করোনাকালের ডায়রি ১

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

ঠিক যখন এই লেখাটা লিখতে বসেছি, মোবাইলে মোবাইলে ঘুরছে সম্ভাব্য লকডাউনের ত্রাস। রাস্তায় লোক ফিকে হয়ে আসছে। মাঝেমাঝেই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ভেসে আসছে অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ। চাপা ফিসফিস। আবার কারও ঘরে সর্বনাশ বয়ে এলো বুঝি। ঘনঘন ফোন বেজে উঠছে। প্রিয় মানুষ ফোনের ওপারে। ‘‘হ্যাঁরে অমুক হাসপাতালে তোর কেউ জানাশোনা আছে। সাতদিন হয়ে গেল মানুষটা আইসিইউ-তে। কেমন আছে কী করছে, কিছুই জানতে পারছি না।” অথবা কেউ ফেসবুকে জানালেন। ‘‘আমাকে যেকোনও উপায়ে একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার জোগাড় করে দেবেন? শ্বাস নিতে পারছি না…” এইসব। ময়লার মাসি সকালে মাথার ঘাম মুছতে মুছতে চোখ মোছে। পাশের বাড়ির দিদির আঠাশ বছরের তরতাজা ছেলেটা গতকাল দুম করে চলে গেল। বিয়েটাও করতে পারল না। ঠিক এইরকম সময়ে দাঁড়িয়ে পয়লা মে সুরসম্রাট মান্না দে-র জন্মজয়ন্তী আমরা কেমনভাবে কোন মানসিকতায় পালন করব, এই অনুসন্ধানেই এই লেখা।

আরও পড়ুন: আমি না গেলে মান্নাবাবু গান গাইবেন না, বলেছিলেন প্রবাদপ্রতিম তবলাবাদক রাধাকান্ত নন্দী

আমি আপাতত প্রাবন্ধিক বা নিবন্ধ রচনার প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলাম। পাঠক আমাকে শুধুই একজন ডায়েরি লেখক ভাবুন। ১৯১৯ সালের পয়লা মে প্রবোধচন্দ্র দে। এই মানুষটিই যেসব বাঙালির মনের মধ্যে বসে থাকা সেই মান্না দে, তা বলবার অপেক্ষা রাখে না। তার ছোটবেলা থেকে সুরের তালিম, কৃষ্ণচন্দ্র দে-র সান্নিধ্য, পরে শচীন দেব বর্মণের আশীর্বাদ ও তারপর অবশেষে মুম্বইয়ের ভেন্ডিবাজার ঘরানায় প্রবেশ নিয়ে নতুন করে কিছুই বলবার নেই। ওস্তাদ আমন আলি খানের সুরসান্নিধ্যে তখন মান্না দে ছাড়াও তালিম নিচ্ছেন লতা মঙ্গেশকর ও বসন্তরাও দেশপান্ডের মতো কিংবদন্তি। এই ঘরানা থেকেই বেগম আখতার, কিশোরী আমনকার, সুমন কল্যাণপুর বা আশা ভোঁসলের আত্মপ্রকাশ। কিন্তু আমি মান্না দে-র সেই প্রথম জীবনের সাফল্য ও কঠোর সংগ্রামের এপিটাফেও নিজেকে একাগ্র করব না। বরং ‘মুম্বই’ নামটা শোনামাত্রই যখন বুকের ভিতর ছ্যাঁৎ করে উঠছে ভয়ে, ঠিক সেইরকম একটা সময়ে দাঁড়িয়ে আমি মান্না দে-র তিনটি প্রিয় গানের আড়ালে নিজের মধ্যে বেড়ে ওঠা উৎকণ্ঠা প্রকাশ করি এই লেখায়।

আরও পড়ুন: আমাদের প্রতিটা দিনই মে দিবস

অবশ্য এই আড়াল করবার পিছনে কোনও ‘পালিয়ে যাওয়া’ নেই। বরং একে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ ভাবাই ভালো। এই অভূতপূর্ব পরিবেশে যখন অস্তিত্বরক্ষাই একটা চ্যালেঞ্জ, ঠিক সেইখানে দাঁড়িয়ে বারবার যে গানগুলি ভেসে আসছে কানে সেখানে মান্না দে ছাড়াও রয়েছেন আরেক বিখ্যাত বাঙালি যিনি বয়সে হয়তো বছর চারেকের ছোট, কিন্তু মেধায় কোনও অংশে তাঁর কম নন। তিনি সুরের জাদুকর সলীল চৌধুরী। অদ্ভুত কাকতালীয়ভাবে আমার বেছে নেওয়া তিনটি গানের সঙ্গেই এই যুগলবন্দি ক্রিয়াশীল হয়েছে। এই কাকতালীয়তা যে নেহাতই সমাপতন নয়, সেকথাতেও আসব বৈকি।

আরও পড়ুন: সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’: সুখপাঠ্যের অন্তরালে

তখন ভারতের সংগীত জগতে ‘মান্না দে’ মোটামুটি একটি পরিচিত নাম। ১৯৫৩ সালে মুক্তি পেল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা থেকে অনুপ্রাণিত ছবি ‘দো বিঘা জমিন’। পরিচালক বিমল রায়ের এই নির্মাণকে অনেক ফিল্ম সমালোচক ইতালীয় নব্য বাস্তবতার অনুবর্তী ভারতীয় নব্যধারার অন্যতম পথিকৃৎ বলে মনে করেন। এই ফিল্মের সংগীত পরিচালক সলিল চৌধুরী সংগ্রামের পদধ্বনি সংগীতের আঙ্গিকে তৈরি করেন এক আশ্চর্য গান। ‘‘ধরতি কাহে পুকার কে, আপনি কাহানি ছোড় যা”। মান্না দে ও লতা মঙ্গেশকর বড় দরদ দিয়ে গেয়েছেন এই গান। এই গানে ফিল্মের কেন্দ্রীয় চরিত্র বলরাজ সাহানিকে দৃপ্ত পায়ে হেঁটে যেতে দেখা যায়। নেপথ্যে চাষিরা চাষ করছে, সোনার ফসল তাদের বলিষ্ঠ হাতে তুলছে গরুগাড়িতে। গ্রামের পল্লিরমণী কুয়ো থেকে জল তুলতে তুলতে গাইছে ‘‘আপনি কাহানি ছোড় যা”, মান্না দে-র কণ্ঠের আকুতি, কোনও কিছুতেই বলরাজ সাহানির কোনও দৃকপাত নেই। তার এই আপাত উদাসীন আচরণের পরও গানটি শুনলে মন কেমন যেন শান্ত হয়ে আসে। কেন এমন? তার সূত্র লুকিয়ে আছে সুরকারের সুর আর গায়কের মুনশিয়ানায়। সুরকার সলিল চৌধুরী একদিকে সেখানে যেমন ‘মার্চ সঙ’-এর আবহ তৈরি করেছেন, অন্যদিকে মান্না দে উদাত্ত কণ্ঠে ভেসে এসেছে রাগ ভৈরবীর মূর্ছনা। এই দুইয়ের সমাহারে গানটি যেন ঠিক এই মুহূর্তের গান হয়ে উঠেছে। মনোগবেষণা প্রমাণ করেছে মানসিক অস্থিরতার অবসান ঘটাতে রাগ ভৈরবীর কার্যকারিতা রয়েছে। এর সঙ্গেই এই গানের পদক্ষেপ তৈরি করেছে একধরনের চরৈবেতি। সেই চরৈবেতি ভর করেই আমাদের প্রত্যেককে উত্তরণের পথে এগোতেই হবে।

আরও পড়ুন: গতকাল যেভাবে এইসব লিখেছিলাম

কিছু গান আছে যা শুনলেই মন ভালো হয়ে যায়। বারবার শুনতে ইচ্ছে করে। তেমনই একটি গান ‘‘বাজে গো বীণা”। ১৯৭৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মর্জিনা আবদাল্লা’ সিনেমার গান। গানের আলাপ থেকেই যে ছলছল টলটল নুপূরের ধ্বনি শোনা যায় তা মনকেও নাচিয়ে তুলতে বাধ্য। এই গানের কণ্ঠে যেমন মান্না দে, সুরকার ঠিক তেমনই সলীল চৌধুরী। এখন প্রশ্ন হল কী এমন আছে এই গানে যা শোনামাত্র এই অতিমারির সময়তেও মন খুশি হয়ে ওঠে? এ-প্রশ্নর উত্তর পেতে গেলে আরও এক দক্ষিণ ভারতীয় গবেষণার কথা জানতে হবে। সেই গবেষণা অনুযায়ী শুদ্ধস্বরের ব্যবহার গানকে অনেকবেশি মনোরম ও হৃদয়গ্রাহী করে তোলে। ফলত জয়জয়ন্তী, বিলাবল প্রভৃতি রাগসংগীত অবসাদে প্রায়ই ব্যবহার করে থাকেন মিউজিক থেরাপিস্টরা। ‘‘বাজে গো বীণা” গানটিতে ব্যবহৃত রাগের নাম ‘রাগেশ্রী’। খাম্বাজ ঠাট থেকে এর উৎপত্তি। ঔড়ব ষাড়ব। একমাত্র কোমল নিষাদ বাদে সবক’টি স্বর শুদ্ধ। তার সঙ্গে দ্রুত কাহারবা তাল। তবে কি এই স্ফূর্তির কারণ এটাই? হয়তো। মান্না দে যখন গানের মাঝামাঝি সঙ্গে গেয়ে ওঠেন, ‘‘সুরে সুরে বাঁধা আছে”, বিক্ষিপ্ত মনের চলনটুকুও যেন রাগেশ্রীর বিন্ন্যাসে ধরা পড়ে যায়। শেষের তাড়ানায় ‘মধণধপধণস*’ যে উত্তরণ তৈরি করে,  তা মনকে সজীব করতে পর্যাপ্ত।

আরও পড়ুন: নীলাঞ্জন হাজরার কবিতা: ‘অস্বীকার করেছি মানচিত্রের কঠোর সীমানা’

আমার আজকের বাছাই তৃতীয় গানটি আরেক বাঙালি হৃষিকেশ মুখার্জি পরিচালিত ছবি ‘আনন্দ’ সেই বিখ্যাত গান ‘‘জিন্দাগি কৈসি হ্যায় পহেলি”। মান্না দে এই গানটিতে যেভাবে মীরের ব্যবহার করেছেন তা অনায়াসে কোনও মনোবিশ্লেষণের কাজে পরীক্ষামূলকভাবে লাগিয়ে দেওয়া যায়। সুরকার সলীল চৌধুরী অন্তরা ও সঞ্চারিতে যেভাবে হঠাৎ কোমল স্বরের ব্যবহার করেছেন, তাতেই ঘানের ভিতরের দর্শন জীবন্ত হয়ে উঠেছে শ্রোতার কাছে। কল্পনা করুন সেই দৃশ্য। সমুদ্রতট দিয়ে রাজেশ খান্না হেঁটে চলেছেন। কিন্তু এই পদচারণা প্রথম সিনেমার বলরাজ সাহানির পদচারণার মতো সপ্রতিজ্ঞ নয়। এই চলন বাঁধনহারা। সেখানে তীব্র সপ্তকে মান্না দে-র মেলে দেওয়া সুর আর উন্মুক্ত আকাশ যেন মিলেমিশে একাকার। এই সুরমূর্ছনা ও বিন্যাসের সমন্বয়সাধন গানটিকে স্বজনহারা বেদনার সঙ্গে ধাতস্ত হবার মনোপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ করে তুলতে পারে। মনোবিদ এলিজাবেথ কুবলার রোজ ‘গ্রিফ ম্যানেজমেন্ট’-এ যার নাম দিয়েছেন ‘স্বীকার করে নেওয়া’ বা ‘অ্যাকসেপটেন্স’। আনন্দ আমাদের বিপর্যয়ের অস্তিত্ব স্বীকার করে নিতে শেখায়। আর সেখানে ঐশ্বরিক দর্শনের বাস্তবায়ন করে তোলেন শ্রদ্ধেয় মান্না দে।

আরও পড়ুন: শঙ্খ ঘোষ: ‘আমার চলা ছিল আমার নিজস্ব’

সম্প্রতি একটি আলোচনায় দেবজ্যেতি মিশ্র বলছিলেন ‘‘এই সময় দাঁড়িয়ে আমাদের ভাবতে হবে আমাদের গান আমরা ঠিক কীভাবে গাইব…”। একথা শুনলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক বছর পর ‘বিটলস’-এর সেই ‘লেট ইট বি’ গানটি কথা মনে পড়ে যায়। পল ম্যাকার্টনি তার ছোটবেলায় হারানো মাকে স্মরণ করে এই গানটি লেখেন। সে ১৯৭০ সাল। ওই গানটি সেই সমকালীন সময়ে তার আবেদন সম্পূর্ণ পালটে ফেলে। সেই গান এই আবহে শুনলে এক লহমায় তার মূল দর্শন পালটে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই একটি অর্থ তৈরি হতে বাধ্য। মান্না দে-র গাওয়া যে তিনটি গানের কথা এখানে বললাম, তাদের ক্ষেত্রেও এই সত্য প্রযোজ্য। লেখার শুরুতেই বলেছিলাম এই গানগুলির নেপথ্যে সুরকার যে সলীল চৌধুরী, তাও নেহাত সমাপতন কিনা অনুসন্ধান করব। সলীল চৌধুরীর যেকোনও সুরের মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োগক্ষমতা এই কারণেই এত গভীর কারণ তার প্রাচ্য-পাশ্চাত্য মিশ্রণে আড়ালে কাজ করে এক ধরনের অনিশ্চয়তা। সেই দোলাচল মান্না দে-ই পারেন মুহূর্তে নির্মাণ করতে। এই অস্তিত্ববাদী সংকটের ঠিক পরমুহূর্তেই এই যুগলবন্দি তৈরি করেন এক ইতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ বা ‘ডিফেন্স’-এর। তাই স্বজনহারা এই মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে মান্না দে-র জন্মজয়ন্তী স্মরণ ক্ষণে এই তিনটি গান ডাক্তার-বন্ধু-পথপ্রদর্শকের মতো আমার সঙ্গে থেকে যাবে চিরকাল।

পরবর্তী পর্ব আগামী শনিবার

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *