কোভিড-১৯ অতিমারি: বাংলাদেশ

সাবরিনা শারমিন চৌধুরী (ঢাকা, বাংলাদেশ)

লকডাউনের পর লকডাউন, করোনার শেষ কোথায়

শুধু ঢাকা বিভাগেই করোনা সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। সারাদেশে সর্বমোট মৃত্যুর সংখ্যা এ-পর্যন্ত ১০,৯৫২। এটি সরকারি হিসাব। এই হিসেবের বাইরে করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও অনেক বেশি মানুষ, যাদের করোনা পরীক্ষা করানো যায়নি।

৫ এপ্রিল শুরু হয়ে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে চলছে লকডাউন। তার আগে ছিল মানুষের চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ১৮ দফার সরকারি প্রজ্ঞাপন। ২য় দফা লকডাউনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে পুরো দেশ। ১ম দফা লকডাউন শেষে আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে আবারও লকডাউন শুরু হতে যাচ্ছে। এ বছর মার্চে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসে লাগে বাংলাদেশে। করোনাভাইরাসে সংক্রমণের সংখ্যা হঠাৎ করেই বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে মৃত্যু। খালি হয়ে যাওয়া হাসপাতালগুলো আবারও উপচে পড়তে থাকে করোনা রোগীর ভিড়ে। পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে দেশ, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা। সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা সামাল দিতে আবারও হিমশিম খেতে শুরু করে প্রশাসন। এমন পরিস্থিতিতে সরকার প্রথমে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালানোর প্রজ্ঞাপন জারি করলেও অনতিবিলম্বে এক সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণা করে। এটি শেষ হলে দু’দিনের ব্যবধানে শুরু হয় আরও এক সপ্তাহের লকডাউন।

আরও পড়ুন: শঙ্খ ঘোষ: ‘আমার চলা ছিল আমার নিজস্ব’

তরুণদের মধ্যে মাস্ক ব্যবহার বেড়েছে

বাংলাদেশে সরকারিভাবে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ ২০২০ তারিখে। ইতালি-ফেরত তিনজন প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে প্রথম কোভিড-১৯ পজিটিভ শনাক্ত করা হয়। অফিসিয়ালি এদেশে করোনার যাত্রা সেই শুরু। এরপর পুরো একটি বছর অতিক্রম হয়েছে। রাজধানীর সীমানা ছাড়িয়ে করোনা পৌঁছে গেছে শহর থেকে শহরে, গ্রামে, পুরো দেশে। তিন জন থেকে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা আজ কত, কতজনের এ-পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান এখনও নির্ণয় করা যায়নি। সরকারি একটি পরিসংখ্যান রয়েছে, কিন্তু অনেকেই বিশ্বাস করেন প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসেবের চেয়ে অনেক বেশি।

২০২০ সালের প্রায় পুরোটা জুড়েই করোনাভাইরাস ভয়ানক দাপটে তাণ্ডব চালায়। তবে ডিসেম্বর মাস থেকে এ তাণ্ডব কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসে। ২০২১ সাল শুরু হয় নতুন আশা নিয়ে। ঘরে থেকেই মানুষ নতুন বছর তুমুলভাবে উদ্‌যাপন করে। নতুন বছরে অফিসাঞ্চলে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসতে শুরু করে। আতঙ্কিত মানুষ একটু একটু করে স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

ইতিমধ্যে দেশে করোনার ভ্যাকসিনও চলে আসে। বাংলাদেশ এ বছরের ২৭ জানুয়ারি থেকে অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনা ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু করে। মার্চ মাস পর্যন্ত ৫৫,৮৩,৫০৭ মানুষ দুই ডোজের এই ভ্যাকসিনের ১ম ডোজ গ্রহণ করেছে। এখন আপাতত ১ম ডোজ ভ্যাকসিন প্রদান বন্ধ রাখা হয়েছে। ৮ এপ্রিল থেকে ২য় ডোজ ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয়েছে।

আরও পড়ুন: শক্তিময়ী সাহসিনী দুর্গতিনাশিনী, এসো সংকটে কল্যাণকরে

মাস্ক ব্যবহারে সচেতন হচ্ছেন না অনেকেই

প্রথম দিকে ভ্যাকসিন নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের ভীতি, সংশয় ও নেতিবাচক ধারণার কারণে ভ্যাকসিন কার্যক্রম আশানুরূপ এগোয়নি। ১ম ধাপে ৬০ লক্ষ মানুষকে ভ্যাকসিন প্রদানের পরিকল্পনা নিয়ে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়। সারাদেশের মানুষকে কয়েকটি ক্যাটিগরিতে ভাগ করে প্রায়োরিটি ভিত্তিতে ই-রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়। ফ্রন্টলাইনে থাকা কর্মী, সরকারি কর্মচারী এবং চল্লিশ ও তদূর্ধ্ব বয়সিরা ভ্যাকসিন গ্রহণে অগ্রাধিকার পায়। প্রথম দিকে তেমন সাড়া পাওয়া না গেলেও একমাসের মধ্যেই মানুষের মধ্য থেকে ভ্যাকসিন নিয়ে দোদুল্যমনতা কমতে থাকে। সর্বক্ষেত্র হতে ইতিবাচক প্রচারণা, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভ্যাকসিন গ্রহণের বিষয়গুলোর ব্যাপক শেয়ার মানুষের নেতিবাচক চিন্তায় পরিবর্তন আনে। মানুষ রেজিস্ট্রেশন শুরু করে এবং হেলথ সেন্টারে যেতে থাকে ভ্যাকসিন নিতে। ১ম ডোজের ভ্যাকসিন শেষ করে যখন ২য় ডোজের অপেক্ষায় অনেক মানুষ, আরও অনেক বেশি মানুষ তাদের ১ম ডোজ পাবার অপেক্ষায়, তখনই করোনার এই ২য় ধাক্কার মুখোমুখি হতে হলো বাংলাদেশকে। করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় বাংলাদেশ, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা হয়ে পড়েছে বিপর্যস্ত। সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে চলেছে রোজ। 

এ বছরের মার্চ মাস থেকে করোনা দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশে মরণকামড় বসায়। গতবছর এই মার্চেই এদেশে প্রথম করোনার সংক্রমণ বিস্তৃত হতে শুরু করে। ঠিক এ বছরও একই সময় করোনা ভয়ানক থাবা মেলে ধরেছে। রোজ করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে এই মুহূর্তে স্থান সংকুলান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বছরের শুরুতে দৈনিক করোনা রোগী শনাক্তের হার ৫%-এর নীচে নেমে এলেও হঠাৎ করেই বেড়ে ২৬%-এ দাঁড়িয়েছে। সরকারি হিসেবে এ-পর্যন্ত দেশে সর্বমোট ৪৯,৪৭,৪১২ করোনা স্যাম্পল পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে করোনা শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৬,৭৩,৫৯৪। প্রতিদিন শনাক্তের সংখ্যা ৭ হাজারের বেশি। (মাইসেপিক দপ্তরে লেখাটি আসা পর্যন্ত)

আরও পড়ুন: চৈত্র সংক্রান্তি আর গাজনের দিনগুলো

কাঁচা বাজারে মাস্কের ব্যবহার নেই বললেই চলে। ছবি সৌজন্য: রফিকুল ইসলাম খোকন

হঠাৎ করে কেন বেড়ে গেল সংক্রমণ? অথবা আসলেই কি হঠাৎ করে বেড়ে গেছে করোনা সংক্রমণের হার? অথবা আসলেই কি কমেছিলো সংক্রমণ? হয়তো কোথাও একটি বড় শূন্যস্থান রয়ে গেছে যা পূরণ করতে চাইছে না কেউ। একদিন হঠাৎ করে করোনা রোগ সংক্রান্ত সরকারি বুলেটিন সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হল। দেশে করোনা রোগের তথ্যপ্রাপ্তির একমাত্র নির্ধারিত উৎসটি বন্ধ হয়ে গেল। মানুষের কাছে এ বিষয়ে আর নিয়মিত তথ্য রইলো না। একসময় মনে হতে থাকল সবকিছু স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। করোনা ঘাপটি মেরেই ছিল, কিন্তু তথ্যের অনুপস্থিতিতে মানুষ অসচেতন হল, অসতর্ক হল। স্বচ্ছল ও শিক্ষিত মানুষ দলবেঁধে বেড়াতে গেল। ঘটা করে সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজন করতে লাগল। করোনা ফিরে এলো আগের চেয়েও ক্রুদ্ধ প্রলয় নিয়ে।

শুধু কি সাধারণ মানুষের অসতর্কতার কারণেই করোনা এমন ভয়ানক রূপ ধারণ করল? তথ্য নিয়ন্ত্রণের ফলে সাধারণ মানুষের হাতে তো সঠিক তথ্য ছিল না, ছিল না সংখ্যার হিসেব। কিন্তু রাষ্ট্রের হাতে তো তথ্য ও পরিসংখ্যান ছিল। সচেতন মানুষরা আরও আগে থেকেই একটি সুপরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণ চাইছিলেন। তাঁরা আশঙ্কা করছিলেন যে পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ হয়ে যেতে পারে। সতর্ক করার চেষ্টা করেছেন সরকারকে। এবারের লকডাউন বা নিয়ন্ত্রণ আরও আগেই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু এরপরও লোকসমাগম করে অনেক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। থেমে থাকেনি ধর্মীয় ও সামাজিক মাহফিল। আন্দোলন, হরতাল, দলবদ্ধ সহিংসতাও থেমে থাকেনি। এরই মধ্যে নেওয়া হয়েছে সিভিল সার্ভিস ও মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা। যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ হয়েছে। পুরো মার্চ মাস জুড়েই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল। সরকারের যথেষ্ট সুযোগ ছিলো আরও আগে সতর্ক হওয়ার। করোনাভাইরাস সংক্রমণের জন্য সাধারণ মানুষ, সরকার, বিভিন্ন গোষ্ঠী সবার কাছ থেকেই পর্যাপ্ত সুযোগ ও সময় পেয়েছে।

আরও পড়ুন: পয়লা বা পহেলা বৈশাখ

২য় ডোজ ভ্যাকসিন নিচ্ছেন নগরবাসী। ছবি সৌজন্য: সাফিয়া শমী

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এবারের করোনাভাইরাস সংক্রমণে ভাইরাসের নতুন ধরনের স্ট্রেইন যুক্ত হয়েছে। যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার এই স্ট্রেইনগুলো খুব বেশি সংক্রামক এবং দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছে। এ-দফায় এই ভাইরাসে ১৯-৪৮ বছর বয়সি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। করোনাভাইরাসে মোট শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে এদের হার ৬৮%-এর বেশি। এঁরাই ভাইরাসটি বহন করে ঘরে আনছে এবং তা সংক্রমিত হচ্ছে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ ও শারীরিকভাবে দুর্বল সদস্যদের মধ্যে। এই তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সক্রিয় গ্রুপ। চাকরি, ব্যবসা ও অন্যান্য দৈনন্দিন কাজে এদের বাইরে যেতে হয়। এঁদের বড় একটি অংশ করোনাভাইরাসের সতর্কতাগুলোও অনুসরণ করছে না। আবার ৪০ বছরের নীচে যাঁদের বয়স, তাঁদের এখনও ভ্যাকসিন দেওয়া হয়নি। ফলে এঁরা যেমন নিজেরা খুব দ্রুত সংক্রমিত হচ্ছে, আবার ভাইরাসটি দ্রুত ছড়াতেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। ভয়ানক দ্রুততায় ছড়িয়ে পড়ছে কোভিড-১৯ ভাইরাস। নতুন গোত্রের এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। সংক্রমণের হার কমাতে তাই মানুষের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিগত সতর্কতার বিকল্প কিছু আপাতত সামনে নেই। অতএব ধাপে ধাপে হয়তো বাংলাদেশকে এ বছরও যেতে হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি কঠোর লকডাউনের মধ্য দিয়ে।

চলমান এক সপ্তাহের লকডাউন অনেকটাই শিথিল ধরনের। এতে লোকজনের চলাফেরাকে সীমিত করার চেষ্টা করা হয়েছে, পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত নয়। সরকারি-বেসরকারি অফিস সীমিত পরিসরে খোলা রাখার নির্দেশনা আছে। শপিংমল বন্ধ রেখে অনলাইন কেনাকাটা চালু রয়েছে। হোটেল-রেস্টুরেন্ট বন্ধ করা হয়েছে, চালু আছে বইমেলা। গণপরিবহণ বন্ধ, অনুমোদন আছে নিজস্ব পরিবহণের। কিন্তু আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে সাত দিনের যে লকডাউনটি সারাদেশে শুরু হতে যাচ্ছে সেটি কঠোরভাবে মানুষের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করবে। এ-সময় জরুরি সেবা ছাড়া সরকারি-বেসরকারি সব অফিস, গণপরিবহণ ও শিল্পকারখানা বন্ধ থাকবে।

আরও পড়ুন: প্রকৃত কবিতা থাকে শুভকামনার মতো জন্মে ও বিদায়ে

অভ্যন্তরীণ বিমান যাত্রায় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিরন্তর প্রচেষ্টা রয়েছে কোম্পানিগুলোর। ছবি সৌজন্য: রফিকুল ইসলাম খোকন

১৮ দফার প্রজ্ঞাপন, ১ম দফার লকডাউন, ২য় দফায় লকডাউন, তারপর হয়তো আরও আরও লকডাউন। লকডাউন, নিষেধাজ্ঞা, নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু তারপর কী? ১৮ দফার সরকারি প্রজ্ঞাপন বা চলমান এই নিষেধাজ্ঞায় কোনও সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সমন্বয় ছিল না। ২য় দফার সাত দিনের লকডাউনের পূর্ণ পরিকল্পনা এখনও আসেনি। এই লকডাউনের জন্য মানুষ কীভাবে প্রস্তুত হবে, তার নির্দেশনা এখনও নেই। একশ্রেণির মানুষ অসুস্থের মতো কেনাকাটা করে নিজের বাড়িকে গুদামঘর বানাচ্ছে। আর এক শ্রেণির মানুষ জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় দলবেঁধে প্রতিবাদ করছে লকডাউনের বিরুদ্ধে। যে শিক্ষিত ও স্বচ্ছল দলটি মনের আনন্দে পর্যটন করে বেড়িয়েছে এবং রোগের সংক্রমণ ছড়িয়েছে সারাদেশে, তারাই এই লকডাউনে ঘরে বসে পিকনিক করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাজার সাবাড় করে। অথচ করোনার সংক্রমণ ছড়ানোতে যাদের ভূমিকা একবারেই গৌণ, জীবিকার তাগিদ ছাড়া যারা বেরই হয়নি, যাদের জীবনে কোনও পর্যটন বা সামাজিক উদ্‌যাপন নেই, তাদেরকেই এখন পেটে ও মাথায় হাত দিয়ে এই লকডাউন পার করতে হবে। এর শেষ কোথায়? কী এর সমাধান? লকডাউনই কি করোনার একমাত্র কার্যকর ভ্যাকসিন? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও নেই।      

আঁধারেরও শেষে জানি আছে শুধু আলো

চিন দেশে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি। ইউরোপে এর বিকাশ। এ দেশ থেকে আমরা শুধু দেখেছি দূরদেশের মানুষের মৃত্যু ও আহাজারি। আমরা সমব্যথী হয়েছি। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছি মুক্তির জন্য। কিন্তু করোনাভাইরাস দূরদেশে মৃতের মিছিলের কান্না হয়ে থেমে থাকেনি। করোনা একসময় আমাদের নিজেদের ঘরে ঢুকে গেছে। রোজই কোনও বন্ধু বা সহকর্মী, কিংবা স্বজন আক্রান্ত হচ্ছে। মৃত্যু হচ্ছে। আর সেই মৃত্যু ভেঙে দিচ্ছে বুকের পাঁজড়। সংক্রমিত হওয়া কাছের মানুষটি নিরোগ হয়ে ঘরে না ফেরা অবদি উৎকণ্ঠার শেষ নেই। এ দেশের প্রতিটি শহরে, গ্রামে; এই প্রাণের শহরের প্রতিটি মহল্লায় অদৃশ্য করোনাভাইরাস ঘুরে বেড়ায় দাপটে। আর আমরা পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করি, আশ্রয় নেই গৃহকোণে।  

করোনাভাইরাস বদলে দিয়েছে মানুষের জীবন। ওলোট-পালট হয়ে গেছে সবকিছু। মানুষের জীবন ও জীবিকা চাপের মুখে পড়েছে। চোখের সামনে প্রতিদিনই মানুষের অন্যরকম অপ্রস্তুত এক লড়াই লড়তে দেখছি আমরা। হঠাৎই নেমে আসা এ লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ। অর্থনৈতিক চাপে পড়ে মানুষ রাজধানী ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছে নিজ এলাকায়। যেখান থেকে একদিন সে জীবিকার তাগিদে এই শহরে এসেছিল, সেখানেই আবার ফিরে চলেছে জীবিকারই দায়ে। এ যেন হঠাৎ করেই জীবনের রথটি উল্টো পথে চলতে শুরু করেছে।

দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে ঢাকার অবস্থাই সবচেয়ে কঠিন। এ শহরে কোনও কিছুই যেন ঠিকঠাক নেই। কিছু মানুষ এত ভয় পেয়েছে যে, তারা বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না। আবার কিছু মানুষ এটির অস্তিত্বকেই মানতে চাইছে না। আবার কিছু মানুষ আছে, যাদের নিজেদেরকে অন্তরীণ করবার জন্য কোনও গৃহই নেই। পথের ধার, রেলস্টেশন অথবা ফুটওভার ব্রিজ এদের রাত্রিকালীন বাসস্থান। বস্তিবাসীদের ইচ্ছে থাকলেই কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশনে থাকবার সুযোগ নেই। এক ঘরেই তাদের বসবাস পুরো সংসার ও পরিবার নিয়ে।

আরও পড়ুন: কাসুন্দি-তৃতীয়া

কঠোর লকডাউন শুরু এই ভাসমান রোজগেরে মানুষদের ভোগান্তির শেষ থাকবে না। ছবি সৌজন্য: রফিকুল ইসলাম খোকন

এই করোনাকালেই মানুষ দেখেছে মানুষকে ভয়ানক রকমের স্বার্থপর হতে। সন্তান করোনায় আক্রান্ত মাকে ফেলে গেছে রাস্তায়। স্ত্রী মরণাপন্ন স্বামীকে মৃত্যুর আগে একফোঁটা পানি দিতে এগোয়নি। রাস্তায় মানুষ পড়ে মরে গেলেও কেউ এগিয়ে যায়নি সাহায্য নিয়ে। প্রতিবেশীর মৃত্যুতে দাফন করতে যায়নি। আতঙ্ক মানুষকে কতটা স্বার্থপর করে দিতে পারে, মৃত্যুভয় এক নিমিষে সব সম্পর্কের বন্ধন কীভাবে ছিন্ন করে দিতে পারে, তা এই করোনাকালেই মানুষ দেখেছে।

এ দেশের প্রতিটি কোনায় প্রতিটি মানুষ এখন অপেক্ষায় আছে এক ঝলক নতুন আলোর। দুঃসময়ের এই আঁধার কেটে গিয়ে আবারও আলো আসবে এই বিশ্বাস বুকে নিয়ে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের সঙ্গে এ দেশের মানুষও দাঁড়িয়ে গেছে করোনাভাইরাসের মুখোমুখি। প্রতিদিনই নতুন করে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। প্রতিদিনই চলে যাচ্ছে কোনও প্রিয়জন। এই হতাশা ও বেদনার মাঝে আশার কথা হল মৃতের চেয়ে সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরা মানুষের সংখ্যা বেশি। অতএব লকডাউন বা ভ্যাকসিন, বিজ্ঞানের সাধনা অথবা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা, যেখান থেকেই আলো আসুক, আলো আসবে। মানুষ মুক্ত হবে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *