অবতারের মৃত্যু বনাম অবতারের মুক্তি

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

সম্প্রতি চলে গেলেন প্রবাদপ্রতিম ক্রীড়াবিদ মিলখা সিং। এখনও মনে আছে ছোটবেলায় ‘আনন্দমেলা’য় পেয়েছিলাম তাঁর বড়সড় এক পোস্টার। সেই পোস্টার আমার পড়ার টেবিলের লাগোয়া দেয়ালে সাঁটা থাকত। আমি খেলাধুলোয় জন্মকাঁচা। চোখে হাইপাওয়ার চশমা। সেই চশমাই আমার দুঃসাহসে বেড়ি পরিয়ে রাখত। কিন্তু মনকে পরাতে পারল কই! আমি তাই স্বপ্নে ঝুঁটিবাঁধা ‘উড়ন্ত শিখ’কে দেখতাম। সেই শিখ সিনেমির ফারহান আখতারের মতো সুদর্শন নন। না হোক। কিন্তু তাঁর দু’চোখে কী বজ্রকঠিন সংকল্প। লক্ষ্যস্থির বাজপাখির মতোই। তবু চোখের কোণে তাঁর যেন সামান্য জল জমে থাকত। সে জল সিন্ধু নদ বেয়ে কাঁটাতার পেরিয়ে ঢুকে পড়ে এই দেশে। ওইপারে পড়ে থাকে আত্মীয়-স্বজনদের রক্তাক্ত মৃতদেহ। মানুষ দানব আর দানব মানুষ। তবু সেই অদ্বিতীয় মানুষটিই তার ভিতরের অন্তর্দ্বন্দ্ব দ্বেষ ও জিঘাংসা কাটিয়ে আমার কাছে হয়ে উঠলেন একজন অবতার। যে দেশের মানুষ তাঁর সব কেড়ে নিল, সেই দেশে মৈত্রীর দৌড় কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব কি? তাই তিনি আমার কাছে অবতারের চেয়ে কম নন। ১৯৬০-এর সেই দৌড় তাঁকে ‘উড়ন্ত শিখ’ বানিয়ে তুলল। সেই মিলখা সিং চলে গেলেন সম্প্রতি। আমার অহংকার ভেঙে দিয়ে। অবতারদেরও মৃত্যু হয় বৈকি।

আরও পড়ুন: অতিমারির একাকিত্বে প্রুফ্রকের সঙ্গলাভ

অবশ্য বিবেকচূড়ামণিতে আচার্য শংকর বলেছিলেন, ‘জীবন্নেব সদা মুক্তঃ’। জীব মাত্রেই সে মুক্ত। যে বন্ধন জীবন্মৃত্যুর গোলক আমরা হামেশাই আশপাশে দেখি, তা হল মায়ার বন্ধন। কিন্তু একথা কোনও তীর্থঙ্কর আচার্য বলতে পারেন। আমার মতো নশ্বর মানুষ সে কথা উপলব্ধি করবে কীভাবে? অবতারদের মৃত্যু কি হয় না? শ্রীরামচন্দ্রর স্বেচ্ছামৃত্যু ঘটেছিল সরযূ নদীতে। শ্রীকৃষ্ণর মৃত্যুর কারণ জরার বিষাক্ত তির। নরসিংহ দেবের মৃত্যু ঘটে শৈব অবতার ষড়ভার হাতে। এ নাহয় পূরাণকথা। ইতিহাসে যাঁদের পাই, তাঁদের মৃত্যু? ভগবান গৌতম বুদ্ধর কথা ভাবুন। দেবদত্তর বারংবার হত্যাপ্রচেষ্টা এড়িয়ে গেলেও একদিন বিষাক্ত মাংস তার পরিনির্বাণের কারণ হয়ে দাঁড়াল। হজরত মহম্মদ বা প্রভু যিশু! তাঁরাও কি মৃত্যুর নাগপাশ থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছিলেন? শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জগন্নাথধামে রহস্যময় বিলীন হয়ে যাওয়াও তো একধরনের মৃত্যুরই নামান্তর। ‘জাতস্য মৃত্যু হি ধ্রুবঃ’। জাতকের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু সেই মৃত্যু তার গুণমুগ্ধ অনুসারীদের কাছে মোক্ষের নামান্তর হয়ে যায়।

আরও পড়ুন: তুৎ পাখি উড়া দিলে…

লক্ষ্য করে দেখুন। উপরোক্ত প্রতিটি যুগসাগ্নিকের মৃত্যু ছিল অস্বাভাবিক। নথি বলে সে মৃত্যুর আগমনের কথা সেই মহামানবের কাছে অজ্ঞাত ছিল না কখনও। যিশু তাঁর ক্রুশবিদ্ধ হবার কথা জানতেন আগে থেকেই। নবী সা. তাঁর সহধর্মিণী আয়েশার কোলে মাথা রেখে ঠিক মৃত্যুর আগে উচ্চারণ করেছিলেন মহামন্ত্র ‘ওহ আল্লাহ্’। গুরু গোবিন্দ সিংহ মৃত্যুর আগের দিন তাঁর শিষ্যদের গুরু গ্রন্থসাহিবের কথা শুনিয়েছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ চিরতরে দেহত্যাগের আগে প্রিয় শিষ্য নরেনকে তাঁর সমস্ত যৌগিক বল দিয়ে গিয়েছিলেন। তবে কি যাঁরা মহামানব, তাঁরা নিজেদের মৃত্যুক্ষণ আগে থেকেই অনুমান করতে পারেন? এ প্রশ্নর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখনও আমাদের কাছে নেই। তবে এক সম্ভাব্য মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আছে বৈকি। একজন সাধক তাঁর অনুরাগী ভক্তদের মধ্যে এক অচ্ছেদ্য মায়াবন্ধন তৈরি করেন। সেই মায়ার জগতে সাধক আর সাধারণ রক্তমাংসের মানুষ থাকেন না। তিনি হয়ে ওঠেন মৃত্যুঞ্জয়। তাহলে তার সেই নশ্বর মৃত্যু ভক্ত মেনে নেবেন কী করে! ভক্তর বিশ্বাসে তাই সাধক হয়ে ওঠেন স্বনিয়ন্ত্রক। তিনি তাঁর স্ব-ইচ্ছায় নিজের জীবনের প্রতিটি ক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাই মৃত্যুও তার নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে ওঠে। সে মৃত্যু হয় দৈহিক। কখনও ভক্ত তাঁকে যিশুর মতো প্রত্যাবর্তন করতে দেখেন। কখনও ঈশা নবির মতো তিনি ‘মিলাদ-উন-নবী’র উজ্জ্বল বাঁকা চাঁদ, কখনও তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মতো আসমুদ্র নীলাচল।

আরও পড়ুন: আমার মহাশ্বেতা: একটি নির্বাচিত সাক্ষাৎকার

ভক্তর চোখে অবতাররা মুক্ত। তাঁর মৃত্যু হয় না কখনও। তিনি জীবিত থাকেন তাঁর জীবৎকালের কর্মসাধনায়, মতাদর্শে, জীবনদর্শনে। এমন করে ভাবলে আর মিলখা সিংয়ের মৃত্যু মনের ভিতর কান্না জাগায় না। মনে হয় তিনি আছেন। থাকবেন চিরকাল। কারণ মানবাবতার তত্ত্ব মানলে তাঁর মধ্যেও ছিল অবতারের অংশ। তাই তিনি উড়তে পারতেন। সেই কারণেই তিনি একজন ‘উড়ন্ত শিখ’।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *