Latest News

Popular Posts

অতিমারির একাকিত্বে প্রুফ্রকের সঙ্গলাভ

অতিমারির একাকিত্বে প্রুফ্রকের সঙ্গলাভ

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

আজকাল কেমন যেন এক অসারভাব এসেছে মনে। ঘুমের ভিতর স্বপ্নগুলোও কেমন যেন অচেনা লাগে। আজকাল আর মৃত্যু দেখি না তেমন। আলিঙ্গনের স্বপ্নও আসে না রাতে। বরং আজকাল বারবার দেখি কোনও বাসে চড়ে বেরিয়েছি অচেনা মানুষদের সঙ্গে। তাদের সকলের মুখ দ্বিধাগ্রস্ত। তারা যেন কোনও তৃতীয় তলের বাসিন্দা। তাদের একজনের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল হঠাৎই। মিস্টার জে এফ প্রুফ্রক। অবশ্য আগে একেবারেই চিনতাম না বলব না। স্কুলজীবনে টি এস ইলিয়টের কবিতা পড়তে পড়তে বেশ কয়েকবার তাঁর ‘লাভ সং’ পড়েছি। যতবার পড়েছি, সেই একদল মহিলার মতোই নজর আটকে গেছে মাইকেলেঞ্জেলোর মূর্তিতে। কিন্তু করোনাকালে বারবার প্রতিদিন সকালে মোবাইল খুললেই যেখানে মৃত্যুর পাহাড়, সেখানে প্রিয় কবি ইলিয়টের ‘দ্য লাভ সং অফ জে অ্যালফ্রেড প্রুফ্রক’ কবিতার প্রুফ্রক যেন নতুন আঙ্গিকে আমার সামনে বেরিয়ে এলেন। তাঁর চোখমুখে সেই একই রকম দোলাচল। যেন দান্তের নরকদহন থেকে বেরিয়ে আসছে তার অসহায়তা। অনুভূতি আর বাস্তবতার মাঝখানে যেন দাঁড়িয়ে রয়েছেন মিস্টার প্রুফ্রক।

আরও পড়ুন: বিশ্ব সাহিত্যে চার চিকিৎসক ও বর্তমান অতিমারি

অথচ এই লেখা লিখবার ঠিক আগের মুহূর্তেও ভেবেছিলাম ইলিয়টের ‘ওয়েস্টল্যান্ড’ হবে আমার লেখার বিষয়। সেই ভ্রান্তিবিলাস বরফের নিচে স্তব্ধ করব নিজের ভিতরের দোলাচল, বেলাডোনা হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখব সামনের রাস্তা দিয়ে হুটার বাজিয়ে এখনও চলে যাচ্ছে একের পর এক শবের গাড়ি। অথচ আমার হাত কাঁপবে না। বরং আমার মনে পড়ে যাবে ইলিয়টের সেই বাল্যবন্ধু জাঁ ভেরদিনালের কথা। যে কবিতায় ডুবে থাকত দিনের পর দিন। যে একদিন তুরস্কের দেরদানেলের যুদ্ধ সৈনিক চিকিৎসক হয়ে গিয়েছিল। আর ফেরেনি। সেই হাউজস্টাফ দাদার কথা আমার মনে পড়বে, যে আমাকে প্রথম স্যালাইন চালানো শিখিয়েছিল। অথবা সেই দিদিটা। যে প্রথম চুপিচুপি ভাইভা ঘরের বাইরে আমাদের সম্ভাব্য প্রশ্ন বলে ভয় কাটিয়ে দিত। তাঁরা কেউ আজ নেই। তাঁরাও ভারদেনালের মতো যুদ্ধে গিয়ে আর ফেরেনি। ভেবেছিলাম লিখব সেইসব। কিন্তু আমার সেসব লেখা হল কই? আমার পথ আগলে দাঁড়িয়ে প্রুফ্রক তাঁর ভগ্নপ্রায় অস্তিত্ব নিয়ে। আমি কাছে গিয়ে বুঝি। যাকে এতক্ষণ এক অখণ্ড মানুষ ভাবছিলাম, সে আসলে ছোট ছোট অগণিত মুহূর্তের কোলাজ। আমি হলুদ কুয়াশা মুছে দিই জানলা থেকে। কুয়াশা বিড়ালের মতো আমার পায়ের কাছে বসে থাকে। আমি কফির চামচ হাতে নিজের ফেলে আসা দিনের অনুভূতি মাপতে থাকি। আর কোট আর টাই চাপা প্রুফ্রক আমাকে কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে, ‘‘আমি সেই লাযাজারাস। মৃত্যুদেশের নাগরিক।” আমার কী বলা উচিত এখন?

আরও পড়ুন: অতিমারি: স্পর্শ, বৌদ্ধিক মুদ্রা ও শ্রুশ্রূষা

যাঁরা এতক্ষণ আমার কাছে অন্তত এই কিস্তিতে আরও একটি চাবুক আশা করেছিলেন, আমি নিশ্চিত তাঁরা যারপরনাই হতাশ হয়েছেন। তাঁরা হয়তো ভাবছেন এ কেমন লেখা। খানিক চেতন, খানিক অচেতন! আসলে ক্রমাগত মৃত্যু আর শোকবদ্ধ হতে হতে আমি এই সন্ধিক্ষণে যেন উপলব্ধি করছি, আর যা কিছু ঘটে যাক, ধ্বংসের শেষ স্মিত সমুদ্রতটে দাঁড়িয়েও হয়তো মানুষের মধ্যে যা অবিনশ্বর থেকে যাবে, তা হল ভালোবাসা। সেই চিরন্তন প্রেমকে স্পর্শ করবার ক্ষমতা কোনও করোনা বা লকডাইনের নেই। অথচ একথা ভাবতেই কেমন অপরাধবোধ জাগছে মনে। এত সবহারানো হাহাকার চারপাশে। পাথরে মোড়া এক একটা সম্পর্ক, তবু? প্রুফ্রক কিন্তু জুল লাফর্গের ইন্টারনাল মনোলগ আউড়ে চলে। ইলিয়টের শব্দতুলির আঁচড়ে তৈরি হয় এক নতুন কবিতার বিশ্ব যার নাম ফ্যান্টাসমোগোরিয়া। সেই বিশ্বে পালিয়ে যেতে মন চায় বারবার। বোদলেয়ারের সাত ভৌতিক বুড়ো বা জীবনানন্দের সোনালি ডানার চিল সেখানে নেই। সেখানে আছে শুধুই প্রেম আর কঠোর অপ্রেমে মোড়া বাস্তবের দোলাচলে স্তব্ধ মিস্টার প্রুফ্রক আর তাঁর তির্যক অভিক্টোরিয় প্রেমগান যেখানে তিনি ডুবে যেতে চান অনন্ত ঘুমে! তবে কি পালিয়ে যাব? স্যামুয়েলের কান্না ছাপিয়ে মিস্টার প্রুফ্রক যেন জন ডানের কবিতার ঢঙে বলে ওঠেন, ‘‘চলো মৎস্যকন্যাদের গান শুনি।” অথচ তার অনিকেত নিয়তি তার পিছু ছাড়ে না। মনে মনে বলি। কে এই পূর্ণতা দিল তবে? এই ভয়ানক ক্ষণে? আমার চিন্তা বাস্তবতার দেয়ালে ঠোক্কর খেয়ে ফিরে এসে বলে, ‘‘কবিতা দিল। কবিতাই পারে।” তক্ষুনি বুঝলাম ইলিয়টের প্রুফ্রক আজ কোনও দ্বিধাগ্রস্ত কালনায়ক নন। তিনি আজ আমার থেরাপিস্ট। আমার অন্তরের আত্মবিমোচন করতেই যেন তার এই নবরূপ। অনুভূতি নয়, চরৈবেতির মন্ত্রে দীক্ষা দিতেই তার আবার এই ফিরে আসা।

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *