিরিজ কবিতার ২নং কবিতাটি ধরা যাক—

“তোমার চুপ করে থাকা

আসলে শান্ত অর্কিড

কয়েক পৃষ্ঠা মেঘের পুনর্মুদ্রণ হলেই

স্নেহময়ী বৃষ্টির মতো কথা বলে উঠবে”

—এখানে ‘কয়েক পৃষ্ঠা মেঘের পুনর্মুদ্রণ’ কথাটিতে যে অপরূপ অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে এবং যে মুগ্ধতা ছেয়ে গেছে কবিতায়, তা অতুলনীয়। পাঠক অভিভূত হবেনই তা বলা বাহুল্য। কিন্তু এই একই কবিতার শেষ কয়েক লাইন এই রকম,

“এক ফোঁটা জল ভাঙার শব্দ

ওইটুকুই ক্লু

সেই শব্দের পাশে নিজেকে বরাবর

সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ মনে হয়”

আরও পড়ুন: দেবজ্যোতি কর্মকারের ‘জন্মান্তর পেরিয়ে অলৌকিক জন্ম’

—ঠিক এইখানে পাঠক মনদ্বন্দ্বে পড়ে যায়। কবিতা রহস্যই কিন্তু এখানে কবি নিজেই রহস্যের প্রতীকী শব্দ ব্যবহার করে দিচ্ছেন— ক্লু। টেনে আনছেন গল্পের গোয়েন্দা চরিত্রকে। শুরু থেকে কবিতার মধ্য দিয়ে যে ভাবনা পাঠকমনে উদয় হচ্ছে তাকেই তিনি সন্দেহসূচক করে দিচ্ছেন। ‘এক ফোঁটা জল ভাঙার শব্দ’-কে তাহলে যা ভাবছিলাম, তার ইঙ্গিত কি কবি অন্যরকম দিতে চাইছেন? অর্থাৎ শুরু থেকে যে ভাবনা তৈরি হচ্ছে শেষে গিয়ে সেই ভাবনার বিপরীতেই জোর করে দাঁড় করিয়ে দিতে চাইছেন এক অনুসন্ধিৎসু মনকে। এভাবেই ভাঙা-গড়া দিয়েই চলেছে তাঁর কবিতারা, তাঁর কাব্য ভাবনারা। এই কবির কবিতায় বিশেষভাবে লক্ষণীয় শব্দের ব্যবহার। আমার অন্তত মনে হয়েছে কবিতায় এমন অনেক শব্দের ব্যবহার তিনি করেছেন, যেগুলো কবির মনে হুট করে উদয় হওয়া। সেভাবেই সেই শব্দে তিনি গড়তে চেয়েছেন কবিতাদের। সেই শব্দদের পরিত্যাগের প্রয়াস করেননি। এই কাব্যগ্রন্থ পাঠকের কাছে নিতান্তই সুখপাঠ্য হিসেবে গৃহীত হবে না তার মূল কারণ কবিতার এই হারমেটিক ফর্ম। কবিতা পড়লাম আর সঙ্গে সঙ্গেই তার রসস্বাদন করে ফেলব তা হবার নয়। কবি নিজেই সে রাস্তা রাখেননি। এছাড়া কবি তাঁর ভাবনাদের কোনও বিশেষ ধাঁচে বাঁধতে চাননি। জীবন থেকে নানানভাবে রসদ গ্রহণ করে তাঁর বলিষ্ঠ কলমে তাদের ব্যক্ত করেছেন, সৃষ্টি করেছেন এক রহস্য, কাব্যময় রহস্য। কিংবা বলা যেতেই পারে রহস্যময় কাব্য।

২.

“আমি দেখি সবুজ ঘাসের মাঠে ছুটে যায় ঘোড়া

তুমি দেখো বাঁকুড়ার টেরাকোটা সবুজ টেবিলে

দু-জনেরই ঘোড়ার রং লালচে বাদামি” (কবিতা: উৎস ও মোহনা)

— ‘ঘোড়ার রং লালচে বাদামি’ কথাটার মধ্যে দিনের আলোর আভাস পাওয়া যায়। দিনের কোন সময় বলে দেওয়া না গেলেও, সময়টা অন্ধকারের যে নয় তা বলে দেওয়াই যায় ওই লালচে বাদামি রঙের জন্যই। ‘সবুজ’ রঙের ক্ষেত্রেও এ-কথা খাটত যদি না তার সঙ্গে ঘাস শব্দটি থাকত। ‘সবুজ ঘাস’ কথাটির মধ্যে একটা অবশ্যম্ভাবী ভাবনা জড়িয়ে। অর্থাৎ লালচে বাদামি রঙের ঘোড়াই নিয়ে এলো কবিতার উৎস। ভেবে নিতে অসুবিধে নেই শুরু হল সকালের আলো থেকেই। শুরু হল কবি সুদীপ দাসের কাব্যগ্রন্থ— অগাধ জলের খড়কুটো। বাঁকুড়ার টেরাকোটার কাজ সম্পর্কে যাঁরা অবগত, তাঁরা জানবেন সেখানে মাটি দিয়ে তৈরি ঘোড়া ও হাতি বহুদিনের শিল্প। ‘বাঁকুড়ার টেরাকোটা সবুজ টেবিল’— এ যেন চাক্ষুষ উপমা। কোথাও সেই প্রাচীনতাকে ধরার প্রয়াস। পরক্ষণেই যে দিনের আলোর উৎসে শুরু তাকেই কবি নিয়ে যাচ্ছেন ‘দেরাজের অন্ধকারে’। আরও কয়েকটা লাইন তুলে দিলাম—

“এতটা জীবন যদি সহমতে দেখতে পেয়েছি দুজনেই

                            বেশকিছু ভুলভ্রান্তি সহ

তবে কেন তাকে পাঠালাম ফের

দেরাজের অন্ধকারে সাময়িক নাম লেখা উইলের খোঁজে

কেন তাকে চাপ সৃষ্টি করতে করতে

বলেছি পৌঁছাতে কোনও পরিত্যক্ত জাহাজঘাটয়’’

—এখানে তৃতীয় লাইনে ‘ফের’ শব্দটি পরস্পরবিরোধী। ‘ফের’ শব্দটি পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দেয়। তাই এখানে যে চাপ সৃষ্টির অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে তার পুনরাবৃত্তি যদি হয়, তাহলে প্রথম লাইনে জীবন সহমতে কাটার প্রশ্নই ওঠে না। বাক্যগুলি পরস্পর দ্বন্দ্বে পরে যাচ্ছে শুধুমাত্র ওই একটি ‘ফের’ শব্দের জন্য। কবিতাটি শেষ হচ্ছে এইভাবে—

“টেবিলের ঘোড়াটাও গরম কফির ঘ্রাণে উত্তেজিত হয়ে

ঘরের মেঝেতে নেমে সদর দরজার উঁচু ফ্রেমে

কলিং বেলটা খুলে ভেঙে

চিবোতে চিবোতে চলে যায়’’

আরও পড়ুন: ‘হাফ কিউসেক’-এই হারিয়ে যাওয়া কিন্তু নিছকই একটা পর্যায়ে নয়, একটা গ্যালন গ্যালন

—পড়ে মনে হয়, কবি নিজেই এক ঘোড়া হয়ে স্বপ্নভঙ্গের অভিমান ও ক্ষোভ নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। শুধু কবি কেন, আমরাও কবির মতোই ঘরের মধ্যে সবুজের মাঝে যে উৎস ও মোহনার স্বপ্ন দেখেছি, চাক্ষুষ করতে চেয়েছি সেই সবুজ টেবিল তাকেই দেখতে বেরিয়ে পড়ছি উৎস ও মোহনার খোঁজে। এভাবেই কবি তাঁর কাব্যগ্রন্থ জুড়ে প্রচুর ছবি এঁকে গিয়েছেন। কখনও বা ‘তরুণ অপেরার জগাই ওরফে সিরাজ’ কবিতায় দেখিয়ে দিয়েছেন আমরা কীভাবে ‘উদ্দেশ্যহীনতার বুদবুদ’-এ আবদ্ধ হয়ে রয়েছি। অর্থহীন ‘জীবনচক্রের ঘূর্ণিতে’ কীভাবে আমাদের ঘর হয়ে উঠেছে ‘যুদ্ধশিবির’। কবি লিখেছেন— ‘আমি প্রাণপণে বাধা দিচ্ছি’। এই ‘আমি’ কে? শুধু কবি? শুধু কবিই যুদ্ধের বিপরীতে দাঁড়াতে চাইছেন? না। আমরা অনেকেই কবির সেই অবস্থানে দাঁড়িয়ে। কবি তাঁর এই কাব্যগ্রন্থে অনেকাংশেই এমন অনেক দৃশ্য কবিতা ও পঙ্‌ক্তিতে সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছেন যাতে পাঠকরা অবশ্যই অভিভূত হবেন। জীবনের অন্তঃস্থলে প্রবেশের তীব্র আকাঙ্ক্ষাই ফুটে উঠেছে পুরো কাব্যগ্রন্থ জুড়ে। উদাহরণস্বরূপ আরও অনেক কবিতার কথাই বলা যেত হয়তো, তবে শেষে এটিই বলার কবিতার পাঠক বইটি হাতে তুলে নিন। বইটির প্রতিটি শব্দের সঙ্গে যাপনের পর নিজেরা এই কবিতায় আচ্ছন্ন হবেনই। যদিও কবি নিজেই বলেছেন, তিনি শব্দ খোঁজেন না, ধ্বনি খোঁজেন না। বাক্য খোঁজেন। তাই তাঁর কবিতায় এমন অনেক শব্দের মধ্যেই রয়েছে বাক্যের সম্পূর্ণতা।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *