অতিমারি: স্পর্শ, বৌদ্ধিক মুদ্রা ও শ্রুশ্রূষা

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

অতিমারির সময় আপৎকালীন পরিষেবা দিতে আসা এক অ্যাম্বুলেন্সের চালকের ফোনে বেজে উঠল হঠাৎ, ‘‘একটুকু ছোঁয়া লাগে, একটুকু কথা শুনি”। টেবিলের এইপারে বসে এই গান শুনলে অন্তত করোনাকালে শিউরে উঠতে হয়। ফিসফিস করে বলতে ইচ্ছে করে, ‘‘বলে কি! এই সময়ে যেখানে পরস্পর পরস্পরের মধ্যে শারীরিক দূরত্ব ছ’ফিট রাখাটাই বাঞ্ছনীয়, সেখানে ছোঁয়া স্পর্শ এসবের কথা কী করে বলছেন কবি?” ভাবতে ভাবতেই আপৎকালীন জরুরি পরিষেবা সম্পন্ন করে নিশ্চয়যান তার গন্তব্যে রওনা দেয়। আর আমি ভাবতে বসি। স্পর্শ আর মন, এদের দু’জনের মধ্যে যোগসূত্র কি আদপেই নেই?

আরও পড়ুন: বিশ্ব সাহিত্যে চার চিকিৎসক ও বর্তমান অতিমারি

ইউজেন ব্লিউলার

ফ্রয়েডের তত্ত্ব মানলে স্পর্শ ছাড়া কোনও রকম মনোবিশ্লেষক পদ্ধতিই অসম্পূর্ণ। মনোবিদ ইউজেন ব্লিউলারও এই একই মত পোষণ করতেন। স্পর্শের মাধ্যমে যে চারটি প্রক্রিয়ায় মনোবিকলন ঘটতে পারে, তাদের সুনিপুণভাবে ব্যাখ্যায়িত করেছেন মনোবিদ মিনজ। ১৯৬৯ প্রকাশিত তাঁর একটি গবেষণাপত্রর সূত্র মেনে বলা যায়, একজন ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে তার প্রতি একধরনের অবচেতনিক যৌনাকাঙ্ক্ষা সংঘটিত হয়। কিন্তু মনোবিশ্লেষণ কি শুধুই যৌনতা? স্পর্শর উৎস জঠরে। তাই মিনজ বলছেন স্পর্শ একজন ব্যক্তির কাছে মায়ের স্মৃতি পুনর্জাগরিত করবার মাধ্যম। শুধু তাই নয়। কারোকে স্পর্শ করে কিছু বললে সেখানে একধরনের স্বীকার্যতার সৃষ্টি হয়। এই মনোভাব একাকিত্ব ভুলিয়ে দিতে পারে। আর স্পর্শ একজন ব্যক্তিকে তার কল্পজগৎ থেকে মুহূর্তে ফিরিয়ে আনতে পারে বাস্তবে।

আরও পড়ুন: করোনাকালের ডায়েরি ৩

ক্যাথরিন ব্রিটন

অতিমারি মানুষকে দূরত্ব শেখাল। এতদিনও সে খানিকটা দূরেই ছিল। তবু খানিকটা আড়চুপি ছিল। আজ যেন তাকে বাস্তবিকভাবেই নগ্ন হতে হল এই সত্যে। এই সময়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিচিত্র পোশাক পরতে হচ্ছে। রোগীকে স্পর্শ করা বারণ। করলেও যৎসামান্য। এর প্রভাব সরাসরি কতটা পড়ছে শ্রুশ্রূষা প্রক্রিয়ায়? ১৯৯০ সালের আর্কাইভ সাইকিয়াট্রিক নার্সিং জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র প্রমাণ করছে আর্তকে স্পর্শ করলে তার শ্রুশ্রূষার সম্ভাবনা প্রায় তিনগুণ বেড়ে যায়। আরেকটু বৃহত্তর বৃত্তে একই কথা লিখছেন কলমবিদ ক্যাথরিন ব্রিটন ‘‘পজিটিভ সাইকিয়াট্রি নিউজ ডেইলি”-তে তিনি লিখছেন কাঁধে সামান্য উৎসাহমূলক টোকা একজন লেখককে একটি অসামান্য লেখার দিকে ধাবিত করাতে পারে। পিঠের সামান্য চাপড় একজন খেলোয়াড়কে তার সবটুকু নিঙড়ে টিমপ্লেয়ার করে তুলতে পারে। স্পর্শ কমিয়ে দিতে পারে শরীরের রক্তচাপ। হ্রাস করাতে পারে ভিতরের বাড়তি উৎকণ্ঠা।

কিন্তু এই অতিমারি পরিস্থিতিতে যেখানে স্পর্শ থেকেই সংক্রমণ, আর সংক্রমণ থেকেই অতিমারি, সেখানে এই ইতিবাচক মাধ্যম কী-করে যথাযথ হয়ে উঠবে? এর সমাধানসূত্র খুঁজে পেতে পারেন বৌদ্ধিক মুদ্রাভ্যাসে। বৌদ্ধধর্ম নৃত্যমুদ্রার মতোই বেশ কিছু অঙ্গুলিপ্রতিস্থাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তেমনই পাঁচটি মুদ্রা ও তাদের প্রাসঙ্গিকতার কথা এইবার বলি।

আরও পড়ুন: করোনাকালের ডায়েরি ২

১) ধ্যানমুদ্রা: এই মুদ্রার প্রয়োগ মহাযান বুদ্ধচিন্তায় দেখা যায়। এই মুদ্রায় ডান এবং বাম হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর শীর্ষ পরস্পর পরস্পরকে স্পর্শ করে থাকবে। এই দুই হাতের একটি হল পুরুষ, অন্যটি নারী। একটি মানুষের মন, অন্যটি শরীর। একসময় এই মুদ্রা চিকিৎসক বুদ্ধমূর্তিতে দেখা যেত। কখনও বা সমাধিমূর্তিতেও প্রতিস্থাপিত হত। দুই হাতের আঙুলের এই পারস্পরিক স্পর্শ আসলে মিলনের সংকেতবাহী। মিলন মানেই প্রশান্তি। আর প্রশান্তিতেই আরোগ্য।

আরও পড়ুন: করোনাকালের ডায়রি ১

২) ভূমিস্পর্শ মুদ্রা: শাক্যমুনি তাঁর ডান হাতের আঙুল দিয়ে পৃথিবী স্পর্শ করে থাকবেন। শোনা যায়, এই মুদ্রা ভগবান বুদ্ধ বোধিপ্রাপ্ত হবার পর পৃথিবীকে সাক্ষী রাখতে ব্যবহার করেছিলেন। আগেই বলেছি, মনোবিশ্লেষণে স্পর্শর অনেকগুলি প্রাসঙ্গিকতার একটি হল, সে একজন ব্যক্তিকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনে। ভূমিস্পর্শ মুদ্রা তেমনই এক মুদ্রা।

৩) বিতর্ক মুদ্রা: বুড়ো আঙুল আর তর্জনী স্পর্শ করে একটি গোলক তৈরি করে এই মুদ্রার উৎপত্তি। এই মুদ্রা বুদ্ধ শিক্ষা প্রদান করতে ব্যবহার করতেন। কিন্তু এই গোলক আসলে ভারসাম্যর বাহক। এই মুদ্রায় মানসিক ভর সমতা পায়। অতিমারির অস্থিরতার ভিতর এই সমতারক্ষা খুবই জরুরি।

৪) অভয়মুদ্রা: হাতকে মেলে ধরে অভয় প্রদানের ভঙ্গিতে এই মুদ্রা। ঠিক যেন কেউ অভয় দিচ্ছেন। আশীর্বাদ করছেন। অভয়মুদ্রা দেখলে মনে হবে, আমি আর একা নই। নিয়তিলিখনে যাই লেখা থাক, কেউ একজন ঠিক এই বিপদ সামলে দেবেন। এই মনোবৈজ্ঞানিক ডাইভারসন পরবর্তী সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক করে তুলবে।

৫) অঞ্জলিমুদ্রা: অনেকটাই ভারতীয় নমস্কার বা নমস্তে পদ্ধতিতে মেলে ধরা এই মুদ্রা। এই মুদ্রায় দুই হাত পরস্পর পরস্পরকে স্পর্শ করে নিবিড়ভাবে। এর ফলে তৈরি হয় একধরনের নিরাপত্তার। বাড়তি রক্তচাপ কমে যায়। আর এই অভিবাদনের পরিবেশ মনের ভিতর কোনও কিছুকে গ্রহণ করবার শক্তি সৃষ্টি করে। অতিমারির সময় এই সত্যকে গ্রহণ করার ক্ষমতা যার যতো বেশি, মানসিকভাবে সে ততটাই শক্তিশালী।

ক্রমশ…

মুদ্রার ছবিগুলি এঁকেছেন কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তীর জন্ম কলকাতায় (২৭ নভেম্বর ১৯৮০)। কিন্তু তাঁর কলকাতায় বসবাস প্রায় নেই। পেশাগতভাবে তিনি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষালাভ কলকাতা ন্যাশানাল মেডিক্যাল কলেজে। পরবর্তীতে মনোবিজ্ঞানে গবেষণার জন্য বিচ্ছিন্নভাবে কিছু স্বীকৃতি পেয়েছেন। কর্মসূত্রে ঘুরে বেড়ান গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেখানে নানান মানুষ। বিচিত্র সেইসব মনের গতিপথ। সেখান থেকেই হয়তো ইন্ধন পেয়ে বেড়ে উঠেছে তার লেখালিখির জগৎ। প্রথম কাব্যগ্রন্থ আকাশপালক (পাঠক)। এর পর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলি হল শিকারতত্ত্ব (আদম), আড়বাঁশির ডাক (দাঁড়াবার জায়গা), জনিসোকোর ব্রহ্মবিহার (পাঠক), কানাই নাটশালা (পাঠক), বহিরাগত (আকাশ) প্রভৃতি। কবিতাথেরাপি নিয়ে কাজ স্বচেষ্টায় গবেষণা করে চলেছেন। এই বিষয়ে তার নিজস্ব প্রবন্ধসংকলন ‘ষষ্ঠাংশবৃত্তি’ (আদম)। কবিতা লেখার পাশাপাশি গদ্য ও গল্প লিখতে ভালোবাসেন। প্রথম উপন্যাস ‘কাকতাড়ুয়া’। আশুদা সিরিজের প্রথম বই প্রকাশিত ‘নৈর্ব্যক্তিক’ (অভিযান)। ‘মরণকূপ’ গোয়েন্দা আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় অভিযান, যদিও তার বিন্যাস ও বিষয়বস্তুতে সে একেবারেই স্বতন্ত্র। এই সিরিজের তৃতীয় উপন্যাস ‘সাহেববাঁধ রহস্য’ (চিন্তা)। সম্পাদিত পত্রিকা ‘শামিয়ানা’। নেশা মনোরোগ গবেষণা, সংগীত, অঙ্কন ও ভ্রমণ।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *