বাবা

Fathers Day

অবশেষ দাস

ছোটবেলায় কখনও ঘোড়ার গাড়ি চড়ার সৌভাগ্য হয়নি। আমার বড় ভাইপো অভিনব। ওর সাড়ে চার বছর বয়সে আমার প্রথম ঘোড়ার গাড়িতে ওঠা। ভিক্টোরিয়ার সামনে থেকে ওকে নিয়ে অনেকটা পাক খেয়েছি। ওই আমাকে প্রশ্ন করে, “তুমি তো আমাকে ঘোড়ার গাড়িতে ওঠালে। তোমাকে প্রথম কে উঠিয়েছে, কাকু।”
উত্তর দিতে একটু লজ্জা হয়েছিল। বলেছিলাম, “তোর মতো আমিও আজ প্রথম ঘোড়ার গাড়ি চড়লাম। আগে কখনও উঠিনি। ছোটবেলায় শহরে আসিনি।”
“কেন ? একদম আসোনি?”
“এসেছি, বাবার হাত ধরে। ওই ময়দানে। বইমেলাতে। কত বড় মেলা। কত লোকজন। কত বই। বাবা এই মেলা থেকেই আমাকে ‘বর্ণপরিচয়’ কিনে দিয়েছিলেন।”
“তখনই তো ঘোড়া চড়ে নিতে হয়।”
অভিনবকে বললাম, “তখন কী শিখেছি আর কি শিখিনি মনে নেই। কিন্তু কোনও ব্যাপারে বায়না করতে শিখিনি। বায়না করার মতো স্বাচ্ছন্দ্য আমাদের ছিল না। তাছাড়া ঘোড়া গাড়ি চড়বার চেয়েও লোভনীয় ছিল, বাবার কোল চড়া। বাবার কোলে মেলা ঘুরেছিলাম।”

আরও পড়ুন: তিনটি কবিতা

অনেকের মনে হবে, অত ছোটবেলার কথা কারও মনে থাকে নাকি! হ্যাঁ, নিশ্চয়ই থাকে। বইমেলা দেখার গল্প আবৃত্তির মতো সারাবছর আর বছর বছর ঘুরে ফিরে এসেছে। জাবর কাটা রংবেরঙের ছোটবেলা ভোলা তো সম্ভব নয়। তারপর বাবার কোলে চড়ে রাজকীয়ভাবে মেলা পরিক্রমা। হাঁটতে শিখে গিয়েছিলাম অনেক আগে। কিন্তু অনেক বড়বেলা পর্যন্ত বাবার কোলে উঠেছি। ভোলার কথা নয়। তারজন্য মা মাঝেমধ্যে বকুনি দিয়েছে। “বাবা আর পারে! নাম আগে দামড়া ছেলে। এইটে পড়িস এখনও বাবার কোলে।” আমি অন্যমনস্কভাবে বাবার গলা জড়িয়ে মজা নিয়েছি। মায়ের বকুনিতে কোনও দিনও কোল থেকে নামিনি। সেজো কাকা হাসতে হাসতে বলতেন, “বাঁদর যেমন কখনও গাছ থেকে নামে না। আমাদের ছেলেটাও কখনও কোল থেকে নামে না।”

কারও কোনও কথাতেই ভ্রূক্ষেপ করতাম না। বাবা এখন পঁচাত্তর। আমার ছেলেমেয়েকে একইভাবে আগলে রেখেছেন। তাদের অত্যাচার একইভাবে সহ্য করছেন। এসব তাঁর কাছে চিরকাল উপভোগ্য হয়েছে। আমাদের দু’টি প্রজন্মের কাছে তিনি এক মস্ত বড় বটগাছ।

প্রতিদিন বাজার করা। আমার ঘুমন্ত বিছানায় খবরের কাগজ পৌঁছে দেওয়া। লেখার টেবিলের বইপত্র গুছিয়ে দেওয়া তাঁর চিরকালের স্বাধীন দায়িত্ব। আমি যে বড় হয়ে গেছি, বাবা হয়ে গেছি সেসব তিনি মনে রাখেন না। কখনও মনে করেন না। তিনি আগের মতোই, শাসনে খড়্গহস্ত। জীবনের চারটে দশক কম লম্বা নয়, তিনি অনলস। পূর্ণ মনোযোগে তিনি আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আগলে রেখেছেন। তাঁর চোখের স্বপ্নগুলো অনেক ছোটবেলায় পড়ে ফেলেছিলাম। বুঝেছিলাম, বড় লোক হওয়ার বিলাসিতা বাবার নেই। বড় মানুষ করে তোলার স্পর্ধা তিনি রাখেন। বাবার সেই স্বপ্নকে আজও মুঠো করে ধরে আছি।

আরও পড়ুন: দেশ, সীমান্ত এবং মিলখা সিংয়ের রূপকথা

কত দুর্গম পথ পেরিয়ে এসেছি। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা সবাই যখন দুপুরবেলা ভাত ঘুম দেয়, ভাড়া ঘরে থেকে দিনের পর দিন টিউশন পড়িয়েছি। পাহাড়ের সরকারি হাইস্কুলে পড়াতে গিয়েছি। বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সব ছেড়েছুড়ে কলেজে পার্টটাইম করেছি। আবার কিছুটা হলেও কলেজের চাকরিতে নিশ্চয়তা এসেছে। সবমিলিয়ে পৃথিবী বলতে আমার কাছে কিছু নেই। আজও আমার বাবা আমার পৃথিবী। আমি বিশ্বাস করি, বাবার জন্য কখনও নিজেকে স্নেহ কাঙাল মনে হয়নি। কাউকে ঠকাতে শিখিনি। নিজেকে রূপকথার রাজা মনে হয়েছে। রূপকথার সেই সিঁড়ি বাবার হাতে বানানো। বলা ভুল হলো, বাবার বুকের রক্ত দিয়ে বানানো।

আমার অসামান্য বাবা একজন সামান্য ফার্মাসিস্ট। কলেজে পড়তে পড়তে বুঝতে পারি, বাবার পক্ষে এত বড় সংসার টানা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি তো অনেক টেনেছেন। মায়ের কষ্টটাও দিন-দিন বাড়ছে। আমি ঝাঁপিয়ে পড়ি সেই কষ্টের আগুনে। বাবা-মা কত বছর ধরে পুড়ছে। আমিও পুড়তে চাই। টিউশন ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। এমএ পাশ করতে না করতে টিউশন ঘরটা একটা মস্ত কারখানা হয়ে গেল। একটা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হল। ‘বাংলার মুখ’ সেই প্রতিষ্ঠান। তার হাত ধরেই উত্তরণ। সবকিছু। এতদিনে এটুকু বুঝেছি, পরিকল্পনা করে জীবনে কিছুই হয় না। প্রতিদিন ঘষেমেজে নিজেকে গড়ে তুলতে হয়। জীবনের কুরুক্ষেত্রে বাবা-ই সেনাপ্রধান। আর মা যুদ্ধজয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবী।

ছোটবেলায় বাবা ঘোড়া চড়াতে পারেননি বলব না। আমাদের ছোটবেলায় ওই বিলাসিতাটুকু করার ফুরসত ছিল না। সুপারি পাতার গাড়ি আমরা অনেক চড়েছি। গাছের মগডালে আমরা অনেক চড়েছি। হাতি-ঘোড়া চড়া তো দূরের কথা। ওদের দেখা পেতেই আমাদের বড়বেলা এসে গেছে। কিন্তু বাবা-মায়ের ভালোবাসায় আমাদের ছোটবেলা আজও ফুরায়নি।

মারাদোনার বিশ্বকাপ থেকে এখনও পর্যন্ত সব বিশ্বকাপ বাবার পাশে বসেই দেখা। সাদা-কালো থেকে রঙিন সবটা তাঁর হাত ধরে দেখা। বাবার দেখানো এই পৃথিবী দিনে-দিনে রঙিন হয়ে উঠেছে। আমার প্রথম দেবতা আমার বাবা। আমার প্রথম পূজা আমার বাবা। বুকের ভেতরটা টনটন করে ওঠে যখনই মনে হয় বাবা একদিন থাকবেন না। ঝরাপাতার পাতার মতো দমকা হাওয়া এসে তাঁকে একদিন উড়িয়ে নিয়ে যাবে। চোখে জল চলে আসে। বাবা-ই তো আমার সমস্ত পৃথিবী রঙে রঙে রামধনু করে তুলেছেন। তাকে কখনও সাদা-কালো দেখতে চাই না। বাবা ছাড়া কখনও জীবন হয় নাকি। এই জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত তাঁর সঙ্গে হেঁটেছি। পৃথিবীর সব বাবা-ই সন্তানের হাত ধরে থাকেন। পৃথিবীর শাখাপ্রশাখা দেখান। ব্রহ্মাণ্ডের মগডালে বসে বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। ছেলেবেলায় বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ পড়েছি, আজও ভুলিনি। আর জগতের বর্ণপরিচয় বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে পড়েছি। তিনি আজও আমাদের জীবনের দিকে তাকিয়ে পথ হাঁটছেন। পৃথিবীর পথে পথে উড়ন্ত ধুলো-বালি-ছাই অবাধ্য রোদ-জল-ঝড় সবার কাছে লিখে দিয়েছি,

বাবা, হাত ছেড়ো না।
এখনও অনেকটা পথ যেতে হবে।
তুমি ছাড়া আমাকে কেউ কোলে নেবে না।
তুমি ছাড়া কেউ আলো দেবে না।

নিবন্ধক বিশিষ্ট সাহিত্যকার এবং বাংলা বিভাগ, বিদ্যানগর কলেজে অধ্যাপনারত

Facebook Twitter Email Whatsapp

5 comments

  • Samapti kayal

    লেখাটি খুব সুন্দর হয়েছে স‍্যার…❤️❤️

  • Amiya Kumar Sardar

    মর্মস্পর্শী বাস্তব স্তবের অনন্য উদাহরণ।
    সমৃদ্ধ হলাম।

  • অমিয় কুমার সরদার

    মর্মস্পর্শী বাস্তব স্তবের অনন্য উদাহরণ।
    সমৃদ্ধ হলাম।

    • অসাধারণ লেখনী । পিতৃত্বের বর্ণপরিচয়।
      বাবাই আমাদের বোধের ঘরে প্রথম আলো জ্বালেন। সারাজীবন আলো হয়ে থাকে। আপনার লেখা পড়ে সেই আলোর সামনে দাঁড়ালাম মনে হলো।

  • খুব ভালো লাগলো ❤️..মনে গেঁথে গেল ❤️

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *