‘চোখের বালি’ই বাংলা সাহিত্যে ঘটিয়েছিল যুগান্তকারী ঘটনা

রাহুল দাশগুপ্ত

‘চোখের বালি’র ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “সাহিত্যের নবপর্যায়ের পদ্ধতি হচ্ছে ঘটনাপরম্পরার বিবরণ দেওয়া হয়, বিশ্লেষণ করে তাদের আঁতের কথা বের করে দেখানো। সেই পদ্ধতিই দেখা দিল চোখের বালিতে। বিবরণ নয়, বিশ্লেষণ, যার উদ্দেশ্য হবে ‘আঁতের কথা’ বের করে দেখানো, এটাই নবপর্যায়ের সাহিত্যের পদ্ধতি, একথা বলে রবীন্দ্রনাথ বাংলা আখ্যানের ইতিহাসে আধুনিকতার সূত্রপাত করলেন। এই আধুনিকতা নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল প্যারীচাদ-বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে, প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ করলেন রবীন্দ্রনাথ, ‘চোখের বালি’তে, যা তার জীবনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসও বটে। এ প্রসঙ্গে ফরাসি সাহিত্যে স্তঁধল-বালজাকের হাতে যে বাস্তববাদের সূচনা হয়েছিল, যেমন তা সম্পূর্ণতা পেয়েছিল ফ্লবেয়রের হাতে, সেই তুলনা মনে আসতে পারে। বালজাকের মধ্যেও অনেক রোমান্টিক উপাদান ছিল, ফ্লবেয়র তাকে শুধু ঝেড়েই ফেলেননি, পাল্টা আক্রমণও করেছিলেন, বালজাকের মহান উত্তরাধিকারকে স্বীকার করেই। রবীন্দ্রনাথও পাল্টা আক্রমণের রাস্তায় গেছেন, বঙ্কিমচন্দ্রের ভ্রান্তিগুলোকে সংশোধন করতে চেয়েছেন, কিন্তু এসবই করেছেন বঙ্কিমচন্দ্রের উত্তরাধিকারকে বহন করেই। পশ্চিমি সাহিত্যের একটা বর্গকে অনুকূল সময়ের সহযোগিতায় বাংলার মাটিতে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করে বঙ্কিমচন্দ্র এবং তাঁর সমসাময়িকেরা যে অমৃতবৃক্ষ রোপণ করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ সেই যুগান্তকারী কর্মটি যাতে দিগ্‌ভ্রান্ত হয়ে বিপথে না যায়, সেই চেষ্টাই করলেন। অর্থাৎ অমৃতবৃক্ষটির গতিপথকে সঠিক দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। তিনি সাহিত্যের নবপর্যায়ের পদ্ধতির কথা বলতে গিয়ে ‘বিশ্লেষণ’ ও ‘আঁতের কথা’ বের করে আনার কথা বললেন। আধুনিকতার দু’টি মূল খুঁটি পুঁতে দিলেন।

আরও পড়ুন: ছিন্নপত্রের পরশপাথর

ঔপনিবেশিকতার ফলে বাংলাদেশের সর্বস্তরেই আধুনিকতা আসছিল। প্রকৃতপক্ষে, ঔপনিবেশিকতা ও আধুনিকতা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এবং ইতিহাস নাম ‘গ্র্যান্ড ন্যারেটিভে’ আধুনিকতার ওপর উপনিবেশকারীদেরই একচেটিয়া দাবি ও অধিকার। আধুনিকতা তারাই এনেছে, গোটা বিশ্বেই উপনিবেশকারীদের এই হুংকার শোনা গেছে। সাহিত্যও এর ব্যতিক্রম নয় এবং সাহিত্যে আধুনিকতা আনার ক্ষেত্রে যে পশ্চিমি বৰ্গটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে, সেটি হল উপন্যাস। প্যারীচাদ-কৃষ্ণকমল-ভূদেব-হরিনাথ-লালবিহারী-রমেশচন্দ্র-মীর মশাররফ-তারকনাথ-ত্রৈলোক্যনাথ সহ অনেকে মিলেই এই পশ্চিমি বর্গটিকে ব্যবহার করে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতা নিয়ে আসতে চেয়েছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে বঙ্কিমচন্দ্রের ভূমিকাই যে ছিল সর্বাগ্রগণ্য, সমালোচকেরা একবাক্যে সেকথা মেনে নিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেও বলেছেন ‘বিষবৃক্ষ’ গ্রন্থেই কাহিনি এসে পৌঁছল আখ্যানে। যে পরিচয় নিয়ে সে এলো তা আছে আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে। আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে থাকা যে সমস্ত বিষয় এই আখ্যানে এলো, তার মধ্যে রয়েছে বালবিধবার জীবনের রিক্ততা ও অবরুদ্ধ কামনার বহিঃপ্রকাশ, বিবাহিত পুরুষের পরনারী আসক্তি, অবহেলিত স্ত্রীর মর্মবেদনা সত্ত্বেও নিজেকে আদর্শ স্ত্রীর মডেল হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস ইত্যাদি। সেইসময় ‘বিধবার সংকট’ ও ‘তার পুনর্বিবাহের সম্ভাবনা’ গোটা সমাজের কাছেই একটা জ্বলন্ত প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছিল। ‘বিষবৃক্ষ’ ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র সমকালের এই সমস্যাটিকেই ধরার চেষ্টা করলেন।

আরও পড়ুন: রবীন্দ্রনাথ ও শিক্ষা

রাজেন্দ্রলাল মিত্রের ভাষায়, ইংরেজির প্রকৃত নভেলের পারিপাট্য তিনি নিয়ে এলেন বাংলা উপন্যাসে। তিনি পিতা, উত্তরসূরিরা চিরকাল বঙ্কিমচন্দ্রকে সেই চোখেই দেখেছেন। কিন্তু নির্ভুল নন, রবীন্দ্রনাথ, রমেশচন্দ্র, তারকনাথ, মীর মুশাররফ যে যেমনভাবে পেরেছেন তাই তাকে সংশোধন করতে চেয়েছেন। কিন্তু একথাও ভোলেননি, বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন বলেই তাঁরা সংশোধনের সুযোগ পেয়েছেন। তিনিই পথিকৃৎ। ‘বাংলা উপন্যাস’ নামক যুগান্তকারী ঘটনাটি তিনিই ঘটিয়েছেন। আবার বঙ্কিমচন্দ্রেরও সৌভাগ্য, উত্তরাধিকার হিসেবে তিনি পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথের মতো মহাপ্রতিভাকে।

বঙ্কিমচন্দ্রের রচনা মূলত বহির্ঘটনানির্ভর। বহির্বাস্তবতার পাশাপাশি অন্তর্বাস্তবতার প্রথম প্রকাশ ঘটে বঙ্কিমচন্দ্রের রচনাতেই। কিন্তু এই অন্তর্বাস্তবতা উদ্‌ঘাটিত হয়েছে মূলত কথোপকথনের সাহায্যে, বিচ্ছিন্ন উপাদান হিসেবে, বিশ্লেষণের দিকে তিনি খুব একটা যাননি। কিন্তু অন্তর্বাস্তবতার বৈশিষ্ট্য ঘটনা-পরম্পরার বিবরণ দানে নয়, অন্তৰ্জীবনের রহস্য বিশ্লেষণে। রবীন্দ্রনাথ ঠিক এই কাজটিই করলেন। ‘চোখের বালি’ই সেই উপন্যাস, বাংলা সাহিত্যে যে এই যুগান্তকারী ঘটনাটি ঘটাল। এই প্রথম সামগ্রিকভাবে অন্তর্বাস্তবতা অবিচ্ছেদ্য মাত্রারূপে যুক্ত হল যেখানে সমস্যাসমূহ নিহিত রয়েছে চরিত্রগুলির ব্যক্তিত্বেই। কিন্তু ‘আঁতের কথা’ বার করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বিশ্লেষণের যে পদ্ধতি নিলেন, তা আমাদের চমকে দিল। নিজেই এই পদ্ধতিটিকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘চোখের বালি’র গল্পকে ভিতর থেকে ধাক্কা দিয়ে দারুণ করে তুলেছে মায়ের ঈর্ষা। এই ঈর্ষা মহেন্দ্রের সেই রিপুকে কুৎসিত অবকাশ দিয়েছে যা সহজ অবস্থায় এমন করে দাঁত-নখ বের করত না। যেন পশুশালার দরজা খুলে দেওয়া হল, বেরিয়ে পড়ল হিংস্র ঘটনাগুলো অসংযত হয়ে। এ কোন অসংযমের কথা বলছেন রবীন্দ্রনাথ? কোন পশুশালার দরজা খুলে দেওয়ার কথা বলছেন? এ কি সেই কার্নিভালের জগৎ বাখতিন, যাকে খুঁজে পেয়েছিলেন দস্তয়েভস্কির উপন্যাসে? যেখানে সাজানো-গোছানো সভ্যতার শৌখিন মুখোশটিকে টান মেরে খুলে ফেলা হয়, আর ভেতরের অসংযমী পশুপ্রবৃত্তি ও হিংস্রতাগুলি অবাধে আত্মপ্রকাশ করে সভ্যতার দর্শকদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়? মননে ও প্রয়োগে রবীন্দ্রনাথ ও দস্তয়েভস্কি যে পরস্পরের কত কাছাকাছি, উভয়ের উপন্যাসগুলি পাশাপাশি রাখলে বারবার সেকথা মনে হতে পারে। বলা বাহুল্য, চোখের বালি’ও এর ব্যতিক্রম নয়।

আরও পড়ুন: পঁচিশে বৈশাখের আগে করোনার বদলে কবিতার কথা

কাকে বলে কার্নিভালের জগৎ? জীবনের সুতীব্র প্রকাশই হল কার্নিভালের জীবন। এই সময়ে জনসাধারণের মধ্যে সবরকমের দূরত্ব লুপ্ত হয়ে যায়, তাদের মধ্যে স্বাধীন, অবাধ ও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কার্নিভালের মাধ্যমে মানুষ যখন ভয়কে জয় করতে শেখে তখন কোনও কোনও সমাজ, ধর্ম বা রাষ্ট্র সেইসব ভয় জাগিয়ে রাখে, এবং সেই সূত্রে মানুষকেও দমন করে রাখে, তাকে নানারকম বেড়ি পরাবার সুযোগ পায়। কার্নিভালের জগৎ তাই মুক্ত জগৎ, সেখানে মানুষ কোনোরকম শেকল পড়ে থাকে না, তার মুক্তির প্রয়াস মূর্ত হয়ে ওঠে এই জগতের মধ্যে, সবরকম ভয় ও বাঁধন থেকে মুক্ত হয়ে সেখানে মানুষ জীবনের প্রাচুর্যকে বরণ করে, আবরণ সরিয়ে মুখোশ ছিঁড়ে সত্যকে বার করে আনে। কার্নিভালের স্বাধীনতার বোধ ভাঙতে পারে কর্তৃত্বের চাপকে। দস্তয়েভস্কির পলিফনিক উপন্যাসগুলিতেও কার্নিভালাইজেশন ঘটেছে, কয়েকটি বিশেষ দৃশ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে দস্তয়েভস্কির উপন্যাস, মহাকাব্যিক সময়কে তিনি প্রায় ব্যবহারই করেন না, তাকে তিনি লাফিয়ে অতিক্রম করে শুধু স্পর্শ করে যান সংকটের সন্ধিস্থান, জীবনের মোড় ফেরার ও বিপর্যয়ের মুহূর্তে, যখন একটি মুহূর্তের অন্তর্লীন তাৎপর্য লক্ষ কোটি বছরের সমান হয়ে দাঁড়ায়, অর্থাৎ যখন মুর্তটি তার সময়গত সীমাবদ্ধতা হারায়, তখনই, সেই অতিক্ষুদ্র সময়বিন্দুতেই তিনি ক্রিয়াকে ঘনীভূত করেন।

দস্তয়েভস্কিতে একটি চরিত্রকে একটা অস্বাভাবিক অবস্থায় ফেলা হয়, তাকে খোঁচানো হয়, খুলে খুলে দেখানো হয়, উদ্ভট সব পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা তাকে অনাবৃত, উত্তেজিত করে তোলে, অস্বাভাবিক ও অপ্রত্যাশিত অবস্থায় অন্যান্য লোকেদের সঙ্গে সংঘাত-বিরোধিতায় লিপ্ত করে, আঘাতের পর আঘাত তাকে উন্মোচিত করে, সেই উন্মোচনের ফলে সেই চরিত্রের ধ্যানের জগৎ আরও নতুন আঘাতের সম্মুখীন হয়। পাঠক একটা ভদ্র সামাজিক পরিবেশ কল্পনা করে নেন, কিন্তু তার সে ভাবনা অচিরেই ভেঙে যায়। দেখা যায়, সেখানে উপস্থিত হয়েছেন এমন কয়েকজন ব্যক্তি যারা খোলাখুলিভাবে সবকিছু বলতে, তাদের সত্তাকে নগ্নভাবে মেলে ধরতে বদ্ধপরিকর, সেখানে অকালে হয় দেখা যাবে নরকের অকল্পনীয় যন্ত্রণা অথবা স্বর্গের অফুরন্ত স্নিগ্ধতা। এই জগতে প্রতিটি বস্তুই তার বিরোধী বস্তুর একেবারে প্রান্তসীমায় অবস্থান করে, প্রেম বেঁচে থাকে ঘৃণার সীমানায়, ঘৃণাও বেঁচে থাকে প্রেমের সীমানায়, ধর্মীয় বিশ্বাস বেঁচে থাকে নিরীশ্বরবাদের সীমানায়, মহিমা ও আভিজাত্য অবনমন ও ইতরতার সীমানায়, পবিত্রতা ও কৌমার্য পাপ ও ইন্দ্রিয়পরায়ণতার সীমানায়। নাটকীয়ভাবে সাজানো এই দৃশ্যগুলিতে মনে হয় যেন জীবনের নির্যাস অনন্তকালের মধ্যে এই একবারই ব্যক্ত হতে চলেছে।

আরও পড়ুন: রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দ ভারতাত্মার দুই স্তম্ভ

‘আঁতের কথা’ বের করে আনতে চেয়ে রবীন্দ্রনাথ জীবনের এই নির্যাসকেই ব্যক্ত করতে চেয়েছেন। ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে তিনি রচনা করেছেন এক কার্নিভালের জগৎ, উদ্ভট ও অস্বাভাবিক সব পরিস্থিতি তৈরি করেছেন যা চরিত্রগুলিকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে উত্তেজিত করে তুলেছে, আর এই উত্তেজনাই তাদের অনাবৃত করে দিয়েছে, খুলে গিয়েছে তাদের অবদমিত অবচেতনার দ্বার, ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে পশুরূপী হিংস্র প্রবৃত্তিগুলি, যারা একের পর এক আক্রমণে ভদ্র সামাজিক পরিবেশকে তছনছ করে দিয়ে গেছে। দস্তয়েভস্কির মতোই তিনি লাফিয়ে অতিক্রম করে শুধু স্পর্শ করে গেছেন সংকটের সন্ধিস্থান, জীবনের মোড় ফেরার ও বিপর্যয়ের মুহূর্তগুলি। গোড়ার চাবিটি রবীন্দ্রনাথই ধরিয়ে দিয়েছেন। এই উপন্যাসের সূচনা মায়ের ঈর্ষা থেকেই। রাজলক্ষ্মী চেয়েছিলেন, মহেন্দ্র যেন আশাকে বিয়ে না করে। তিনি আশাকে বিহারীর ঘাড়ে চাপাতে চেয়েছিলেন। কারণ বিহারীকে তিনি স্টিমবোটের পিছনে আবদ্ধ গাধাবোটের মতো মহেন্দ্রের একটি আবশ্যক ভারবহ আসবাবের মতো দেখতেন। কোনও সম্পর্কের প্রতি নিজের বিশ্বস্ততা নিয়ে মহেন্দ্রের মনে কোনও সন্দেহ ছিল না। পাছে মায়ের প্রতি আনুগত্য টলে যায়, বউ মা’কে ছাড়িয়ে যায়, এই ভয়ে মহেন্দ্র বিয়ে করতে চাইত না। কিন্তু একটা জিনিস সে সহ্য করতে পারত না। আর সে হলো, পরের ইচ্ছার চাপ। রাজলক্ষ্মী নারাজ ছিলেন বলেই মহেন্দ্রের রোখ চেপে গেল। আর এই রোখের বশেই আশাকে সে বিয়ে করে নিয়ে এলো। অনাগত বধূর প্রতি মায়ের ভয় ও ঈর্ষাই মহেন্দ্রকে উত্তেজিত করে তুলেছিল। আর এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই সে বিয়ে করে বসল আশাকে।

ফলে প্রথম থেকেই দুটি ব্যাপার ঘটল। একদিকে রাজলক্ষ্মী ও আশার সম্পর্কের মধ্যে একটা উদ্বেগ রয়ে গেল। অন্যদিকে, মহেন্দ্র ও আশার বিয়েতেও রয়ে গেল ফাঁক, কারণ তা ছিল নেহাতই এক সাময়িক উত্তেজনার ফসল। এই ফাঁকটা গোড়ায় বোঝা যায়নি। রাজলক্ষ্মী যত বন্ধুর প্রতি বিরূপ হয়েছেন, ছেলের প্রতি তীব্র অধিকারবোধে ও বন্ধুর প্রতি ঈর্ষায় তাকে অস্বস্তিতে ফেলতে চেয়েছেন, মহেন্দ্র তত নববিবাহিতাকে নিয়ে এক মধুর প্রণয়-খেলায় মেতে উঠেছে। আশা যেন এক নিষ্পাপ, অনভিজ্ঞ, অপাপবিদ্ধ খেলার সামগ্রী, খেলোয়াড়ের ইচ্ছাপূরণ, মা’কে অগ্রাহ্য করতেই অর্থাৎ সাময়িক প্রয়োজনেই যাকে বড় করে তোলা হয়েছে। কিন্তু এই খেলা বেশিদিন চলে না। যে সম্পর্কের গোড়ায় গলদ বেশিদিন তার ওপরের স্থিতাবস্থাকে বজায় রাখা যায় না। অন্তরের ভাঙন একদিন উপরিতলে প্রকট হয়ে উঠবেই। শুধু প্রয়োজন এক অনুঘটকের, যে এক নতুন অশান্ত, উত্তেজিত, অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্ম দেবে। ঠিক এই ঘটনাই ঘটল বিনোদিনীর আবির্ভাবের ফলে। রাজলক্ষ্মী-মহেন্দ্র-আশার সংসারে এসেই সে বুঝতে পারল আশা নেহাতই এক অপরিণত বালিকা, মহেন্দ্রের জীবনে খেলার সামগ্রী, যে খেলা বেশিদিন চলবে না। মোহ কেটে গেলেই মহেন্দ্র বুঝতে পারবে তার জীবন ও আবেগের বহুমুখী সম্ভাবনাকে তৃপ্ত করতে প্রয়োজন এক অভিজ্ঞ, পরিশীলিত, শিক্ষিত, বিদগ্ধ নারীর, যে মহেন্দ্রের জীবনে সত্যিকারের পরিপূরক হয়ে উঠবে। নিজেকে সেই জায়গায় ভাবতে বিনোদিনীর কোনও সমস্যা হলো না, কারণ আশার পরিবর্তে এই সংসারে তারই বন্ধু হয়ে আসার কথা ছিল। আশার আবির্ভাবকে সে নেহাত একটা দুর্ঘটনা বলে ধরে নিল এবং প্রবল ব্যক্তিত্বে ও অধিকারবোধে সংসারের ভার নিজের কাঁধে তুলে নিল।

আরও পড়ূন: রবীন্দ্রনাথ, গীতাঞ্জলি এবং নোবেল প্রাপ্তি

এই পর্যন্ত ব্যাপারটা গড়ালে সমস্যা হত না। কিন্তু জড়বস্তুকে যেভাবে খাপে খাপে মিলিয়ে দেওয়া যায়, জীবনকে সেভাবে যায় না। বিনোদিনী সংসারে অপরিহার্য হয়ে উঠলেও মহেন্দ্রের জীবনে তখনও বহিরাগত। সেখানে সর্বস্ব হয়ে আছে আশা। একে নিজের প্রতি অবিচার বলেই ধরে নিল বিনোদিনী। সংসারকর্মে ও বৈদগ্ধে সবার মনে ইতিমধ্যেই তার শ্রেষ্ঠত্ব মুদ্রিত হয়ে গেছে। কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে নিজের অচরিতার্থ যৌনতা ও প্রেমকে তৃপ্ত করা যায় না। সুযোগ পেলে বিনোদিনী হয়ে উঠতে পারত এক অসামান্য প্রেমিকা ও বধূ। যৌনসঙ্গী হিসাবেও সে হতে পারত অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু কে তাকে এই যৌনতা ও প্রেম চরিতার্থ করার সুযোগ দেবে? বিনোদিনী মহেন্দ্রের ওপর নিজের সম্মোহনী শক্তি প্রয়োগ করতে শুরু করল। প্রথমে সে আশার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলল। হয়ে উঠল ‘আশার মিতে, চোখের বালি’। আশাই তাকে নিজের অন্দরমহলে নিয়ে গেল। খাল কেটে কুমির ডেকে আনল সে। নিজেকে আশার পাশে রেখে প্রতি মুহূর্তে নিজের উৎকর্ষতার প্রমাণ রাখতে শুরু করল বিনোদিনী। তার ঔজ্জ্বল্য ও ব্যক্তিত্বের কাছে আশা ক্রমেই ম্লান ও নিষ্প্রভ হতে শুরু করল। মহেন্দ্রের মোহ কাটতে শুরু করল। তাদের সম্পর্কের মধ্যে যে ফাঁকটুকু ছিল, সেটা ক্রমেই বড় হতে শুরু করল। একজন পরিপূর্ণ নারী ও তার নারীত্বের বিচ্ছুরণে প্লাবিত হয়ে একটি নিষ্পাপ, অনভিজ্ঞ বালিকার তাৎপর্যহীনতাকে সে উপলব্ধি করল। নারীত্বের, প্রেম ও যৌনতার রসসিক্ত আস্বাদ নেওয়ার জন্য মহেন্দ্র আবারও হয়ে উঠল উত্তেজিত ও উন্মত্ত। এমন নারীকে মহেন্দ্র আগে কখনও দেখেনি। মননে ও শরীরে, পরিপক্কতায়, নিজস্ব মতামতে, উদ্ভাবনী শক্তিতে, সক্রিয়তায়, তীব্র অধিকারবোধে এই নারী তুলনাহীনা। গোটা জগৎ-সংসার একজন নারীর কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল, অথবা একজন নারীই তার কাছে হয়ে উঠল গোটা জগৎ-সংসার।

বিনোদিনী শুধু এটুকুই চেয়েছিল। সে চেয়েছিল, মহেন্দ্রর জীবন থেকে আশার সম্পূর্ণ বহিষ্কার এবং নিজের অবিসংবাদিত প্রতিষ্ঠা। একজন প্রভাবশালী পুরুষের জীবনে নিয়ন্ত্রক হতে চেয়েছিল সে। তার বিশ্বাস ছিল, এই ক্ষমতা তার আছে। এতদিনে সে তাকে প্রমাণ করে ছাড়ল। যদিও সে বিধবা, তথাপি কামনা-বাসনা-আবেগে-আকর্ষণে সে যে একজন বিবাহিত নারীর চেয়ে অনেক বেশি একজন পুরুষকে আচ্ছন্ন করে দিতে সক্ষম, নারী হিসাবে নিজের এই দাবিটিকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল সে। সে এমন একটা জীবনকে প্রতিষ্ঠা দিতে চেয়েছিল, যাকে বাতিলের দলে ফেলে দিতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে সমাজ। নিজেকে সেই সমাজের চোখে একজন দ্রোহী, ক্রুশেডার করে তুলল বিনোদিনী। অন্যদিকে, বিবাহিত জীবনের শৃঙ্খল মহেন্দ্রের কাছে ভারবহ হয়ে উঠেছিল। পরের ইচ্ছার চাপ সে সহ্য করতে পারে না। বিবাহিত জীবনটাই তার কাছে চাপের হয়ে উঠেছিল কারণ এই জীবনে কোনও স্বাধীনতা ও উত্তেজনা ছিল না, গতানুগতিকতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না, ইচ্ছের বিরুদ্ধে একে বয়ে নিয়ে যেতে ক্রমেই অপারগ হয়ে উঠছিল মহেন্দ্র। তাছাড়া মা ও স্ত্রী বরাবরই তার অনুগত, তার আঘাতে অভ্যস্ত ও প্রত্যাঘাত করতে অক্ষম, তার আবেগ ও প্রভাবের কাছে সহজ আপস ও আত্মসমপর্ণই তাদের স্বভাবের বৈশিষ্ট্য। বিনোদিনী বিধবা, সাহসী ও বুদ্ধিমতী, সর্বোপরি আপসে নারাজ এবং প্রত্যাঘাতে নিপুণা। এই প্রথম একজন নারীকে দেখল মহেন্দ্র যে পুরুষের কাছে আত্মসমর্পণ করে না, তেজে ও মেধায় পুরুষের সমান-সমান হতে চায়, হুঁটটি খেলে পাটকেলটি ফিরিয়ে দিতে মুহূর্তমাত্র কুণ্ঠিত হয় না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারী যেখানে সর্বদাই অনুগত ও বিপন্ন, সেখানে এই মূর্তিমান বিদ্রোহীকে দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেল মহেন্দ্রর। বিনোদিনীকে পাওয়ার জন্য সে মরিয়া হয়ে উঠল। এই প্রথম কোনও নারীর কাছে আত্মসমর্পণ ও প্রেমভিক্ষা করতেও কুণ্ঠিত হল না।

আরও পড়ুন: অন্তরতর

বিনোদিনী কিন্তু গোড়া থেকেই এ ব্যাপারে সতর্ক ছিল। সে জানত, মহেন্দ্রকে যতদিন উত্তেজিত রাখা যায় ততদিনই সে তার অনুরক্ত থাকবে। মহেন্দ্র কোনোকিছু চাওয়ামাত্র পেতে অভ্যস্ত, যতক্ষণ না পাচ্ছে ততক্ষণই তার উত্তেজনা, অপ্রাপ্তিই মহেন্দ্রকে বেঁধে রাখার মূলমন্ত্র, পেয়ে গেলেই তার সমস্ত আগ্রহ ও মোহ ফুরিয়ে যায়। জীবনে না পাওয়ার বেদনা কী ভয়াবহ, মানুষকে কীভাবে তা তাড়িত ও উন্মত্ত করে তোলে, সেই শিক্ষাই মহেন্দ্রকে দিতে চাইল বিনোদিনী। সে নিশ্চিত ছিল, মহেন্দ্রকে পাওয়ার সুখ দিতে গেলেই তাকে হারাতে হবে। সুখের একঘেয়েমিতে কয়েকদিনেই মহেন্দ্র সমস্ত আকর্ষণ হারিয়ে ফেলবে এবং তারপর নতুন কোনও মোহের পিছনে ছুটতে থাকবে। অতএব মহেন্দ্রর ওপর থেকে সে নিজের সমস্ত অধিকারবোধ ও দাবিদাওয়া তুলে নিল। পরের ইচ্ছার চাপ মহেন্দ্র সহ্য করতে পারে না। মহেন্দ্রর ওপর থেকে নিজের ইচ্ছার সমস্ত চাপ সে সরিয়ে নিলো। মহেন্দ্রকে দিল সম্পূর্ণ স্বাধীনতার স্বাদ। মোহগ্রস্ত মহেন্দ্র এই স্বাধীনতা নিয়ে কী করবে, তা ভেবে যেন কূলকিনারাই পেল না। মায়ের অসুস্থতার সময়ও সে উদাসীন হয়ে রইল। স্ত্রীর চোখের সামনে ব্যাভিচার করল, কিন্তু অনুতপ্ত হল না। বন্ধুর বিরুদ্ধে কদর্য অভিযোগ আনল। আর এত কিছু করেও বিনোদিনীর অধিকারবোধ ও দাবিদাওয়াকে ফিরে পেল না। অন্যদিকে, স্বাধীনতা মহেন্দ্রকে যে কুৎসিত করে তুলেছে, তা দেখে বিনোদিনী আতঙ্কিত হয়ে উঠল। সে চেয়েছিল একজন দেবতার কাছে নিজের প্রেম ও মেধাকে উৎসর্গ করতে, মহেন্দ্রর ভিতর থেকে একজন দানব বেরিয়ে এলো দেখে সে তাকে ঘৃণা করতে শুরু করল। মহেন্দ্রর প্রতি বিনোদিনীর ভালোবাসা জেগে রইল ঘৃণার সীমানায়, এ দু’টোকে কিছুতেই পৃথক করতে না পেরে সে শুরু করল নতুন দেবতার সন্ধান।

বিনোদিনীর জীবনে এই নতুন দেবতা হয়ে এলো বিহারী। রবীন্দ্রনাথ ‘শান্তিনিকেতন’ গ্রন্থের ‘ব্রাহ্মসমাজের সার্থকতা’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘‘ভারতবর্ষেও যখন আত্মরক্ষার দিন উপস্থিত হয়েছিলো, তখন সাধকের পর সাধক এসে ভারতবর্ষের চিরসত্যকে প্রকাশ করে ধরেছিলেন।” রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপন্যাসগুলিতে এই সাধককেই চিত্রিত করতে চেয়েছেন, যিনি ভারতবর্ষের চিরসত্যকে প্রকাশ করবেন। গোরা, নিখিলেশ, শচীশ-এরা সবাই সেই সাধকের বিভিন্ন প্রকাশ। ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে তিনি এই তিনজনের পূর্বসূরির ছবি এঁকেছিলেন বিহারী চরিত্রে। এই সৎ, অকপট, ঋজু, স্পষ্টভাষী, নির্মল, সহৃদয় মানুষটির মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেন ভারতবর্ষের শ্বাশ্বত ও খাঁটি মানুষটিকেই আঁকতে চেয়েছেন। এভাবেই তুর্গেনেভ, দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, চেকভ, গোর্কির মতো মহান রুশ লেখকেরা গভীর দরদে রাশিয়ার খাটি মানুষকে এঁকেছেন, যার মধ্যে কোনও বিকৃতি নেই, যার স্বভাবের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে রাশিয়ার শ্বাশ্বত বিবেক। বিহারী যেন এক খ্রিস্টীয় চরিত্র। পজিটিভ গুড ম্যান। এই একটি সাচ্চা লোক যে গোটা পৃথিবীর পাপের বিরুদ্ধে কথা বলছে। রাশিয়ার খাঁটি মানুষের সন্ধান করতে গিয়ে দস্তয়েভস্কি বারবার সৃষ্টি করেছেন এরকম ‘পজিটিভ গুড ম্যান’। তবে এ ব্যাপারে তাঁর অতুলনীয় সৃষ্টি প্রিন্স মিশকিন। এই মিশকিনকে ভালোবাসে, তার পদচুম্বন করে নিজের সমস্ত পাপ ধুয়ে ফেলতে চেয়েছিল রুশ সাহিত্যের এক চিরস্মরণীয় নারী। এই নারীর নাম ছিল নাস্তাসিয়া ফিলিপ্পোভনা। বিহারীর পদচুম্বন করে সেভাবেই বারবার নিজের সমস্ত পাপ ধুয়ে ফেলে উত্তরণ চেয়েছে বাংলা সাহিত্যের চিরস্মরণীয় নারী, বিনোদিনী।

আরও পড়ুন: মানকচুর জিলিপি ও রবীন্দ্রনাথ

বিহারী ও বিনোদিনীর সম্পর্কই নিঃসন্দেহে ‘চোখের বালি’র সবচেয়ে জটিল জায়গা। বিহারী সম্পর্কে মহেন্দ্র শেষপর্যন্ত উপলব্ধি করেছে, ‘‘যাহা যথার্থ গভীর এবং স্থায়ী, তাহার মধ্যে বিনা চেষ্টায়, বিনা বাধায় আপনাকে সম্পূর্ণ নিমগ্ন করিয়া রাখা যায় বলিয়া তাহার গৌরব আমরা বুঝিতে পারি না। বিহারী যে যথার্থ গভীর এবং স্থায়ী’’, ভারতবর্ষের খাঁটি বিবেকের মতো, তা প্রথম শনাক্ত করতে পেরেছে বিনোদিনী। অসাধারণ অসাধারণকে চিনে নিয়েছে। অপ্রাপ্তি ও ঈর্ষাই বিনোদিনীর পিছনে ছুটিয়ে নিয়ে গেছে মহেন্দ্রকে। তার এই দীনতা বিনোদিনীর অগোচর ছিল না। মহেন্দ্র তার পদচুম্বন করে প্রণয়প্রার্থী হয়েছে, বিনোদিনী সাড়া দিতে পারেনি। কিন্তু সে নিজেই ছুটে গেছে। বিহারীর কাছে, উন্মত্তের মতো বিহারীকে খুঁজে বেরিয়েছে, তার কাছে ভোগের সামগ্রি হতে চায়নি, বরং করুণাভিক্ষা করেছে, যাতে তার ত্রাণ ও উত্তরণ জোটে। বিহারী যেকোনও সম্পর্কের মধ্য দিয়ে শুধুমাত্র একটা জিনিসই খুঁজে গেছে, আর তা হল ‘মঙ্গল’। এই একটা ব্যাপার, যা ভারতীয় জীবনের চিরন্তন সত্য বলে মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কাছে। ‘শকুন্তলা’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ‘‘প্রেমকে স্বভাবসৌন্দর্যের দেশ হইতে মঙ্গলসৌন্দর্যের অক্ষয় স্বর্গধামে উত্তীর্ণ করিয়া দেওয়াই ভারতবর্ষের ইতিহাস’’, কারণ, ‘কুমারসম্ভব ও শকুন্তলা’ প্রবন্ধে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘‘মোহে যাহা অকৃতার্থ মঙ্গলে তাহা পরিসমাপ্ত।” ‘চোখের বালি’তে ঠিক এই ব্যাখ্যাটিরই প্রয়োগ ঘটিয়েছেন তিনি। তাই মহেন্দ্র যেখানে অকৃতার্থ হয়েছে, বিহারী সেখানেই সাফল্য পেয়েছে।

‘বিহারী’ ও ‘মঙ্গল’ যেন সমার্থক হয়ে গেছে ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে। বিহারী আগাগোড়া সকলের মঙ্গল চেয়ে এসেছে। গোড়ায় সে ছিল রাজলক্ষ্মী ও মহেন্দ্রর মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী। উভয়েই তাকে তার প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন না করেই নেহাতই একজন সহজলভ্য শুভার্থী হিসাবে ধরে নিয়েছে, কারণে-অকারণে সর্বদাই যার সেবা ও উপকার পাওয়া যায়। নিজেদের স্বার্থে ঘা খেলে বা কোনও অন্যায় কাজে বিহারী বাধা দিতে এলে অনায়াসে তাকে আঘাত ও বঞ্চিত করতেও দ্বিধাগ্রস্ত হয়নি। রাজলক্ষ্মী মহেন্দ্রের স্বার্থে সর্বদাই বিহারীকে নানা অন্যায় অনুরোধ করেছেন। মহেন্দ্র বিহারীর বিরুদ্ধে কদর্য অভিযোগ আনতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়নি। বিহারী কিন্তু সর্বদাই মহেন্দ্রকে সদুপদেশ দিয়ে গেছে। সর্বদাই রাজলক্ষ্মীর বিপদে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। মহেন্দ্র আশাকে বিয়ে করে নিয়ে এলে বিহারী আশার মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠেছে। কিন্তু আশাও সেকথা বোঝেনি, গোড়া থেকেই বিহারীর প্রতি বিরূপ হয়ে থেকেছে। বিহারীর সঙ্গে তার একসময় বিয়ের সম্বন্ধ এসেছিল, এই ব্যাপারটিই ছিল তার কাছে অস্বস্তির কারণ। মহেন্দ্রকে সে নিঃসংকোচে বিশ্বাস করেছিল। মহেন্দ্র সেই পবিত্র, নিষ্পাপ, স্বর্গীয় বিশ্বাসের গুরুত্বই বোঝেনি। বিহারী কিন্তু গোড়া থেকেই আশাকে চিনতে পেরেছিল। এ মেয়েকে দিয়ে যে কখনও কোনও অমঙ্গল হবে না, এই মেয়ের হৃদয় যে মঙ্গলসৌন্দর্যের আধার, আগাগোড়া সেকথা অনুধাবন করতে পেরেছে বিহারী এবং অলক্ষ্যে, নীরবে সমস্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আশাকে নির্ভরতা জুগিয়ে গেছে।

আরও পড়ুন: ‘বিসর্জন’-এর কথায়

বিনোদিনীর ব্যাপারে কিন্তু অতটা নিশ্চিত হতে পারেনি বিহারী। বিনোদিনী মঙ্গল না অমঙ্গল নিয়ে এসেছে, এই নিয়ে গোড়া থেকেই তার মধ্যে দ্বিধা ছিল। প্রথমে তার মনে হয়েছিল বিনোদিনী অমঙ্গলই নিয়ে এসেছে, এমন এক অমঙ্গল, যা আশাকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিতে চায়। কিন্তু ক্রমেই বিনোদিনীকে সে যেন একটু একটু করে আবিষ্কার করেছে। সে বুঝতে পেরেছে, বিনোদিনীর মধ্যেও বিপন্নতা চায়, সে-ও আসলে নির্ভরতা চায়। নিরপেক্ষভাবে বিহারী তখন বিনোদিনীর সংকটকে বুঝতে চেয়েছে। তার মনে হয়েছে, বিনোদিনীর অন্তরে, ‘‘একটি পূজার নারী নিরশনে তপস্যা করিতেছে।” বিনোদিনীর মধ্যে সে একটু একটু করে খুঁজে পেয়েছে মঙ্গলের মহিমা। আর সবার কাছে বিহারী যখন ক্রমেই অপ্রিয় হয়ে উঠেছে, একমাত্র বিনোদিনীর কাছেই সে যত দিন গেছে আরও প্রিয় হয়ে উঠতে পেরেছে। নিজের সমস্ত মহত্ব ও শক্তি দিয়ে আর সবার মঙ্গল চেয়েও যখন সে তাদের কাছ থেকে শুধু আঘাতই পেয়ে গেছে, বিনা আয়াসে সেইসময় বিনোদিনী তার সম্পূর্ণ অনুগত হয়ে উঠেছে এবং তার জন্য সমস্ত ত্যাগস্বীকার করতে প্রস্তুত হয়ে উঠেছে। বিহারী ও বিনোদিনীর মধ্যে বারবার ভুলবোঝাবুঝি হয়েছে। মহেন্দ্র বারবার বিনোদিনীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরি করতে চেয়েছে এবং তীব্র ঘৃণায় বিনোদিনী তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই অন্তরঙ্গতা বিহারীর মনে ভুল ধারণার সৃষ্টি করেছে। বিহারীর খোঁজেই সে পশ্চিমে গেছে এবং ফুল, মালা ও হৃদয়ের অর্ঘ্য সাজিয়ে তার জন্য প্রতীক্ষা করে গেছে। বিহারী ভেবেছে বিনোদিনীর এসব আয়োজন বোধহয় মহেন্দ্রের জন্যই, কিন্তু শেষপর্যন্ত এই ভুল তার ভেঙেছে, বিনোদিনীর প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পেরে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।

বিহারী গোড়া থেকেই যেন মঙ্গলের দূত, উপন্যাসের রঙ্গমঞ্চে মঙ্গলকে টিকিয়ে রাখতে দৃঢ়সংকল্প এক সৈনিক। আর বিনোদিনীর উপস্থিতি প্রত্যেকের জীবনেই নিয়ে এসেছে নানা রকম অমঙ্গল। মায়ের কাছ থেকে সন্তান দূরে সরে গেছে, স্ত্রীর কাছ থেকে স্বামী দূরে সরে গেছে, বন্ধুর প্রতি বন্ধু অবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে, একজন মানুষ ভারসাম্য হারিয়ে প্রিয়জনদের কাছে বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠেছে। গোটা রঙ্গমঞ্চে অমঙ্গলের বিষ ছড়িয়ে দিয়েছে বিনোদিনী। কখনও যেন মনে হয় সে এক অমঙ্গলের দেবী। কিন্তু সত্যিই কি তাই? বিনোদিনী আসার আগে মা-সন্তান এবং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে যে উদ্বেগ ও গোঁজামিলগুলো ছিল, বিনোদিনী না এলেও তা কি কোনওদিন প্রকট হয়ে উঠত না? মিথ্যার সাহায্যে কতদিন স্থিতাবস্থা বজায় রাখা সম্ভব হতো? রাজলক্ষ্মী তো সত্যিই আশাকে ভালোবাসত না। আশা তো সত্যিই ছিল অপরিণত, অনভিজ্ঞ এক বালিকা। মহেন্দ্র সত্যিই তো এই অপরিপক্কতা ও অনভিজ্ঞতা নিয়ে চিরদিন সুখী হতে পারতো না। যে ফাটলগুলো অদৃশ্য ছিল, তা একদিন দৃশ্যমান হতোই। বিনোদিনী তাকে শুধু দৃশ্যমানই করলো না, অমঙ্গলের আগুনে পুড়িয়ে তাদের প্রত্যেককে এক আঁটি, মঙ্গলময় জীবনের দিকে টেনে নিয়ে গেল। অমঙ্গল ছিল সেই নরক ও পরিশুদ্ধির স্তর, যা বিনোদিনীর পক্ষে অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। বিনোদিনী বুঝেছিল, বাইরে থেকে যাকে স্থিতাবস্থা মনে হচ্ছে, ভেতরে ভেতরে তা উত্তপ্ত হয়ে আছে। সবচেয়ে তাকে যা আঘাত করেছিল, তা হল সবাই যে যার মতো আত্মরতিতে ব্যস্ত, তার দিকে কারও তাকানোর সময় নেই। যদিও সে বিধবা, তথাপি মানুষ হিসাবে চারপাশের কারও চেয়ে নিকৃষ্ট হয়। সমাজের এই নিষ্ঠুর ঔদাসিন্যকে জীবনের সমস্ত অধিকার নিয়ে সে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল। সমাজকে দেখিয়ে ছেড়েছিল, সে কী পারে! যখন সে ভোগ করতে উদ্যত হয়েছে, তখন সে হয়ে উঠেছে তীব্র বেগবান তেজি এক ঘোড়ার মতো, যাকে প্রতিহত করা যায় না। যখন সে ত্যাগ করেছে, তখনও কেউ তাকে প্রতিহত করতে পারেনি, সে যেন হয়ে উঠেছে এক সাধিকা।

আরও পড়ুন: শিশুমনের ছড়া এবং রবীন্দ্রনাথ

বিনোদিনী যে নিজের সুখ ও ভোগের জন্য অমঙ্গলকে ডেকে আনেনি, সেকথা উপন্যাসের শেষে গিয়ে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মহেন্দ্রকে সে অনায়াসে লাভ করেছে, কিন্তু তার ওপর থেকে নিজের সমস্ত অধিকারবোধ তুলে নিয়েছে এবং তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে আশার কাছে। রাজলক্ষ্মীকে নিপুণ হাতে সেবা করেছে। তার অমঙ্গলের অভিঘাতেই আশা হয়ে উঠেছে নিজের ব্যক্তিত্বে সুপ্রতিষ্ঠিত এক পরিপূর্ণ নারী। মহেন্দ্র নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। এবং লিখেছে, ‘পথ দেখিয়া চলিব, তাহার আলো কোথায়… সে আলো তোমার বিশ্বাসপূর্ণ দু’টি চোখের প্রেমস্নিগ্ধ দৃষ্টিপাতে। বিনোদিনী বিনীত অথচ দৃঢ়ভাবে বিহারীর বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। বিহারীকে যে সে উন্মত্তের মতো খুঁজে ফিরেছে নিজের ভোগ ও স্বার্থের কারণে নয়, এই প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে তাকেই স্পষ্ট করে দিয়েছে। ঠিক যেভাবে নাস্তাসিয়া বারবার মিশকিনের বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, এমনকী বিয়ের ঠিক প্ৰাক্মুহূর্তেও রোগোজিনের সঙ্গে পালিয়ে গেছে, সেভাবেই বিনোদিনী বিহারীকে কিছুতেই বিয়ে করতে রাজি হয়নি। নিজের পাপবিদ্ধ জীবনে বিহারীকে সে নামিয়ে আনতে চায়নি, বরং বিহারীর করুণাপ্রার্থী হয়ে নিজেকে শুদ্ধ করতে চেয়েছে, যাতে তার পরিত্রাণ ও উত্তরণ জোটে।

বিহারী নিজের অজ্ঞাতে যে ক্ষতচিহ্ন উপহার দিয়েছিল, সারাজীবন তাকে পবিত্র দান হিসাবেই বহন করেছে বিনোদিনী। এই ক্ষতচিহ্ন যেন পরিশুদ্ধ হওয়ার সময়কার আগুনে পোড়ার দাগ, এক স্বীকৃতি, বিনোদিনীকে যা মোহের নরক থেকে মঙ্গলের অমরাবতীতে উত্তীর্ণ করে দিয়েছে। মহেন্দ্র বা বিহারী, উভয় পুরুষকেই অনায়াসে লাভ করতে পারত বিনোদিনী। চাইলে উভয়ের সংসারেই রাজরানি হয়ে থেকে যেতে পারত। কিন্তু পরিণামে কাউকেই গ্রহণ না করে ত্যাগের মধ্যে দিয়ে সে বেছে নিয়েছে একা চলার পথ, এক শীর্ণ তোরণ, বাইবেল অনুযায়ী, যে শীর্ণ পথ দিয়ে দু’জন পাশাপাশি চলতে পারে না। দস্তয়েভস্কির উপন্যাসে মানবতার জন্য বলিপ্রদত্ত ক্রশবিদ্ধ মানবেরা সকলেই যেমন দণ্ডপ্রাপ্ত, সেভাবেই নিজেই নিজেকে দণ্ডিত করে এক নিঃসঙ্গ অথচ কণ্টকময় পথ বেছে নিয়েছে বিনোদিনী। বিহারী দণ্ডিত হয়েছে অন্যভাবে। উপন্যাসের শেষে দেখা গেছে, সকলেরই তাকে প্রয়োজন, আশা-রাজলক্ষ্মী-মহেন্দ্র সবার জীবনেই সে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, মহেন্দ্রই হয়ে উঠেছে এক বাতিল, পরিত্যক্ত মানুষ। মহেন্দ্রকে ছাপিয়ে উঠেছে আশা, একের পর এক দুর্যোগ তাকে রূপান্তরিত করে দিয়েছে, নারী হিসেবে নিজের মহিমা সম্পর্কে সে সচেতন হয়ে উঠেছে। বিনোদিনীর অভিঘাতে পরিবর্তিত হয়ে গেছে বিহারীও। কয়েকটি মানুষের মঙ্গলে নিজের যে খ্রিস্টীয় মহিমাকে সে উৎসর্গ করেছিল, তাকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছে গোটা মানবতার মধ্যে। অসুস্থ, বিপন্ন মানুষের সেবায় বাকি জীবনটা কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। মহেন্দ্রকেও সে পথ দেখিয়েছে, তাকে অনুসরণ করে মহেন্দ্রও কর্মযোগেই জীবনকে সার্থক করে তোলার সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে।

আরও পড়ুন: রবীন্দ্রসাহিত্যে ফুটবল

রবীন্দ্রনাথ যে এক ঔপনিবেশিক ভূখণ্ডের কথা লিখছেন, তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে একটিমাত্র জায়গায়। পিকনিকে গিয়ে মহেন্দ্রের গাড়ি বাগানের বাইরে অপেক্ষা করছিল। দু’জন শ্বেতাঙ্গ গাড়োয়ানকে চাপ দিয়ে গাড়িটি নিয়ে স্টেশনে চলে যায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের রচনাটি যে আসলে এক উপনিবেশিতের বয়ান, তা বোঝা যায় রচনাটির অন্তর্নিহিত ভাবে। দস্তয়েভস্কির উপন্যাসে অমঙ্গলের যে বীভৎসতা, রবীন্দ্রনাথে তা নেই। হত্যা ও রক্তপাতের পরিবর্তে রবীন্দ্রনাথ এক সার্বিক মঙ্গলের ছবি এঁকেছেন, যে মঙ্গলকে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন কালিদাসের নাটকে। এই মঙ্গলকেই তিনি ভারতবর্ষের চিরসত্য বলে জানতেন, উপনিষদ থেকে কালিদাস পর্যন্ত আবহমান ভারতীয় সাহিত্যে যা বহমান থেকেছে। বঙ্কিমচন্দ্র মূল খসড়াটি লিখেছিলেন ‘বিষবৃক্ষ’ ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এ। রবীন্দ্রনাথ তাকে ভারতীয় রসে সিক্ত করে তুলেছেন। যে গোবিন্দলাল ভ্রমর এবং রোহিণী, উভয়ের সঙ্গেই নির্মম অবিচার করে, তাকে তিনি সন্ত বানানোর চেষ্টা করেননি। মহেন্দ্রকে তিনি উপযুক্ত শাস্তি দিয়েছেন। যে রোহিণীকে উপন্যাসের প্রথমভাগে বুদ্ধিমতী, সাহসী ও ব্যতিক্রমী মনে হয়, তাকে তিনি দ্বিতীয় ভাগে নেহাৎ এক সস্তা রমণী করে তোলেননি। বিনোদিনী আগাগোড়া তার মহত্ব অক্ষুণ্ণ রেখেছে। যে ভ্রমর আজীবন অবিশ্বাসী, নির্দয়, খামখেয়ালি পতির প্রতি বিশ্বস্ত থাকার সুবাদে জোৎস্নারাতে রোমান্টিক মৃত্যু ও মার্বেলের মূর্তি হয়ে পুনরুজ্জীবন লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেছে, আশার জন্য সেই রোমান্টিকতা তিনি বরাদ্দ করেননি। পরিবর্তে তাকে আত্মমর্যাদায় স্থিত এক পরিপূর্ণ নারী করে তুলেছেন, পুরুষতান্ত্রিকতার প্রতি যে নিঃশর্তভাবে অনুগত নয়।

রবীন্দ্রনাথ যে বাংলা উপন্যাসের জনকের মূল পাণ্ডুলিপিটিকে সময়োপযোগী সংশোধন ও সংস্কার করতে পেরেছেন, তা তার যুগান্তকারী প্রতিভারই স্বাক্ষর হয়ে রয়েছে। দস্তয়েভস্কির মতোই তার রচনাকেও কখনো কখনও বেশ সাজানো-গোছানো মনে হয়। অতিনাটকীয় মুহূর্তগুলির সঙ্গে বাস্তবতার সামঞ্জস্য রক্ষা করা যায় না। তখন আমাদের মনে পড়ে যেতে পারে জর্জ স্টেইনারের সেই তুলনা। স্টেইনার লিখেছিলেন, তলস্তোয়ের চরিত্ররা রক্তমাংসের, কিন্তু দস্তয়েভস্কির চরিত্রেরা হল আসলে একেকটি আইডিয়া। রবীন্দ্রনাথের চরিত্রেরাও আসলে একেকটি আইডিয়া। তার মধ্যে বেশি রক্তমাংস খুঁজতে গেলে আইডিয়াটাই ফসকে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে, শেষ কথা এটাই বলার।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • নবনীতা বসু হক

    ভালো লাগল কার্ণিভাল থিয়োরি ।কিন্তু মাঝে চাপল্য গুরু ও গভীর ব্যাখ্যানে লঘু করে দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *