‘বেহালা জনপদের ইতিহাস’ গড়ার কারিগর: প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য

স্বপ্না রায়

সাতাত্তরের শেষাশেষি। বারুইপুরের শাসন নামের ছোট্ট স্টেশন। সেখান থেকে আটিসারার উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা। সেখানে যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এসেছিলেন। চলেছি আমাদের বাংলার শিক্ষক সুধীন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে। তখন আমরা একাদশ। বিবেকানন্দ কলেজ, ঠাকুরপুকুরের আট-দশজন ছাত্রছাত্রীর একটি দলের সেই প্রথম ‘বাহিরে যাত্রা’। স্যার আমাদের সদ্য পড়িয়েছেন ‘জীবনস্মৃতি’র ‘বাহিরে যাত্রা’ অধ্যায়টি। কলকাতায় ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপে রবীন্দ্রনাথের “বৃহৎ পরিবারের কিয়দংশ পেনেটিতে ছাতুবাবুদের বাগানে আশ্রয় লইল।” সেই সূত্র ধরেই রবীন্দ্রনাথ বললেন, “এই প্রথম বাহিরে গেলাম।” আমরাই বা বলব না কেন? এমন করেই পড়ানোর বিষয়কে পথচলার আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করে নেবার সহজপাঠে আমাদের দীক্ষা দিয়েছেন আমাদের মাস্টারমশাই। 

আরও পড়ুন: ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’

তখন বাংলা অনার্স। ক্লাসের পড়ার ফাঁকেই বলে উঠলেন— ”চলো তোমাদের নেপালগঞ্জে নিয়ে যাই। ওখানে রাঘবপুরে বহু পুরনো একটি চার্চ আছে।” ওখানকার অধিকাংশ মানুষজন অর্থনৈতিক কারণেই মূলত খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কেওড়াপুকুর খাল ধরে কীভাবে প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনারিরা খ্রিস্টধর্মের প্রসার ঘটিয়েছিলেন, তার নিখুঁত বর্ণনা আছে সুধীন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘বেহালা জনপদের ইতিহাস’ বইটিতে। “কেওড়াপুকুর খালটি যেমন দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিপণ্য বহনের জলপথ ছিল তেমনি এই খালপথেই প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনারীরা এই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল খ্রীস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে।” বলেছিলেন রামজি প্রামাণিকের কথা— যিনি এ অঞ্চলের প্রথম খ্রিস্টান বলে পরিচিত হয়েছিলেন। রাঘবপুর চার্চ সেই পুরনো দিনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজও। কতবার যে নিয়ে গেছেন সেখানে।

আরও পড়ুন: ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’ (অন্তিম পর্ব)

নেপালগঞ্জ ছিল কৃষিপ্রধান অঞ্চল। এখনও বেহালা-টালিগঞ্জের বহু বাজারে নেপালগঞ্জ থেকে শাকসবজি, দেশি মুরগি, ধানের চারা আসে। আমরা যখন কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত তখনও স্যার আমাদের এবং আরও অন্যান্য বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে গিয়ে বাজার করিয়েছেন চার্চ দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে। কখনও বড়দিন উপলক্ষে ওই অঞ্চলে সপ্তাহব্যাপী চলা খ্রিস্টমেলা দেখাতে নিয়ে গেছেন। ওখানকার ফাদারের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। খ্রিস্টীয় কীর্তন শুনেছি। চার্চের আয়োজনে মেয়েরা পড়াশোনা শিখছেন। শিশুশিক্ষার আয়োজন, স্কুল, এখন তো সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজও তৈরি হয়েছে। স্যারের সৌজন্যে আমরা একটু একটু করে বড়ো হয়ে যাচ্ছি। জীবনকে জানছি। সমাজবিবর্তনের ইতিহাস জানছি অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সমস্ত দিক থেকে।

আরও পড়ুন: গোষ্ঠ পালের ইন্টারভিউ: স্মৃতিমেদুর রূপক সাহা

রাঘবপুর চার্চ— গথিক আর্টের নিদর্শন রূপে এই উপাসনালয়টি একটি মনোজ্ঞ স্থাপত‍্যশিল্প

একদিন হয়তো বললেন রেভারেন্ড জেমস লংয়ের কথা— যিনি ঠাকুরপুকুরে স্থায়ীভাবে বসবাস করেছিলেন। যাঁর নামে জেমস লং সরণি তৈরি হয়ছে। তাঁর সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন— “রেভারেন্ড লঙ শুধু খ্রীস্টান মিশনারীই নন তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং ঐতিহাসিক। নীলকরদের দ্বারা অত্যাচারিত চাষীদের তিনি পরম হিতৈষী বন্ধু।একাধারে তিনি মানবপ্রেমিক ও ভারতবন্ধু।” বলেছিলেন, “তিনি মানুষকে ধর্মান্তরিতকরণের দ্বারা সাম্রাজ্যবাদের জোয়ালে বাঁধতে চাননি। তিনি খ্রীস্টধর্মের প্রেরণার মধ্যে দিয়ে মানুষের মনুষত্ববোধকে জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন।” এই সব কথা শুনতাম আমরা গভীর আগ্রহ নিয়ে। পেরেছিলেন আগ্রহ তৈরি করতে। আজ তার মূল্য অনুভব করতে পারি। তাঁর জেমস লঙ ও বেহালা জনপদসম্পর্কিত নিবন্ধটি খুবই জরুরি বলে মনে হয়।

আরও পড়ুন: আব্বাস কিয়ারোস্তামি: জীবনের জয়গান গাওয়া এক কবি

জেমস লং

উনিশশো তিরিশ সালের ৮ আগস্ট সুধীন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম। কলকাতার ভবানীপুরে মামাবাড়িতে তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয়েছে। আদি বাড়ি হুগলির পোলবায়। আমৃত্যু কলকাতাবাসী। পড়াশোনা বেহালা হাইস্কুল, বিবেকানন্দ কলেজ (বড়িশা কলেজ), চারুচন্দ্র কলেজ। বিষ্ণুপুর শিক্ষাসংঘ স্কুলে পড়িয়েছেন একসময়। উনিশশো ষাট সালে বিবেকানন্দ কলেজে অধ্যাপনা শুরু এবং সেখান থেকেই অবসরগ্রহণ।

আরও পড়ুন: রক্তাক্ত ভাষ্য বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা

পান্নালাল দাশগুপ্ত

ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সেই সূত্রেই সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পান্নালাল দাশগুপ্তের মতো মানুষের সংস্পর্শে এসেছিলেন। প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে একসময় সরে এসেছেন। কিন্তু সম্পর্কে কখনও ফাটল ধরেনি। তাঁদের নিয়ে তাঁর যে সমস্ত লেখালেখি তার মূল্যও কম নয়।

আরও পড়ুন: খাদ্য-আন্দোলন: শহিদ দিবস

Welcome To Granthagara - Granthagara

শিক্ষকতাকে প্রায় ব্রত হিসাবে নিয়েছেন। দশটা-পাঁচটার চাকরি নয়। সন্ধে হয়ে এসেছে। আমাদের পড়াচ্ছেন হয় ‘পুনশ্চ’, নয় ‘চার অধ্যায়’ কিংবা ‘আধুনিক কবিতা’ বা ‘জনা’। আমরা কেউ বাড়ি ফেরার জন্য ব্যস্ত নই। মনে হত স্যার পড়িয়েই যান। একজন সফল শিক্ষক তো বটেই। নিঃসন্দেহে ছাত্রদরদীও। নীরবে যে কতজনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের অর্থনৈতিক দুরবস্থা তাঁকে ব্যথিত করেছে। কত পরিবারের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছেন মুকুটহীন অভিভাবকের মতো।

শিক্ষকতা প্রক্রিয়াকে যেকোনও পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, পড়ানোর মান যে ঠিক কতখানি উচ্চতায় পৌঁছতে পারে তার ভিন্নতর দৃষ্টান্ত সুধীনবাবু। কারও কাছে সুধীন স্যার, কেউবা এস বি। আমরা শুধু স্যারই বলতাম। রবীন্দ্রনাথের ‘সবুজের অভিযান’ পড়াচ্ছেন। তাঁর সেই মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বরের মাদকতায় আমাদের শুনে শুনেই গোটা কবিতা মুখস্থ হয়ে গেল। আর কথায় কথায় আমরা বলে উঠতাম সেই কবিতার লাইন— “ভুলগুলো সব আনরে বাছা বাছা।”

ভীষণ রকমের রবীন্দ্রমনস্ক ছিলেন। রবীন্দ্রনাথপাঠের আগ্রহ ছাত্রমনে সঞ্চারিত করে দেবার মন্ত্র তাঁর জানা ছিল। রবীন্দ্রগানের উল্লেখ কথায় কথায়। বালক রবীন্দ্রনাথ বেহালা ব্রাহ্মসমাজে এসে গান গেয়েছিলেন এ খবরও তাঁর থেকেই জানা। বিষ্ণুপুর শিক্ষাসংঘে ‘মুক্তধারা’ নাটকে অভিজিৎ সেজেছিলেন। সিল্কের পাঞ্জাবি পরেছিলেন। সে গল্প যে কতবার করেছেন। কলেজে আমাদের দিয়ে করিয়েছিলেন ‘শিশুতীর্থ’। পাঠ এবং গান। রিহার্সাল দিতে হয়েছে রীতিমতো। রিহার্সালেও কত যে আনন্দ। রিহার্সাল দেওয়া হয়েছে এর-ওর বাড়িতেও। খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা। এই সব কিছুই যে জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে সেই সহজ সত্যের সঙ্গেও আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, মনে হতে পারে রূপকথার গল্প শোনাচ্ছি। সেই রূপকথার জগতে জীবনের অনেকগুলো প্রহর কেটেছে। আনন্দময় সেই মুহূর্তগুলো এখনও যেন ফ্রেমে বাঁধা আছে। মাঝেমাঝে ধুলো ঝেড়ে নিলেই ফিরে যাওয়া যায়  সেই ‘ কোন্ পুরাতন প্রাণের টানে’। আর তখনই মনে হয়— “আজ এই মেঘের শ্যামল মায়ায়/  সেই বাণী মোর সুরে আনে।।”

শ্রাবণের ধারার মতো সে সুর যেন আজও ঝরে পড়ে। তখন মনে পড়ে তাঁর হাতে হাত রেখে আমাদের জোড়াসাঁকো যাত্রা। তাঁর পায়ে পা মিলিয়ে শান্তিনিকেতনে কোপাই নদীর তীরে পৌঁছে যাওয়া। ‘পুনশ্চ’র কোপাই-খোয়াইকে দেখা। তখন কোথায় ‘খোয়াই বনের অন্য হাট’ কোথায় ‘বিশ্ববাংলা হাট ‘। তখন রিকশা চেপে সদলবলে ‘আমার কুটির’ অভিযান। ‘আমার কুটির’ এর তৈরি হবার ইতিহাস, সুষেণ মুখোপাধ্যায়, পান্নালাল দাশগুপ্ত প্রমুখ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে তার যোগ, ‘আমার কুটির’কে কেন্দ্র করে বিপ্লবীদের আনাগোনা, সাধারণ মানুষের উপার্জনের উপায় এমন সব অজানা তথ্যের সম্ভারে সাজিয়ে দিচ্ছেন আমাদের মনকে। তখন অন্য শান্তিনিকেতন। তখন ‘বহিরাগত’ হয়েও শান্তিনিকেতন আমাদের “সব হতে আপন।” তখন ভুবনডাঙার মাঠ পেরিয়ে শান্তিনিকেতনকে ভালোবাসতে শেখা।

Shantiniketan | LBB

‘আধুনিক কবিতা’ ছিল পাঠক্রমের অন্তর্গত। অমিয় চক্রবর্তী, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, সমর সেন, পড়া চলছে। তালিকার বাইরে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর কবিতাও পড়া হচ্ছে। ক’দিন বুদ্ধদেব বসু নিয়ে আলোচনা চলল। ‘কঙ্কাবতী’ নিয়ে আলোচনা করছেন বিজ্ঞান বিভাগের মাস্টারমশাইদের সঙ্গে। আমাদের বলছেন সেসব। সে এক দিন গেছে।  

আর ছন্দ পড়ানো।  সেও যেন এক ইতিহাস। ছন্দ নির্ণয়ের সোনার কাঠি যেন ছিল তাঁর হাতে। যে কাঠির স্পর্শে তানপ্রধান, ধ্বনিপ্রধান, ছড়ার ছন্দ প্রাণ পাবে। বলছেন অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, দলবৃত্তের কথা। কখনও তাঁর মাস্টারমশাই গৌরীশংকর ভট্টাচার্য কীভাবে ছন্দ পড়াতেন তার কথাও। বৈষ্ণব পদাবলির ছন্দ নির্ণয় করতে হলে কীভাবে পদ পাঠ করতে হবে ছেলেমেয়েদের কাছে, সেই ভঙ্গিটি খুব মজার ছিল। গোবিন্দ দাসের অভিসার পর্যায়ের একটি পদের কথা মনে পড়ে— “কণ্টক গাড়ি কমল সম পদতল মঞ্জীর চীরহি ঝাঁপি”। অলংকার পড়ানোর অন্যরকম একটা আমেজ ছিল তাঁর গলায়। বলতেন, বল— ”নামে সন্ধ্যা তন্দ্রালসা সোনার আঁচল খসা” কী অলংকার হবে? বৈষ্ণব পদাবলি, শাক্ত পদাবলির কথা না-হয় না-ই বললাম। আর সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘জাগরী’। একরাতেই সে উপন্যাস শেষ করেছিলাম স্যারের থেকে বই নিয়ে। ‘জাগরী’ ছিল পরের বছরের সিলেবাসে। 

জীবনানন্দের কথা বলে শেষ করার নয়। একসময় জীবনানন্দকে প্রতিদিনের সঙ্গী করে নিলেন। কথা বলছেন জীবনানন্দকে কোট করে। জীবনানন্দের কবিতার লাইন নিয়ে ছন্দ করাচ্ছেন।  উনিশশো ছেচল্লিশ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। আমাদের ফর্টিসিক্সের বন্ধুরা বলতেন কয়েকজনকে। নৃত্যশিল্পী অসিত চট্টোপাধ্যায় ছিলেন এমনই এক বন্ধু। তাঁর ছিল ‘রাগিণী’ নামের নৃত্যচর্চার প্রতিষ্ঠান। ‘রাগিণী’ থেকে একবার জীবনানন্দের একটি কবিতার নাট্যরূপ মঞ্চস্থ করানো হয়েছিল। ভীষণ ভালো ছিল স্যারের তৈরি সেই স্ক্রিপ্টটি। এখন হয়তো  হারিয়ে গেছে। এমন করেই যে আমরা হারিয়ে ফেলি সবকিছু। জীবনানন্দচর্চায় হয়তো প্রয়োজনে তৈরি সেই স্ক্রিপ্টটিও আজ অমূল্য বলে মনে হত।

Jibanananda Das - Wikipedia

জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে বড়িশা কলেজ, এখনকার বিবেকানন্দ কলেজের সঙ্গে সম্পর্ক জানাচ্ছেন।  উনিশশো বাহান্ন সালের নভেম্বর মাস থেকে উনিশশো তিপান্ন সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত জীবনানন্দ দাশ এই কলেজে পড়িয়েছেন। এসব নিয়ে পরে একটি নিবন্ধও তৈরি করেছেন। অনেক বিভ্রান্তির নিরসন সে লেখায়। মূলত জীবনানন্দ দাশের এই কলেজের চাকরি নিয়ে নানান কথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তখনকার পরিচালন সমিতির কাগজপত্র দেখে অনেক অন্ধকার সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন স্যার। কলেজ সম্পর্কে অকারণ কটুকথা শোনার মানুষ তিনি নন। তাঁর নিবন্ধটি থেকে খানিকটা অংশ উদ্ধৃত করা যায়। “বড়িশা কলেজ তখনকার দিনে প্রাইভেট কলেজ ছিল না, ছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুমোদিত ডিসপারশিয়াল স্কিমের কলেজ। এই কলেজের গভর্নিং বডি স্থানীয় শিক্ষানুরাগীরা হলেও কলেজকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

Vivekananda College, Kolkata Reviews on Placements, Faculty and Facilities

…জীবনানন্দকে বড়িশা কলেজে আনতে গেলে ইংরেজিতে একটা Temporary post create করা দরকার মানে Approval থাকাও দরকার। ড. রায় আগস্ট মাসের কার্যকরী সভায় ইংলিশ টিচারের প্রস্তাব তুলে সভাপতিকে দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়েছিলেন।… সম্পূর্ণ একটি অস্থায়ীপদে তাঁকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছিল।… পদটি স্থায়ী করার জন্য এবং ওই স্থায়ীপদে জীবনানন্দকে নিয়োগ করার জন্য কর্তৃপক্ষ শিক্ষদপ্তরে চেষ্টা চালিয়েছিলেন।… শিক্ষাদপ্তর বড়িশায় ইংরাজি অধ্যাপকের জন্য নতুন পোস্ট দিতে রাজি ছিলেন না। 

… পোস্ট approve না হলে সাধারণভাবে চাকরি অনুমোদিত হয় না।… কলেজ কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে ড. সুশীলকুমার রায় তাঁর নিয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন একথা বলা হয়। আসলে ব্যাপারটি আদৌ সত্য নয়।” গোটা নিবন্ধটি এখানে তুলে ধরা অর্থহীন। তবু এ কথাগুলো বলা জরুরি মনে হল সুধীন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে। ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়কে তিনি যেমন এ লেখায় নিয়ে এলেন, জীবনানন্দের চাকরি সম্পর্কিত মনগড়া গল্পকে ভুলে যেতে বললেন আমাদের, তেমনই নিজের কলেজের প্রতি দায়িত্ব-ভালোবাসাকে আর একবার প্রমাণ করলেন। এ নিবন্ধটি সম্পূর্ণ তুলে দিতে পারলে হয়তো আরও ভালোভাবে জীবনানন্দ-সম্পর্কিত তথ্যাদি জানানো যেত। এটি ‘সপ্তাহ’ পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুপরবর্তী সময়ে তাঁর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লেখাগুলোকে (সব লেখা পাওয়া সম্ভব হয়নি) একজায়গায় জড়ো করে ‘লেখালেখি’ নামে একটি বই প্রকাশ করা হয়েছিল ‘শ্লোক’ কবিতা পত্রিকার পক্ষ থেকে। সেখানে এই লেখাটি পুনরায় সংযোজিত করা হয়েছে। নিবন্ধটির নাম ‘কবি অধ্যাপক জীবনানন্দ ও বড়িশা কলেজ।’ বিবেকানন্দ কলেজ ফর উইমেন এবং বিবেকানন্দ কলেজ, ঠাকুরপুকুরে জীবনানন্দ দাশের নামাঙ্কিত প্রস্তরফলক দু’টি স্থাপনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উদ্যোগ তিনিই নিয়েছিলেন। 

‘লেখালেখি’ বইটিতে সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর , পান্নালাল দাশগুপ্ত, মোহিনী চৌধুরীকে নিয়ে লেখাগুলোও কম মূল্যবান নয়। এই বইটি যদি কেউ নিবিষ্টচিত্তে পাঠ করেন, তাহলে দেখবেন একজন মানুষ কীভাবে নিজের ভাবনার জগৎকে বিস্তারিত করে দিয়েছেন। কত রকমের লেখা। রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, শরৎচন্দ্র তো আছেনই। আছেন চিত্তরঞ্জন দাশ, জেমস লং, পিয়ারসন, এন্ডরুজ , প্রমথনাথ বিশী, ভবানী মুখোপাধ্যায়। আবার চর্যাপদও।

রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে বাজেয়াপ্ত উপন্যাস ‘খেয়ালী’র কথা আছে। বীরেন রায় সে উপন্যাসের লেখক। বিপ্লবী কিরণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে উপন্যাসটি উৎসর্গ করা হয়েছিল। ‘খেয়ালী’  সম্পাদনা করে আবার বের করা যায় কিনা ভাবছিলেন। হয়ে ওঠেনি। ‘খেয়ালী’র লেখক উপন্যাসের কিছু পরিবর্তন ঘটিয়ে ‘অগ্নিযুগের কাহিনী’ নাম দিয়ে একটি চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন। সেটি চলচ্চিত্রায়িত হয়েছিল আমাদের অনেকেরই জানা। সেই প্রসঙ্গটিও এখানে উপস্থাপিত হয়েছে। 

বিপ্লবী কিরণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

বেহালার একটি ইতিহাস নির্মাণের কথা ভাবছিলেন অনেক দিন ধরে। প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি লিখে চলেছেন ‘History of Behala Brahmasamaj’, ‘যুগসাধিকা রানী রাসমণি’, ‘বেহালা  নস্করপুরের বুনোপঞ্চানন্দ ও লোকঐতিহ্য’র মতো ছোটো ছোট বই। আঞ্চলিক ইতিহাসে ধর্মচেতনা কীভাবে জড়িয়ে থাকে, মানবজীবনপ্রবাহে ধর্মীয় ভাবনার গুরুত্ব ঠিক কোনখানে এ নিয়ে নিরন্তর ভেবে চলেছিলেন। মৃত্যুর আগের বছরও ‘বেহালা চণ্ডীতলার শ্রীশ্রী চণ্ডীমাতার ইতিবৃত্ত’ নামে যে বইটি লিখেছিলেন, সেটি ঠিক নিছক পূজাপদ্ধতি, ব্রতকথা বা পাঁচালি নয়। সেটি লোকধর্মমূলক সমাজঅর্থনীতিভিত্তিক গবেষণাকর্ম। এ গ্রন্থটিতে চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের সমাজতাত্ত্বিক সমীক্ষা বিশেষভাবে উল্লেখ করবার।

সুধীন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম পরিচয় তিনি যথার্থ অর্থে একজন শিক্ষক। কিন্তু ‘বেহালা জনপদের ইতিহাস’ বইটি যখন ছুঁয়ে দেখি, তখন মনে হয় এই একটি কাজের মধ্যে দিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন  বেহালা জনপদের অধিবাসীবৃন্দের হৃদয়ে। আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চায় অনুরাগী মানুষের হৃদয়ে। স্থানিক ইতিহাসের আলোচনায় এই বইটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কাজ চলছিল অনেক আগে থেকেই। তখন তিনি তরুণ। বন্ধু মানিক চট্টোপাধ্যায়ের আন্তরিক সহায়তা পেয়েছিলেন এ কাজে। সেইসময় বেহালা সম্পর্কিত লেখাগুলো প্রকাশিত হতে পেরেছিল ‘পৌরবার্তা’য়। ‘ঐতিহ্যের বেহালা’ নামের কলমে সেসব লেখা বেরোত।

বেহালার বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন। মানুষজনের যাপিত জীবনের খোঁজ নিয়েছেন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ধর্ম, রাজনীতি অর্থনীতি সবটাই খুঁটিয়ে জেনেছেন। বেহালা জনপদের সমৃদ্ধিতে  বৃহত্তর বেহালা জনপদের বিভিন্ন পরিবার ও ব্যক্তির ভূমিকা ঠিক কতখানি তার খোঁজ নিয়েছেন। খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন সংগঠন, স্কুল-কলেজের গড়ে ওঠা, বেহালায় ব্রাহ্মসমাজ গঠনের ইতিহাস এসবের নির্ভরযোগ্য তথ্যাদি সংগ্রহ করে তবেই  গ্রন্থপ্রকাশের পরিকল্পনা। 

‘বেহালা জনপদের ইতিহাস’ প্রকাশিত হয়েছিল ‘প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স গিল্ড’ থেকে। মূলত পবিত্র অধিকারীর উৎসাহে। পরবর্তীকালে যিনি ‘রঙ্গ ব্যঙ্গ রসিকেষু’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। বেহালা জনপদের একটি রেখচিত্র ধরা আছে ‘বেহালা জনপদের ইতিহাস’ বইটিতে। আছে গ্রামীণ বেহালার নাগরিক বেহালায় রূপান্তরের কথা। তিনি তো আক্ষরিক অর্থে ইতিহাসবিদ নন। তিনি একেবারে নিজের মতো করে ইতিহাসকে ধরতে চেয়েছেন। অসম্পূর্ণতাকে সম্পূর্ণ করার কাজ তো হতেই পারে। প্রথম সংস্করণ নিঃশেষিত। দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করবার ইচ্ছে ছিল সকলের। সেখানে হয়তো বেহালা জনপদের রাজনৈতিক ইতিহাস, নাট্য আন্দোলন, সংস্কৃতি জগতের খবরাখবর সংযোজিত হত। কিন্তু কর্কটসহবাস যিনি করেন, তাঁর তো যাবার তাড়া থাকতেই পারে। তাই অসমাপ্ত থেকে গেল অনেক কাজ।

দু’হাজার তিন সালের পাঁচ সেপ্টেম্বর। শিক্ষকদিবসের সকালে তাঁর সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাৎকার। কথা বলেছিলেন আর ক’টি। একটা অস্বস্তির মধ্যে ছিলেন মনে হচ্ছিল। সেদিন ছিল কবি চিত্ত ঘোষের জন্মদিন। দু’হাজার কুড়ির পাঁচ সেপ্টেম্বর তাঁর একশো বছর পূর্ণ হল। সেদিন তাঁর বাড়িতে তাঁর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে কবিতা পড়ার কথা ছিল। তাই স্যারের সঙ্গে দেখা করে এসেছিলাম সকালবেলাতেই। পরের দিন শান্তিনিকেতন। সন্দীপদা, সন্দীপ দত্তের নির্দেশ মান্য করে কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্রের একটি অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্ব ছিল সিংহ সদনে। সাত তারিখ বাড়ি ফেরা।

সোমবার। আট সেপ্টেম্বর। বিশেষ কাজে কর্মস্থল থেকে ফিরে মতি নন্দীর বাড়িতে যেতে হয়েছিল।  খবর গেল সেখানেই। শ্মশান হল, শ্রাদ্ধশান্তি হল, স্মরণসভাও দু’চারটি। কিন্তু ‘বেহালা জনপদের ইতিহাস’ রচয়িতা সুধীন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেইবা মনে রাখলেন? মাত্র দশ হাজার টাকার বিনিময়ে এ বইয়ের স্বত্ব যাঁরা কিনে নিলেন নতুন করে প্রকাশ করবেন বলে, সেই কাজটি ইতিমধ্যে তাঁরা সম্পন্ন করেছেন কি না সে খবর আজও আমার জানা নেই। আজ তাঁকে মনে করে বেদনাটুকু সম্বল করে প্রয়াণ দিবসে প্রণতচিত্ত হলাম। 

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • SUBHRANSU ROY

    অনবদ্য লেখা। বিশেষত লেখার শেষ অংশে ‘ বেহালা জনপদের ইতিহাস ‘ রচিয়তা সুধীন্দ্র বন্দোপাধ্যায় কে কেইবা মনে রাখলেন ‘ লাইনটি যেন আমাদেরকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *