করোনাকালের ডায়েরি ৩

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

সম্প্রতি নিঃশব্দে কেটে গেল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একশো ষাটতম জন্মজয়ন্তী। কেন ‘নিঃশব্দে’ বললাম? অবশ্য এই শব্দপ্রয়োগের অন্তরালে দীর্ঘ অভিযাত্রা রয়েছে আমার। ছোটবেলায় যখন স্কুলে পড়ি, তখন রবীন্দ্রজয়ন্তীর সকাল মানেই রাস্তাজুড়ে একের পর এক প্রভাতফেরি, নন্দনচত্বর। ‘ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা’ গাইছেন গীতা ঘটক। তারপর স্কুলবাস। রবীন্দ্রজয়ন্তী মানেই স্কুলের পিটিরুমে সাহিত্যসভা। সেই অনুষ্ঠান ছুটির ঘণ্টার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হত না কিন্তু। স্কুলফিরতি রাস্তায় আকাশে বাতাসে ভেসে আসত ‘তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে প্রাণে’। তখন বুঝতাম না, এই রবীন্দ্রনাথ আসলে একজন প্রাতিষ্ঠানিক লোক। তখনও আমি কাদম্বরীর সুইসাইড নোট পড়িনি। তাই রবীন্দ্রনাথ তখনও আমার কাছে ‘কাল ছিল ডাল খালি’ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে ‘ঠাকুর’ ছিলেন। ঘরে ফিরে আমাদের ছোট ভাড়াবাড়ির বসবার ঘরে বিছানার চাদর সাজিয়ে মঞ্চ তৈরি হত। সেখানে জমে উঠত আমাদের পারিবারিক সাহিত্যসভা। রবীন্দ্রনাথ আমাদের জীবন থেকে অনিশ্চয়তা কাটিয়ে জীবনদেবতা হয়ে উঠতেন।

আরও পড়ুন: যে উপন্যাসে ছড়িয়ে রয়েছে সন্ত্রাস

বেশ কয়েকবছর হয়েছে, নন্দনচত্বর থেকে সেই অনুষ্ঠান সরে এসেছে রাস্তায়। কখনও বা মোহরকুঞ্জে। মানুষ এখন কোনও দেমাকি জলসায় রবীন্দ্রসংগীত গাইতে ভয় পান। গানের রিয়েলিটি শোতে রবীন্দ্রনাথের গান গাইলে তড়িঘড়ি প্রস্তুতি পর্বেই বাতিল হয়ে যেতে হয়। আজকাল রবীন্দ্রজয়ন্তী মানে ন্যাকামি, গঞ্জিকাগিটার আর ‘চাঁদ উঠেছিল গগনে’। করোনা হবার আগেই রবীন্দ্রনাথ যেন আমাদের জীবন থেকে ‘নিঃশব্দ’ হয়ে গেছেন। তারপর করোনাকাল। ঘরফিরতি এই রবীন্দ্রযাপনে শুধুই অ্যাম্বুলেন্সের চিৎকার। নেটজুড়ে নেটিজেনদের বিদগ্ধ বিরক্তি। ঠিক যেন রবীন্দ্রনাথকে আমাদের জানাটা আজ সম্পূর্ণ হয়েছে। আর প্রয়োজন নেই। ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে…’। রবীন্দ্রযাপনকে ছাপিয়ে গেছে অতিমারির আশঙ্কা, অস্তিত্ব সংকট, অক্সিজেনের অভাব। অথচ রবীন্দ্রগানে লুকিয়ে থাকা একটুকরো অক্সিজেনের সন্ধান আজ আমি আপনাদেরকে তুলে দিচ্ছি।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)

আন্তর্জালে ছড়িয়ে থাকা রবীন্দ্র গানগুলির মধ্যে তিনটি গান বারবার নানান কণ্ঠে, আঙ্গিকে, গায়কিতে ফিরে ফিরে আসতে দেখলাম। সেই তিনটি গানের মধ্যে কী এমন আছে যা এই করোনাকালে তাদের এত জনপ্রিয় করে তুলল? দেখা যাক। প্রথম গানটি ‘আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা’। রাগ পিলুর ছায়ায় টপ্পা অঙ্গের গান। পর্যায় প্রেম। ১৯১০ সালে এই গানটির স্বরলিপি সম্পূর্ণ করেন অনাদিকুমার দস্তিদার। ‘কেবল তুমিই কি গো এমনি ভাবে রাঙিয়ে মোরে পালিয়ে যাবে।’ এই করোনা-আবহে এমন প্রেম মনে করিয়ে দেবে গাব্রিয়েল গারসিয়া মারকুয়েজের কলেরার দিনগুলিতে প্রেমের কথা। ধীর ধ্রুপদে এই গানের ছন্দ দাদরা। অর্থাৎ তিন তিন ছয় মাত্রা।

আরও পড়ুন: সর্বজনীন ও সম্প্রীতির আলোকে ‘ঈদ’

দ্বিতীয় গান ‘নাই রস নাই দারুণ দাহনবেলা’। প্রকৃতি পর্যায়ের গান। রাগ মুলতানের ছায়া। সবচেয়ে চমকপ্রদ হতে হয় এই গানের শব্দচয়নে। যখন কবি বলছেন, ‘খেলো তব নীরব ভৈরব খেলা’, ঠিক যেন মনে হচ্ছে কবি নিঃশব্দে দেখছেন আমাদের করোনাযাপন। হাসপাতালের বাইরে উৎকণ্ঠায় ভুগতে থাকা রোগীর আত্মীয়-পরিজনদের দীর্ঘ লাইন, লকডাউনের পথঘাটে ঘূর্ণায়মান নিঃসঙ্গ ধুলোর কুণ্ডলী, আর হু-হু করে নামতে থাকা শরীরের অক্সিজেন পরিমাপ। এই গানের স্বরলিপি ১৯২৫ সালে করেন দীনু ঠাকুর। তাল কাহারবা। গ্রীষ্মের দাবদাহে রাগ মুলতানের মূর্ছনা যেন এই বিষণ্ণতায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

আরও পড়ুন: মরণোত্তর দেহদান আন্দোলনের প্রাণ ব্রজ রায়

তৃতীয় গান বাউল অঙ্গের। ‘আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে’। ১৯১০ সালে এই গানটির স্বরলিপি করেন অনাদিকুমার দস্তিদার। এই গানের তাল দাদরা। এক মন্দ্র দুলকি চালে এই গান আমাদের যেন বিপদের ভিতরেও সেই বৃহৎ ‘আমি’র ঠিকানা এনে দেয়। ‘তাই হেরি তায় সকলখানে’। এই গানে গুরুগম্ভীর অবতরণ না থাকলেও রয়েছে এক গভীর অন্তরদর্শনের পথ।

কিন্তু এই করোনাকালে বারেবারে ফিরে এই তিনটি গানের মুহুর্মুহু ফিরে আসা কি শুধুই তাদের শব্দচয়নের জন্য? সেই প্রসঙ্গে আসি এইবার। এই চরম অসামঞ্জস্যতা, অনিশ্চয়তায় এক সমতার প্রয়োজন। আমরা সকলেই জানি সংগীতে তাল দুই প্রকার। সমপদী ও অসমপদী। সমপদী তালে তালের বিন্যাস সমান থাকে। অসমপদীতে তা থাকে না। দাদরাতে তা বিন্যস্ত তিন-তিনে। কাহারবায় তা চার-চার। বলাই বাহুল্য, আমার বাছাই করা তিনটি রবীন্দ্রসংগীতের তালই সমপদী। তবে কি ছন্দের এই সমতা এই গানের মধ্যে সুপ্ত শ্রূশ্রুষার শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে? কে জানে। হয়তো তাই।

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (১ম অংশ)

কিন্তু সুরবিহীন গান আর শব্দহীন কবিতা কি এক নয়? যদি এই তিন গানের শব্দ, তাল এই সময়ে প্রাসঙ্গিক হতে পারে, তাহলে সুরবিন্যাসে প্রাসঙ্গিকতা কোথায় সে প্রশ্নে আসি। সে আলোচনায় আসবার আগে এক মজার অভিজ্ঞতার কথা বলি। দীর্ঘদিন আইসিইউ আর হাসপাতালে থাকতে থাকতে কিছু কিছু শব্দের ভিতর লুক্কায়িত স্বর খুঁজতে মনে ইচ্ছে জন্মেছিল আমার। সংগীতদর্পণে জেনেছিলাম পৃথিবীর আদিমতম শ্রুতি ও তার থেকে জন্ম নেয়া স্বর মানুষ খুঁজে পেয়েছিল পশুপাখির কণ্ঠস্বর থেকে। তাদের কলকাকলি থেকে জন্ম নিল স্বর ও সুর। গাভীর শব্দে ষড়জ, ভেকের শব্দে ঋষভ। খুঁজে দেখলাম ভেন্টিলেটরের মনিটরে বাজতে থাকা ‘বিপবিপ’ শব্দ আসলে তীব্র ষড়জ। এক অচল ও নিথর শব্দ। শয্যায় শুয়ে থাকা নিথর দেহের মতোই সে অবিচল। তেমনই অ্যাম্বুলেন্সের ধাবমান সুরে কোমল ঋষভ, কোমল গান্ধারের পরেই কড়ি মধ্যমের অবতারণা। ঠিক যেন দ্রুত ও ধাবমান এক টোড়ির আরোহণ ও অবরোহণ। সেই সুরবিন্যাসে যেন মিশে যাচ্ছে জরুরিপরিষেবা যানের ধাবমানতার অস্থিরতা ও সংকট। সেই টোড়ি ঠাট থেকে উৎপন্ন রাগ ‘মুলতান’-এর আশ্রয়ে থাকা ‘নাই রস নাই’ গানটি। যেন এক সংকটকালে হঠাৎ বেজে ওঠা অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ। তার অবরোহণে সেই শিথিল অসহায়তা। ঠিক তখনই হাসপাতালচত্বরে ভেসে এলো কান্নার শব্দ। নীচের উঠোনে বুক চাপড়ে কাঁদছেন এক মহিলা। সদ্য ভাইরাস কেড়ে নিল তাঁর স্বজনকে। তার কান্নার অনুরণিত সুরশব্দে পিলুর কাতরতা ও মানাভিমান মিশে যাচ্ছে। যেন এক মানের মূর্ছনায় দাঁড়িয়ে গাইছেন কেউ। ‘আহা, তোমার সঙ্গে…’। আর তারপর আমার পাশ ছুঁয়ে অনন্তের পথে ভেসে চলেছে পলিথিনে মোড়া ঈশ্বরের দূত। খই ছড়িয়ে দিচ্ছেন শ্মশানসঙ্গীরা। গোরস্থানের পথে নিঃশব্দে চোখ মুচছেন শববাহী মৌলানা। সেখানে কোনও ভাষার বন্ধন নেই, মন্ত্রের আবহ নেই, আজানের সুর নেই। সেই দৃশ্যে শুধুই বাউলের উদাসীনতা। ‘আছে সে নয়নতারায়’।

আরও পড়ুন: ‘চোখের বালি’ই বাংলা সাহিত্যে ঘটিয়েছিল যুগান্তকারী ঘটনা

এক আশ্চর্য কাকতালীয় দৃকক্ষেপের কথায় আসি এইবার। এই তিনটি গানের মধ্যেই একটি বিষয় এক। তিনটি গানেই গান্ধার স্বরটিকে অত্যন্ত মুনশিয়ানায় ব্যবহার করা হয়েছে। কখনও সে শুদ্ধ, কখনও কোমল। মনে করে দেখুন। কিছুদিন বছর আগে কলকাতার এনআরএস হাসপাতালে কোমাচ্ছন্ন এক ব্যক্তি তার চেতনা ফিরে পেয়েছিলেন দরবারি কানাড়ার সুরে। রাগ দরবারি কানাড়ায় গান্ধারের প্রয়োগ অবিসংবাদিত। পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতে এক উন্মত্ত সিংহকে শান্ত করতে সক্ষম হয়েছিল রাগ ভৈরবীর সুরমূর্চ্ছনা। ভৈরবীতে কোমল ঋষভ ও কোমল গান্ধারের ভূমিকা ভোলবার নয়। ‘নাই রস নাই’ গানে ‘তব নীরব ভৈরবখেলার’ অবতরণে কোমল গান্ধার এক অপূর্ব সমাপতন তৈরি করে। আবার ‘আহা তোমার সঙ্গে’ গানটিতে ‘প্রাণের খেলা’ অংশটিতে কোমল গান্ধারের প্রয়োগ ছাড়া অতোটা মর্মর্স্পর্শী হতে পারতো কি। ঠিক তেমনই প্রাণের মানুষ ‘আছেন প্রাণে’ শুদ্ধ গান্ধারে। সেই প্রাণের মানুষ ‘সকল খানে’ কোমল গান্ধার হয়ে নেমে এলেন। এইটুকু কি নেহাতই সমাপতন? নাকি এই অতিমারিকালের শ্রূশ্রুষা! আমার বিনীত আবেদন, যাঁরা মনে করেন, রবীন্দ্রনাথকে যথেষ্ট জানা সম্পন্ন হয়েছে, তাঁরা রবীন্দ্রসংগীতের এই প্রয়োগসম্ভাবনা ভেবে দেখুন। দেখবেন এই অস্তমিত সভ্যতায় যুগপুরুষের মতো হয়তো রবীন্দ্রনাথ আবার হয়ে উঠবেন খেয়ার তরি, আমাদের সকলের অক্সিজেন, আর উত্তরণের প্রতিষেধক।

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *