করোনাকালের ডায়েরি ২

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

ঠিক এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমার কী লেখা উচিত। বিশেষত যখন গতকাল অন্তত তিনজন অত্যন্ত বিদগ্ধ ও সৃষ্টিশীল মানুষ আমাকে ফোনে জিজ্ঞেস করলেন কী করে মন স্থির রাখা যায়? যখন বিকেল পাঁচটায় কবিসম্পাদক গৌতমদা আমাকে ফোনে ভাঙা-ভাঙা গলায় জানালেন, ‘‘খবরটা শুনেছ? সৌরভ আর নেই!” সৌরভদা আমার থেকে বছর দু’য়েকের বড়। খুব সাংঘাতিক সখ্যতা ছিল না। কবিতা নিয়ে দলবাজি ব্যাপারটা আমার পছন্দের বিষয় নয়। তাই আগ বাড়িয়ে আলাপও করিনি কখনো। তবু পরিচয় ছিল। তবু ভিতর ভিতর একটা সূক্ষ্ম ভালোলাগা ছিল। শ্রদ্ধা ছিল। ভাবতাম এই সৌরভদার মতো কর্মঠ লোকই এখন বাংলা কবিতার দরকার। যে অন্যর বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়বে। দলাদলের মধ্যেও দলাদল মানবে না। একজন তরুণ কবির সুপারিশ নিয়ে বাংলা একাদেমিতে গিয়ে বলবে, ‘‘দাদা। এই নামটা ঢোকান। ছেলেটা ভালো লিখছে। এতোদিন ধরে। আপনারা দেখেও দেখেন না। ‘‘আমার সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য। আমি সেই তরুণ কবি নই। গেল পাঁচ ছ’বছর আমি বাংলা অকাদেমিতে ব্রাত্য। কিন্তু তাতে আমার দুঃখ নেই। কারণ সৌরভদা আমাকে দূর থেকে এক দুর্দান্ত উপন্যাস-চরিত্রের রসদ জুগিয়েছে। ভেবেছিলাম এক বড় গল্প লিখব। ওই লোকটাকে নিয়ে। নায়কোচিত। কেন লিখব? কারণ তার সেই সাহস ছিল। সেই কারণেই করোনাকালে তার অসুস্থতার খবর আমাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করলেও আমি জানতাম, সৌরভদা ভালো হয়ে যাবে। সৌরভদাকে করোনা ছুঁতে পারবে না। কিন্তু কী হল? আমি ডোমের কাজ করি সারারাত। মৃতদেহ আসে আর যায়। আমি কাগজে পরচা লিখি। ভোটের পর দুই দলের লোকজন পরস্পর পরস্পরের খুলি ফাটিয়ে আসে। আমি ড্রেসিং করি। রক্ত বন্ধ করি। আমার মনোবিজ্ঞানচর্চা মাথায় ওঠে। কী হবে মন নিয়ে? মনের সে জোর কোথায়? মনের সে জোর থাকলে সৌরভদাকে মরতে দিতাম? শঙ্খ ঘোষকে? পবিত্র মুখোপাধ্যায়কে? সুধীর চক্রবর্তীকে? আমার পরিচিত অপরিচিত মৃত্যুমিছিলকে কি আমি রুখে দিতাম না যদি টেলিকাইনেসিস থাকত?

এই অসহায় বোধ থেকেই একদিন মহামানব জন্ম নিল। সে ভিনগ্রহের মানুষ। সে উড়তে পারে। গুলি তার বুকে লেগে চ্যাপ্টা রাঙতা হয়ে যায়। তার চোখের রেডিয়েশনে পুড়ে যায় হিংসার আগুন। সে উড়তে পারে, ঘুসি মারতে পারে। তবু সে অসহায়। সামান্য ব্যাঙ্ক কর্মচারী। ইএমাই নিয়ে তার চিন্তা। কেন? সে তো সব পারে? সে তো অমর। না সে অমরত্ব চায় না। নশ্বর মানুষ হতে চায়। কেন চায়? পাগল কুকুরে কামড়াল তাকে? না। আরও ভয়ংকর। সে যে ভালোবেসে ফেলেছে। ভালোবাসা ‘সুপারম্যান’কেও অসহায় করে দেয়। হয়তো নিজস্ব অসহায়তা ও অস্তিত্ববাদী বিপন্নতা কাটাতে এক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ হিসেবে ফ্রেডরিক নিৎসে তৈরি করেছিলেন ‘উবেরমেন্‌শ’। কিন্তু তাকে অপ্রতিরোধ্য করতে করতেও তার মনে হয়েছে, তার কাছে একটা বেছে নেবার সুযোগ থাকা দরকার। একটা ‘চয়েস’। সেই বেছে নেবার শক্তিতেই ঈশ্বরপুত্র প্রমিথিউস নশ্বর মানুষ হতে পেরেছিলেন। আর নরেন্দ্রনাথ দত্ত স্বামী বিবেকানন্দ।

আশুদার সম্ভাব্য রাফ স্কেচ। এঁকেছেন লেখক

সে প্রসঙ্গ যাক। আমি খালপাড়ে থাকি। যমুনাবতী বৃন্দাবনের কথা শুনে আমার কী হবে? খাল বেয়ে মৃতদেহ ভেসে আসে রোজ। আমি ডোম। সৎকার করি। সেই চুল্লির আগুনের মাদকতা বাংলা মদের থেকে বহুগুণ বেশি। আগুনের লেলিহান শিখা উপরের দিকে উঠে যায়। আকাশের দিকে। ফিকে হতে হতে মিলিয়ে যায়। আমি উবেরমেন্শ খুঁজি। যে একইসঙ্গে অসহায় অথচ সর্বশক্তিমান। যে চরম প্রেডিকটেবল হবার পরেও একেবারেই রহস্যময়। তার মনের গতিপথ মাপা একদিকে যেমন খুবই সহজ, অন্যদিকে ততটাই কঠিন। কী নাম হতে পারে? কী হবে তার নাম? আমি বাংলার ডোম। জ্যাক, পল, রবিন বেশ লাগে পড়তে। কিন্তু একটা বাঙালিয়ানা না থাকলে চলে না। ডোরাকাটা জঙ্গলের রাজা। রাজকীয় কায়দায় বাদাবন থেকে বেরিয়ে এসে ঝাঁপ দেবে শিকারের বুকে। তারপর একপলকে মিলিয়ে যাবে। সেই ঝাঁপ কেউ দেখতে পাবে না, এতটাই সূক্ষ্ম। সেই ঝম্পকতাল গমক ঘটে যাবে মনের অতল গভীরে। মনের ব্যবচ্ছেদ। আমি পেলাম আমার উবেরমেন্শ। ডাঃ আশুতোশ মুখোপাধ্যায়। একসময়কার দুর্দান্ত মনোরোগ গবেষক। অথচ এখন এক বিপন্ন পিতা। তার তরুণ চিকিৎসক-পুত্র ঋক অন্যায় জনরোষের শিকার। কিন্তু আশুতোষ সেই অসহায়তাকে জয় করতেই যেন পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন অন্য সব অসহায় মানুষদের পাশে। তাদের কেউ অসহায় মা, কেউ অসহায় পুত্র, কেউ বা কোনও অসহায় প্রেমিক। তাদের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে তাদের চারপাশ। তাদের নিজস্ব অসহায়তা। এর মধ্যে কোথাও যেন আমার নিজস্ব অসহায়তাও মিশে রয়েছে। আমার হাতের অসহায় শিকলযন্ত্রণা। সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া এই বাস্তবজগতে হয়তো কঠিন। সেই কারণেই কল্পনার জগতে অবগাহন। কল্পবিশ্বের সেই অনিমেষচারণায় মৃত্যু উপেক্ষিত হবে কী করে? আশুদার অভিযানে তাই মৃত্যুর কারণ রহস্যময়। সে কি স্বেচ্ছায়? না ইচ্ছায়? পরোক্ষে না প্রত্যক্ষে? ধোঁয়া মিলিয়ে যেতে যেতেই পরবর্তী লাশ এসে আমার ঘরের পাশের পচনধরা খালে নোঙর করে। আরেকটি স্বপ্ন দেখি আমি। চিতার আগুন দেখতে দেখতে। খানিক দূরে ওই পারে আমার অল্টার্ড ইগো দেখতে পাই। সেও মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে হতাশভরে। তারও সামনে লাশের সারি। অথচ কবর দেবে এমন শাবল নেই তার। হাত খাবলে খাবলে কবর কতটাই বা গভীর করা যায়? একঝলক দেখতে পাই তার মুখ। একঝলক দেখতে পাই আমার আশুদাকে।

ক্রমশ

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *