চুঁচুড়ার দত্ত-বোস-মল্লিক-বড় শীল বাড়ির দুর্গোৎসব আজও টিকিয়ে রেখেছে পরম্পরাকে

Chunchura Durga

সোহম ভট্টাচার্য

বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো যার প্রধান ইতিহাস বা ঐতিহ্য হয়তো লুকিয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রচুর বনেদি বাড়ির আনাচে কানাচে। আগের পর্বে লিখেছি চুঁচুড়ার আঢ্যবাড়ি নিয়ে, আজ কথা বলব আরও চারটি বনেদি বাড়ি নিয়ে, যেগুলি অবস্থিত আমার শহর চুঁচুড়াতে।

আরও পড়ুন: কাটোয়ার জাগ্রত দেবী মহামায়ার সুপ্রাচীন এবং স্বপ্নাদিষ্ট ‘হাড়িবাড়ির দুর্গাপুজো’

১) চুঁচুড়া দত্তবাড়ির দুর্গোৎসব:

১৮৬২ সালে দত্তবাড়ির এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং এক বিখ্যাত পাট ব্যবসায়ী সাগরলাল দত্ত এই বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু করেন। বর্তমানে ওনার ষষ্ঠ বংশধরেরা পুজোটি নিয়মিত পালন করে চলেছেন। এই বাড়ির দুর্গা দ্বিভুজা, অভয়ারূপিণী, সঙ্গে বাহন হিসেবে থাকে দু’টি সিংহ। প্রতিমা হয় একচালার এবং বাড়ির বিশাল ঠাকুরদালানে প্রতিমা নির্মাণ করেন শিল্পী কাশীনাথ পাল। প্রথা অনুযায়ী, রথযাত্রার দিন কাঠামো পুজো হয়, মহালয়ার আগের দিন মায়ের চক্ষুদান সম্পন্ন হয় এবং ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় জমজমাটভাবে হয় বোধন অনুষ্ঠান। সপ্তমী-অষ্টমী-নবমী, এই ৩ দিনেই সেই বাড়িতে হোম বা যজ্ঞ করা হয় এবং শুধু অষ্টমীর দিন ধুনো পোড়ানোর রীতি রয়েছে। শোনা যায়, এই একচালার দুর্গা প্রতিমার সঙ্গে নাকি অষ্টধাতুর তৈরি আরও এক মূর্তি রয়েছে সেই বাড়িতে, পুজোর ক’টা দিন একসঙ্গে ওই দুই মূর্তিরই পুজো হয় পাশাপাশি। দশমী পুজো সম্পন্ন হলে, সেই অষ্টধাতুর মূর্তিটি ফিরে যায় চিরাচরিত ঠাকুরঘরে এবং মাটির প্রতিমা দত্ত পরিবারের পুরুষদের কাঁধে ঘাটের দিকে রওনা হন বিসর্জনের উদ্দেশ্যে।

২) বোস বাড়ির দুর্গাপুজো:

চুঁচুড়ার সুজনবাগানে অবস্থিত বোসবাড়ি ১৯৫০ সাল থেকে দুর্গাপুজো পালন করে আসছে। পুজোটি শুরু করেন স্বাধীন ভারতের হুগলি জেলার প্রথম রেভিনিউ অফিসার শ্রীহেমেন্দ্রনাথ বোসের পুত্র শ্রীসুধীর কুমার বোস এই বছর এই পুজো ৭১তম বর্ষে পদার্পণ করতে চলেছে। এই বাড়িতে পুজো হয় বৈষ্ণব মতে। তাই কোনও রকম বলিদান অনুষ্ঠিত হয় না এখানে। অত্যন্ত ঘরোয়া পরিবেশে বাড়ির ঠাকুরদালানে প্রতিমা নির্মাণ এবং পুজো অনুষ্ঠিত হয়। নবমীর দুপুরে অতিথিদের প্রসাদ এবং আমিষ খাবার পরিবেশন করা হয়।

আরও পড়ুন: চুঁচুড়া আঢ্য বাড়ির দুর্গোৎসব: ঐতিহ্যের ২৮৬ বছর

৩) মল্লিকবাড়ির পুজো:

হুগলির ঘুটিয়াবাজারে অবস্থিত মল্লিকবাড়ির পুজোর বয়স ৩৫০ বছরেরও বেশি। তবে তারও আগে মল্লিক পরিবারের মূল বাসস্থান ছিল আদিসপ্তগ্রামে, ১৯৪২ সালে কোনও কারণবশত পরিবারের বিভিন্ন সদস্যরা আলাদা হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যান। শ্রীলক্ষ্মী নারায়ণ দে মল্লিক সপ্তগ্রাম থেকে হুগলি এসে ২৫টি মন্দির নির্মাণ করেন, যেগুলির মধ্যে একটিই হল মল্লিক ঠাকুরবাড়ি। শুরুতে মল্লিক বংশের মানুষেরা প্রধানত সোনার ব্যবসা করতেন, বর্তমানেও সুবর্ণ বণিক সমিতি এই পুজোর দায়িত্বে রয়েছে।

এই বাড়িতে কাঠামো পুজো হয় রাধাষ্টমীর দিনে এবং ঘটপুজো শুরু হয় মহালয়ার দিন থেকেই, তবে বোধন ষষ্ঠীর দিনই সম্পন্ন হয়। পুজো হয় বৈষ্ণব মতে। এই বাড়িতে দুর্গা শিবক্রোড়ে অধিষ্ঠাতা, প্রতিমা হয় একচালার, চালচিত্র সমেত। নৈবেদ্য সমেত পুজোর সমস্ত উপকরণ সরবরাহ করেন বর্তমান বংশের সেবকরা। এই পুজোর অনন্য একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় দশমীর দিন। বিজয়ার আগে পরিবারের সদস্যরা সেই বাড়িতেই রচিত হওয়া একটি গান গেয়ে ঠাকুরকে বিদায় দেন। তারপর বাড়ির পুরুষ সদস্যরা কাঁধে করে প্রতিমা কাঁধে করে গঙ্গার ঘাটের দিকে নিয়ে যান।

৪) বড় শীলবাড়ির দুর্গোৎসব:

অপূর্ব ইন্দো-ডাচ স্টাইলে এই বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন অত্যন্ত ধনী-প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নীলাম্বর শীল, ১৭৬৩ সালে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, বড় শীল গলিতে অবস্থিত এই বাড়িটির এখনও যথেষ্ট যত্ন নেওয়া হয়। ১৮০৩ সালে নীলাম্বর শীলের দ্বিতীয় পুত্র মদনমোহন শীলের আমলে এই বাড়িতে বিশাল ঠাকুরদালান নির্মিত হয়। আগে শুধুই কার্তিক পুজো হত এখানে। বেশ কয়েক বছর আগে থেকে এখানে বৈষ্ণব মতে দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে। দুর্গা এখানে শিবের কোলে অধিষ্ঠাতা, একচালার। প্রতিমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য, সমস্ত অস্ত্রের অনুপস্থিতি। এই বাড়িতে উল্টোরথের দিন কাঠামো পুজো অনুষ্ঠিত হয়।

সপ্তমী তিথি থেকে এই বাড়ির গৃহদেবতা ‘শ্রীধর জিউ’কে দালানে এনে রাখা হয় এবং সেদিনকার পুজো শেষ হলেই তাঁকে আবার ঠাকুরঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। একই প্রথার পুনরাবৃত্তি ঘটে অষ্টমী এবং নবমীর দিনও। এই বাড়িতে কুমারী পুজো হয় না, তবে অষ্টমীর দিন ধুনো পোড়ানো অনুষ্ঠিত হয়।

তথ্যসূত্র ও ছবির ঋণ স্বীকার: কিঞ্জল বোস (kinjalbose.wordpress.com)

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *