প্রসঙ্গ আল-আকসা: বিশ্বজুড়ে ছি-ছিক্কার আর অভিশাপ কুড়াচ্ছে ইসরাইল

অনিন্দ্য বর্মন

সভ্যতার শুরু থেকেই লড়াই এবং যুদ্ধ ওতপ্রোতভাবে সমাজকে বিদ্ধ করেছে। রাজ্য, লালসা অথবা ধর্মীয় কারণে বহু দেশের মাটি ভিজে উঠেছে, রক্তে রাঙা হয়েছে। লাল রং গাঢ় হয়েছে চোখের জলে। যন্ত্রণা হয়েছে দ্বিগুণ। আর সভ্যতার বহু স্থাপত্য নীরবে বহন করে চলেছে এই রক্তাক্ত ইতিহাস।

এইরকমই একটি স্থাপত্য পুরনো জেরুসালেম শহরের আল-আকসা মসজিদ। এটি ইসলাম ধর্মের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত। টেম্পল মাউন্ট নামক একটি ছোট্ট টিলার ওপর অবস্থিত এই মসজিদকে মুসলমানরা হারাম এশ-শরীফ নামেও অভিহিত করেন। জনশ্রুতি অনুযায়ী, নবী মহম্মদ সা. মক্কা যাওয়ার পথে এখানে রাত্রিবাস করেন। এখানেই তিনি আল্লাহ্‌র আদেশ পান এবং সেই অনুসারে মক্কার কাবার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (১ম অংশ)

প্রাথমিকভাবে এই মসজিদ ছিল একটি প্রার্থনাগৃহ। তৈরি করেন রাশিদুন বংশের খলিফা উমর। আনুমানিক ৭০৫ খ্রিস্টাব্দে এই প্রার্থনাগৃহটি মসজিদে পরিবর্তিত করেন উমায়েদ বংশের খলিফা আবদ আল মালিক। সেই সময় থেকেই আল-আকসা মসজিদ ধ্বংসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। আনুমানিক ৭৪৬ খ্রিস্টাব্দে একটি প্রবল ভূমিকম্পের কারণে মসজিদটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। ৭৫৪ সালে আব্বাসিদ বংশের খলিফা আল মনসুর পুনরায় মসজিদ নির্মাণ করেন। ১০৩৩ সালে আবার ভূমিকম্পে ভেঙে পড়ে মসজিদ। এইবারে ফাতিমিদ বংশের খলিফা আলি আজ জাহির মসজিদ নির্মাণ করেন। এই নির্মাণের কিছু অংশ বর্তমান সময়েও রয়ে গেছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে আয়ুব্বিদ বংশ, মামলুক বংশ, অটোমান বংশের রাজা, সুপ্রিম মুসলিম কাউন্সিল এবং জর্ডন রাজ্যের সহযোগিতায় নানারকমের নির্মাণ এবং পুনর্গঠনের কাজ আল-আকসা মসজিদে হয়েছে।

একদিকে যেমন এই মসজিদ মুসলমানদের জন্য তৃতীয় পবিত্রতম স্থান, অন্যদিকে ইহুদিরা এই স্থানটিকে তাদের সবথেকে পুণ্যতম স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁরা এই স্থানটিকে সেকেন্ড টেম্পল বলে থাকেন। এই কারণেই আল-আকসা মসজিদ বারংবার মুসলিমদের (ইসরাইলি) এবং ইহুদিদের (প্যালেস্তিনীয়) সংঘর্ষের সাক্ষী থেকেছে।

আরও পড়ুন: ‘চোখের বালি’ই বাংলা সাহিত্যে ঘটিয়েছিল যুগান্তকারী ঘটনা

200 worshippers injured after Israeli forces attack Masjid Al Aqsa on  Friday eve

ইউরোপে প্রথম ক্রুসেডের সময় (খ্রিস্ট ধর্মকে হিন্দু এবং ইসলামীয় ধর্মের থেকে রক্ষা করার যুদ্ধ) আনুমানিক ১০৯৯ সালে খ্রিস্টানরা এই মসজিদ দখল করে এটিকে টেমপ্লাম ডমিনি (টেম্পল অফ গড) গির্জায় পরিবর্তিত করেন। ১১৮৭ সালে আয়ুব্বিদ বংশের খলিফা সালাদিন এই স্থান দখল করেন এবং পুনরায় গির্জাটিকে মসজিদে রূপান্তরিত করেন। বর্তমান সময়েও এই মসজিদ রক্তাক্ত ইতিহাসের সাক্ষী থেকেছে। ১৯৫১-তে রাজা প্রথম আবদুল্লাহকে এখানে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৯৬৯-তে ডেনিস মাইকেল রোহন নামক এক ব্যক্তি মসজিদে আগুন লাগিয়ে দেন। ১৯৮০-তে বেন শোসান এবং ইয়েহুদা এতজিয়ন মসজিদটি বিস্ফোরক দিয়ে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেন। ১৯৯০-তে ইসরাইলিদের আক্রমণে ২২ জন প্যালেস্তিনীয় মারা যান। ২০০০ সালে এখানে একটি গণ্ডগোলকে কেন্দ্র করে পুলিশ গুলি চালায়, যার ফলে ২৪ জন মারা যান।

২০২১-এ এসেও এই বিবাদ থেমে থাকেনি। গত শুক্রবার আল-আকসা মসজিদে ইসরাইলি পুলিশের সঙ্গে প্যালেস্তিনীয়দের সংঘর্ষে ১৬০ জন আহত হন। সোমবার মসজিদে পুনরায় হামলা হয়। প্যালেস্তিনীয়দের মতে, এই আক্রমণে শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। দুই গোষ্ঠীর মধ্যে দাঙ্গার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। অতর্কিতেই এই হামলা চালান হয়। বহু মানুষ মসজিদে প্রার্থনা করছিলেন। গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাস এবং রাইফেল দিয়ে তাদের ওপর নির্বিচারে আক্রমণ করা হয়। রমযানের সময় এই অতর্কিত হামলা কেউই আশা করেননি।

আরও পড়ুন: রাশিয়ার স্কুলে বন্দুকবাজের এলোপাথাড়ি গুলি, প্রাণ গেল ১১ পড়ুয়ার

প্রায় ১০০০ ইসরাইল পুলিশ মসজিদে ঢুকে রবারের গুলি এবং টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে হামলা করে। গ্রেনেড ছোড়া হয়, যার ফলে আগুন লেগে যায়। মানুষ ভয়ে পালাতে শুরু করে। এমনকী মসজিদের ভেতরে স্বাস্থ্য দফতর, যেখানে কিছু মানুষ চিকিৎসাধীন ছিলেন, সেখানেও আক্রমণ করা হয়। আনুমানিক ৩০০ জন মানুষ আহত হয়েছেন এই ঘটনায়। তবে রবার বুলেট ব্যবহার করার ফলে কেউ মারা যাওয়ার কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান খুবই ভয়ংকর। মসজিদের একজন আধিকারিক রাদ দে আনা-র বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি তাঁর পরিচয়পত্র দেখানো সত্ত্বেও তাঁকে মাটিতে ফেলে লাথি মারা হয়। তারপর তাঁকে জোর করে মসজিদ থেকে বের করে দেওয়া হয়। এই ঘটনার সময় নূর এমতুর নামক এক প্যালেস্তিনীয় মহিলা মসজিদের বাইরে ছিলেন। রবার বুলেটে আহত একজনকে তিনি সাহায্য করার চেষ্টা করেন। কিন্তু পুলিশ তাঁর দিকে টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। চারিদিকে ইসরাইলি পুলিশ সবার ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে।

প্যালেস্তিনীয় ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভ পার্টির প্রধান মুস্তাফা বারঘুতি সেই সময় মসজিদে উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান যখন মানুষ আক্রান্তদের সাহায্য করার চেষ্টা করছিলেন, তখন পুলিশ তাদের ওপরও আক্রমণ করে। তাঁর মতে, এইভাবে প্রার্থনার সময় আক্রমণ করা অন্যায়। ইসরাইলি পুলিশ মানুষের ধর্মীয় ভাবনাকে আঘাত করেছে। তারা প্যালেস্তিনীয় এবং নিজেদের মধ্যে বৈষম্যের রোষকে বাড়িয়ে তুলছেন। আর্ত মানুষের হাহাকার শুনে মসজিদে ছুটে গিয়েছিলেন ডাঃ হাজেম রিদি। তিনি মসজিদের প্রবেশের চেষ্টা করলে ইসরাইলি পুলিশ তাকে বাঁধা দেয়। অনেক চেষ্টা করেও ডাঃ রিদি ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি।

আরও পড়ুন: বিদেশিরা কি এবার পালন করতে পারবেন হজ, বৈঠক সৌদির

পুলিশের মতে, বহু সংখ্যক মানুষ প্রার্থনার সময়ে মসজিদে ঝামেলা করছিল। তাই পুলিশ এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু অবশ্য তাঁর পুলিশ বাহিনীর এহেন আক্রমণকে কৃতিত্বই দিয়েছেন। তাঁর মতে, পুলিশ ঠিক কাজ করেছে। তিনি পুলিশের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

অন্যদিকে, এই আক্রমণের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন বহু রাষ্ট্রপ্রধান এবং সাধারণ মানুষ। জেরুসালেমের ইসলামীয় প্রধান মহম্মদ হুসেইন এই অন্যায় আক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে সাহায্য চেয়েছেন। তাঁর মতে, ইসরাইলিরা ইচ্ছে করেই এই কাজ করেছে। তারা মানুষকে প্রার্থনা করতে দিতে চায় না। তিনি এই ঘটনাকে জঘন্য অপরাধ বলে দাবি করেছেন। তাঁর মতে, ইসলাম ধর্মের এই মুহূর্তে প্রধান কর্তব্য হল সংঘবদ্ধভাবে আল-আকসা মসজিদকে রক্ষা করা।

রমযান মাসে প্যালেস্তিনীয়রা ইসরাইলি নিয়ম অনুযায়ী পুরনো জেরুসালেম শহরের অনেকাংশে যেতে পারছিলেন না। তাঁরা এর বিরোধিতাও করেন। এরপর সরকারি আদেশ অনুসারে অনেক প্যালেস্তিনীয় নাগরিককে তাঁদের বাড়ি ছেড়ে দিতে হয়, যাতে সেখানে ইসরাইলিরা বসবাস করতে পারেন। মনে করা হচ্ছে এই কারণের জন্যই এমন আক্রমণ চালানো হয়।

ইউনাইটেড নেশনস জানিয়েছে যে মানুষকে এইভাবে উৎখাত করা একপ্রকার অপরাধ। ইউএসএ জানিয়েছে যে, পবিত্র রমযানের একদম শেষে এসে এহেন আক্রমণ অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং এখনই এই হিংসা বন্ধ হওয়া উচিত। প্যালেস্তাইনের রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাস জানান যে, এর জন্য সম্পূর্ণভাবেই ইসরাইল সরকার দায়ী। তিনি আল-আকসা মসজিদে পীড়িতদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছেন। তাঁর মতে, ইসরাইল একটি জঘন্য অপরাধ করেছে এবং প্রকাশ্যে সেই অপরাধকে অপরাধদমন পদক্ষেপ বলে প্রচার করেছে। সকলকে সমান অধিকার এবং সম্মানের বার্তা দিয়েছেন ইউএন আন্তর্জাতিক দলের প্রধান টর ভেনেসল্যান্ড।

আরও পড়ুন: রবীন্দ্রনাথ ও শিক্ষা

শুধু প্যালেস্তাইনই নয়, বিশ্বের আরও বহু দেশ এই জঘন্য হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা জেরুসালেমবাসীর পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছে। এর মধ্যে আছে মিশর, আরব লিগ, মিডল ইস্ট কোয়ার্টেট, ইউএসএ, রাশিয়া, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং ইউনাইটেড ন্যাশন। এরা সবাই এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

এই ঘটনার একটি সারমর্ম হতে পারে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বক্তব্য। তিনি ট্যুইটারে লিখেছেন― রমযানের সময় কিবলা এ আওয়াল, আল-আকসা মসজিদে প্যালেস্তিনীয়দের ওপর ইসরাইলি বাহিনীর আক্রমণের তীব্র বিরোধিতা করছি। এই আক্রমণ সমস্ত মনুষ্যত্ব এবং আন্তর্জাতিক নিয়মবিরুদ্ধ। আমরা প্যালেস্তাইনের সমস্ত মানুষের পাশে আছি। আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অনুরোধ জানাই যে, তাঁদের প্যালেস্তিনীয় মানুষ এবং তাঁদের অধিকারকে যোগ্যতা এবং সম্মান জানানোর জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *