চোর

বিশ্বজিৎ সরকার

বাড়ি থেকে বেরোবার আগে মেয়ের সঙ্গে এক ঝলক ঝগড়া হয়ে গেল মণিময়ের। মেয়ে তুলিকা যত বড় হচ্ছে, ততই তার সঙ্গে তর্কাতর্কি বাড়ছে মণিময়ের। আসলে তুলিকার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের একটা ভাবনার জগৎ তৈরি হয়ে চলেছে, মণিময়ের সমস্যা এটা সে বুঝতেই চায় না। তার ভাবনা মেয়ে তুলিকা এত দিন ধরে তার কাছ থেকে যা কিছু শিখে এসেছে সেটা ধরেই পথ চলুক মেয়ে, সুহৃদয় মন এবং শানদার মগজের মিলনেই পরিপূর্ণ মানুষের বিকাশ, আর এই মানুষের লক্ষ্যে পৌঁছতে গেলে জীবনকে গতিময় করতে হবে, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকলেই গন্তব্যের সিকিভাগ কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়— এই কথাগুলোই শিখিয়ে এসেছে মেয়ে তুলিকাকে। কিন্তু মাধ্যমিক পাশ করার পর তুলিকা আস্তে আস্তে উপলব্ধি করে, তার বাবার শেখানো জগৎ থেকে বাস্তবের জগৎটা আলাদা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার অনুভব-সত্যেের অনুসন্ধান করে পথ চলতে গেলে স্রোতের বিরুদ্ধে কখনও কখনও হাঁটতে হয়, আর সেখান থেকেই শুরু হয় নানান সমস্যা। পাশে পাশে বিপত্তি উজিয়ে ওঠে তার থেকে চুপচাপ থেকে আপন পথে এগিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। আর এখান থেকেই মেয়ের সঙ্গে তার সংঘাত। মণিময় বলে, দেখ চারিদিকের পথচলতি অন্যায় দুর্নীতি, অনাচার আমরা যারা দেখেও দেখি না তারা আসলে আত্মহননকারী, নিজেদের কবর নিজেরাই খুঁড়ে চলেছি প্রত্যেকটি অন্যায় দুর্নীতির সঙ্গে সমঝোতা মানেই নিজেদের স্বার্থ জড়িত। আজ না হলেও কাল বা পরশু এই অন্যায় এই দুর্নীতি আমাদের ছোবল মারবেই, অন্যায়ের এই হাঁড়িকাঠে একদিন না একদিন আমাদের মাথা যাবেই। মেয়ে তুলিকা রেগে বলে— তোমার মাথায় তো কেউ চিটে গুড় ঢালছে না, তাহলে তোমার এত চিন্তা কেন? মণিময় ম্লান হেসে সামান্য নিশ্বাস ছেড়ে বলে, আমাদের অফিসে ইউপি থেকে আসা নতুন পিও-টার সঙ্গে দেশকাল সমাজ নিয়ে যখন কথা হত তখনও সে এইরকম কথা বলত। তার একটা বাণী ছিল— নেতা লোক ঘুঁষ খা রাহা হ্যা্য়, ব্ল্যাক লিস্টেড কোম্পানিকো বরাত মিল রাহা হ্যায়, বেতমিজ লোগ রেপ কর রাহা হ্যায়— ইসকো সাথ হামরা কেয়া লেনাদেনা। ম্যায় কুছ কর স্যাকতা নেহি, সবকো আপনা আপনি কাম মে ধ্যাতন দেনা জরুরি হ্যায়। অথচ দেখ তো, সেই সৎ কর্মনিষ্ঠ ছেলেটা শেষকালে কেমন দুর্নীতিবাজদের শিকার হল, ট্যাক্সিতে যেতে যেতে গোটা ব্রিজটা ভেঙে পড়ল ওর মাথায়। আসলে সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সমস্যা বলে যেগুলো আমরা পাশ কাটাই, সেগুলো সব আমাদের নিজেদের সমস্যা। কলকাতার উড়ালপুল দুর্ঘটনা থেকে এটা বোধোদয় হওয়ার সময় এসেছে।

আরও পড়ুন: ‘ভালোবাসিবে বলে ভালোবাসিনে’

মেয়ে বলে ভাগ‍্য, জন্ম মৃত‍্যু কার কোথায় লেখা আছে, তা খণ্ডন করার নয়। মেয়ের প্রশ্নে মণিময় উত্তর ছুড়ে দেয়, এই রকম ভাবলে সব ল‍্যাটা তো চুকেই যায়, সব তার উপর ছেড়ে দিলে দুনিয়াব‍্যাপী দুর্নীতি অনাচারকে ভবিতব‍্য বলে মেনে নেওয়া সহজ হয়ে যায়।

বাবার যুক্তির সঙ্গে না পেরে ওঠায় মেয়ে তুলিকা বলে— ঠিক আছে তুমি তোমার ভাবনা নিয়ে থাক। আমি এখন অ্যাডাল্ট, আমাকে আমার ভাবনা ভাবতে দাও। মেয়ের এই ধরনের কথাবার্তাতে রেগে যায় মণিময়। মেয়ে ও বাবার বাগ্‌যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সংসারে গোলযোগ ছড়িয়ে পড়ে। অবস্থা সামাল দিতে গৃহকর্ত্রী রুচিরাকে ছুটে আসতে হয়, বাপ মেয়ের ঝগড়া থামাতে হিমশিম খেতে হয়। আজকের কথাকাটাকাটির সূত্রপাতও বাপ-মেয়ের ভাবনার ফারাক থেকেই। সকালে বাথরুম থেকে ফিরে মণিময় দেখে মেয়ে পেপারটা নিয়ে ভাগ্যপফল আর পেজ থ্রির পাতায় বুঁদ। মণিময় উষ্মাভরে বলে ওঠে, এত খবর থাকতে তোর চোখ হাবিজাবি পাতায়! এও এক দৃষ্টিভঙ্গি দর্শনের ব্যাাপার। তোর অজান্তেই কেমন করে সব আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলে তোদের আর সব আত্মস্থ করতে করতে লঘু আনন্দের সঙ্গে আত্মবিশ্বাস ও নষ্ট হতে থাকে। সাতসকালেই বাবার লেকচার শুনেই তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে, তৎক্ষণাৎ পাল্টা জবাব শুনিয়ে দেয়— “এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই তোমাকে পথে বসাবে, তোমাকে শেষ করে দেবে।” অন্যর সময় হলে মেয়ের সঙ্গে কাটাকাটি লেগে যেত তার কিন্তু আজ বাইরে যাবার তাড়া তার, তাই হজম করে নেয় মেয়ের কথা। সামান্য কথা কাটাকাটির মধ্যে দিয়ে শেষ হয় এই পর্ব।


যে কাজের জন্য‍ মণিময় সকালে স্নানপর্ব ছেড়ে বেরিয়েছিল, তা সম্পন্ন ক’রে সে এখন বর্ধমান তেলিপুকুরের টোটো স্ট্যান্ডে। মণিময় গিয়েছিল বাঁকুড়ায় গ্রামের বাড়িতে ভোট দিতে। বেশ কয়েক বছর গ্রাম ছেড়ে এলেও ভোটটা এখনও বাঁকুড়ার গ্রামের বাড়িতেই, গ্রামের বাড়িতে যাতায়াত থাকায় এখনও ওখানেই রয়েছে ভোট। রাজ্যের প্রথম পর্বের ভোট আজ, সেই ভোট দিয়েই সে ফিরছে।

এপ্রিলের প্রথম পক্ষ, সারাদিন গরমে হাসফাঁস করছে মানুষ, তবে সারাদিন গুমোট গরমের পর হঠাৎ করে ঝোড়ো হাওয়া বওয়ায় কিছুটা স্বস্তি প্রকৃতির বুকে। মধ্য বিকেলের সূর্যের তেজ এই ঝোড়ো হাওয়ার প্রতিরোধে কিছুটা শক্তি হারিয়েছে। সামান্য শীতল বায়ুপ্রবাহের স্পর্শে ফুরফুর মেজাজে এখন মণিময়। টোটোতে চার যাত্রী। তেলিপুকুর থেকে সদরের রাস্তা ধরে ছুটছে টোটো। চারদিক ভোটের পোস্টারে ছয়লাপ পুরো শহর। রাস্তার দুপসারি ক্ষেত্র নেতাদের কাটআউটে ঢাকা, দেওয়াল ঢেকেছে ভোটের ছড়ায়, এখানে ভোট হতে এখনও এক সপ্তাহ বাকি। চারিদিকে ভোটের প্রস্তুতি প্রদর্শনের ব্যপক আয়োজন দেখে যাত্রীদের একজন বলে ওঠে— ‘যে যায় লঙ্কায় সেই তো রাবণ’। বক্তার বয়স পঞ্চাশ ছুঁই-ছুঁই। চোখেমুখে কর্মঠ মানুষের ভাঁজ, গালে দিন পাঁচ সাতেকের না কামানো দাড়ি।

আরও পড়ুন: কলকাতায় প্রায় বিস্মৃত একটি খেলা এবং কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন

সাধারণ দৃষ্টিতে স্বল্প শিক্ষিত গ্রামের সাধারণ চাষি বলে মনে হয়। বক্তার কথাতে আর এক যাত্রী তাকায় তার দিকে। ফিটফাট চেহারা। গায়ে রঙিন শার্ট, চোখমুখে স্মার্ট ভাব। মণিময় লক্ষ করে দু’জনকে। বক্তার কথার কয়েক মুহূর্ত পরেই, টোটোচালক বলে ওঠে— “আর বলবেন না, সব সমান। এই আমদের কথাই ধরেন না, আমাদের নিয়ে কত আশার কথা শুনিয়েছিল বিরোধী দল, অথচ এখন কত হেনস্থা হতে হচ্ছে আমাদের। কোনও নেতা সকালে বলে যাচ্ছে, বিকালে আবার অন্য নেতা অন্য বলছে। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ যেন সব দলের কাছেই বোড়ে।” মণিময় শোনে রাজনৈতিক দলগুলি সম্পর্কে এই শ্রমজীবী মানুষদের ধারণা। তার মনে হয় এখন সব মানুষের নিজস্ব চিন্তাভাবনা লোপ পেয়ে যায়নি। হঠাৎই ফিটফাট স্যুট পরা পঁয়ত্রিশের ভদ্রলোক বলে ওঠে— “মানুষ পেয়ে পেয়ে লুভিয়ে গেছে, যত পাবে তত দাও, এভাবে কি আর দেশ চলে?”

ছোকরা ভদ্রলোকের কথা শুনে মাথাটা চিনচিন করে ওঠে মণিময়ের। মানুষ লোভী হয়ে গেছে আর নেতারা সব সাধু এই কথাটাই যেন বলতে চায় যুবক। যুবকের কথাতে চুপ মেরে যায় টোটোচালক ও প্রৌঢ় কৃষক। যুবকের ধোপদুরস্ত চেহারা দেখে বোধহয় একটু ঘাবড়ে যায় টোটোচালক ও প্রৌঢ় কৃষক। কাজেই তাদের নিস্তব্ধতাতেই টোটোর মধ্যে শেষপর্যন্ত যুবকের কথাটাই যেন ভো-ভো করতে ঘুরতে লাগে। মণিময় ভাবে, একটা উত্তর না দিলেই নয়। অন্তত এই দু’টি মানুষের মতের সঙ্গে তাল মেলানো তার সমাজিক দায়। সে মুখ খোলে— “মানুষের লোভী হওয়াটা দেখলেন, নেতাদের দ্বারা কোটি কোটি টাকার নিত্যনতুন কেলেঙ্কারিগুলো ভুলে গেলেন?

যুবকটি তার পূর্ব কথার আত্মপ্রসাদ লাভ করে রাস্তার দুপসারি দৃশ্য অবলোকনে ব্যাপৃত ছিল, মণিময়ের কথাতে ঘাড় সামান্য বেঁকিয়ে বলে ওঠে— “হ্যাঁ, কিন্তু এই নেতাদের না হলে তো চলে না মানুষের।”

মণিময় শান্তভাবে বলে— “মানুষের চলে না মানে। নেতারা কি করুণা করছে আমাদের? নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে। সেটা সুষ্ঠুভাবে পালন করা তাদের কাজ। তার জন্য তাদের ভাতাও দেওয়া হয়, আর সেটা জনগণের ট্যাক্সের পয়সায়।” তার কথাতে ভদ্রলোকটি উৎফুল্ল হয়ে বলে— “বাবু ঠিকই বলেছেন।”

ছেলেটি এবার গলার সুর মোটা করে বলে ওঠে— “রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের গালিগালাজ করাটা এখন অনেকের স্বভাব, কারোর ফ্যাশন, এরা কিছু পায় না বলেই পথেঘাটে ঝাল মিটিয়ে নেয়। এসবই ধান্দাবাজদের প্রলাপবাক্য।”

ছেলেটির কথা শুনে মনে মনে উত্তেজিত হতে থাকে মণিময়। মানুষকে খাটো করে অপমান করে রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষে এভাবে উচ্চকিত স্বরে গলা ফাটাতে কাউকে দেখেনি মণিময়। পথচলতি একক মানুষ প্রায়শই অকপটে নিজ অভাব-যন্ত্রণা দলীয় শাসনের আধিপত্য-জনিত সন্ত্রাসের কথা বলতে দরাজ। এদের অনেকেই না পাবার জন্য মুখর নয়। চারিদিকে সংগঠিত দলীয় রাজনীতির দাপাদাপিতে এদের অনেকের ব্যক্তিসত্তা অবদমিত লাঞ্ছিত। সেই লাঞ্ছিত ব্যক্তিসত্তার ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাদের বক্তব্যে, যুবকের মতে এগুলো ধান্দাবাজদের প্রলাপবাক্য, মণিময়ের মনে হয় এই কথার মধ্যে তাঁকে যেন সরাসরি আক্রমণ করে বসেছে ছেলেটি। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণের জন্য নয়, তার মনে হয় এই ভাবনা দর্শনকে জিতিয়ে দেওয়া উচিত নয়, এতে মানুষ প্রভাবিত হয়। পাল্টা যুক্তি দেওয়া একজন সুস্থ সচেতন মানুষের রাজনৈতিক কর্তব্য। সে তাই থিতু হয়ে রাগ সংযত করে যুবকের হাঁটুটে হাত রেখে বলে— “ব্রাদার মানুষ এখনও বহুলাংশেই সৎ, দুর্নীতিবাজদের হাতে সমাজ ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রের কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় মনে হচ্ছে সবাই খারাপ হয়ে গেছে, আসলে তা নয়। কিছু মানুষই এইসব দুর্নীতিবাজদের পেছনে ঘুরঘুর করে, বেশিরভাগ মানুষই চাই অন্যায় না করে শান্তিতে জীবন কাটাতে”— মণিময়ের বক্তব্যে গভীর প্রত্যয়ের সুর।

আরও পড়ুন: পূর্বমেঘের শস্যবাসনা

যুবকটি এবার রাগত স্বরে চেঁচিযে বলে ওঠে— “ধুর মশাই অত রাজনৈতিক নেতা পার্টির প্রতি অ্যালার্জি, তাহলে ভোট দিলেন কেন? গোটা আঙুলটাই তো ভোটের কালিতে চুবিয়ে ফেলেছেন।’’ বাচ্চা ভোট কর্মীটি একটু বেশি করেই কালি লেপে দিয়েছিল, তখনই লক্ষ করেছিল মণিময়। হয়তো প্রথমবার ভোটকর্মী হওয়ার কারণেই এই অনভিজ্ঞতা সেই বেশি কালিই বেমানানভাবে জ্বলজ্বল করছে মণিময়ের আঙুলে।

টোটো তখন সদর রাস্তা ছেড়ে শহরের ছোট গলিতে আটকে। সামনে থেকে আসা এক ম্যাটাডোরে রাস্তা জ্যাম। সামনের লাইট পোস্টে ঝুলছে নির্বাচন কমিশনের পোস্টার, বিজ্ঞাপন “ভোটদিন নির্ভয়ে, ভোটদান আপনার মহান কর্তব্য।” পাশে একটি বিজ্ঞাপনের ছবি, একটা ভোট মূল্যবান তাই তুলে ধরা হয়েছে ছবিতে। মণিময়ের চোখ আটকে যায় সেই বিজ্ঞাপনে, তার ইচ্ছা হয় বিজ্ঞাপনটি যুবকটিকে দেখাতে। চেঁচিয়ে বলে ওঠার তাগিদও অনুভব করে— একটা ভোটের জন্য সরকার কত কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে আর ভোটটা দেবেন না বলছেন! কিন্তু সেই ইচ্ছা ও সংলাপ চেপে রাখে বরং একটু সুর চড়িয়ে বলে— “শুনুন, ওইসব নেতানেত্রীদের নির্বাচিত করার আমার কোনও মোহ নেই ভাই।”

যুবকটি বলে, “ভোট তো দিয়ে এলেন, বড় বড় কথা বলা আর কাজে ফারাক। আপনি তো মহা ভণ্ড।” মণিময় উত্তেজিত হয়ে বলে, “বলছি তো এই সব নেতার প্রতি আমার কোনও দায় নেই। আমার ভোট নোটায়।” ‘নো-টা-য়’ বেশ উচ্চস্বরে গর্ভভরে কাটাকাটা শব্দ বেরিয়ে আসে তার মুখ দিয়ে।

যুবকটির বোধহয় নোটার কথা খেয়াল ছিল না। নোটার কথা শুনে সে চুপসে যায়। তার এতক্ষণের দাম্ভিক মেজাজ, অহমিকা কোথায় যেন মিলিয়ে যায়, তার যুক্তি পথ গভীর গিরিখাতে উদরস্থ হয়। তার কথা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখমণ্ডল রাগে থমথম করে। সেই রাগের বহিঃপ্রকাশ না হওয়ার এক অদ্ভুত অস্বস্তিতে সে উসখুশ করে। মণিময় তার এই অবস্থা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে। মনের মতো জবাব দিতে পারায় তার চোখে মুখে পরিতৃপ্তের রেশ ছড়িয়ে পড়ে। তাদের এই আলোচনায় ছিল না বাকি একজন বয়স্ক সওয়ারি এবারে বলে, “বাবু নোটা কী জিনিস?”

আরও পড়ুন: সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৬)

মণিময় উৎসাহ ভরে বলে— “নোটা মানে আপনার কাউকে পছন্দ নয় এমন। যদি মনে করেন আপনার কোনও প্রার্থী বা দলকে পছন্দ নয়, তাহলে আপনি সেই দলের প্রতীকে ভোট না দিয়ে অপছন্দের ঘরেও বোতাম টিপতে পারেন, তখন আপনার ভোটটা যাবে ওই নোটার ঘরে।” বয়স্ক সওয়ারিটি বলে, “বাঃ, বেশ। তাহলে বাবু এবার আমার ভোট ওই নোটায়।” ছোকরা টোটোচালক ফিক করে হেসে ওঠে। তার হাসি থামিয়ে স্মার্ট ছোকরা যুবক বলে ওঠে— “এই গাড়ি থামা। নামব।” তবে নামার আগে মণিময়কে গভীরভাবে নিরীক্ষণ করে, সেই দেখার মধ্যে থাকে চাপা ক্রোধ। স্ট্যান্ড থেকে সবাই স্টেশন যাবার জন্য উঠেছিল কিন্তু স্টেশনের একটু আগে যুবকটি নেমে যাওয়ার টোটোচালক একটু অবাক হয়। কিন্তু স্টেশন পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গেই তার এই ক্ষণিকের ভাবনা মিলিয়ে যায়।

৩.
আগের গাড়ি ছেড়ে গেছে আধঘণ্টা আগে, এর পরের লোকাল ছাড়তে এখনও আধঘণ্টা বাকি। মণিময় দু-নম্বর প্ল্যাটফর্মের একটা দোকান থেকে ভাঁড়ে এক কাপ চা খেয়ে বসার জন্য একটু নিরিবিলি জায়গা খুঁজতে থাকে। ওপরের ফুট বোর্ডে যাত্রীদের ভিড় সবচেয়ে বেশি কেন-না অপেক্ষামান যাত্রীরা ট্রেনের ঘোষণা শুনেই নিচে নামার অপেক্ষায়। প্ল্যার্টফর্মের সিটগুলো ভর্তি থাকায় মণিময় হাওড়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে যাত্রী শেডের নিচে গিয়ে বসে, একটা ম্যাগাজিন খোলে, মিনিট দশেক ম্যাগাজিনে ছিল মণিময়।

আরও পড়ুন: অন্ধেরা, নির্বোধেরা

হঠাৎ একটু উত্তেজনা হইচই। তার চমক ভাঙে, দু-নম্বর প্ল্যার্টফর্মের মাঝখান থেকে শোরগোল ডাকাডাকি কানে আসে তার। তাকিয়ে দেখে বেশ কিছুলোকের জটলা, কয়েকজনের হাতে ছোট ছোট লোহার রড, তাদের যথেষ্ট উত্তেজিত দেখায়, মনে হয় তারা যেন কাউকে খুঁজছে। হঠাৎ চোখ আটকে যায় মণিময়ের, আরে টোটোর যুবক না! পরক্ষণেই যুবকের মুখ থেকে শুনতে পায়, উত্তেজনাময় আহ্বান— কোথায় বেটা নোটা বাজ! দেখি একবার— নেতারাই নাকি চুরি করে ধসিয়ে দিচ্ছে সমাজ। শালাকে জ্যান্ত মারব। এইসব রক্তবীজ ধ্বংস না করলে দেশের রেহাই নেই, উগ্রপন্থীতে ভরে যাবে দেশ, আমি শালা যুব সভাপতি, আমাকে এভাবে বলা! মণিময় চমকে ওঠে। স্পষ্ট বুঝতে পারে তাকেই খুঁজছে ওরা, রাগে মাথার মধ্যে উত্তেজনার স্রোত বয়ে যায়। না এসব শোনা যায় না। ওদের মুখোমুখি হতেই হবে। আবেগী দোলায় তার অন্তর্গত রক্ত শির শির করে ওঠে। মনে ভেসে ওঠে ‘চিত্ত যেথা ভয় শূন্য, উচ্চ যেথা শির’। মস্তিষ্কে আহবানের ঢেউ ওঠে— গ্রাম করতে সাহসী হও, বিজয় অর্জন করতে সাহসী হও। এই দুই উদ্বাস্তু ভাবনা তার চলার বেগে পায়ের তলার রাস্তা জাগিয়ে দেয়। সে এগোতে থাকে। দশ কদম যাওয়ার পরই হঠাৎ তার মেয়ে তুলিকার সকালের কথাটা মনে পরে “তোমার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই তোমাকে ডোবাবে, তোমাকে শেষ করে দেবে।” তুলিকার কথা মনে পরতেই তার গতি শ্লথ হয়ে যায়, পা আটকে যায়। এক বিরুদ্ধ ভাবনার স্রোতে তার মাথাটা ঝিমঝিম করতে থাকে। সে হঠাৎ মুখ পরিবর্তন করে সহস্র মানুষের মধ্যে ভিড়ে যায়, ঠিক চোরের মতন।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *