অন্ধকার সময় (৩য় অংশ)

জয় ভদ্র

বিগত ২রা ফেব্রুয়ারির পর আজ পাক্কা দেড় মাস অতিক্রান্ত। রবীন্দ্রসংগীত বেজে উঠল। প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে কলে চাপ দিতেই ওপাশ থেকে এক পুরুষের গভীর কণ্ঠস্বর, ‘হ্যালো, আমি রতনলাল সাধুখাঁর কার সঙ্গে কথা বলছি?’
   ‘হ্যাঁ বলছি, আপনি?’
   ‘আমি মিস্টার প্রীতময় গুপ্ত বলছি, গুপ্ত অ্যান্ড সন্স-এর মালিক। আপনার একটা অ্যাপোয়েন্টমেন্ট পাওয়া যাবে?’
   ‘আপনি নাম্বারটা পেলেন কোথা থেকে?’
   ‘আপনার দোকানের পাশের দোকানদারের কাছ থেকে নাম্বারটা পেয়েছি। আপনারই ঘনিষ্ঠ সে। বাবু সমাদ্দার। আজ সকালেই গিয়েছিলাম আপনি কখনও আসেননি। অনেকক্ষণ ওয়েট করলাম। শেষে উনি আপনার নাম্বারটা দিলেন।’
   ‘হ্যাঁ, সকালে একটা কাজে হঠাৎই আটকে গিয়েছিলাম। তা কী ব্যাপারে বলুন।’
   ‘আমাদের অ্যান্টিক কালেকশনের বিজনেস। বহু পুরনো ব্যবসা বলতে পারেন, প্রায় ১০০ বছরের। আমার ঠাকুরদার বাবার আমল থেকে শুরু।‌‌‍‍‌ ইন্টারন্যাশনাল কানেকশন আছে। ফরেনে অ্যান্টিক সাপ্লাই দিই আমরা। বাকিটা না হয় ফেস টু ফেস কথা হবে। তো একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যাবে?’
   ‘রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে। ওই ন’টা সোয়া ন’টা নাগাদ আসুন না। একরকম ফাঁকাই থাকে। কাস্টমার তেমন আসে না ওই সময় খুব একটা।’
   ‘থ্যাঙ্ক ইউ।’

আরও পড়ুন: অন্ধকার সময়

রাত ঠিক ন’টা পনেরো। প্রীতময় গুপ্ত ১১০/১বি, হুমায়ুন প্লেসের দোকানটায় আসে। দোকানের মধ্যে যাকে দেখলেন তাকে নমস্কার করে ভেতরে ঢোকার অনুমতি চাইলেন। ভেতরে ঢুকে পরিচয় দিল আমার নাম প্রীতম গুপ্ত। প্রত্যুত্তরে দোকানের লোকটিও প্রতি নমস্কার জানায়। পরিচয় দেয় আমি রতনলাল সাধুখাঁ। কোকড়ানো চুলের মাঝবয়সি মানুষ। ডান গালে একটা কাটা দাগ আছে। নাকের সামনেটা কিছুটা ভোতা। তার নীচে পুরুষ্ট কালো-সাদা গোঁফ। গায়ের রং তামাটে। চোখে পুরনো আমলের সেলুলয়েড ফ্রেমের চশমা, যদিও হাতের রিস্ট ওয়াচটা আধুনিক চায়না ব্র্যান্ডের। পরনে আকাশী নীল রঙের হাইনেক।
   প্রীতময়কে শোকেসের ঠিক আগে বাঁ কোণের একটা টুলে বসার অনুরোধ করলেন রতনলাল। উনি একজন কাস্টমারের সঙ্গে কথা বলছিলেন তখন। বেশ বড়োই দোকান। দোকান ভর্তি ঠাসা কালেকশন। জীবজন্তু-পাখির স্টাফিং বডি থেকে পুরনো আমলের অস্ত্রশস্ত্র, গ্রামোফোন রেকর্ড কি নেই! চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তা দেখতে থাকে প্রীতময়। ভেতরের এক কোণে দেখে সাজানো আছে সম্ভবত অষ্টাদশ শতকের কিছু কাঠের আসবাবপত্র। এরই পাশে কিছু বইয়ের কালেকশন আছে। শোকেসের যেখানটায় ও বসে আছে সেখানে সাজানো আছে হাতির দাঁতের কারুশিল্প আর বিড়াল জাতীয় কিছু জন্তুর না। শোকেসের মত সোজা তাকায় সেখানে এক জায়গায় নজরে পড়ল সোনার হাঁসের পালকের কলম…
   মিনিট পনেরো পর নাগাদ কাস্টোমার চলে গেল ওর পছন্দমতো জিনিসটি বারগেনিংয়ে ঠিক পোষালো না-বলে। সে চলে যেতেই দোকান পুরো ফাঁকা। রতনলাল সাধুখাঁ প্রীতময়কে তার সামনের টুলটায় বসার আমন্ত্রণ জানালে সেখানে বসতেই রতনলাল অনুযোগের সুরে বলতে থাকল, ‘সরি দাদা, আপনাকে বসিয়ে রাখার জন্য। আসলে আমার কর্মচারীটা আজ তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে বেরিয়ে গেছে। তাই দেখুন না কাস্টমার ডিলিং করতে হচ্ছে। তা বলুন আপনার জন্য আমি কি করতে পারি?’
   ‘হ্যাঁ, ফোনে যদিও আপনার সঙ্গে এক প্রস্থ কথা হয়েছে… একচুয়ালি আমরা হলাম গিয়ে এন্টারপ্রাইজার আর আমার অফিসটা একদম খিদিরপুর পোর্টের কাছেই। এই আমার কার্ড’— বলে প্রীতময় প্যান্টের পেছন থেকে পার্সটা বের করে ওর ভেতরে থাকা ভিজিটিং কার্ডটা বের করে রতনলালকে দেয়।
   রতনলাল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কার্ডটা দেখে। তারপর বলে, ‘হ্যাঁ, বলুন দাদা।’
   ‘আপনার আরও অনেক কাস্টমার আমার আছে। আমরা তাদের থেকে ডাইরেক্ট ক্যাশে মাল কিনে নিই। যেটা আমাদের এই মুহূর্তে রিকোয়ারমেন্ট সেটা আমার পুরনো ক্লায়েন্টেদের কাছ থেকে পাচ্ছি না। দু-একজন দেবে বলেও আরও সময় চাইছে। তাই অনেক খুঁজে আপনার সন্ধান পেলাম। আপনার তো দেখছি প্রচুর কালেকশন!’

আরও পড়ুন: অন্ধকার সময় (২য় অংশ)

‘তা দাদা আপনাদের আশীর্বাদে…’
   ‘আপনার কত দিনের দোকান?’
   ‘তা আপনাদের মতন একশো বছরের কনসার্ন না-হলেও আমরাও প্রায় ধরুন গিয়ে নয়-নয় করে সত্তর-পঁচাত্তর বছরের দোকান তো হবেই। আমার ঠাকুরদা এই দোকান শুরু করেছিলেন।’ এরপর রতনলাল নির্মল হেসে বলেন, ‘তিন পুরুষ। তো আপনার রিকোয়ারমেন্টটা একটু বলবেন দাদা।’
   ‘ক্যাট ফ্যামিলির কিছু এনিমেলস স্টাফিং দরকার। বার্ড থাকলেও নিতে রাজি আছি।
আপনাকে একটু খুলেই বলি দাদা। তাহলো এই মুহূর্তে এখানকার পরিবেশ আইনের নানা জটিলতায় সাপ্লাই বন্ধ আছে কিন্তু আমার এখনই কিছু মাল চাই। বাল্ক অর্ডার আছে বিদেশে। আমরা একচুয়ালি হোলসেলার। অর্ডার সাপ্লাই দিই ফরেনে। এছাড়া ফি-বছর অকশন ডাকি।’
   রতনলাল বিনয়ের সঙ্গে মিনমিনিয়ে বলে, ‘বাল্ক হয়তো পারব না কিন্তু কিছু এক্সক্লুসিভ কালেকশন আছে। দেখতে পারেন তবে আপনি। ঠিকই বলেছেন এই ধরনের সাপ্লাই এখন টোটালি স্টপ। আমার কাছে কৃষ্ণনগর রাজপরিবারের বেশ কিছু স্টাফিং আছে। ওর মধ্যে একটা মাঝারি সাইজের ব্ল্যাক প্যান্থারও আছে।’
   ‘অরিজিনাল মানে রাজবাড়ির…’
   ‘পাক্কা।’
   ‘অথেন্টিসিটি কি?’
   ‘বিশ্বাস।’
   ‘বিশ্বাস! শুধু বিশ্বাসে অথেন্টিসিটি প্রমাণ হয়?’
   রতনলাল হেসে বলেন, ‘দাদা এই লাইনে আপনারাও বহুদিনের আমরাও কিন্তু কম দিনের নয়। ভালো করে আপনি জানেন কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া একচুয়াল অরিজিনাল মানের অথেন্টিসিটি প্রুফ করা যায় না। বিশেষ করে আমাদের পেশায়। জানেন তো বেশিরভাগই চোরাই মাল। তাছাড়া আমাদের পক্ষে কার্বন ডেটিং করা সম্ভব হয় না। যেমন আপনার এই প্যান্থারটা। আমি কিন্তু প্রথমেই বলে রাখছি দাদা হাই কনফিডেনসিয়াল… পরে কিন্তু কিছু বলতে পারবেন না আমায়। তবে বার্ডগুলোর কিন্তু আছে।’
   ‘প্যান্থারটা এখানে দেখছি না তো?’
   ‘ওই যে বললাম হাই কনফিডেনসিয়াল। যেদিন নেবেন সেখানেই নিয়ে গিয়ে আপনাকে দিয়ে দেব। এখানে আনার কোনো সিম নেই। আর জানবেন ওর জন্য কোনো চেক ইস্যু নয়, ডাইরেক্ট কেস ডিলিং।
   প্রীততম চুপ। নাকের নচে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। এক চিন্তাশীল গাম্ভীর্যতা নিয়ে বলে, ‘হুম… তা আপনার তো ভ্যারাইটি কালেকশন… অন্যগুলো একটু দেখান না। দূর থেকে অত বোঝা যায়?’
   ‘তা আসুন না। ভেতরে আসুন। অনেক কিছু আছে।— রতনলাল সামনের কাঠের পাটাতন তুলে ক্লায়েন্টকে ভিতরে ঢোকায়, ‘সিগারেট চলে স্যার?’ সে নিজেও একটা ধরায়…
   ‘চলে, কিন্তু আপনার…?’
   ‘এই একটু সাবধানে… এই দিকটা দেখেছেন?…’
   ‘আপনার দোকানে ঢুকে প্রথম ওখানেই চোখ গিয়েছিল।’
   ‘ও আচ্ছা-আচ্ছা…’ রতনলাল হেসে ওঠে, ‘মেডিয়েভাল সোর্ড, কিছু বর্শাও আছে। এখানে অরিজিনালিটি প্রুফ আছে কয়েকটার। ওই যে ওই এক্সট্রিম ডানে যে-সেটটা দেখছেন তার পাশেরটা পলাশির যুদ্ধের সময়কার— কার, কবেকার, কোথাকার— সব ফারসি শব্দে খোদাই করা আছে। মাঝেরটা টিপুর ফ্যামিলির। ওখানেও ফারসি শব্দে…’
   ‘ফার্সি পড়তে জানেন?’
   রতনলাল লজ্জিত হয়ে বলেন, ‘না স্যার।’
   ‘আমি কিন্তু এগুলো নিলে তার আগে লিঙ্গুইস্টিক্স-এর ফারসি জানা লোক নিয়ে আসব।’
   ‘আপনি যেরকম চাইবেন স্যার। তবে মাল সব গ্যারান্টি।’
   ‘ওই বুকসেলফটা একটু দেখাবেন!’
   ‘অবশ্যই আসুন…’
   প্রীতময় ওই বুকশেলফটার কাছে যায়। বইগুলো ঘাঁটতে থাকে। তার মধ্যে হঠাৎ চোখে পড়ল— জে এইচ টুল ওয়ালশের ‘দ্য হিস্ট্রি অফ মুর্শিদাবাদ’। ১৯০২-এর লন্ডনের জেরল্ড পাবলিকেশনের প্রথম সংস্করণ। প্রথম প্রকাশের অরিজিনাল কভার-সহ পুরোটাই বাঁধানো তুলোট পেপারের বই। যদিও অনেক ছেঁড়া পেপার পাতলা স্ট্রেসিং পেপার সাঁটানো। এরপর আর একটা বই হাতের কাছে এলো, যদিও খুব খারাপ অবস্থা। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে গেল প্রীতময়! তাবাতাবাই গোলাম হোসেন খানের ‘সিয়ার-উল-মুতাক্ষরিন’। পাবলিশার: Calcutta, Printed by James White, 1789 [1790] 3v.। ওই একই টাইটেলের আরও একটা এডিশন চোখে পড়ল। যদিও শুধুমাত্র ভল্যুম ওয়ান। পাবলিশার: London, Printed for Oriental Translation Fund of Great Britain and Ireland, 8132।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (১ম অংশ)


   রতনলাল বাঁহাতে একবার মাথাটা চুলকে নিয়ে খেদের সঙ্গে বলতে লাগল, ‘বহুদিন পর আপনার মতন একজন মানুষ আমার দোকানে এলেন। এসবের কদর আর কে বোঝে বলুন? এই বইগুলো খুব যত্নে সাবধানে রাখতে হয় জানেন…’
   প্রীতময় সিগারেট টানতে টানতে হাতে ধরা বইটি নিয়ে সমগ্র বুকসেলফ নিরীক্ষণ করতে করতে করতে রতনলালের কথায় জলদগম্ভীর স্বরে জানতে চাইল, ‘হুঁ… পুঁথি জাতীয় কিছু আছে?’

   রতনলাল বলে, ‘আজ্ঞে?’
   ‘পুঁথি। তালপাতার বা ভূর্জপত্রের…’
   ‘স্যার বললে কি বিশ্বাস করবেন?’
    ‘অবিশ্বাসের সেরকম তো কিছু দেখছি না!’
    ‘এই বছর দুই আগে আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরির সেই সময়কার নকল করা একটা পুঁথি বিক্রি করেছিলাম। ওটাও সোনার জলের…’
   ‘পেলেন কোথা থেকে?’
   রতনলাল লজ্জা পেয়ে বলল, ‘আমরা সোর্স বলি না। ওই যে আপনাকে বললাম না রিয়েল অরিজিনাল মালের বেশিরভাগটাই চোরা সাপ্লাই।’
‘এইরকম রিসেন্ট কিছু এসেছে?’
‘রিসেন্ট এসেছে স্যার। ওই যে দেখছেন লাল কাপড়ে মোড়া…’
   রতনলাল সাবধানে সেইটা পেরে প্রীতময়ের হাতে তুলে দেয়। সে হাতে করে উপরের লাল কাপড়টা সরায়। ভূর্জপত্রের পুঁথি। বর্ণগুলো অনেকটা বাংলা অক্ষরের মতোই বোধ হয়। পুঁথির তৃতীয় পাতায় ওপরের গান দিকে একটা ইংরেজি লোগোর স্টাম্প মারা সাউথ এশিয়ান স্টাডি সেন্টার, সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট ২০০৩।

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *