অভিন্ন হৃদয় বন্ধু: অ্যাশ, ব্রক, মিস্টি এবং পোকেমন

অনিন্দ্য বর্মন

অ্যাশ কিন্তু সেরুলিয়ান শহরে পৌঁছতে পারেনি। পথে একটি দুর্ঘটনা ঘটে এবং একঝাঁক জংলি স্পিয়েরো (ফ্লাইং পোকেমন) অ্যাশ এবং পিকাচুকে আক্রমণ করে। পিকাচুকে বাঁচাতে অ্যাশ একটি মেয়ের সাইকেল নিয়ে পালায়। বিভিন্ন কারণে সাইকেলটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে অ্যাশ মেয়েটিকে কথা দেয় যে, সে তাকে নতুন সাইকেল কিনে দেবে। এই ঘটনার ফলে পোকেমনে একটি বিরাট পরিবর্তন হয়। প্রথমত, অবাধ্য পিকাচু অ্যাশের কথা শুনতে শুরু করে, যা ভবিষ্যতে মানুষ এবং পোকেমনের বন্ধুত্বের দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। অন্যদিকে, মিস্টি নামের মেয়েটি অ্যাশের সঙ্গেই যাত্রা করবে বলে স্থির করে। অ্যাশ, পিকাচু এবং মিস্টি এসে পৌঁছয় পিউটার শহরে। শহরের রক পোকেমন জিমকে অ্যাশ চ্যালেঞ্জ করে এবং জিম লিডার ব্রককে হারিয়ে জীবনের প্রথম জিম ব্যাজ-বোল্ডার ব্যাজ জেতে। ব্রকও অ্যাশের পোকেমনদের প্রতি ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে অ্যাশের সঙ্গ নেয়।

আরও পড়ুন: পোকেমনের দুনিয়ায় আপনাকে স্বাগত

ব্রকের বিরুদ্ধে অ্যাশের প্রথম জিম ব্যাটেল— শো ডাউন ইন পিউটার জিম

এইবার অ্যাশ, পিকাচু, মিস্টি এবং ব্রক এসে পৌঁছয় সেরুলিয়ান শহর। কোনও অজ্ঞাত কারণে মিস্টি কিছুতেই সেরুলিয়ান শহরে আসতে চায়নি। সেরুলিয়ান জিমকে চ্যালেঞ্জ করার পর অ্যাশ জানতে পারে যে, মিস্টি সেরুলিয়ান শহরের জিম লিডার। পিকাচু মিস্টির বিরুদ্ধে লড়তে অস্বীকার করলেও অ্যাশ মিস্টির থেকে কাসক্যেড ব্যাজ জিতে নেয়। এটা অ্যাশের দ্বিতীয় জিম ব্যাটেল জয়। আর এখান থেকেই শুরু হয় অ্যাশ, মিস্টি এবং ব্রকের অভিন্ন বন্ধুতা যা আমরা বছরের পর বছর দেখে আসছি।

আরও পড়ুন: যখন বৃষ্টি নামে

মিস্টির বিরুদ্ধে অ্যাশের দ্বিতীয় জিম ব্যাটেল— দ্য ওয়াটার ফ্লাওয়ার অফ সেরুলিয়ান জিম

অ্যাশ, পিকাচু, মিস্টি এবং ব্রক এরপর ক্যান্টো প্রদেশের বিভিন্ন শহর ঘুরে বেড়ায়। অ্যাশ আরও ৬টা জিম ব্যাজও জেতে। আসলে পোকেমনের প্রত্যেকটি এপিসোডই একেকটি অ্যাডভেঞ্চার। তবে পোকেমনের সমস্ত চরিত্রের নিজস্ব স্বপ্ন এবং উদ্দেশ্য আছে। যেমন জিম লিডার হওয়া সত্ত্বেও ব্রক একজন পোকেমন ব্রিডার হতে চায়। অর্থাৎ ব্রক পোকেমনদের লালন-পালন করে তাদের বড় করে তুলতে চায়। ব্রকের আরও দু’টি ভালো গুণ আছে। সে একজন ভালো পোকেমন ডাক্তার এবং রাঁধুনি। মানুষ হোক বা পোকেমন, তাদের খাবার তৈরি অথবা শ্রুশ্রূষা করতে ব্রকের জুড়ি মেলা ভার। অ্যাশ, মিস্টি এবং অন্যান্য পোকেমনের সব রান্না এবং দেখভাল ব্রকই করে থাকে। তবে ব্রকের চরিত্রের আরেকটি মজাদার দিক আছে। ব্রক যেকোনও সুন্দরী মহিলার সঙ্গে মুহূর্তেই প্রেমে পড়ে যায়। প্রায় সব শহরের নার্স জয় এবং অফিসার জেনিদের প্রেমে ব্রক পাগল। একই রকম দেখতে হওয়ার কারণে অ্যাশ অথবা মিস্টি নার্স জয়, অফিসার জেনিদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। কিন্তু ব্রক মুহূর্তের মধ্যে তাদের তফাত বলে দিতে পারে। ব্রক এছাড়াও একজন দক্ষ রক পোকেমন ট্রেনার। ক্যান্টো ছাড়াও অন্যান্য প্রদেশে রক পোকেমন জিম হিসেবে পিউটার শহরের জিমের যথেষ্ট সুনাম আছে। রক পোকেমন ট্রেনার বলে ব্রকের কাছে রক পোকেমনের আধিক্য বেশি। তার সবথেকে প্রিয় পোকেমন হল অনিক্স, জিওডুড, সুডোউডো (রক) এবং ক্রোগাঙ্ক (পয়সন)।

আরও পড়ুন: ধ্বংসের দোরগোড়ায় সুন্দরবন: ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও আজকের বিতর্ক

নির্ভরতার প্রতীক— ব্রক

অন্যদিকে, মিস্টি একজন ওয়াটার পোকেমন মাস্টার হতে চায়। মিস্টির তিন দিদিকে বলা হয় সেরুলিয়ান শহরের সেনসেশন্যাল সিস্টার্স। ডেইসি, ভায়োলেট এবং লিলি পোকেমন পারফরমার্স অর্থাৎ তারা পোকেমনদের সাহায্যে বিভিন্ন খেলা দেখিয়ে থাকে। সেরুলিয়ান শহরের জিম একদিকে জিম, অন্যদিকে তাদের অনুষ্ঠানের মঞ্চ। আবার এই চার বোনই সেরুলিয়ান শহরের জিম লিডার। এবং ওয়াটার পোকেমন জিম হিসেবে সেরুলিয়ান শহরের জিমেরও যথেষ্ট সুনাম। অ্যাশের মতোই পিকাচু মিস্টি এবং ব্রকের সব কথা শোনে। পারতপক্ষে পিকাচু কখনোই মিস্টি অথবা ব্রকের পোকেমনদের বিরুদ্ধে ব্যাটেল করে না। কিন্তু বেশ কয়েকবার পিকাচু মিস্টি এবং ব্রকের হয়ে পোকেমন ব্যাটেলে অংশ নিয়েছে। মিস্টি একদিকে সুন্দরী, নরম স্বভাবের, অন্যদিকে রেগে গেলে মিস্টিকে আটকানো মুশকিল। অ্যাশ অথবা ব্রক কেউই মিস্টিকে চটাতে সাহস পায় না। অন্যদিকে, দু’জনেই মিস্টির ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল। ওয়াটার পোকেমন ট্রেনার বলেই মিস্টির কাছে ওয়াটার পোকেমন বেশি। তার সবথেকে প্রিয় পোকেমন হল স্টারইউ, স্টার্মি, সাইডাক এবং হর্সি (ওয়াটার)।

আরও পড়ুন: কবি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সিনেমা কেবলমাত্র চলচ্চিত্রের গুণেই ভাস্বর

বন্ধুত্বের প্রতীক— মিস্টি

পিকাচুর মতোই অ্যাশের আরও অনেক পোকেমন আছে। তবে এদের মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় হল বালবাসর (গ্রাস), স্ক্যোয়ার্টেল (ওয়াটার) এবং চারিজার্ড (ফায়ার)। অদ্ভুত বিষয় হল অ্যাশ এই চারজনের কাউকেই নিজে থেকে ধরেনি। পিকাচুকে সে পেয়েছিল প্রফেসর ওকের কাছ থেকে। বালবাসর একটি জঙ্গলে অসুস্থ পোকেমনদের রক্ষা করার জন্য মেলানি বলে একটি মেয়েকে সাহায্য করত (এপিসোড বালবাসর অ্যান্ড দ্য হিডেন ভিলেজ)। অ্যাশ, মিস্টি, ব্রক এবং পিকাচু যখন সেখানে পৌঁছয়, বালবাসর তাদের আক্রমণ করে। অবশ্য পরে সে বুঝতে পারে যে, অ্যাশরাও পোকেমনদের ভালোবাসে এবং তাদের কোনও ক্ষতি করবে না। মেনানিও বুঝতে পারে যে, বালবাসর অ্যাশকে পছন্দ করে এবং সেও পিকাচুর মতোই স্বাধীন হতে চায়। মেলানিই অ্যাশকে পরামর্শ দেয় বালবাসরকে নিজের পোকেমনের মতো ট্রেন করার জন্য। এইভাবেই অ্যাশ বালবাসরকে পায়। পরবর্তীতে বালবাসরকে অ্যাশ প্রফেসর ওককে দিয়ে দেয়। বালবাসর প্রফেসর ওকের বিশাল পোকেমন সংগ্রহশালার রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং সে প্রফেসর ওকের ল্যাবরেটরির পোকেমন ব্রান্ড অ্যাম্বাসেডর।

আরও পড়ুন: দেবজ্যোতি কর্মকারের ‘জন্মান্তর পেরিয়ে অলৌকিক জন্ম’

বালবাসর

অ্যাশের স্ক্যোয়ার্টেলকে পাওয়ার পেছনেও ঠিক এরকমই গল্প আছে। স্ক্যোয়ার্টেল আগে স্ক্যোয়ার্টেল স্কোয়াড বলে একদল স্ক্যোয়ার্টেলের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত আর দুষ্টুমি করত (এপিসোড— হিয়ার কামস দ্য স্ক্যোয়ার্টেল স্কোয়াড)। জেসি, জেমস আর মিয়াওথ তাদের দিয়ে খারাপ কাজ করাচ্ছিল। অ্যাশকে স্ক্যোয়ার্টেলও পছন্দ করত না। কিন্তু অ্যাশ স্ক্যোয়ার্টেলকে টিম রকেটের আক্রমণ থেকে বাঁচায়। এছাড়াও যখন অফিসার জেনি স্ক্যোয়ার্টেল স্কোয়াডকে তাদের বদমায়েশির জন্য গ্রেপ্তার করতে যায়, তখনও অ্যাশই তাদের বাঁচায়। স্ক্যোয়ার্টেল নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং স্ক্যোয়ার্টেল স্কোয়াডের বাকিদের সঙ্গে শহরকে একটি বড় আগুনের হাত থেকে রক্ষা করে। একদিকে অফিসার জেনি স্ক্যোয়ার্টেল স্কোয়াডকে শহরের দমকল বাহিনীর মর্যাদা দেয়, অন্যদিকে স্ক্যোয়ার্টেল অ্যাশের সঙ্গে থাকার ইচ্ছে প্রকাশ করে। এভাবেই স্ক্যোয়ার্টেল অ্যাশের টিম জয়েন করে। পরে অবশ্য অ্যাশ স্ক্যোয়ার্টেলকে ছেড়ে দেয় যাতে সে আবার স্ক্যোয়ার্টেল স্কোয়াডের সঙ্গে কাজ করতে পারে।

আরও পড়ুন: ছাঁকনি

স্ক্যোয়ার্টেল

একজন ট্রেনার তার চারম্যান্ডারকে (ফায়ার) নিয়ে খুশি ছিল না। সে মারা যেতে পারে জেনেও সে তার চারম্যান্ডারকে বৃষ্টির মধ্যে ফেলে চলে যায় (এপিসোড— চারম্যান্ডার দ্য স্ট্রে পোকেমন)। অ্যাশ তাকে খুঁজে পায় এবং বাঁচায়। প্রথমে সে অ্যাশের সঙ্গে যেতে রাজি হয় না। সে তার নিজের ট্রেনারের জন্য অপেক্ষা করে। কিন্তু একটা সময় সে বুঝতে পারে যে, অ্যাশ সত্যিই তার ভালো চায়। শেষমেশ চারম্যান্ডারও অ্যাশের সঙ্গ নেয়। পরে অবশ্য সে বিকশিত হয় চার্মিলিয়ানে। এবং শেষমেশ সে বিকশিত হয় চারিজার্ডে। চারিজার্ডই অ্যাশের প্রথম পূর্ণ বিকশিত পোকেমন। প্রথমে চারিজার্ড অ্যাশের কোনও কথা শুনত না। এমনকী ক্যান্টো পোকেমন লিগে অ্যাশ হেরে যায় কারণ চারিজার্ড তার কথা অনুযায়ী ব্যাটেল করতে রাজি হয় না। কিন্তু ওরেঞ্জ আইল্যান্ডে চারিজার্ড অ্যাশের মন বুঝতে পারে। তাকে নিজের বন্ধু হিসেবে মেনে নেয়। অ্যাশ যোহটো প্রদেশ ভ্রমণের সময় আরও বেশি ট্রেনিংয়ের জন্য চারিজার্ডকে চারিসিফিক ভ্যালিতে পাঠিয়ে দেয়।

আরও পড়ুন: অমৃতের সন্ধান ও অমৃতলাল পাড়ুই

চারম্যান্ডার

অ্যাশের প্রথম দিন থেকে ছায়াসঙ্গী হল পিকাচু। বালবাসর, স্ক্যোয়ার্টেল এবং চারিজার্ডকে অ্যাশ ছেড়ে দিলেও তারা তার অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। যখনই অ্যাশ বিপদে পড়ে, সে তার তিন প্রিয় পোকেমনকে ডেকে পাঠায়। অ্যাশ বহু পোকেমন ধরেছে, আবার বিভিন্ন কারণে তাদের ছেড়েও দিয়েছে। তার প্রথম ধরা পোকেমন ছিল ক্যাটারপি, যে পরে মেটাপড এবং বাটারফ্রিতে বিকশিত হয়। এবং বাটারফ্রিকে অ্যাশ পরে ছেড়ে দেয়। এমনকি অ্যাশ একবার পিকাচুকেও ছেড়ে দেবে ভেবেছিল (এপিসোড— গুড বাই পিকাচু)। কিন্তু পিকাচু অ্যাশের কাছে ফিরে আসে। একঝলক দেখে নেওয়া যাক যে অ্যাশের সংগ্রহে কী কী পোকেমন আছে অথবা ছিল—

আরও পড়ুন: শূর্পণখা: রাক্ষসী নয়, নারী

গ্রাস— বালবাসর, সেপটাইল, টরটেরা, স্নাইভি, বেইলিফ

ফায়ার— চারিজার্ড, স্যিন্ডাকুইল, টরকোল, ইনফারনেপ, পিগনাইট

ওয়াটার— কিংলার, টোটোডাইল, করফিশ, বুইসেল, অশাওয়াট, স্ক্যোয়ার্টেল, গ্রেনিনজা

পয়সন— মাক

ফ্লাইং— নকটাওয়েল, সোয়েলো, স্টার‍্যাপ্টর, গ্লাইস্কর, আনফেস্যান্ট, ট্যালনফ্লেম, পিজিওট

গ্রাউন্ড— ডনফ্যান, প্যালপিটোড, ক্রকোডাইল

নর্মাল— টরোস, স্নোরল্যাক্স, এপম

আইস— গ্লেইলি, ল্যাপ্রাস

ফাইটিং— স্ক্র্যাগি, হ্যালুচা, প্রাইমএপ

বাগ— ল্যেভানি, বাটারফ্রি, হেয়ারক্রস

রক— বোলডোর

ড্রাগন— গিবল, নয়ভার্ন, গুডরা

এছাড়া অ্যাশের বিশ্বস্ত পিকাচু সবসময়ে তার সঙ্গেই থাকে। এরকম অনেক পোকেমন আছে, যাদের সঙ্গে অ্যাশ খুব অল্পই সময় কাটিয়েছে অথবা তাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *