অস্ট্রেলিয়ার সমসাময়িক সাহিত্যপত্র

সুশোভন রায়চৌধুরী

অস্ট্রেলিয়ার সাহিত্য পত্রিকার প্রচ্ছদে লিটল ম্যাগাজিনের স্বভাববিরুদ্ধ ‘আনপুটডাউনেবল’-এর মতো শব্দ পাওয়া না গেলেও অস্ট্রেলিয়ার অতিরূঢ় সাহিত্য সমালোচকও স্বীকার করতে বাধ্য হবেন, প্রোডাকশন কোয়ালিটি হোক, প্রচ্ছদ হোক অথবা কনটেন্ট, অস্ট্রেলীয় সাহিত্য পত্রিকা বর্তমানে দেশের সামগ্রিক চিত্রটাকেই তুলে ধরছে। আগামীতে সমসাময়িক সাহিত্যপত্রের সম্ভাবনা ক্ষীণ বলাটা কিছুটা বইমেলার জমজমাট ভিড়ে দাঁড়িয়ে মানুষ এখন আর বই পড়ে না বলবার মতো বিষয়।

আরও পড়ুন: তামিল পত্রিকা ‘বিবেকচিন্তামণি’

এই শতকের প্রথম দশকেই দেখা যাচ্ছে প্রকাশিত হচ্ছে একঝাঁক নতুন সাহিত্য পত্রিকা। যেমন— ‘কিল ইওর ডার্লিংস’, ‘আর্চার’, ‘কন্ট্রাপাসো’, ‘হায়ার আর্ক’, ‘কাটিংস’, ‘টিংকচার’, ‘দ্য ক্যানারি প্রেস’, ‘স্টিল্টস’, ‘দ্য রিভিউ অফ অস্ট্রেলিয়ান ফিকশন’, ‘অ্যাম্পারস্যান্ড’ ও ‘সিজার’ যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তবে অস্ট্রেলীয় সাহিত্য পত্রিকার ঘরানায় নবাগত পত্রিকার সঙ্গে রয়েছে প্রসিদ্ধ ও বহু চর্চিত সাহিত্য পত্রিকাগুলিও, যারা সেই পঞ্চাশের দশক থেকেই অস্ট্রেলিয়াতে সুনামের সঙ্গে প্রকাশ করে চলেছেন তাঁদের কাগজ। এই প্রসিদ্ধ পত্র-পত্রিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম— ‘ওভারল্যান্ড’, ‘আইল্যান্ড’, ‘সাউদারলি’, ‘ওয়েস্টারলি’, ‘দ্য লিফটেড ব্রো’, ‘গ্রিফিথ রিভিউ’, ‘স্লিপার্স আলমানাক’, ‘গোয়িং ডাউন সুইংগিং’, ‘মিনজিন’ ইত্যাদি পত্রিকা।

আরও পড়ুন: ভোজপুরি বিতর্ক: হিন্দি জাতীয়তাবাদ এবং আরও কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা

এই সমস্ত পত্রিকার কোয়ালিটি বা কনটেন্ট নিয়ে বহু আলোচনা হলেও পত্রিকাগুলির উদ্দেশ্য, তাদের স্বপ্ন ও স্বার্থকতা সম্পর্কে সেরকম আলোচনা পাওয়া যায় না। এখন অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ঠিক কী, তাঁরা কী স্বপ্ন দেখলেন আর সেই স্বপ্ন কতটাই বা পূরণ হল তা নিয়ে এত তাড়াতাড়ি আলোচনা করাটা কি ঠিক হবে? যার উত্তরে এটুকুই বলবার, একটা নির্দিষ্ট সময়কে ধরে নিয়ে যদি সেই আলোচনা হয়ও, ক্ষতি কি? যেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অস্ট্রেলীয় সমালোচকেরা, সমালোচনার ক্ষেত্রে এই তরুণদের সম্পাদিত পত্রিকাগুলিকে রীতিমতো মেইন স্ট্রিম বা বাণিজ্যিক পত্রিকার কনটেন্টের সঙ্গে তুলনা করে বসছেন? মেইন স্ট্রিম অস্ট্রেলীয় পত্রিকার থেকে এই সাহিত্যপত্রগুলির কনটেন্ট একেবারেই আলাদা। এই পত্রিকার লেখকেরা কেউ দৈনিক অথবা বাণিজ্যিক পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত নন। তাঁদের লেখার ধরন ও গড়ন কিছু ক্ষেত্রে ইডিওসিনক্রেটিক, পিকিউলিয়ার অথবা সম্পাদকের ব্যক্তিগত বোধের পরিচায়ক বলে মনে হতে পারে। এককথায় লেখাগুলি এক্সপেরিমেন্টাল। পত্রিকার আঙ্গিক ও বিষয়বস্তুতে তাঁরা যে নিত্যনতুন বৈচিত্র্য এনে চলেছেন, সেটা অস্বীকার করবার কোনও উপায় নেই।

আরও পড়ুন: ‘লেখকেরা বড় অভিমানী, তাঁদের আত্মমর্যাদাবোধ একটু বেশি প্রখর’: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

এই সমস্ত সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদকেরা বেশিরভাগই অনূর্ধ্ব ৩০ বছর বয়সি, উচ্চশিক্ষিত ও অস্ট্রেলিয়ার কোনও না কোনও বড় শহরের বাসিন্দা। পত্রিকা সম্পাদনা তাঁদের পেশা নয়। এই তরুণেরা পত্রিকা চালাতে অনেক সময়ে একাধিক পেশার সঙ্গে যুক্ত হন। কিন্তু পত্রিকা সম্পাদনা এমনই এক দুরূহ কাজ যে, প্রতিনিয়ত লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ, লেখার জন্য তাগাদা, প্রকাশিতব্য বিষয় নিয়ে সম্পাদক লেখক বৈঠক সব কিছুই চালিয়ে যেতে হয় সমান তালে। যে কারণে অস্ট্রেলিয়াতে পত্রিকা বাড়বার সঙ্গে তাল মিলিয়েই শহরগুলিতে বাড়ছে সাহিত্য সভার আয়োজনও। এর মধ্যে কিছু পত্রিকা ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে আয়োজন করছে সাহিত্য উৎসব ও বক্তৃতার মতো ইন্টার অ্যাক্টিভ অনুষ্ঠান। আবার কিছু ক্ষেত্রে পত্রিকার লেখক-পাঠক-শুভানুধ্যায়ীদের মিলিত হতে দেখা যাচ্ছে সংখ্যা প্রকাশ অনুষ্ঠানে।

আরও পড়ুন: অক্সিজেন সংবেদন

আমাদের ভারতীয় বা বাংলা সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ অনুষ্ঠানের সঙ্গে অস্ট্রেলীয় সংস্কৃতির সামান্য পার্থক্য আছে। পশ্চিমবঙ্গে যেমন প্রকাশ অনুষ্ঠানে পত্রিকা প্রকাশের পাশাপাশি থাকে গান বাজনা, কবিতা-গল্প পাঠের আসর, অস্ট্রেলিয়াতেও ঠিক তাই। তবে ওই গানবাজনার ক্ষেত্রে তাঁরা আমন্ত্রণ জানান, কোনও খ্যাতনামা শিল্পী বা গানের ব্যান্ডকে। উদ্দেশ্য একটাই, বেশি জনসমাগম, যার অর্থ আরও বেশি করে সংগীত ও সাহিত্য জগতের মধ্যে হবে মতের বিনিময়।

ধরা যাক, সাহিত্যপত্রিকা ‘লিফটেড ব্রো’-এর কথা। এই পত্রিকাটি অস্ট্রেলিয়ার একাধিক শহরে তাদের পত্রিকা প্রকাশের অনুষ্ঠান করে থাকে। তাদের আগ্রহের বিষয় সমাজতত্ত্ব, যা নিয়ে মাঝেমধ্যেই প্রকাশিত হয় বিশেষ সংখ্যা। ‘লিফটেড ব্রো’-এর এক একটি সংখ্যায় প্রায় ৪০ থেকে ৬০ জন লেখকের উপস্থিতি থাকে, যা আমাদের উল্লিখিত পত্র- পত্রিকাগুলির মধ্যে সবচাইতে বেশি। বাকি পত্রিকার এক একটি সংখ্যায় যেখানে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন লেখকের আনাগোনা। এত বড় একটা লেখকগোষ্ঠী নিয়ে, সঙ্গে অলংকরণ শিল্পী, কার্টুনিস্ট, ডিজাইনার ও চার সম্পাদকের প্রধান স্যাম কুনি রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন অস্ট্রেলিয়ার সাহিত্য পরিসরে। পত্রিকার প্রকাশ বিন্যাসে রয়েছে ব্রডশিট-স্টাইল ফরম্যাট। ফলে ছাপাতেও খুব বেশি খরচ পড়ে না, ইচ্ছেমতো সময়ে একই মুদ্রিত মূল্য রেখে ইচ্ছেমতো পাতার সংখ্যা বাড়ানো যায়। লেখনীতে কথ্য ভাষার প্রয়োগ ও অলংকরণে কার্টুন পত্রিকাটিকে করে তুলেছে পাঠক-প্রিয়। প্রকাশিত হচ্ছে রম্য রচনা, বই আলোচনা ও ছোট গল্প। ‘লিফটেড ব্রো’ বর্তমানে ত্রৈমাসিক।

আরও পড়ুন: দিনরাত্রির কাব্য

অস্ট্রেলিয়াতে এখন যে সমস্ত তরুণ সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনার পথে এগিয়ে আসছে, তাঁদের মধ্যে অনেকেই ব্যবহার করছেন অস্ট্রেলিয়ার একটা জনপ্রিয় ক্রাউড ফান্ডিং ওয়েবসাইট, নাম— Pozible. ২০১০ থেকে ২০১৪-এর মধ্যে এই পজিবল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পত্রিকার জন্যে অর্থ সাহায্য গ্রহণ করেছে ‘আর্চার’, ‘অ্যাম্পারস্যান্ড’, ‘হায়ার আর্ক’, ‘সিজার’ ও ‘লিফটেড ব্রো’-এর মতো সার্থক সাহিত্য পত্রিকাগুলি। সবগুলো পত্রিকাকে একত্রিত করলে অস্ট্রেলীয় জনসাধারণ সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য দিয়েছেন প্রায় ৭০ হাজার ইউএস ডলার। এর থেকেই প্রমাণিত, অস্ট্রেলীয় সাহিত্য প্রেমী ও পাঠকেরা তাঁদের পত্রিকাকে টিকিয়ে রাখবার ক্ষেত্রে কোনও রকম কার্পণ্য করেন না। তাই প্রয়োজন বাড়তি রসদের। যদিও একই পত্রিকার পর পর দু’টো সংখ্যা ক্রাউড ফান্ডিংয়ে প্রকাশিত হচ্ছে, এরকম দৃষ্টান্ত কখনোই দেখা যায়নি।

আরও পড়ুন: সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৮)

ম্যাথিউ অ্যাসপ্রে ও থিওডর এল সম্পাদিত ‘কনট্রাপসো’র আত্মপ্রকাশ সংখ্যা সম্পূর্ণভাবেই দুই সম্পাদকের ব্যক্তিগত অর্থে প্রকাশিত। আমাদের জেনে রাখা ভালো, অস্ট্রেলিয়ায় প্রিন্টিংয়ের খরচ কিন্তু খুব একটা কম নয়। ‘কনট্রাপসো’র আত্মপ্রকাশ সংখ্যা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছিল কারণ তাঁরা ব্যবহার করেছিলেন শর্ট রান ডিজিটাল প্রিন্টিং। পত্রিকা প্রকাশ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়, সিডনির গ্লেবে অঞ্চলের ‘স্যাফো বুকশপ’ নামের এক বইয়ের দোকানে। এই পত্রিকা আন্তর্জাতিক কবি ও কবিতা নিয়ে কাজ করতে বিশেষ আগ্রহী, ফলে অনুবাদ সাহিত্যের কথা মাথায় রেখে আন্তর্জাতিক স্তরে পত্রিকা বিক্রির জন্যে প্রিন্ট অন ডিমান্ড পদ্ধতির শরণাপন্ন হতে হয়।

আরও পড়ুন: পঞ্চাশটি ঝুরোগল্পের ডালি ‘তরুণিমার কোনও অসুখ নেই’

অনুবাদের কথা যখন উঠলোই তখন বলতে হয় নবাগত ‘হায়ার আর্ক’-এর কথা। এটি এমন একটি পত্রিকা, যার লেখক থেকে শুরু করে অলংকরণ-প্রচ্ছদ শিল্পী, ডিজাইনার, পাঠক সবাই একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাসিন্দা। যদিও পত্রিকার বিষয়বস্তু আন্তর্জাতিক সাহিত্যের অনুবাদ। ‘হায়ার আর্ক’-এর প্রতিটি সংখ্যাতেই উঠে আসেন একজন বিদেশি লেখক ও তাঁর লেখার ইংরেজি অনুবাদ। ছাপা ও প্রকাশ দু’টোই মেলবোর্ন থেকে। প্রচ্ছদেও রয়েছে এক বিশেষত্ব। তাঁদের প্রচ্ছদে ছাপা হয় পুরনো কোনও অস্ট্রেলীয় সাময়িকীর প্রচ্ছদের রিপ্রিন্ট। ‘হায়ার আর্ক’-এর অলংকরণেও পাওয়া যাবে অভিনবত্বের ছোঁয়া যার কৃতিত্ব পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলী মাইক চিউ, উইলিয়াম হেওয়ার্ড  ও মাইকেল হেওয়ার্ডের প্রাপ্য যিনি প্রায় ৪০ বছর আগে ‘স্ক্রিপসি’ নামের এক সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করতেন।

আরও পড়ুন: জনপ্রিয়তা কি সীমাবদ্ধতাও

অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান সাহিত্যের পরিসরে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী, স্বপ্নবাজ, সংস্কৃতিমনস্ক এই তরুণ সম্পাদকদের আগমন সৃষ্টি করেছে এক নতুন সময়ের। যে সময় শুধুমাত্র অস্ট্রেলীয় সাহিত্যপত্রে তরুণদের সুযোগ করে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে চলেছে ঝড়ের গতিতে। এই তরুণেরা যেমন আগ্রহী শিল্পে ও সাহিত্যে, ঠিক ততটাই তাঁদের আগ্রহ প্রিন্ট কালচার নিয়েও। তাঁরা শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করছেন না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে তাঁদের উদ্ভাবনী দিয়ে নতুন কিছু সংযোজন করে চলেছেন। এই কথাগুলো রেবেকা স্টারফোর্ড ও হানা কেন্ট সম্পাদিত ‘কিল ইওর ডার্লিংস’ পত্রিকার ক্ষেত্রেও খাটে।

‘কিল ইওর ডার্লিংস’-এর সঙ্গে বর্তমানে রেবেকা স্টারফোর্ড বা হানা কেন্ট আর যুক্ত নেই। পত্রিকার সম্পাদনার ভার এসে পড়েছে ব্রিজেড মুলেন-এর ওপর। তবু অস্ট্রেলিয়ার আঞ্চলিক পত্রপত্রিকার সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান কোনওভাবেই ভুলবার নয়। মুদ্রিত পত্রিকার পাশাপাশি ‘কিল ইওর ডার্লিংস’ ওয়েবজিন আকারেও পাঠকের কাছে পৌঁছতে দায়বদ্ধ। মাঝেমধ্যেই লেখকদের কর্মশালা, সম্পাদকদের ইন্টার্নশিপ কিংবা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের প্রোগ্রামের সফল আয়োজকের ভূমিকায় দেখা যায় এই পত্রিকাকে।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদের বন্যা ও নদী ভাঙন: ফরাক্কা ব্যারেজের প্রভাব

শুধু নতুন পত্রিকাগুলো বলেই নয়, অস্ট্রেলিয়ার প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ সাহিত্য পত্রিকাগুলোও পাঠক ও সমাজের কাছে নানান রকমের অনুষ্ঠান ও কর্মশালার মাধ্যমে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতাকে ধরে রাখতে উদ্যোগী আর একইসঙ্গে সাহায্য করে পত্রিকার বিক্রিবাটাতেও। অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম পুরনো সাহিত্য পত্রিকা ‘মিনজিন’। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক জোরা স্যান্ডারস যখন প্রথম সম্পাদনার দায়িত্বে নিযুক্ত হন, তাঁর বয়স মাত্র পঁচিশ। তবে তাঁর সম্পাদনাতেই এখনও বহাল তবিয়তে চলছে এই পত্রিকা; যার কাজ, প্রকাশ বিন্যাস, প্রকাশিত লেখা নিয়ে মাঝেমধ্যেই টুইটার বা ফেসবুকের মতো সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্মে আলোচনার ঝড় তোলেন নেটিজেনরা। ‘ওভারল্যান্ড’, ‘সাউদারলি’ বা ‘গ্রিফিথ রিভিউ’-এর মতো কাগজগুলিতেও হয়েছে প্রকাশ বিন্যাসের আমূল পরিবর্তন। ‘গ্রিফিথ রিভিউ’ উপন্যাসের জন্য ঘোষণা করেছে বার্ষিক পুরস্কার, যেখানে  ডিজিটাল মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘ওভারল্যান্ড’ও।

এখনও পর্যন্ত উল্লিখিত পত্রিকাগুলির মুদ্রিত মাধ্যম নিয়ে আলোচনা করলেও প্রতিটি পত্রিকাই ডিজিটাল মাধ্যমে তাঁদের ওয়েবসাইট নিয়ে উপস্থিত। অস্ট্রেলিয়ানরা পত্রিকা পড়া, পত্রিকা কেনা ও সমাজমাধ্যমে পত্রিকা বিষয়ক আলোচনাতে যথেষ্ট সক্রিয়। কিন্তু পত্রিকার ডিজিটাল সংস্করণ যেমন ই-বুক কেনা বা পড়বার ক্ষেত্রে ততটা আগ্রহী নন।

আরও পড়ুন: প্রজনন মায়া লাগে শস্যচরাচরে

অ্যালিস গ্রুন্ডির সম্পাদনায় ‘সিজার’ পত্রিকাটি যবে থেকে প্রকাশিত হল, তারা বেছে নিল আপাদমস্তক এক্সপেরিমেন্টেশনের পথ। পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলী সাহিত্যের ফর্ম, কনটেন্ট ও প্রযুক্তি নিয়ে শুরু করলেন খেলা। পয়সার বিনিময়ে রুচিসম্মত অলংকরণ ও মার্কেটিংয়ের অঙ্গ হিসেবে দৈনিকে সমালোচনা, বিপণন কেন্দ্রের প্রাইম পজিশনে পত্রিকাকে রাখা— সব কিছুতেই সুনজর রয়েছে সম্পাদক অ্যালিসের। আন্তর্জাতিক পাঠকদের সুবিধার্থে খুলেছেন অ্যাপও। কিন্তু অ্যাপ তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে যে পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয় হয়, সেই তুলনায় পাঠকের থেকে সেরকম সাড়া তিনি পেলেন না। ফলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ‘সিজার’-এর অ্যাপ। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাঁরা প্রকাশ করে চলেছেন তাঁদের এক্সপেরিমেন্টাল সাহিত্য।

আরও পড়ুন: ১৯৬২-র ৪ সেপ্টেম্বর: এশিয়ান গেমস ফুটবলে সোনা জয়ের রূপকথা পা দিল হীরক জয়ন্তীতে

এখন যে প্রশ্নটা যেকোনও সাহিত্যপত্রের কাছে হামেশাই করা হয়, তা হল— ঠিক কাদের জন্য তাঁদের পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ? তাঁরা কি শুধুই একটা প্ল্যাটফর্ম, যেখানে প্রসিদ্ধ পত্রপত্রিকার প্রত্যাখ্যাত সাহিত্যিকেরা জায়গা পাবেন? তাঁদের উদ্যোগ কি সরকারের থেকে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধে আদায়ের জন্য? কিন্তু যে কথাটা বলা হয় না তা হল, এই ছোট ছোট পত্রিকাগুলিই তরুণ লেখক ও সম্পাদকদের জায়গা করে দিচ্ছে, সাহায্য করছে পাঠকের সঙ্গে নতুন লিখিয়েদের পরিচয় ঘটাতে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিশিং বিভাগের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ছাত্রছাত্রীরা আকৃষ্ট হচ্ছে এই পত্রিকাগুলির প্রতি যেখানে সম্পাদনা ও পত্রিকা প্রকাশের যাবতীয় বাস্তবিক জ্ঞান তারা অর্জন করছে এই সমস্ত সাহিত্যপত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েই। ‘কিল ইওর ডার্লিংস’, ‘সিজার’ বা ‘অ্যাম্পারস্যান্ড’ পত্রিকা এরকমই কিছু ছাত্রছাত্রীর সম্পাদনা ও নিষ্ঠার ফসল।

আরও পড়ুন: জগদর্শন কা মেলা (পর্ব ২)

‘অ্যাম্পারস্যান্ড’-এর ট্যাগলাইন ‘curiosity journal’, যার আত্মপ্রকাশ এমন একটা সময়ে, যখন তার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক অ্যালিস গেজ,  সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিশিং বিভাগের স্নাতকোত্তর ছাত্রী। ‘অ্যাম্পারস্যান্ডের’ প্রতিটি সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে সমসাময়িক আধুনিক চিত্রকলার পুনর্মুদ্রণ। একটি সংখ্যা প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁরা আয়োজন করেছিলেন এক ফোটোগ্রাফি প্রতিযোগিতার যেখানে বিজয়ীদের তোলা ছবি দিয়ে সেজে উঠেছিল সংখ্যা। কবিতা, কমিক্স, গল্প, প্রবন্ধ সবকিছু থাকলেও এই পত্রিকাটির আকার হয়ে ওঠে অন্যতম আকর্ষণের কারণ। ‘অ্যাম্পারস্যান্ড’ হলো একটি পোস্টকার্ড সাইজের পত্রিকা। প্রথম দিকে অস্ট্রেলিয়া কাউন্সিলের পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থ সাহায্যে প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে ক্রাউড ফান্ডিংয়ের সাহায্যে তাঁরা হয়ে ওঠেন স্বতন্ত্র ও স্বাবলম্বী।

আরও পড়ুন: পুরুলিয়ার তেলকুপিতে জলের নীচে ইতিহাস

আমার মনে হয় এই মুহূর্তে, অস্ট্রেলীয় সাহিত্যপত্রের সম্পাদকেরা যে বিবর্তনশীল সময়ের মধ্য দিয়ে চলছেন, সেখানে তাঁদের কাজটা হয়ে উঠছে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং, ফলে উপভোগ্যও। আগামীর চিন্তা না করে অস্ট্রেলীয় পত্র-পত্রিকার তরুণ সম্পাদকেরা পত্রিকার ফর্ম ও কনটেন্টের নিরিখে হয়ে উঠছেন অনেক বেশি এক্সপেরিমেন্টাল। তাঁরা পত্রিকা প্রকাশের পদ্ধতিতে আনছেন পরিবর্তন। যেখানে অস্ট্রেলিয়ার মেইন স্ট্রিম বা বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলি আমেরিকা বা ব্রিটেনে অবস্থিত তাদের সদর দপ্তরের প্রতি দায়বদ্ধ, সেখানে এই প্রতিষ্ঠানবিরোধি আঞ্চলিক পত্রিকাগুলি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে পাঠকের কাছে। এরা শুরুও করছে, প্রয়োজনে বন্ধও করছে৷ পিছোচ্ছে আবার এগোচ্ছেও। ‘কিলিং ইওর ডার্লিংস’ বা ‘লিফটেড ব্রো’-এর মতো পত্রিকা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে তারা আগামীর জন্যে সম্পূর্ণ তৈরি।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *