প্রসঙ্গ: সত্যজিৎ রায়ের দু’টি সিনেমা

রাহুল দাশগুপ্ত

সত্যজিৎ রায়ের ‘পরশ পাথর’ এক অভিনেতার ট্র্যাজেডি

তুলসী চক্রবর্তী ভারতীয় সিনেমার এক অবিস্মরণীয় অভিনেতা। হিন্দি সিনেমায় যেমন বলরাজ সাহানি (১৯১৩-১৯৭৩), বাংলা সিনেমায় তেমনই তুলসী চক্রবর্তী (১৮৯৯-১৯৬১) এবং ছবি বিশ্বাস (১৯০০-১৯৬২)। সমস্ত সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকা দুই প্রশ্নাতীত জিনিয়াস। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ছবি বিশ্বাস তবু কিছু স্বীকৃতি পেয়েছেন জীবদ্দশায়, তুলসী চক্রবর্তীর ভাগ্যে সেটুকুও জোটেনি। অথচ তুলসী চক্রবর্তী সম্পর্কে সত্যজিৎ রায় মন্তব্য করেছিলেন, হলিউডে অভিনয় করলে তিনি নিশ্চিতভাবে অস্কার পেতেন। সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় তাঁর সঙ্গে বাস্টার কিটন (১৮৯৫-১৯৬৬)-এর তুলনা করেছেন। আবার কোনও কোনও দৃশ্যে তিনি স্বয়ং চার্লি চ্যাপলিনকে (১৮৮৯-১৯৭৭) মনে করিয়ে দিয়েছেন। ‘পরশপাথর’ ছবিতে তুলসী চক্রবর্তী যেখানে আয়নায় মুখ দেখছেন, তার সঙ্গে ‘লাইমলাইট’ ছবিতে চ্যার্লির মুখের সাদৃশ্যের কথা বলেন কেউ কেউ। আবার কেউ বলেন, অভিনয়ের ধরনে, অভিব্যক্তির প্রকাশে চার্লির তুলনায় বাস্টার কিটনের সঙ্গেই তার মিল বেশি। স্বয়ং ছবি বিশ্বাস, যিনি অন্য কাউকে পাত্তা দিতেন না, তুলসী চক্রবর্তীর সঙ্গে অভিনয়ের সময় কিছুটা নার্ভাস বোধ করতেন বলে শোনা যায়। ছবি বিশ্বাস এবং তুলসী চক্রবর্তী একসঙ্গে অভিনয় করছেন, এই দৃশ্যটি নিঃসন্দেহে ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে স্মরণীয় দৃশ্য এবং ঘটনা।

আরও পড়ুন: করোনাকালের ডায়রি ১

তুলসীকে যখন চ্যাপলিন বা কিটনের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তখন নিশ্চয়ই স্থান-কালের কথা ভুলেই করা হয়। টি এস এলিয়ট যখন কবিতা লিখে গোটা দুনিয়ায় সমস্ত শিরোপা জুটিয়ে ফেলেছেন, সমসাময়িক জীবনানন্দ দাশ তখন নিজের সমস্ত উপন্যাস সযত্নে ট্রাঙ্কে গুছিয়ে রাখেন, কোনওদিন সেসব প্রকাশের মুখ দেখবে, এমন দুরাশা পরিত্যাগ করে। এই হল আমাদের দেশ! এই হল ভারত এবং বঙ্গদেশ! এখানে কবে কোন জিনিয়াস স্বীকৃতি পেয়েছেন? স্বয়ং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঋত্বিক ঘটকের মতো যুগান্তকারী দুই ব্যক্তিত্ব এখানে কত না লাঞ্ছনা সয়েছেন! দেবব্রত বিশ্বাসকে তাঁর অসামান্য স্বকীয়তা ও মৌলিকতার জন্য কী নিদারুণ হেনস্থাই না হতে হয়েছে এখানে। ঔপনিবেশিকতায় ধ্বস্ত এই দেশ প্রতিভার বাড়াবাড়ি সহ্য করে না। নিজেদের মেধার অক্ষমতা ঢাকতে এখানে খুনির মতোই প্রতিভাবানের গলা টিপে ধরা হয়। আর মাতামাতি করা হয় নিজেদের হিসাবের ভেতরে থাকা মধ্যমেধা ও নিম্নমেধার চাতুরিবাজদের নিয়ে। এই দেশে তুলসী চক্রবর্তীর মতো আকাশচুম্বী প্রতিভাকে পেটের ভাত জোটাতে যে প্রায় উঞ্ছবৃত্তি করতে হবে, নিদারুণ দারিদ্র্যের সঙ্গে যুঝতে হবে আজীবন, তা আর এমন কী অস্বাভাবিক। তুলসী চক্রবর্তী শুধু বাংলা বা ভারতীয় সিনেমার নন, গোটা দুনিয়ায় বিশ শতকের সিনেমার ইতিহাসে কমেডিয়ানদের মধ্যে অন্যতম সেরা। সত্যজিৎ রায় থেকে ঋত্বিক ঘটক, উত্তম কুমার থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অনেক দিক্‌পালই তাঁর সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত। বাংলা সিনেমায় কমেডি অভিনয়ের ক্ষেত্রে এক স্বর্ণযুগের সূত্রপাত করে যান তিনি। তাঁর মহৎ দুই উত্তরাধিকার রবি ঘোষ (১৯৩১-১৯৯৭) এবং সন্তোষ দত্ত (১৯২৫-১৯৮৮)। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯২০-১৯৮৩), জহর রায় (১৯১৯-১৯৭৭) এবং অনুপকুমার (১৯৩০-১৯৯৮), কিছু অবিস্মরণীয় অভিনয় রয়েছে এঁদের। নবদ্বীপ হালদার, কেষ্ট মুখোপাধ্যায়, চিন্ময় রায়ের কিছু কিছু ছোটো কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ অভিনয় এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। এর সঙ্গে রয়েছে দুই দিক্‌পাল উৎপল দত্ত (১৯২৯-১৯৯৩) এবং উত্তমকুমার (১৯২৬-১৯৮০)-এর কিছু সিরিওকমিক ক্ল্যাসিক! মনোজ মিত্রের (জন্ম – ১৯৩৮) কথাও এ প্রসঙ্গে আসতে পারে। কমেডি অভিনয়ে কোন উচ্চতায় পৌঁছেছিল বাংলা সিনেমা, তা এই উদাহরণগুলো থেকেই বোঝা যায়! একমাত্র ইংরেজি সিনেমায় চ্যাপলিন, কিটনের স্বর্ণযুগের সঙ্গে তুলনা করা যায় বাংলা সিনেমার এই স্বর্ণযুগের। কিন্তু এ নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও মননশীল গবেষণা হয়েছে কী? যদি হত, তুলসী চক্রবর্তী নিশ্চয়ই পথিকৃতের সম্মান পেতেন।

আরও পড়ুন: আমি না গেলে মান্নাবাবু গান গাইবেন না, বলেছিলেন প্রবাদপ্রতিম তবলাবাদক রাধাকান্ত নন্দী

সত্যজিৎ রায়ের ‘পরশপাথর’ ছবিটির কথাই ধরা যাক। খুব উৎকৃষ্ট মানের ছবি এটি নয়। অন্তত সিনেমার গোড়া থেকে ককটেল পার্টি পর্যন্ত, সত্যজিৎ রায় তার জিনিয়াস দেখিয়েছেন। অতি উচ্চমানের কৌতুকবোধ, ‘সেন্স অফ হিউমার’, যা সত্যজিতের বৈশিষ্ট্য, তার পরিচয় পাওয়া যায় এই অংশে। কিন্তু এরপরই যেন সত্যজিতের মতো মহৎ প্রতিভাও খেই হারিয়েছেন। তিনি ঠিক কী বলতে চান, কোথায় পৌঁছতে চান, তা যেন ঠিক স্পষ্ট হয়নি। পরশুরামের মূল কাহিনি থেকে অনেকটাই সরে গেছেন তিনি। পরেশ দত্তের পতনের যে ধারাবাহিক ছবিটি আঁকা হয়েছে, তার মধ্যে যেন সেই মজাটাই নেই! কিন্তু মানুষের উত্থানে যেমন মজা থাকে, পতনেও তেমনই মজা থাকে। সেই মজাটাকেই যেন কোথাও মিস্ করে গেছেন সত্যজিৎ। গোড়ায় যে তীব্র, শাণিত কৌতুকবোধ দেখিয়েছেন, সেটিকেই হারিয়ে ফেলেছেন। সংলাপ ভোতা ও মামুলি হয়ে উঠেছে। একজন ব্যক্তিমানুষের বিপন্নতাই প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু সেই বিপন্নতা যেন দর্শকের সহানুভূতিকে সেভাবে স্পর্শ করে না। তাঁরা মজা পেতে চান, কিন্তু বারবার প্রতিহত হন। আর তার কারণ হিসাবে বলা যায়, গোড়ায় যে সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল, পরে সিনেমাটি ঠিক তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পারেনি। তার ধার ও ভার, দু’টোই হারিয়ে ফেলেছে। অবশ্য এই ছবিটিকেই অনেকে তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয়-প্রতিভার মাইলস্টোন হিসাবে চিহ্নিত করতে চান। তাদের এই চাওয়াকে মান্যতা না দিয়ে অবশ্য উপায় থাকে না। সত্যজিৎ রায় এখানে তাঁর ভাবনার ক্ষেত্রে দীনতা দেখিয়েছেন। তুলসী চক্রবর্তী নিজের অভিনয়ের ক্ষেত্রে কোনও দীনতা দেখাননি। ছবিটির গোড়ায় তুলসী চক্রবর্তী একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের মানসিকতা ও বিপন্নতাকেই ফুটিয়ে তুলেছেন। রোজকার জীবনযুদ্ধে এই মানুষটি জেরবার। পরশুরামের নায়ক কিন্তু একজন উকিল ছিলেন। যদিও তিনি ছিলেন একজন ব্যর্থ উকিল, আর একইভাবে দারিদ্র্যে অভ্যস্ত। এ প্রসঙ্গে আমাদের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ছবিটির কথা মনে পড়তে পারে। সত্যজিৎ মূল কাহিনি থেকে অনেকটাই সরে গিয়েছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় চার যুবকের গৌরব দেখাতে চেয়েছিলেন তাঁর উপন্যাসে। এক শেকড়-ছেঁড়া, উদ্দাম, বোহেমিয়ান, রোমান্টিক জীবনের প্রতিনিধি তারা। জীবনের গতানুগতিকতাকে অনায়াসে বুড়ো আঙুল দেখায়। কিন্তু সত্যজিৎ ওই যুবকদের মধ্যে সময়ের গ্লানি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাননি। তিনি তাদের মধ্য দিয়ে একটা যুগের অবক্ষয়ের ছবি দেখিয়েছেন। সুনীল খুশি ছিলেন না সত্যজিতের এই ব্যাখ্যায়। সত্যজিৎও আর কখনও সুনীলের কাহিনি নিয়ে ছবি করেননি। সত্যজিৎ এইভাবেই মূল কাহিনিকে অবলম্বন করে বারবার নিজের জীবন-দর্শন এবং মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কাহিনি তার কাছে বরাবরই নিছক অবলম্বন, খড়-মাটির কাঠামো। যে মহান শিল্পী সেই কাঠামোকে নিজের কল্পনায় রঙিন করে শিল্পে উত্তীর্ণ করেন, তাঁর হৃদয় ও দেখার চোখ সম্পূর্ণভাবে তার নিজেরই। সেখানে তিনি কাহিনিকার ও তাঁর ভাবনাকে আমল দিতে নিতান্ত নারাজ। ‘পরশপাথর’ ছবিটিকেও এই বিষয়টি মাথায় রেখেই দেখতে হবে। সত্যজিৎ সাধারণত সরল, সাদামাটা, অনাড়ম্বর কিন্তু মানবিক, মর্মস্পর্শী ও কৌতুকময় কাহিনি পছন্দ করতেন। তিনি সমসময়ের জটিল সাহিত্যকে এড়িয়ে গেছেন। কখনও জগদীশ গুপ্ত, মানিক, সতীনাথ, ধুর্জটিপ্রসাদ, কমলকুমার, অমিয়ভূষণ, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, মহাশ্বেতা বা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্য নিয়ে সিনেমা করার কথা ভাবেননি। সাহিত্যের ওইসব জটিলতাকে তিনি সন্তর্পণে এড়িয়ে গেছেন। সুনীল বা শংকরকে তিনি বেছেছেন, কিন্তু কাহিনিকার হিসাবে মোটেই তেমন আমল দেননি, শুধু কাহিনিটিকে নিয়েছেন এবং নিজের সুবিধামতো তাকে ব্যবহার করেছেন। মহৎ সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনি রবীন্দ্রনাথ ও বিভূতিভূষণকে বেছেছেন, কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজের জটিলতাগুলোকে এড়িয়ে মূলত জোর দিয়েছেন মানবিক সম্পর্কের সংবেদনশীল, ঘাত-প্রতিঘাতময় দিকগুলোয়। আর তিনি বেছেছেন পরশুরামকে, তার মেধাবী কৌতুকবোধের জন্য। এই মেধার কিঞ্চিৎ অভাবই বোধহয় তাঁকে সেভাবে শিবরামের দিকে আকৃষ্ট করেনি, তাঁর অসামান্য কৌতুকবোধ সত্ত্বেও। ‘পরশপাথর’ গল্পে আছে, দরিদ্র উকিলটি একটি পরশপাথর পেয়ে রাতারাতি অত্যন্ত ধনী হয়ে ওঠে। সে জাদুকরের মতোই যেখানে যত লোহা আছে, তাকে সোনায় পরিণত করার নেশায় মেতে ওঠে। রাতারাতি নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে এক মস্ত কারখানার মালিকে পরিণত হয় সে এবং তার জীবনের গতিপ্রকৃতিই সম্পূর্ণ বদলে যায়।

আরও পড়ুন: আমাদের প্রতিটা দিনই মে দিবস

তুলসী চক্রবর্তী নিজের অতুলনীয় অভিনয়-প্রতিভায় উত্থানের এই জাদুবৎ, কৌতুকময় ঘটনাটিকে অতি দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। জাদুর জগতে প্রবেশ করে তিনিও যেন নিজের ব্যক্তিত্বটিকে জাদুবৎ করে তুলেছেন। গোড়ায় মানুষটির মামুলি জীবন-যাপনের ছবিই উঠে এসেছ। এই রোজকার, সাদামাটা জীবন-যাপনের ছবিতেও কৌতুক আছে। বৃষ্টি আসছে দেখে কাহিনির গোড়ায় তুলসী তাই ব্যস্ত হয়ে বাড়ির দিকে ছুটতে থাকে এবং তারপর প্রবল বৃষ্টির মাঝখানে পড়ে গিয়ে বিষন্ন বোধ করে। এই ব্ৰস্ততা ও বিষণ্ণতায় ফুটে ওঠে একইসঙ্গে কৌতুক ও শোক, যা মধ্যবিত্ত জীবনের নির্যাস হিসাবেই ধরা পড়েছে। পরেশ এই সময় কুড়িয়ে পায় পরশ পাথরটি, সেটিকে বাড়ি ফিরে এসে নিতান্ত হেলাফেলায় দিয়ে দেয় প্রতিবেশী কিশোরটিকে। পরে পাথরটার মাহাত্ম্য বুঝে নানা ছলচাতুরি করে সেটিকে আবার হাতিয়ে নেয় এবং গিন্নিকে দেখায় নিশ্চিত হওয়ার জন্য। সোনার দোকানে গিয়েও প্রথমটায় পরেশের অনিশ্চয়তা কাটে, তার মধ্যে একইসঙ্গে লোভ, আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তা খেলা করে। কিন্তু এরপরই সে নিশ্চিত হয় এবং লোভের কবলে পুরোপুরি আত্মবিসর্জন দেয়। সোনার দোকান থেকে বেরিয়ে সে একটা ট্যাক্সি নেয় এবং নেশা ও ঘোরের মধ্যে চলে যায়। এতদিন শুধু সে স্বচ্ছলতার স্বপ্ন দেখে এসেছে, এখন প্রাচুর্য তার হাতের মুঠোয়। খুব দ্রুত এই যে পরেশের মধ্যে ভাবের পরিবর্তন হতে থাকে, ভিন্ন ভিন্ন মানসিক স্তরের মধ্য দিয়ে এই যে চলন, তাকে নিপুণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন তুলসী চক্রবর্তী।

আরও পড়ুন: সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’: সুখপাঠ্যের অন্তরালে

পরশুরাম এই গল্পটি লিখেছিলেন ১৯৪৮ সালে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং ভারতের স্বাধীন সরকার তখন বাস্তবিকই বাঙালির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। বাঙালি জীবনে তখন বোধহয় সত্যিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল একটি পরশ পাথরের। মধ্যবিত্ত বাঙালির সেই স্বপ্নই হয়ে ওঠেন পরেশ দত্ত। লোহাকে সোনা বানাতে পারেন তিনি। পরশুরামের গল্পের পরশ দত্ত নতুন যুগের বাঙালি। পুরনো যুগের রোমান্টিসিজম তার মধ্যে নেই। তিনি বোঝেন শুধু কীভাবে অর্থ উপার্জন করতে হয়, পুঁজি বাড়াতে হয়, ধনী থেকে আরও ধনী হয়ে উঠতে হয় এবং সেই ধনকে দশ জন গুর্খা দারোয়ান আর পাঁচটা বুলডগ দিয়ে রক্ষা করতে হয়। সত্যজিৎ রায়ের পরেশের মধ্যে কিন্তু দেশোদ্ধারের রোমান্টিকতা এখনও রয়ে গেছে, তাই নানা দান-ধ্যান করে নিজের পুণ্য বাড়িয়ে চলেন তিনি, অনায়াসে স্রেফ মানুষের হিতার্থে সোনা বিতরণ করেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, পরেশের শ্ৰেণিচরিত্রকে বুঝতে সত্যজিৎ কি ব্যর্থ হয়েছেন? তুলসী চক্রবর্তী তাই বিপুল ধনী হয়েও বিনয়ী, দরদি ও হিতকারী। সত্যজিৎ বোধহয় সেক্ষেত্রে এই যুক্তি দিতে পারেন, এই ধনী ব্যক্তিটি তো কোনও অসৎ উপায়ে, লোক ঠকিয়ে ধনী হননি। তাই তার মধ্যে প্রকৃতিগত ভালোমানুষিটি রয়ে গেছে। কিন্তু এই যুক্তি মেনে নিলে, এই ফ্যান্টাসির আসল কৌতুকটিই হারিয়ে যাবে, যেখানে উপায়কে আড়ালে রেখে নিছক কার্যসিদ্ধি অর্থাৎ সাফল্যকে দেখানো হয়েছে। এই আড়াল করার অর্থ এই নয় যে, এতে পরেশ দত্তর শ্রেণিচরিত্র পাল্টে যাবে। অন্তত পরশুরাম তা করতে চাননি। তিনি স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে স্রেফ মজা দেখতে চেয়েছেন। সত্যজিৎ হয়তো দেখাতে চেয়েছেন, পরেশ অর্থের সঙ্গে চান যশ। প্রতিবেশী ছেলেটিকে অনায়াসে ভুলে গেলেও নিজের অতীতকে মনে না রাখতে চাইলেও পরেশ জানেন একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি হিসেবে তার কী কী করা উচিত! আর এই ঔচিত্যবোধ দেখাতে গিয়েই তিনি দানধ্যান। নিয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলেন, আর এই অতিরঞ্জন নিঃসন্দেহে সত্যজিতের বিরল কৌতুকবোধেরই ফসল।

আরও পড়ুন: গতকাল যেভাবে এইসব লিখেছিলাম

পরেশ দত্ত একটি খ্রিস্টান ছেলেকে নিজের সহকারী হিসাবে বহাল করে, যার নাম, প্রিয়তোষ হেনরি বিশ্বাস। এই প্রিয়তোযের শ্রেণিচরিত্র পরশুরাম নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। নতুন যুগের চাকরিজীবী, বশংবদ, মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি প্রিয়তোষ, যে অনায়াসে নিজের মেধা, মর্যাদা, বোধ-বুদ্ধিকে বিসর্জন দিয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দিতে পারে। নিজের ব্যক্তিত্বকে সম্পূর্ণ লোপ করে দিতে পারে। এই প্রিয়তোষ চোখের সামনে আশ্চর্য, জাদুবৎ সমস্ত ব্যাপার দেখেও কখনও বিস্মিত হয় না, কখনও কোনও প্রশ্ন করে না, তার বাধ্যতা ও আনুগত্য সম্পূর্ণ প্রশ্নাতীত। আর এইভাবেই সে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চায়, একটি ধনী, চালাক মেয়ের সঙ্গে সে প্রেম করে, এই প্রেমই তার জীবনের একমাত্র বিনোদন, আর সে মন দিয়ে চাকরি করে, সবই তার কাছে অর্থহীন। নতুন যুগের স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, বিলাসপ্রিয় এবং সম্পূর্ণভাবে, সব কিছুর প্রতি দায়বদ্ধতাহীন প্রিয়তোষ মধ্যবিত্ত শ্রেণির সার্থক প্রতিনিধি। সত্যজিতের সিনেমায় এই প্রিয়তোষের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, কালী বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯২১-১৯৯৩)। কালী ভারতীয় সিনেমায় সর্বকালের সেরা অভিনেতাদের একজন, তাঁকে হলিউডের ওমর শরিফের সঙ্গে তুলনা করতে ইচ্ছা করে আমার, দু’জনের মুখ, চেহারা ও অভিনয়ের ধরনের সাদৃশ্য লক্ষণীয়, কিন্তু এই সিনেমায় তাকে কিছুটা চতুর বলেই মনে হয়। আসলে পরশুরাম যে যান্ত্রিক, নির্বোধ, অনুগত, অনুভূতিহীন, নিরেট দেওয়ালের মতো একজন টাইপকে আঁকতে চেয়েছিলেন, সত্যজিতের ছবিতে তাকে একজন বাস্তব মানুষ বলেই মনে হয়! এই কালীই ককটেল পার্টির খবর দেয় তুলসীকে।

আরও পড়ুন: নীলাঞ্জন হাজরার কবিতা: ‘অস্বীকার করেছি মানচিত্রের কঠোর সীমানা’

এই ককটেল পার্টি ‘পরশপাথর’ ছবিটিকে একটি ধ্রুপদি উচ্চতায় তুলে নিয়ে গেছে। যাকে, লুই বুনুয়েলের ‘ভিরিদিয়ানা’ ছবির ভিখিরিদের ডিনার পার্টির সঙ্গে তুলনা করতে ইচ্ছা করে আমার। তুলসী চক্রবর্তী জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিনয় করেছেন এই দৃশ্যে। প্রথমে পার্টিতে গিয়ে তিনি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু কেউ তাকে পাত্তা দেয় না, বরং সবাই কেমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে থাকে। লোকের চোখ টানতে তখন পরেশ দত্ত স্বভাববিরুদ্ধভাবেই মদ্যপান করতে শুরু করে এবং মাতলামি করার জন্য তাকে জঘন্যভাবে অপমানিত হতে হয়। এই অপমানের জবাব দিতে গিয়েই পরেশ নিজের দম্ভ প্রকাশ করে ফেলে, সবাইকে দেখিয়ে দিতে চায় নিজের অসীম ক্ষমতাকে, পরশ পাথরের রহস্য প্রকাশ করে ফেলে। পরেশ দত্তকে প্রথমে মনে হয় করুণার পাত্র, মদ্যপান তাকে শোচনীয়ভাবে কৌতুককর করে তোলে এবং শেষপর্যন্ত সে হয়ে ওঠে বেপরোয়া ধরনের দাম্ভিক। এই পর্যায়ক্রমকে নিপুণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন তুলসী চক্রবর্তী। কিন্তু সত্যজিৎ রায় একটি টেকনিক্যাল ভুল করে ফেলেছেন। এবং সেই ভুলটি সাংঘাতিক। পরশুরাম পরিষ্কার লিখেছেন, এইসব পার্টিতে গিয়ে পরেশবাবু, চুপচাপ খেয়ে যান, মাঝে মাঝে ইয়েস নো বলেন, কিন্তু তার পেটের কথা কেউ বার করতে পারে না, শ্যাম্পেন খাইয়েও নয়। একদম নির্ভুল পর্যবেক্ষণ! এইরকম একজন সতর্ক, সাবধানী, হিসেবী মানুষ স্রেফ নিজের দম্ভ দেখাতে গিয়ে নির্বোধের মতো সবার সামনে নিজের রহস্যকে প্রকাশ করে ফেলবে, নিজের পতনকে। সুনিশ্চত করবে, তা হয় কী করে? আবারও প্রশ্ন জাগে, সত্যজিৎ কি পরেশ দত্তের শ্রেণিচরিত্রকে ঠিকমতো ধরতে পেরেছেন? তা যে পারেননি, তা বোঝা যায় পরবর্তী ঘটনাগুলোয়। পরেশ দত্তের পিছনে পুলিশ লাগে, এবং সত্যজিতের সিনেমায় পুলিশের সামনে পরেশ দত্ত অসহায়ভাবে ভেঙে পড়ে, আত্মসমর্পণ করে। সত্যজিৎ কেন উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের পুলিশকে নিয়ে এরকম একটি ইউটেপিয়া রচনা করলেন, তা আমাদের বিস্মিত করে! পরশুরাম কিন্তু ঠিকই বিশ্লেষণ করেছেন, বাংলা সরকারের আদেশে পুলিশের লোক পিছনে লাগল। তারা সহজেই বশে এল, কারণ রাম-রাজ্যের রীতিনীতি এখনও তাদের রপ্ত হয়নি, দশ-বিশ ভরি পেয়েই তারা ঠান্ডা হয়ে গেল। সত্যজিৎ পুলিশকে ঠিক নির্লোভ দেখাননি, কিন্তু পরেশ দত্তের শ্রেণিচরিত্রকে বিশ্লেষণ করতে ভুল করেছেন। পরেশ দত্তের মতো লোকেরা কখনও ওভাবে ভেঙে পড়ে না, আত্মসমর্পণ করে না, স্বীকারোক্তি করে না, নিজের ভালোমানুষি ও পরোপকারের বর্ণনা দিয়ে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করে না। সত্যজিৎ রায় উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষকে কতটা অসম্পূর্ণভাবে জানতেন, ‘পরশ পাথরে’র পরবর্তী ঘটনাবলিই তার প্রমাণ! তুলসী চক্রবর্তীর এখানে কিছুই করার থাকে না। তাকে অপেক্ষা করতে হয়, প্রিয়তোষের পেটে পরশ পাথরটি গলে যাওয়া পর্যন্ত। কারণ তারপরই পরেশ দত্তের হাতে সোনা বনে যাওয়া সমস্ত লোহা আবার আগের মতোই লোহা হয়ে যায়। পরশুরাম কিন্তু ঠিকই দেখিয়েছেন, পরেশ দত্তের মতো লোকেরা গোটা দুনিয়াকে হাতের মুঠোয় রাখতে পারে। আর তাদের নিরিখে বিচার করতে বসলে, গোটা দুনিয়াকে ভালোমতোই চেনা যায়। এই দুনিয়া কোন কোন ধান্দায় চলে, সেই ধান্দাগুলোকে বোঝা যায়। পরেশ তাই প্রিয়তোষকে পরশ পাথরকে হাপিস করে দিতে বলে ঠিকই, কিন্তু তার পেছনে থাকে তার জটিল অঙ্ক। আসলে পরশ পাথরটি গোড়ায় ছিল তার লোভের স্মারক, কিন্তু পরে তা পরেশের যথেষ্ট বদনামের কারণ হয়ে ওঠে। কিন্তু শুধু বদনাম ঘোচানোর জন্য পরেশ এই পাথরটি প্রিয়তোষকে দেয় না। ততোদিনে প্রিয়তোষের প্রকৃতিকে সে নিজের হাতের তালুর মতোই বুঝে গেছে। সে বুঝে গেছে, পরশ পাথরটি হাতে পেলেও প্রিয়তোষ তাকে কাজে লাগাতে পারবে না। প্রিয়তোষ কোনওদিনই তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে না। প্রিয়তোষ স্রেফ তার নির্দেশ পালন করবে। প্রিয়তোষের মগজ খাটিয়ে কিছু করারই ক্ষমতা নেই। তার নির্বুদ্ধিতা এবং আনুগত্য সম্পূর্ণ যান্ত্রিক। ক্ষমতা-যন্ত্রে প্রিয়তোষের মতো যন্ত্র একেবারে সঠিক মাপে বসানো। আর ঠিক তাই হয়। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে পাথরটায় বিষ আছে ভেবে প্রিয়তোষ সেটাকে খেয়ে নেয়। কিন্তু পরেশের তো প্রিয়তোষকে হারালে চলবে না। এই পুঁজিবাদী, ক্ষমতা-ব্যবস্থা তো প্রিয়তোষের মতো যন্ত্রমানুষকেই চায়। তারা কখনও কোনও প্রশ্ন করে না, স্রেফ আনুগত্য দেখায় এবং এইভাবেই স্থিতাবস্থাকে বজায় রাখে, যে স্থিতাবস্থার ভেতর তাদের নিজেদের নিরাপত্তা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে। এইসব নির্বোধ, অনুগত, যান্ত্রিক লোকেরা জানে, তারা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে কিছু করতে পারবে না। তাদের সেই মৌলিকতা বা উদ্ভাবনী শক্তি নেই। তারা শুধু চায় নিরাপত্তা। স্থিতাবস্থার ভেতরই নিজেদের এই নিরাপত্তাকে খুঁজে নেয় তারা। আর স্থিতাবস্থাও তাই নিজেদের প্রয়োজনে এইসব মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, তাদের নিরাপত্তা দেয়, তাদের সুখ-সুবিধা-আরাম-বিলাসের ব্যবস্থা করে।

আরও পড়ুন: কোভিড-১৯ অতিমারি: বাংলাদেশ

ভারতবর্ষের উত্তর-ঔপনিবেশিক বৈশিষ্ট্যগুলিকে ধরে রেখেছে এইসব মানুষই। পরেশ পাথরটিকে হারিয়ে পরেশ আসলে একটি মোক্ষম চাল দেয়। সমস্ত বিতর্ক থেকে সে বেরিয়ে আসে। কিন্তু ততদিনে নিজের প্রয়োজনীয় পুঁজি সে গুছিয়ে নিয়েছে। বিরাট সেই রসদ। সেই রসদকে খাটিয়ে মুনাফার ওপরে মুনাফা করার ক্ষমতা সে রাখে। এখন আর তার পরশ পাথরের প্রয়োজন নেই। লোহাকে এখন সোনা করার ক্ষমতা তার আছে। উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষ চলে গেছে দেশি পুঁজিপতিদের হাতে। পরেশ এই দেশি পুঁজিপতিদেরই একজন। সে জানে, এই গরিব দেশে গরিব লোকদের ঠকিয়ে লোহা থেকে কিভাবে সোনা বার করতে হয়। এখানে পরশ পাথরের কোনও প্রয়োজন নেই। এই দেশের বাস্তবতাই সেই পরশ পাথর, যেখানে একজন পুঁজিপুতি নিজের পুঁজি খাটিয়ে অনায়াসে মুনাফার পর মুনাফা করে যেতে পারে, লাভের পর লাভে ফুলেফেপে উঠতে পারে। রাষ্ট্র, সমাজ, প্রশাসন অর্থাৎ গোটা ক্ষমতা-ব্যবস্থাকে সে নিজের পাশে পাবে। পরেশের অপ্রতিরোধ্য গতি তাই অব্যাহত থাকে। প্রিয়তোষ নিজের প্রশ্নাতীত আনুগত্যে সেই মুনাফা-লাভের যন্ত্রে নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করে দেয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এই গোপন খেলাটিই সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় অনুপস্থিত। পরেশ দত্ত তাই নিছক আত্মরক্ষার খাতিরেই প্রিয়তোষকে পাথরটি দিয়ে দেয় আর নিজে পালাতে থাকে। আর প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করার জন্য প্রিয়তোষ সেই পাথরটিকে গিলে নেয়। সত্যজিৎ রায় একবারও নিজেকে প্রশ্ন করেন না, কেন পালাবে পরেশের মতো একজন ধনী পুঁজিপতি? পরেশের মতো মানুষ কী। কখনও পালাতে পারে? তাও আবার পুলিশ-প্রশাসনের ভয়ে? উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষ যেখানে তার জন্য একটি স্বর্গরাজ্য রচনা করে রেখেছে? যদি সে ধরাও পরে, তবু পুলিশ-প্রশাসন তার কী করতে পারে? সে তো পরোক্ষভাবে ক্ষমতা-ব্যবস্থাকেই মদত দিয়ে এসেছে! স্থিতাবস্থাকে বজায় রাখতেই প্রয়াসী হয়েছে! লোহাকে সে সোনা করেছে ঠিকই, আর লোহা গরিবদেরও থাকে। এ কাজ পরেশ মোটেই গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্রের খাতিরে করেনি। ব্যক্তিমালিকানাকে সে বজায় রেখেছে, পাথরটিকে নিজের কুক্ষিগত করে রেখেছে। পাথরটিকে সে শুধু ব্যবহার করেছে। নিজের লোভে আর স্বার্থে। এই লোভ আর স্বার্থ কোনও ব্যক্তির নয়, গোটা একটা শ্রেণির বৈশিষ্ট্য। তাঁর জন্য সোনার দাম কমে গেছে ঠিকই। আর সোনা থাকে ধনীদেরই। কিন্তু এই আত্মঘাতী প্রক্রিয়াকে ঠেকাতেই তো সে পাথরটাকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছে। সোনা থেকে ফিরে আসতে চেয়েছে লোহায়। আসলে সে কোন শ্রেণিকে বাঁচাতে চেয়েছে? পাথরটাকে ধবংস করে কোন শ্রেণিকে নিরাপত্তা দিতে চেয়েছে? সত্যজিৎ গোটা ব্যাপারটির অত্যন্ত সরলীকরণ করেছেন। তাই পরেশ দত্তকে আত্মরক্ষার্থে মিনমিন করে বিবৃতি দিতে হয়, তিনি আসলে মোটেই বেশি লোভ করেননি, বাড়ি-গাড়ি করেছেন ঠিকই, কিন্তু তা নিছক অতি মামুলি কিছু স্বচ্ছলতা পাওয়ার জন্য, বাসে-ট্রামে চড়ে আর হেঁটে হেঁটে তার পা হেজেমজে গেছিল! পরেশ দত্তের শ্রেণিচরিত্রটাই এখানে, এই অক্ষম, দুর্বল অজুহাতে আড়াল করা হয়েছে। পরেশ দত্তের লোভ আর চাতুর্যকে এখানে যেভাবে তার ভালোমানুষী আর স্বীকারোক্তি দিয়ে আড়াল করা হয়েছে, তাতে পরিচালকের আপোশ আর সরলীকরণই বড়ো হয়ে উঠেছে, যেন একটা কিশোরপাঠ্য ফ্যান্টাসি হয়েই শেষপর্যন্ত থেকে গেছে তার সিনেমাটি, দেশ ও সমাজের সত্যকে তা কোনওভাবে উন্মোচিত করতে পারেনি! সত্যজিৎ রায়ের এই আংশিক ব্যর্থতার জন্যই জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিনয় করেও তুলসী চক্রবর্তীর মতো এক অভিনেতার জীবনে ‘পরশ পাথর’ সিনেমাটি শেষপর্যন্ত একটা ট্র্যাজেডি হয়েই থেকেছে! ভারতের চিরশ্রেষ্ঠ দুই পরিচালক তুলসী চক্রবর্তীকে সামান্যই ব্যবহার করতে পেরেছেন। ঋত্বিক ঘটকের ‘অযান্ত্রিক’ সিনেমায় ছোট্ট একটি রোলে অভিনয় করেছেন তুলসী। সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালি’ ছবিতে তার প্রসন্ন গুরুমশাইয়ের ভূমিকায় অভিনয় অবশ্য স্মরণীয় হয়ে আছে। প্রসন্ন অত্যন্ত কঠোর গুরুমশাই হিসাবে, সেইসঙ্গে সে একজন চতুর খুচরো ব্যবসায়ী, লোকে তাকে খাতির করে, তার ওপর নির্ভর করে, গ্রামের নিদারুণ দারিদ্র্যের পটভূমিতে সে এক রাশভারী চরিত্র, মনস্তত্বের বিভিন্ন এই স্তরকে অল্প কয়েক মিনিটের অভিনয়ে নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তুলসী চক্রবর্তী। নির্মল দে-র ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে তুলসীই তো নায়ক! চারপাশে অনবদ্য অভিনয়ের ছড়াছড়ি। একদিকে উত্তম-সুচিত্রা, অন্যদিকে ভানু-জহর-নবদ্বীপ ত্রয়ী, কিন্তু সিরিওকমিক অভিনয়ে সবাইকে ছাপিয়ে যান তুলসী। বোর্ডিংয়ের ছোকরা যুবকদের অভিভাবক হিসাবে, বাবা হিসাবে, স্বামী হিসাবে, প্রেমিক হিসাবে, একটি বিপন্ন পরিবারের আশ্রয়দাতা হিসাবে, চাকরের সঙ্গে ব্যবহারে কর্তা হিসেবে, কত বিচিত্র ভূমিকা মিশে গেছে ওই একটি চরিত্রে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি অনবদ্য। কী সাবলীল দক্ষতায় একটি ভূমিকা থেকে অন্য ভূমিকায় চলে গেছেন তিনি, কোথাও সেই অনায়াস যাতায়াতকে আরোপিত বলে মনে হয় না, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং সবটা মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এক অসম্ভব মৌলিক ব্যক্তিত্ব। এই ব্যক্তিটি উদার, খোলামেলা, রসিক ও স্নেহশীল। তাঁর কৌতুকবোধ বারবার তাকে বিশিষ্ট করেছে।

আরও পড়ুন: শঙ্খ ঘোষ: ‘আমার চলা ছিল আমার নিজস্ব’

আসলে তুলসী যেসব চরিত্রে অভিনয় করেছেন, সেগুলো সংক্ষিপ্ত হলেও বেশ জটিল। একটা সময় বাঙালি জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল এইসব মানুষ। এরা সুযোগ বুঝে দাপট দেখায়, সুযোগ বুঝে উঞ্ছবৃত্তি করে, সুযোগ বুঝে ঝাপিয়ে পড়ে, সুযোগ বুঝে নিজেকে আড়াল করে। বাঙালি জীবনের দোষে-গুণে ভরা ভেতরের রসটি ফুটে ওঠে। এইসব চরিত্রের মধ্য দিয়ে। এরা নির্ভেজাল বাঙালি, তারা অনায়াসে ঠকে এবং ঠকায়, অতি মামুলি এদের জীবন, তবু এই জীবন বৈচিত্র্যময় রসে পরিপুষ্ট, কৌতুকবোধে জারিত। জীবনানন্দ দাশ যেমন একজন বিশ্বমানের কবি হয়েও নির্ভেজাল বাঙালি, দেবব্রত বিশ্বাস যেমন একজন বিশ্বমানের গায়ক হয়েও নির্ভেজাল বাঙালি, তুলসী চক্রবর্তীও তেমনই একজন বিশ্বমানের অভিনেতা হয়েও নির্ভেজাল বাঙালি। তাঁর অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতীয় চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলিই তার দোষ-গুণ নিয়ে নির্ভেজালভাবে ফুটে ওঠে। তাঁর মতো অভিনেতাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার মতো উপযুক্ত মেধা ও পরিকাঠামো তার সময়ের বাংলা সিনেমায় ছিল না। সেই সময় একঝাঁক বিশ্বমানের অভিনেতা একসঙ্গে বাংলা সিনেমায় অভিনয় করতে এসেছিলেন। কিন্তু তুলসী চক্রবর্তী, ছবি বিশ্বাস, উত্তম কুমার, উৎপল দত্ত, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, সন্তোষ দত্ত, অনিল চট্টোপাধ্যায়, পাহাড়ী সান্যাল, কানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, বিকাশ রায়, বসন্ত চৌধুরী প্রমুখ বাংলা সিনেমায় যে স্বর্ণযুগ এনেছিলেন, তা সেই উচ্চতায় পৌঁছতে পারেনি, উপযুক্ত মেধা ও পরিকাঠামোর অবলম্বন পেলে যেখানে পৌঁছতে পারত! নিজেদের প্রতিভার তুলনায় যৎসামান্য স্বীকৃতিও তাঁদের জোটেনি। তবু মূলত সত্যজিৎ রায় এবং কিছুটা ঋত্বিক ঘটক ছিলেন বলেই এরা কখনও কখনও নিজেদের প্রতিভার প্রতি সুবিচার করার অপর্যাপ্ত হলেও সুযোগ পেয়েছেন। তুলসী চক্রবর্তীও এর কোনও ব্যতিক্রম নন।

সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে বাইরে’ একটি ব্যর্থ প্রয়াস

সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে বাইরে’ ছবিটি মুক্তি পেয়েছে ১৯৮৪ সালে। সত্যজিতের ছবির যারা মুগ্ধ দর্শক, তাদের কাছে এই ছবিটি হতাশা ছাড়া কি-ই বা জাগাতে পারে? যিনি ‘অপু ট্রিলজি’র মতো ছবি করেছেন, তিনি কী করে এরকম একটি ছবি করতে পারেন, উঠে আসতে পারে এই প্রশ্নটিও। সত্যজিৎ বারবার রবীন্দ্রনাথ থেকে সরে গেছেন। এই সরে যাওয়াটা কোনও সমস্যা নয়। সমস্যা হল, তিনি কোথায় সরে গেছেন? ‘ঘরে বাইরে’র মতো জটিল একটি দার্শনিক ও রাজনৈতিক উপন্যাসকে নিয়ে তিনি যে জগাখিচুড়ি তৈরি করেছেন, তাতে দেশ, সমাজ, রাজনীতি ও ইতিহাসকে বুঝতে সত্যজিতের অক্ষমতাই আবার প্রকট হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন: প্রকৃত কবিতা থাকে শুভকামনার মতো জন্মে ও বিদায়ে

গোড়া থেকেই এই সিনেমায় গোলমাল হয়ে আছে। সন্দীপ ভাষণ দিতে গিয়ে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের কথা বলে। ব্রিটিশদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির কথা বলে। ব্রিটিশরা যে ইচ্ছে করে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে বিভেদ ঘটাতে চাইছে সেকথাও বলে এবং ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে সন্দীপ একজন হিন্দু জাতীয়তাবাদী এবং মুসলমান-বিদ্বেষী। তার মধ্যে এই নিয়ে কোনও দ্বিচারিতা নেই। তার মত খুব স্পষ্ট, ‘‘ওদের একেবারে নীচে দাবিয়ে দিতে হবে, ওদের জানা চাই জোর আমাদেরই হাতে।” সত্যজিৎ দেখাতে চেয়েছেন, সন্দীপ মুখে ঐক্যের কথা বললেও ভেতরে ভেতরে মুসলমান-বিদ্বেষী। কিন্তু এখানে মনে রাখা দরকার, ‘ঘরে বাইরে’র ঘটনাগুলি ঘটেছে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পরে, ১৯০৭ সাল নাগাদ। হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতিক্রিয়া হিসাবে মুসলিম জাতীয়তাবাদের সূত্রপাত হয়। ১৯০৬ সালে হিন্দু আগ্রাসনকে ঠেকাতে এবং মুসলিমদের স্বাধীকারকে প্রতিষ্ঠা দিতে মুসলিম লিগের জন্ম হয় ঢাকায়। আর এর জন্য দায়ী ছিল সন্দীপের মতো হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের হিন্দুত্ব নিয়ে প্রবল সংকীর্ণতা। ব্রিটিশদের ফাদে প্রথমে এরাই পা দেয়, পরে সেই একই ফাঁদে পা দেয় মুসলিমরা, আর এই দুই সংকীর্ণ মতান্ধতা ক্রমে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রতিযোগী হয়ে ওঠে, যার চূড়ান্ত ও বিষময় পরিণাম ছিল দেশভাগের ঘটনা। মুসলিমদের নীচে দাবিয়ে সন্দীপ যে হিন্দুরাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে, তা ভারতবর্ষকে কোন বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, সেটাই দেখাতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ। সন্দীপ খামোখা হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের কথা বলতে যাবে কেন?

আরও পড়ুন: মাতৃভাষা দিবসে ‘ভাইরাল’ উত্তম-কিশোর স্মৃতিমাখা গানের দৃশ্য প্রসঙ্গে

Ghare Baire' (1984)

দ্বিতীয় গোলমালটা আরও সাংঘাতিক। সন্দীপ ও নিখিলেশের মধ্যে স্বদেশি নিয়ে ভাবনাচিন্তায় একটা মূল তফাত আছে। সন্দীপ ধ্বংস ও ভাঙনের পক্ষে, বিদেশি সবকিছু ধ্বংস করে সে স্বদেশি সবকিছুকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। চারপাশে সে হিংসার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। মানুষের মধ্যে সে স্বদেশি নামক একটা নেশা ধরিয়ে দিতে চায়। নিখিলেশ সবরকম নেশার বিরুদ্ধে, সে স্বচ্ছ চিন্তার মানুষ। স্বদেশি বলতে সে ভাঙন নয়, গঠনকেই বোঝে। গঠনমূলক কর্মসূচির মধ্য দিয়েই সে স্বদেশি করতে চায়। স্বদেশি ব্যাঙ্ক, স্বদেশি শিল্প, এইসব প্রয়াস তারই নমুনা। কিন্তু তার এই গঠনমূলক কর্মসূচি জনসমর্থন পায় না, কিন্তু সন্দীপের ভাঙনমূলক কর্মসূচি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যুবকদের মধ্যে উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। দেশ গড়ার কাজে হিংসা ও ভাঙনের সমর্থক ছিলেন না রবীন্দ্রনাথ। তিনি সবসময় নতুন নতুন গড়ে তোলায় ব্যাপৃত হয়ে দেশ গড়ে তোলার পক্ষপাতী ছিলেন। এ ব্যাপারে নিখিলেশের দূরদর্শিতাকে বাহবা না দিয়ে উপায় থাকে না। মুশকিল হল, স্বদেশি নিয়ে গঠন ও ভাঙনের এই বিরোধের কথাই সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে কোথাও আসেনি। চন্দ্রনাথবাবু সন্দীপের দিকে অনেক উষ্ণ বাক্য ছুড়ে দেন, তিনি নেতাদের স্বার্থপরতা, জনপ্রিয়তার লোভ, দুর্নীতি ইত্যাদি নিয়ে অনেক বড় বড় কথা বলেন, কিন্তু কোথাও আসল সমস্যাকে স্পর্শ করেন না। নিখিলেশ ও সন্দীপের মধ্যে মতাদর্শগত বিরোধটা আসলে ঠিক কোথায়, তাকে কোথাও স্পষ্টভাবে চিনিয়ে দেন না।

আরও পড়ুন: প্রকৃত কবিতা থাকে শুভকামনার মতো জন্মে ও বিদায়ে

আর সন্দীপও যখন গরম গরম ভাষণ দেয়, তখনও যেন তার রাজনৈতিক বক্তব্য ঠিক দানা বাধে না। আসলে ‘ঘরে বাইরে’ একটি সুমহান ও আদ্যন্ত রাজনৈতিক উপন্যাস। আর সত্যজিৎ রায় যখনই রাজনীতিতে ঢুকতে গেছেন, তখনই যেন তার চিত্রনাট্য বলিষ্ঠতা হারিয়ে ফেলেছে, নিজের দুর্বলতাকে তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। সত্যজিতের রাজনৈতিক ভাবনা খুব দুর্বল, ব্রিটিশ-বিরোধী কিছু বস্তাপচা, অগভীর শব্দস্রোতে তা সীমাবদ্ধ, তার মধ্যে কোনও গভীরতা বা উন্মোচন নেই। সন্দীপ শুধুমাত্র একজন জাতীয়তাবাদী নয়, একজন শ্রেণিশত্রুও বটে। জমিদারের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা এই বুর্জোয়া নেতার জীবনে শখ-আহ্লাদ-আমোদ-আরামের অভাব নেই, কিন্তু গরিব মানুষদের প্রতি সমবেদনার অভাব আছে। সে অনায়াসে স্বদেশির নামে গরিব মানুষদের ক্ষতি করতে পারে, তাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে, পুড়িয়ে দিয়ে পথে বসাতে পারে। মিথ্যা, প্রতারক এক ভবিষ্যতের কথা বলে সে তাদের ভুলিয়ে রাখতে চায়। সন্দীপের মধ্যে যে এক ঘৃণ্য ও চতুর রাজনৈতিক প্রতারক লুকিয়ে আছে, রবীন্দ্রনাথ তাকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। অন্যদিকে, নিখিলেশের অবস্থান ভিন্ন শ্রেণিতে হলেও সে গরিব মানুষের ব্যাপারে সহমর্মী, তার মধ্যে কোনও শ্রেণিবিদ্বেষ বা শ্রেণি-ঔদাসিন্য নেই। সত্যজিৎ হয়তো এই শ্রেণিশত্রুর মুখোশটি খুলে দিতে আরও তৎপর হতে পারতেন, কিন্তু শ্রেণি-ভাবনাটি তাঁকে কখনোই সেভাবে ভাবায়নি। পঞ্চ, মিরজান বা নকুর মতো চরিত্রেরাই তার সিনেমায় অনুপস্থিত।

আরও পড়ুন: ‘বনলতা সেন’ আসলে মৃত্যু, জন্ম থেকে জন্মান্তরে যাবার বিশ্রাম

ধর্ম, স্বদেশি বা জাতীয়তাবাদ ও শ্রেণির পর আসে অর্থের অসংগতি। মিরজানের নৌকোটি ডুবিয়ে দেওয়ার পর সন্দীপের সহযোগী ও নিখিলেশের নায়েব তাকে ক্ষতিপূরণ বাবদ পাঁচ হাজার টাকা রেডি রাখতে বলে। এটাই মূল উপন্যাসে নেই আর সমস্যার সূত্রপাত এখানেই। এই নৌকোটি করে নিখিলেশের জমিদারিতে বিলিতি দ্রব্য আসত। সেই যোগাযোগের সেতুটি উড়িয়ে দেয় সন্দীপ। সন্দীপ বিমলার কাছে গিয়ে এই পাঁচ হাজার টাকাই চায়। কিন্তু পরে অমূল্যর জবানিতে জানা যায়, সাড়ে তিন হাজার টাকা হলেই সন্দীপের চলে যাবে। অমূল্য নাকি হিসেব করে দেখেছে। প্রশ্ন হল, ক্ষতিপূরণ-বাবদ যেখানে নায়েব পাঁচ হাজার টাকা রেডি রাখতে বলে, সেখানে কোন যুক্তিতে অমূল্য জানায় সাড়ে তিন হাজার টাকা। হলেই চলে যাবে? মূল উপন্যাসে আছে, মিরজান দু’হাজার টাকা চেয়েছিল। সন্দীপ বাড়িয়ে পাঁচ হাজার চায়। এখানে নায়েব পাঁচ হাজার রেডি রাখতে বলে। সন্দীপ তাই চায়। কিন্তু অমূল্য নিজের হিসাব অনুযায়ী বিমলাকে জানায় সাড়ে তিন হাজারের কথা, সন্দীপের নাকি সেটা হলেই চলে যাবে। ফলে অঙ্কের হিসাব নিয়ে দারুণ গরমিল দেখা দেয়। কার হিসাবটা ঠিক, অমূল্যের না কি নায়েবের? হিসাব যারই ঠিক হোক, এখানে সন্দীপ পাঁচ হাজার চেয়েছে নায়েবের কথাতে। এখানে সে বাড়িয়ে কিছু চায়নি। ফলে সন্দীপ যে লোভ করেই বিমলার কাছে বেশি টাকা চেয়েছিল, সেই ব্যাপারটাই সত্যজিতের ছবিতে অনুপস্থিত।

আরও পড়ুন: রঙের গাঁ খোয়াবগাঁ

The Home and the World (rewatch) | Martin Teller's Movie Reviews

কিন্তু এর চেয়েও বড় মুশকিল হয় পরবর্তী ঘটনাগুলোয়। সন্দীপই মূল উপন্যাসে বিমলার কাছে টাকা চায়। কিন্তু সিনেমায় বিমলাই উদ্যোগী হয়ে বারবার সন্দীপকে অর্থসাহায্য করার জন্য আবেদন জানায়। সন্দীপের কথায় নিজের সিন্দুক থেকে সে নিজেই চুরি করে। যে প্রবল আত্মদংশন এই সময় তার মধ্যে সক্রিয় থাকে সেটাই সত্যজিতের ছবিতে অনুপস্থিত। সিনেমায় বিমলার মধ্যে কোনও দ্বিধা নেই, সে চুরি করে অনায়াসে সন্দীপকে সোনার মোহরগুলি এনে দেয়। ঠিক সেই সময় নাটকীয়ভাবে সেখানে নিখিলেশ এসে উপস্থিত হয়। সন্দীপকে সে তার জমিদারি ছেড়ে চলে চাওয়ার নির্দেশ দিয়ে যায়। অত বড় বড় দুটো পুঁটুলি বা সোনার মোহর কিছুই তার চোখে পড়ে না। সত্যজিতের সিনেমায় এই ধরনের কাঁচা কাজ অভাবনীয় মনে হয়। মূল উপন্যাসে এসব কিছুই নেই। অমূল্যকে বিমলা ডেকে পাঠায় কয়েক দিন পরে। তার কাছে নিজের গয়নার বাক্স তুলে দিতে চায়। ঠিক সেই সময় ওই ঘরে প্রথমে সন্দীপ, পরে নিখিলেশ এসে ঢোকে। আসলে সন্দীপকে সতর্ক করতে এবং তার জীবন বাঁচাতেই আসে নিখিলেশ। পরে সত্যজিতের সিনেমায় একথা সে বলেও। কিন্তু ওই ক্লাইম্যাক্সের মুহূর্তে বিমলার সামনে সন্দীপের কুকীর্তিগুলো একে একে ফাঁস করে দেয় নিখিলেশ। বিমলার সামনে সন্দীপের মুখোশটি খুলে দিতে চায়। ফলে নিখিলেশের চরিত্রের আসল মাহাত্ম্যই এতে থাকে না। অন্যদিকে, বিমলার ভেতরকার দ্বিধা ও অনুশোচনাকেও তুলে ধরতে ব্যর্থ হন সত্যজিৎ। সন্দীপ গরিব মানুষদের কত ক্ষতি করেছে, মোটা দাগে এই কথাটা বিমলাকে বুঝিয়ে দেওয়ার পর তবেই বিমলা আসল সন্দীপকে চিনতে পারে!

আরও পড়ুন: ভাষার মাস কেন নয় ফাল্গুন

বিমলা অমূল্যকে কলকাতায় পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু অমূল্য সাফ জানায়, কলকাতায় না গিয়ে, গয়না না বেচেও সে বিমলার প্রয়োজনীয় টাকা এনে দেবে। কাছাড়ি থেকে, সেদিন রাতেই। মূল উপন্যাসে কিন্তু আছে, অমূল্য কিছুতেই বিমলাকে বলতে চায়নি, টাকাটা সে কোথা থেকে এনে দেবে! আর সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সত্যজিতের সিনেমায় অমূল্য অকপটে নিজের পরিকল্পনার কথা বিমলাকে বলে দেয়, এমনকী হাতের অস্ত্রটিও বিমলাকে দেখায়। বিমলা সব শুনে বাধা দেয়, কিন্তু অমূল্য শোনে না। এদিকে বিমলার সঙ্গে সন্দীপের সম্পর্কের সুরটা ইতিমধ্যেই কেটে গেছে। তার আগে অবশ্য বিলিতি কায়দায় সন্দীপ বিমলাকে একাধিকবার চুম্বন করেছে। সন্দীপের স্বদেশিটা যে কতটা বাইরের লোকদেখানো, তার সিগারেট থেকে চুম্বন, সবটাই বিলিতি, সেটাই যেন দেখাতে চেয়েছেন সত্যজিৎ। বিমলা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে, নিখিলেশের কাছে সমস্ত স্বীকারোক্তি করেছে, সন্দীপ নিজে তাদের বেডরুমে এসে সমস্ত মোহর ফেরৎ দিয়ে গেছে। শেষবিদায়ের আগে নিখিলেশও একদম সন্দীপের মতোই বিলিতি কায়দায় বিমলাকে চুম্বন করেছে। আর এটাই যেন ঠিক বোঝা যায় না। নিখিলেশের স্বদেশি তো সম্পূর্ণ খাঁটি, তাহলে তাকে দিয়ে অমন বিদেশি চুম্বন করানোর অর্থ কী, সত্যজিতের এই ব্যাপারটা সিনেমায় ঠিক যেন স্পষ্ট হয় না।

আরও পড়ুন: পঞ্চাশ পূর্ণ ‘বাবু মশাইইই…’

সত্যজিৎ তাঁর সিনেমায় নিখিলেশের ভূমিকায় বেছেছেন ভিক্টর ব্যানার্জিকে। বিয়ের পর স্বামীকে দেখে দীর্ঘ নিশ্বাস পড়েছিল বিমলার। তার মনে যে রাজপুত্রটি লুকিয়েছিল, তার সঙ্গে একমই মেলে না। ভিক্টরের সঙ্গেও আসল নিখিলেশের মেলে কি? ভিক্টর যথেষ্ট সুপুরুষ নন কি? নিখিলেশের চরিত্রে অবশ্য চমৎকার অভিনয় করেছেন ভিক্টর, একজন মার্জিত, শান্ত, রুচিসম্পন্ন, সজ্জন, প্রাজ্ঞ মানুষ, যার ব্যক্তিত্বে কোনও তাকলাগানো ব্যাপার নেই। তবু কোথাও গিয়ে যেন ভিক্টরকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মনে হয় না, যেন কিছুটা আরোপিতই মনে হয় তাঁর অভিনয়। বরং সেদিক থেকে সন্দীপের ভূমিকায় সৌমিত্রর অভিনয় অনেক স্বাভাবিক ও বলিষ্ঠ, ধূর্ত, লোভী ও কামুক একটি চরিত্রকে তিনি অনায়াসে ফুটিয়ে তুলেছেন। মুশকিল হয়েছে বিমলাকে নিয়ে, স্বাতীলেখা বিমলা চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ বলেই মনে হয়। তাঁর ব্যক্তিত্বে ও আচরণে সেই সম্মোহনী আকর্ষণ বা আবেদন নেই, অনেক সময় তিনি কী আচরণ করবেন, কী অভিব্যক্তি প্রকাশ করবেন, সে ব্যাপারে তাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতোই লাগে। দর্শকের মনে কোনও প্যাশন জাগিয়ে তুলতে তিনি পারেননি, ফলে তীব্র প্যাশনের মুহূর্তেও তাকে ঠিক উদ্দীপিত মনে হয় না, ফলে সৌমিত্রকেও সেইসব মুহূর্তে অসহায় লাগে। এমনকী বিমলার চোখে ধরা পড়ে যাওয়ার মুহূর্তেও সন্দীপের বিপন্নতা ও দুর্বলতা ঠিক যেন পরিস্ফুট হয় না, বিমলার পাথুরে আড়ষ্টতার পাশে নিজেকে প্রকাশ করতে গিয়েও সে যেন বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ফিরে আসে। সবমিলিয়ে, ব্যর্থতার বহুমাত্রিক ছবিটিই যেন ক্রমে স্পষ্ট হতে থাকে।

সত্যজিৎ রায় এই সিনেমায় মূল উপন্যাসের তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণের পরিবর্তে একটিই নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণকে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। তিনি পুরুষের দৃষ্টিকোণকে অনুপস্থিত রেখে শুধুমাত্র একটি নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্ত ঘটনাগুলিকে দেখতে চেয়েছেন। এই নারী চার দেওয়ালের সংকীর্ণতাকে অতিক্রম করে বাইরের দুনিয়ার অংশ হয়ে উঠতে চায়, বাইরের দুনিয়ার মোহ তাকে আকৃষ্ট করে, কিন্তু শেষপর্যন্ত এই মোহ তাকে ভ্রান্তির কোনও চোরাবালির দিকে ঠেলে দিয়েছে তাকেও বুঝতে পারে, সে ফিরে আসতে চায় নিজের নিরাপদ, সুখী গৃহকোণে, কিন্তু ততদিনে নিজেই সে নিজের শাস্তির ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে ফেলেছে। সন্দীপ কাপুরুষের মতো পালিয়ে যায়, কিন্তু যে আগুন যে জ্বালিয়ে গেছে এবং যে আগুনে। বিমলা ইন্ধন জুগিয়ে গেছে, তাতে আত্মাহুতি দিতে হয় নিখিলেশকে। দাঙ্গা শুরু হয়, যার উৎসে থাকে সন্দীপের নিরন্তর প্ররোচনা, ধর্ম ও শ্রেণিগত বিদ্বেষ, মুসলমান ও গরিবদের ওপর অত্যাচার। এভাবেই গোটা ব্যাপারটাকে হয়তো দেখাতে চেয়েছেন সত্যজিৎ রায়।

কিন্তু বিমলা তো আরও অনেক বেশি জটিল চরিত্র। সন্দীপকে তার দরকার ছিল, নিজেকে নারী হিসেবে পূর্ণভাবে চেনার জন্য। এ এমন এক নারী, নিজের জন্য সীমাবদ্ধ গৃহকোণকে ছাপিয়ে যে এক বৃহত্তর পরিসর খুঁজে নিতে চায়, সেই পরিসরকে যে নিজের দেশ বলে শনাক্ত করতে চায়। এ শুধু নারী-পুরুষের সম্পর্কের গল্প নয়, একজন নারীর নিজেকে নারী হিসাবে খুঁজে নেওয়ারও কাহিনি। বিমলার এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা, প্যাশন ও বলিষ্ঠতাই সেই যুপকাষ্ঠ হয়ে ওঠে, যেখানে সে বলি দিতে বাধ্য হয় নিজের স্বামী ও সুখী গৃহকোণকে। পরে সেখানে ফিরে আসতে চেয়েও সে পারে না, দেশের অশান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিই যেন নিয়তির মতো তাকে ফিরতে দেয় না, তাকে প্রায়শ্চিত্তের দিকে ঠেলে দেয়। বিমলা এক আদর্শবাদী নারী, নিজেও সে সবসময় একজন আদর্শ পুরুষকেই খোঁজে। তাই যখনই তার মোহ কেটে গেছে, সন্দীপের মধ্যে এক লোভী, কামুক ও প্রতারক পুরুষকে সে আবিষ্কার করেছে, তখনই সে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। পুরুষের মধ্যে কোনও দুর্বলতাকেই বিমলা সহ্য করতে পারে না, নিখিলেশের বিনীত স্বভাবকে দুর্বলতা ভেবে প্রথমে সে ভুল করেছিল। এই সবল পুরুষের খোঁজেই সে সন্দীপের দিকে সবেগে ধাবিত হয় এবং প্রতারিত হয়। কিন্তু এই ভুলও তার ভাঙে, সন্দীপের বাইরের শক্ত খোলসের আড়ালে থাকা একজন কাপুরুষ তার চোখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, তার স্বামীর ওপরের ভদ্রতার আড়ালে থাকা ভেতরের স্থিতপ্রাজ্ঞ মানুষটিকেও সে চিনতে পারে।

অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই বিমলা নিজেও এইভাবে প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে। বিমলার অন্তর্গত এই বিশৃঙ্খলাকে যেন বাইরে থেকেই দেখেছেন সত্যজিৎ রায়, ঠিক যেন তার ভিতরে প্রবেশ করতে পারেননি। বিমলা স্বাতীলেখার সাধ্যাতীত ছিল, স্বাতীলেখার আড়ষ্ঠ, কুণ্ঠিত ও আবেদনহীন অভিনয় বিমলা চরিত্রের বিপুল বৈচিত্র্য ও বিস্তারের ছায়ামাত্র স্পর্শ করতে পারেনি বলেই মনে হয়। তাছাড়া বিমলা একটা সময়েরও ফসল। সত্যজিৎ সিনেমার নিপুণ ও অবিস্মরণীয় শিল্পী। কিন্তু তিনি সমাজ, রাজনীতি ও ইতিহাসের পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক হিসাবে কতটা সফল হয়েছেন, কতটা গভীরে যেতে পেরেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন বারেবারেই উঠে আসতে পারে।

লেখক রাহুল দাশগুপ্ত ইউনিভার্সিটি গ্লান্টস কমিশনের স্কলারশিপ নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট। পড়িয়েছেন যাদবপুর ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলায় প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক। কর্মসূত্রে যুক্ত ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির সঙ্গেও। কলকাতার লিটল ম্যাগাজিন ও গবেষণা কেন্দ্রের ‘তরুণ প্রাবন্ধিক সম্মাননা’র প্রথম প্রাপক। ২০১৭ সালে পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার। বাংলা উপন্যাসের প্রথম অভিধান ‘উপন্যাসকোশ’ গ্রন্থটির জন্য পান ‘দীপক মজুমদার সম্মাননা’। ২০১৮ সালে পেয়েছেন ‘কবিপত্র’ সম্মান, ‘মানুষ দাশগুপ্ত স্মৃতি সম্মাননা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেড়শো বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকায় ভারতীয় কবি হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। মনিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছেন সাহিত্য অকাদেমির আমন্ত্রণে কবিতা অনুবাদের ওয়ার্কশপে। বিভিন্ন জায়গায় বক্তব্য রাখার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন। সম্পাদনা করেছেন বেশ কিছু বই। বিভিন্ন দৈনিক পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। এক সময় সম্পাদনা করেছেন ‘এবং সমুদ্র’ পত্রিকা, এখন করেন ‘চিন্তা’ পত্রিকা। পোস্ট ডক্টরেট করেছেন গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের ইন্দোলজি বিভাগে। কর্মসূত্রে গার্ডেন হাই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত। ভালবাসেন বই পড়তে, সিনেমা দেখতে এবং মেয়ে উপাসনার সঙ্গে সময় কাটাতে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *