Latest News

Popular Posts

দেশ, সীমান্ত এবং মিলখা সিংয়ের রূপকথা

দেশ, সীমান্ত এবং মিলখা সিংয়ের রূপকথা

শুভ্রাংশু রায়

প্রয়াত মিলখা সিং। স্ত্রী নির্মল কৌরের মৃত্যুর এক সপ্তাহের মধ্যেই করোনা কেড়ে নিল কিংবদন্তি অ্যাথলেট মিলখা সিংকে। রয়ে গেল অসংখ্য স্মৃতি, কয়েক টুকরো ইতিহাস এবং উপমহাদেশের জীবনের এক বড় টানাপোড়েনের বেদনামাখা স্মৃতিচারণ। মৃত্যুর পরমুহূর্ত থেকেই সে-খবর ভাইরাল। নিউজ চ্যানেল, প্রিন্ট মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া সর্বত্র মিলখা সিংয়ের ছবি ও প্রয়াণের খবরে ছয়লাপ। নিঃসন্দেহে প্রয়াণের পর মিলখা সিংকে নিয়ে এই স্মৃতিচারণের নেপথ্যে রয়েছে অ্যাথলেট হিসাবে তাঁর আন্তর্জাতিক গেমসে অনবদ্য কৃতিত্ব। এশিয়ান গেমসে চারটি সোনা, কমনওয়েলথে একটি এবং ১৯৬০-এর রোম অলিম্পিকে ০.০১ সেকেন্ডের জন্য গৌরবময় চতুর্থ স্থান অধিকার করা। কলকাতায় বেশ কয়েকবছর আগে এক সাংবাদিকের কাছে মিলখা সিংকে আক্ষেপ করে বলতে শুনেছিলাম, “আমি কি আর জীবদ্দশায় কোনও ভারতীয় অ্যাথলেটকে অলিম্পিক থেকে পদক আনতে দেখব না!” মিলখার সেই আক্ষেপ মেটেনি। তাঁর নিজের ইভেন্ট ৪০০ মিটার তো বটেই, অন্য কোনও ইভেন্টের ফাইনালে অলিম্পিকের আসরে কোনও পুরুষ ভারতীয় অ্যাথলেটকে ফাইনালে দৌড়নোর যোগ্যতা অর্জন করতে দেখে যেতে পারলেন না মিলখা সিং। খুব স্বাভাবিক কারণেই মৃত্যুর পরের দিন আলোচনার বৃত্তে তাই অ্যাথলেট মিলখা সিং অনেক বেশি ফোকাসড।

আরও পড়ুন: কপিল দেব ১৭৫:৩৮, ইতিহাস থেকে ক্রিকেট রূপকথা

কিন্তু ব্যক্তি মিলখা সিংয়ের জীবন বা বলা ভালো জীবনের বিভিন্ন টানাপোড়েন যে বড় ঘটনার সঙ্গে ভীষণভাবে জড়িয়ে, তা কিন্তু উপমহাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের সবথেকে ট্র্যাজিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। দেশবিভাগ বা পার্টিশন। যে ভয়ানাক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে নানা চড়াই-উতরাইয়ের ভেতর দিয়ে মিলখা সিংকে পেরোতে হয়েছিল, সে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের ছিন্নমূল কোটি কোটি মানুষকে যেতে হয়েছিল। তাই ক্যাপ্টেন মিলখা সিং যখনই ভিকট্রি স্ট্যান্ডে সবথেকে উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে সাফল্যের পদকটি গলায় ঝুলিয়েছেন, সেই সাফল্য আসলে কোটি কোটি ছিন্নমূল মানুষের হয়ে দাঁড়িয়েছে। জয়ী হয়েছেন ছিন্নমূল হওয়া কোটি কোটি মিলখা সিং, আজকের ভাষায় ‘মিলিয়নস অফ মিলখাস’।

আরও পড়ুন: লিয়েন্ডার পেজ ৪৮: এক ইতিহাসের মুখোমুখি

মিলখা সিংয়ের জীবনে বারবার ফিরেফিরে এসেছে পাকিস্তান। তাঁর গ্রাম গোবিন্দপুরা। পাকিস্তানের পঞ্জাব প্রভিন্সের অন্তগত। ভাগ মিলখা ভাগের সেই ভয়ানক দৃশ্যের কথা মনে পড়ে। আক্রান্ত পুরো মিলখার পরিবার। পালাতে গিয়ে কাদায় আছাড় খায় বালক মিলখা। জলে জমে মাটির কাদা নয় রক্তভেজা মাটিয়ে পা হড়কে যায় মিলখার। মিলখা সিংয়ের আত্মজীবনী ‘রেস অফ মাই লাইফ’ পড়ুন, সেখানে সেই ভয়ার্ত দিনগুলির বিবরণ রয়েছে। কিন্তু এই ভয়ার্ত অতীত, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মিলখাকে আজীবন তাড়া করে বেরিয়েছে। ১৯৬০ গুডউইল গেমসে অংশগ্রহণের জন্য পাকিস্তানে যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠলে মিলখা প্রথম অবস্থায় পাকিস্তান যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।

আরও পড়ুন: ৪৭ বছর পরেও গাভাস্করের মনে অম্লান মাঠের মধ্যে চুল কাটার স্মৃতি

নেহরুর অনুরোধে পাকিস্তানে ফিরে গিয়ে সেদেশের সেরা দৌড়বীর আব্দুল খালেককে ৪০০ মিটার দৌড়ে পরাজিত করেন। রেস শেষে পাকিস্তান চিফ জেনারেল আইয়ুব খান মিলখা সিংকে ‘ফ্লাইং শিখ’ বা ‘উড়ন্ত শিখ’ নামে অভিহিত করেন, যা মিলখা সিংয়ের নামের সঙ্গে আজীবন রয়ে যায়। এখানেও পাকিস্তান যোগসূত্র রয়ে যায়। তাই একথা বলা হয় যে, পাকিস্তানের সেই রেস ঘিরে উভয় দেশেই মিডিয়ায় যে চর্চা মিলখা সিং পেয়েছিলেন, তা ছিল অভূতপূর্ব। পাকিস্তানের সর্বোচ্চ শাসকের থেকে স্বীকৃতি প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে তাঁর জীবনে একটি বড় প্রাপ্তি ছিল। তবে তা অতীত জীবনের ক্ষততে কতখানি মলম লাগাতে সক্ষম হয়েছিল, সে প্রশ্ন রয়েই যায়।

আরও পড়ুন: সত্যজিৎ ঘোষ: ফ্ল্যাশব্যাকে আশির দশকের কলকাতা ফুটবল দুনিয়া

দেশভাগের পরে শরণার্থী জীবন কিছুদিন কাটানোর পরে চতুর্থবারের চেষ্টায় সেনাবাহিনীতে যোগদানের সুযোগ হয় এই কিংবদন্তি অ্যাথলেটের। সেনাবাহিনীতে তাঁর যোগদান জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তাঁর জীবনে যুক্ত হয়েছিল নতুন একটি শব্দ― ‘শৃঙ্খলা’। যা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মিলখার সঙ্গ ছাড়েনি।

মিলখা সিংয়ের জীবনের বিভিন্ন পর্ব এতটাই নাটকীয় ছিল যে, ‘ভাগ মিলখা ভাগ’-এর পরিচালক রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরা মন্তব্য করেছিলেন যে, মিলখার বায়োপিক বানানোর সময় বাইরে থেকে কোন নাটকীয়তা আমদানির তেমন প্রয়োজন হয়নি। কারণ মিলখা সিংয়ের নিজের জীবনই নানা নাটকীয় উপাদানে ভরপুর ছিল।

ছবি ঋণ: দ্য হিন্দু

তিনি অবশ্যই খুবই বড় মাপের অ্যাথলেট ছিলেন। সত্য কথা বলতে, তার মানের কোনও পুরুষ অ্যাথলেট আজ অবধি পুরো উপমহাদেশে সম্ভবত কেউ জন্মাননি। কিন্তু দুর্দান্ত ক্রীড়াবীদ এটাই মিলখা সিংয়ের একমাত্র পরিচয় নয়। এই লেখা যখন শেষের পথে জানা গেল পাকিস্তানের যে গ্রামে (সেই সময় অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারত) মিলখা সিং জন্মেছিলেন সেই গোবিন্দপুরা (বর্তমান নাম বস্তি বুখারিয়া) গ্রামের বাসিন্দারা শোকবার্তা পাঠিয়েছেন তাঁদের পুত্তর মিলখার প্রয়াণে। এগুলিই মিলখা সিং নামক রূপকথার মূল ভিত্তি। যে রূপকথা সীমান্তের বাঁধনকে ছিঁড়ে ফেলে। গল্প শোনায় পার্টিশনের ভয়ংকর অতীতের আর সেই দুঃস্বপ্নকে পেরিয়ে জীবনের সাফল্যকে। মিলখা সিং নামক আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়ান দৌড়বীরের জীবন কাহিনি সেখানেই মিশে যায় ছিন্নমূল হওয়া উপমহাদেশের কোটি মানুষের জীবন সংগ্রামের সঙ্গে। মিলখা সিং নামক রূপকথার অমরত্ব প্রাপ্তি মনে হয় সেখানেই।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন।

Related Posts

10 thoughts on “দেশ, সীমান্ত এবং মিলখা সিংয়ের রূপকথা

  1. মিলখা সিং এর চলে যাওয়ার বেদনা ও লাখো মানুষের বেদনা এক হয়ে গেছে। চমত্কার মূল্যায়ন।

  2. আরো একটি অসাধারণ লেখা। ক্রীড়া ও সাম্প্রদায়িকতার এক অদ্ভুত মিশেল মিলখা সারাজীবন সবার স্মৃতিতে অমলিন থেকে যাবে।সেটাই সুচারু ও সুনিপুনভাবে উঠে এসেছে লেখাটায়।

  3. খুব‌ই দুঃখজনক । তবে আপনার লেখা পড়ে অনেকটা জানলাম। আরো জানার জন্য ‘রেস অফ মাই লাইফ’ পড়ার ইচ্ছা রয়েছে। ধন্যবাদ স্যর

  4. মিলখা সিং এর প্রয়াণের মধ্যে দিয়ে আমরা একজন অসাধারণ ক্রীড়াবিদ কে হারালাম ….. এই ক্ষতি পূরণ করতে হয়তো আরো অনেক সময় ব্যাহত হবে …. খেলার মাঠে নিজের যুদ্ধজয়ের কাহিনী রচিত করলেও একটা মহামারীর কাছে পরাজিত হতে হলো …. জীবন হয়তো এরম ই … যেখানেই থাকবেন ভালো থাকবেন …
    লেখাটির মাধ্যমে অনেক পুরনো স্মৃতি সমচ্চারিত হলো …. বেশ ভালো লাগলো লেখাটি ….

  5. “উড়ন্ত শিখ” কে জানাই আমার সশ্রদ্ধেয় প্রণাম।
    তিনি আমাদের কাছে, সারাজীবনের জন্য,সত‍্যিকারের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।

  6. ক্রীড়া জগতের আরও এক নক্ষত্র কে আমরা হারালাম, যা আমাদের কাছে অত্যন্তই বেদনাদায়ক । খুব সুন্দর একটি লেখা ।

  7. খেলা ও খেলোয়াড়দের নিয়ে সবসময়ই ভালো লেখেন শুভ্রাংশু।

  8. দেশ ভাগের ক্ষত কে ক্রীড়া জগতের সাফল্য অনেক খানি প্রলেপ দিতে সাহায্য করেছিলো।তেমনি আগামী প্রজন্মের কাছে শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরেছিলেন জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ইতিহাস সৃষ্টি করতে হয়। লেখক সেই বিষয় টি খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

Leave a Reply to নবনীতা বসু Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *