সুন্দরবনে কংক্রিট নদীবাঁধ নাকি প্রাকৃতিক বাঁধ, জোর চর্চা

সমীরণ মণ্ডল (লাহিড়ীপুর, সাহেবঘাট, গোসাবা)

‘আসছে বছর আবার হবে’র মতো বছর বছর সাইক্লোন এবং জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের ট্রাঞ্জিশন জোন ডুবে যাচ্ছে বাঁধভাঙা নোনা জলে। উপনিবেশিক শাসনামলে সুন্দরবনের ১০২টি দ্বীপের মধ্যে অপরিণত ৫৪টি দ্বীপে জলাজমি উদ্ধার এবং কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য জমিদারি লিজে জঙ্গল সাফাই করে বাঁধ নির্মাণ হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজ শাসন থেকে মুক্ত হয়েছে ভারত এবং জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়ে জমিদারদের আমদানীকৃত শ্রমিকরাই ভূমি সংস্কারের ফলে জমির মালিক হয়ে রয়ে গিয়েছেন এখানে। মৎস্যজীবী এবং কৃষিজীবী মিলিয়ে ভারতীয় সুন্দরবন অঞ্চলের ট্রাঞ্জিশন এলাকায় ১৯টি ব্লকে দু’টো জেলা মিলিয়ে প্রায় ৪৫ লক্ষ মানুষের বসবাস। এক ফসলি জমি নির্ভর এই সমস্ত মানুষ এখন এটা বুঝতে শিখছে, ‘আসছে বছর আবার হবে/ মানুষ আবার ত্রাণ পাবে।’ যেন একটি অঘোষিত কর্মসূচি চলছে। যদিও ইয়াসের পর একটি স্লোগান উঠতে দেখা যাচ্ছে— ‘ত্রাণ চাই না কংক্রিটের নদীবাঁধ চাই।’ এই কংক্রিটের নদীবাঁধ চাই স্লোগান ওঠার পর বিভিন্ন সামাজিক এবং গণমাধ্যমে কংক্রিটের বাঁধ সুন্দরবনের বাস্তুরীতির জন্য কতটা উপযুক্ত, সে বিষয়ে জোর চর্চা শুরু হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন: লকডাউনে বাদাবনের বাঘ

কোর এলাকায় ভাঙন। ম্যানগ্রোভ জঙ্গলও নদীতে চলে যাচ্ছে

পরিবেশ-প্রেমীরা যথারীতি মাঠে নেমে পড়েছেন কংক্রিটের বাঁধের ভয়াবহ পরিণতি এবং কংক্রিটের ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ক্ষতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করতে। তাঁদের দাবি, প্রাকৃতিক এবং ম্যানগ্রোভ বাঁধ সুন্দরবনের জন্য উপযুক্ত হবে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের একটি সুসম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ হলে সুন্দরবনকে রক্ষা করা যাবে। সুন্দরবনের নদীবাঁধ নিয়ে বিশেষ কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি বিগত ঝড়গুলোতে একের পর এক সুন্দরবনের জনজীবন বিধ্বস্ত হওয়ার পরও। বারে বারে কেন বাঁধ ভেঙে জনজীবন ভেসে যাচ্ছে এই প্রশ্ন করেনি প্রগতিশীল সহনাগরিক সমাজ। কিন্তু আজ কংক্রিটের বাঁধের দাবি ওঠার সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক বাঁধের দাবি সুন্দরবনের নদীবাঁধ ভাঙা রুখে একটি সুস্থ স্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করবে, এটা আশা করা যায়। ‘সন্তান না কাঁদলে মা দুধ দেয় না’— তাই সুন্দরবনবাসীর কংক্রিটের বাঁধের দাবি আরও সংগঠিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত। আদালতগুলোতেও মানবাধিকার প্রশ্নে দ্বারস্থ হওয়া যায় কিনা, সে বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করা উচিত। ফলশ্রুতি যাইহোক, আন্দোলন এভাবে এগোতে থাকলে মানুষ একটি বাঁধ পাবে এমনটাই বিশ্বাস। চাষি একটি বাঁধ পাবেন ফসল বুনে নতুন স্বপ্ন ঘরে তুলতে। হোক না সে কংক্রিটের বা প্রাকৃতিক বাঁধ, মানুষের দুশ্চিন্তা এবং দুরবস্থা ঘোচাতেই যেন সেই বাঁধের নির্মাণ হবে।

আরও পড়ুন: করোনা আবহে কী মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব? জনগণের মতামত চাইল সরকার

নদী চর সহ বাঁধে ভাঙন

সুন্দরবনের ৩৫০০ কিমি বছরের পর বছর অযত্নে অবহেলায় ফেলে রাখা মাটির বাঁধ জল আটকাতে যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে। মনে করুন এই অযোগ্য মাটির বাঁধের ২০০ জায়গায় ২০০ মিটার করে ভেঙেছে। সুতরাং ৩৫০০ কিমি বিয়োগ ২০০×২০০ মিটার মাটির পরিচর্যাহীন নদীবাঁধ ভাঙেনি। সুতরাং না ভাঙা জরাজীর্ণ নদীবাঁধগুলোর এই লড়াইয়ে ক্ষত অনতিবিলম্বে সারিয়ে তুলে প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি করার কথা ভাবা হোক। এবং ভেঙে যাওয়া জায়গাগুলোর কারণ বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনে কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণ করে পরিবেশ-প্রেমীদের দাবিমতো ম্যানগ্রোভ বা প্রাকৃতিক বাঁধের গার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে। অবশ্যই সেক্ষেত্রেও বিকল্প কংক্রিটের কথা ভাবতে হবে, যা জলের সঙ্গে বিক্রিয়া ঘটাবে না। কারণ যে জায়গাগুলো বারবার ভাঙছে, সেগুলোর সুরক্ষা আপৎকালীন পরিস্থিতিতে নেওয়া উচিত কারণ ম্যানগ্রোভ বা প্রাকৃতিক বাঁধ নির্মাণের প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। এছাড়া যে বাঁধই হোক, ভাঙনের কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা উচিত। সুন্দরবনে জন্ম থেকে বেড়ে ওঠার কারণে বাঁধ ভাঙার কিছু কারণ আমারও কিঞ্চিৎ জানা। আর সেই জানাটা বিশেষ কোনো স্পেশালিস্ট ডিগ্রি ছাড়াই। যেহেতু সুন্দরবনেই বসবাস আর বাঁধ নির্মাণ করতে ভাঙনের কারণ খুঁজে বের করাটা জরুরি, তাই মনে হয় নিজের জানা কিছু কারণ বিশ্লেষণ করাটাও প্রয়োজনীয়।

আরও পড়ুন: জীবনের গাছপালা, জীবনের ডালপালা

ব্লক পিচিং সহ নদীবাঁধ ইনকমপ্লিট

বাঁধ কী কী কারণে ভাঙতে পারে

দেখা যাবে, বাঁধ ভাঙছে রিভার সাইটে পর্যাপ্ত ম্যানগ্রোভ সহ কয়েকশো মিটার ভাঙনহীন চর থাকার পরেও। কারণ, নদীর স্রোতে রিভার সাইটের বাঁধের গোড়া খেয়ে চলে যাওয়া। বর্ষায় নদীবাঁধের উপর দিয়ে স্থানীয় লোকজন সহ গবাদি পশুর চলাচলের ফলে বাঁধের মাথা ভেঙে যায়। এরপর তা নিচু হয়ে যাওয়ায় জল উপচে ঢোকে। তাছাড়াও কান্ট্রিসাইটে বাঁধের গোড়ায় অবৈধ এবং বৈধ চিংড়ি ঘেরি, ফিশারি বা পুকুর-খাল থাকায় বাঁধের গোড়া দুর্বল থাকে। ফলত উপচে জল ঢোকার সময় চাপে পড়ে বাঁধ ভেঙে যায়। এছাড়া নদীবাঁধে কাঁকড়ার খাদ বা স্থানীয় ভাষায় ‘ঘোঘ’ থাকাও একটা কারণ। হঠাৎ জল উপচে ঢোকার সময় বাঁধের ফাটল বা ঘোঘে জল ঢুকে বাঁধ ভেঙে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে দুইপাশে ব্লক পিচিং করে বাঁধের মাথায় ইট দিয়ে ঢেকে দেওয়ার কথা ভাবা যেতেই পারে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাবে চর ম্যানগ্রোভ সহ ধসে গিয়ে বাঁধ ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। নদীর খাদ বা স্রোত পরিবর্তনের ফলে ম্যানগ্রোভ জঙ্গল সহ দ্বীপভূমির কিছু অংশ এভাবে নদীতে চলে যেতে পারে।

আরও পড়ুন: চুঁচুড়ার চোখ আটকেছে কবিতার দেওয়ালে

বাঁধের দুই দিকে পর্যাপ্ত চর বা জায়গা না থাকা এবং রিভার সাইটে চর না থাকার ফলে ম্যানগ্রোভ জন্মাতে পারে না

কোর এলাকা বা বাফার এলাকায় সুন্দরবনের যে অঞ্চলে মানুষ ঢুকতে পারে না বা সীমায়িত ঢোকার অনুমতি, সে অঞ্চলে প্রচুর এ ধরনের ভাঙনের ফলে ম্যানগ্রোভ জঙ্গল নদীতে চলে যাচ্ছে। ঠিক একই ধরনের ভাঙন লোকালয়ের কোথাও কোথাও দেখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে নদী বিশেষজ্ঞের পরামর্শমতো নদীর নতুন গতিপথকে বাধামুক্ত করে দিয়ে বাঁধ বা রিংবাঁধ (বেড়িবাঁধ দেওয়া উচিত হবে) এছাড়াও দ্বীপগুলো নদী বা সাগরের থেকে দূরত্ব এবং সাগর বা নদীর সেই দীপগুলোর উপরে প্রভাব এবং দ্বীপগুলোর গঠন ও মাটির উপরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাঁধ সংক্রান্ত একটি স্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী সমাধানসূত্র খুঁজে বের করা উচিত। সুন্দরবনের মানুষের কংক্রিটের বাঁধের দাবিটি আসলে একটি মনস্তাত্ত্বিক শক্তিশালী বাঁধের দাবি আর এই দাবির জন্ম দিয়েছে সুন্দরবনের নদীবাঁধ সংক্রান্ত প্রশাসনিক উদাসীনতা।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৪র্থ অংশ)

পর্যাপ্ত চর এবং ম্যানগ্রোভ থাকা সত্বেও রিভার সাইটে বাঁধে ভাঙন

একটি সময় ইরিগেশন দপ্তর থেকে বেলদার বলে একটি পদের সৃষ্টি করে মাটির এই বাঁধগুলোর উপরে সজাগ দৃষ্টি রাখা হত। আজ এই পদের বিলুপ্তি ঘটেছে অথচ কোনো কংক্রিট চিন্তাভাবনা করা হয়নি, যেখানে পাহারা ছাড়াই নদীবাঁধ সুরক্ষিত থাকতে পারে। বছর বছর নোনা জল ঢোকা এবং ফসল নষ্ট হওয়া এবং তার পরেও কয়েকবছর ফসল না হওয়া মানুষকে জঙ্গল-নির্ভরতা বাড়াবে বৈ কমাবে না। সুতরাং শক্তিশালী বাঁধ তৈরি সুন্দরবনের বাফারে মাছ-কাঁকড়া ধরা মৎস্যজীবীর সংখ্যা যেমন কম করবে, ঠিক তেমনি চুরি করে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এলাকা বা কোরে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে গিয়ে সুন্দরবন ন্যাশনাল পার্কটি মানুষ মুক্ত থাকার ফলে বাস্তুরীতি সংরক্ষিত থাকবে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *