অন্ধকার সময়

জয় ভদ্র

কলিংবেল টেপা মাত্রই মিনিট দুই পর ফ্ল্যাটের দরজাটা একটু ফাঁক হল। একজন মহিলা দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে জিজ্ঞেস করলেন ‘কাকে চাই?’
   আমি জেসাস। জেসাস সিনহা। ডক্টর মুখার্জির সঙ্গে একটু অ্যাপয়েনমেন্ট ছিল…
   ‘দাঁড়ান একটু’ বলে মহিলাটি আবার সদর দরজা বন্ধ করে দিল। মিনিট দুই পরে সেই মহিলা আবার এসে দরজাটা পুরো হাট করে দিল ওকে ভেতরে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে, আর এও নির্দেশ দিল বাইরের র‌্যাকে জুতোটা খুলে ঢুকতে।
   জেসাস সিনহা ভেতরে প্রবেশ করে সামনের ড্রইংরুমের সোফায় এসে বসল। ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে সে একবার চোরাচোখে মহিলার আপাদমস্তক পরখ করে নিল এবং মনের মধ্যে কোনো সন্দেহ‌‌ই রাখল না যে, সে এই ফ্ল্যাটের নিছক পরিচারিকা ছাড়া আর কেউ নন। বেশ সাজানো গোছানো ড্রয়িংরুম। ভেতরের ইন্টেরিওর ডেকোরেশন দেখলে ভদ্রলোকের বিশেষ সাংস্কৃতিক রুচিবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। এই ড্রইংরুমের স্কোয়ার ফিট আন্দাজ করলে বেশ বড় ফ্ল্যাট বলেই বোধ হয়।  প্রায় দুশো থেকে আড়াইশো স্কোয়ার ফিট তো হবেই। সোফার ডান দিকের চওড়া দেওয়ালটায় মেহগনি কাঠের বুকসেলফ— নয় নতুন, নতুবা নতুন করে পালিশ করা হয়েছে। একেবারে আধুনিক ডিজাইনের। বিটের সাপোর্টের উপর স্বচ্ছ কাচের পাল্লা। তাইতে ভেতরের বইগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। এক ঝলকে বইগুলোর পুটের প্রিন্ট-টাইটেল দেখে মনে হয় বেশিরভাগই বিদেশি বইপত্র। সম্ভবত হিস্ট্রি সোসিওলজি ও অ্যানথ্রোপলজি সংক্রান্ত। আবার বেশকিছু বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের বই ও গবেষণা গ্রন্থ বলে মনে হল। কিন্তু ঘরের বাকি আসবাবগুলোর প্রায় প্রতিটি অ্যান্টিক কালেকশন এমনকী নিজে যে-সোফায় বসে আছে সেটাও। দেওয়ালে সেট করা বিভিন্ন দেশের প্রাণী ও মানুষের মুখোশ। এর মধ্যে পুরুলিয়া অঞ্চলের শিল্পীদের তৈরি মুখোশ তো আছেই। শোকেসগুলোর ওপর বেশকিছু ব্রোঞ্জ, কষ্টিপাথর ও মাটির মূর্তির মডেল। এমনকী রুমের এক কোণে থাকা কাঠের ওয়াচ-স্ট্যান্ডটাও অ্যান্টিক কালেকশন। সাবেকি দম-দেওয়া ঘড়ি। এটা দেখে জেসাসের হঠাৎ মনে হলো দিন ছয়-সাতেক ছোটো এক ঘটনার কথা। গড়িয়াহাটে এক ঘড়ির শোরুমে ঢুকেছিল নিজের প্রয়োজনে। সেখানেও ঠিক এইরকম একটা অ্যান্টিক মডেল বিক্রির জন্য রাখা ছিল খুব লোভ হয়েছিল এটা দেখে তার। কিন্তু ওই মধ্যবিত্ত… সাধ আছে সাধ্য নেই!

আরও পড়ুন: জনঅরণ্যে সম্প্রীতির বার্তা

সারাটা ঘর ধবধবে সাদা রঙের দামি কোম্পানির পেইন্ট দিয়ে ম্যাট ফিনিস করা। জেসাস তন্ময় হয়ে দেখতে দেখতে আবারও ডান দিকের বুকসেলফের ভেতরের বইগুলোকে দেখতে থাকে…
   ‘নমস্কার’, হঠাৎ জলদগম্ভীর শব্দে জেসাসের বিহ্বলতা ভাঙে। মুখ ফিরিয়ে দেখে প্রায় ছয় ফুটের উপর লম্বা গৌরবর্ণের এক ভদ্রলোক। নাকের নিচে পুরু পাকানো কাঁচা-পাকা গোঁফ। পরনে সাদা পাঞ্জাবি।
   ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বর শোনামাত্রই জেসাস উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার জানিয়ে বলেন, ‘আমি জেসাস, জেসাস সিনহা। তারকনাথ মজুমদারের কাছ থেকে আসছি। আপনার সঙ্গে ফোনেও আমার কথা হয়েছিল।’
   ভদ্রলোকও প্রতি নমস্কার জানিয়ে বলেন, ‘আমি ডক্টর অরুণাভ মুখার্জি আপনিই…’
   ‘হ্যাঁ’, বলে জেসাস তার প্যান্টের পেছনের পকেটের পার্স থেকে আইডেন্টি কার্ড বার করে ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে দেয়।
   ডক্টর মুখার্জি সেটি ভালো করে নিরীক্ষা করে তারপর বলেন, ‘আমি আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম, তা আসুন আমার ভেতরের ঘরে, ওখানেই কথাবার্তা হবে।’
   ভেতরের যে-ঘরে জেসাস গিয়ে বসল সেটাও বিশালঘর। যদিও ড্রইংরুম থেকে সামান্য ছোটো হবে হয়তো। পুরোটাই লাইব্রেরি। বইপত্র জার্নাল-ম্যাগাজিনে ঠাসা বুকসেলফ। প্রায় অন্ধকার ঘর। ডক্টর মুখার্জি টেবিলল্যাম্প জ্বেলে নিজের কাজের গুরুত্বপূর্ণ কিছু নথি দেখছিলেন। পুরো এক্সিকিউটিভ টেবিল জুড়ে বেশ কিছু পুরনো নথি ও কাগজপত্র ছড়ানো। নিজের চেয়ারে বসতে বসতে ডক্টর মুখার্জি তার উল্টোদিকের চেয়ারে বসার অনুরোধ করলেন, আর বসা মাত্রই কোনোরকম জিজ্ঞেস না-করেই সরাসরি বললেন— প্রথমে আমাদের একপ্রস্থ চা হয়ে যাক কী বলো… বলা মাত্রই ঘর থেকে চিৎকার করে সারোদা নামে এক মহিলাকে চায়ের লিকার নিয়ে আসতে বললেন। এরপর শুরু করলেন কথাবার্তা।
প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন মিস্টার তারকনাথ মজুমদার কি আপনার বস?
   ‘না’।
   ‘তাহলে?’
   ‘আমি ওনার আপন এবং একমাত্র শ্যালক।’
   ‘জেসাস’— তা আপনার নামটি বেশ আনকমন আর চমৎকার। কেন এমন নামকরণ?
   জেসাস মৃদু হেসে বলে, ‘২৫ ডিসেম্বর জন্ম বলে।’
   ‘তা এই লাইনে আপনার এক্সপেরিয়েন্স?’
‘তা বলতে পারেন এইচএস-এর পর থেকেই জামাইবাবুর কাজে মাঝেমধ্যেই এসিস্ট করতাম। তবে নিজের কোম্পানি করেছি এই মাত্র বছর তিনেক হল।
   ‘এখন আপনার বয়স?’
   ‘তা এই বছর আঠাশ-ঊনত্রিশ হবে-টবে।’
   ‘খুব ইয়ং। তা আপনাকে যে কাজের দায়িত্ব দেব সলভ করতে পারবেন তো?’
   ‘আমার প্রফেশনের সব ক্লায়েন্টদেরকেই বলি আই’ল ট্রাই মাই বেস্ট। কিন্তু সেটা নির্ভর করে কেসটা টেক ওভার করব কি করব-না তার ওপর। এনিওয়ে আপনার ম্যাটারটা আগে শুনি।’

আরও পড়ুন: প্রসঙ্গ আল-আকসা: বিশ্বজুড়ে ছি-ছিক্কার আর অভিশাপ কুড়াচ্ছে ইসরাইল

ডক্টর মুখার্জির মুখে পুরো ঘটনাটা শুনে জেসাসের মনে হল ঘরটা আরও নিস্তব্ধ হয়ে এলো। ইতিমধ্যেই সারদা নামে যে মহিলাটি ট্রেতে করে দু’টো বড় পোরসিলিনের মগে লিকার চা আর বিস্কুট নিয়ে এলেন জেসাস দেখল সেই মহিলাটি যিনি তাকে এই কিছুক্ষণ আগেই এই ফ্ল্যাটের সদর দরজা খুলে দিয়েছিলেন। সারদা ট্রে-টা রেখে সঙ্গে-সঙ্গে চলে যাওয়াতে ঘরটা আবার আগের মতোই নিস্তব্ধতায় ভরে গেল।
   চায়ের প্রথম সিপ নিয়ে জেসাস প্রশ্ন করল, ‘পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন?’
   ‘এফআইআর করেছিলাম।’
   ‘কবে?’
   ‘প্রায় মাস দেড়েক হল।’
   ‘কপিটা দেখতে পারি।’
   ‘ওঃ সিওর। ফাইলটা সামনেই আছে।’— কাপের গরম চায়ে এক চুমুক দিয়ে ভদ্রলোক একটা ট্রান্সপারেন্ট ফোল্ডার থেকে কপিটা বের করে নিয়ে জেসাসকে দেখালেন।
   কপির লেটারটা ভালো করে পড়তে পড়তে জেসাস দেখল কোনো এক আননোন ব্যক্তির নামে এফআইআর করা হয়েছে, ‘ফলোআপ করেছিলেন?’
   ‘তিন-তিনবার। এই গত সপ্তাহেই শেষ একবার গিয়েছিলাম।’ তারপর মগের চায়ে আর একবার সিপ নিয়ে এক্সিকিউটিভ চেয়ারটায় হেলান দিয়ে প্রৌঢ় এক গভীর নিশ্বাস ফেললেন।
   সুতরাং জেসাসের আর নতুন করে কোয়্যারির প্রয়োজন পরল না। বুঝেই গেল এফআইআর হয়েছে ঠিকই। কিন্তু আননোন ব্যক্তি আর বিষয়টা গুরুত্বহীন মনে করে কেসটায় থানা আর কোনো ফলোআপে যায়নি। কপিটা আবার সে ভালো করে চোখ বুলিয়ে দেখল পিএস: দেশপ্রিয় পার্ক। তারপর বলল, ‘এর একটা ফোটোকপি আমার লাগবে।’
   ডক্টর মুখার্জি অরিজিনালটা নিয়ে ওইটা ট্রান্সপারেন্ট ফোল্ডারে রেখে ওখান থেকেই ওর একটা ফোটোকপি জেসাসকে দিলেন।
   ‘ঠিক কবে মিসিং হয়েছে বলে মনে হয়? আসলে কপিটায় ঠিক সেরকম কোনো উল্লেখ নেই।’
   ‘সেটা জানলে পরে তো এফআইআরের কপিতেই তো লিখে দিতাম গত। ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় কাজ করতে গিয়ে দেখি শেলফের যে-জায়গায় থাকার কথা সেখানে নেই। তার ঠিক এক সপ্তাহ পরেই থানায় যাই…’
   ‘দেখছি তো ঘরজুড়ে আপনার ভাস্ট কালেকশন! আপনার কোনো ভুলে এসবের মধ্যে ঢুকেও তো থাকতে পারে…’
   ‘আপনার কি মনে হয় আমি খুঁজিনি? আর তাছাড়া ইম্পরট্যান্ট ম্যাটারগুলো আমার এই বসার পেছনের ওয়ালে বুকসেলফেই থাকে। আপনি নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন ওই সেলফগুলোর কোনো গ্লাস-সাটার নেই সবটাই উডেন। চাবি আমার স্ত্রী বা আমার নিজের কাছেই থাকে।’
   জেসাস দেখল ওই সেলফের উডেন ডোরগুলো নতুন, নয়তো নতুন করে গালা পালিশ করা হয়েছে ড্রইংরুমের ওই বুকশেলফের মতোই। হয়তো সবগুলোই একসঙ্গে পালিশ করা হয়েছে বা নতুন করে বানানো হয়েছে… ‘লাস্ট কবে দেখেছিলেন?’
   ‘এফআইআরের দিন কুড়ি আগেই। এই যে আমার চেয়ারের পেছনের দেওয়ালটার বুকসেলফ। ওখান থেকে পেড়ে কাজ করে আবার ওখানেই রেখে দিয়েছিলাম।’
   ‘তারপর?’
   ‘এরপর আমি দিন দশেকের জন্য আউটস্টেশন ছিলাম।’
   ‘কোথায় গিয়েছিলেন?’
   ‘ছেলের কাছে আমেরিকায়। সে সেখানে অধ্যাপনা করে। প্রায় মাস সাত হল জয়েন করেছে।
   ‘একমাত্র সন্তান?’
   ‘হ্যাঁ আমাদের ওই একটি মাত্র সন্তান।’
   ‘বাড়িতে আর কে কে থাকেন?’
   ‘আমার মিসেস আর আমাদের সর্বক্ষণের সাহায্যের সঙ্গী সারদা সে আমাদের এখানেই থাকে। মাঝেমধ্যে দেশে যায়। ওর বাড়ি কাকদ্বীপ।’
   ‘আপনার বাড়ির পরিচারিকা বা অন্য কোনো পরিচিতজনকে সাসপেক্ট করেন এ ব্যাপারে?’
   ‘দেখুন এ তো আর সোনাদানা নয় যে সারদাকে সন্দেহ করব। এক হতে পারে আমার আত্মীয় অথবা জানাশোনা ফ্রেন্ডশিপ বা স্টুডেন্ট সার্কেল। কিন্তু কাকেই-বা সন্দেহ করব। সবাই আমার কমবেশি কাছের মানুষ…’
   কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে জেসাস বলল, ‘হুম্… একটু দেরিই করে ফেলেছেন।’
   ‘সরি মিস্টার সিনহা। এছাড়া আমার কি-বা করার ছিল। আমি তো লোকাল থানার ওপর ভরসা করেছিলাম। বাই দ্য ওয়ে, লিভ ইট। আপনার রেমুনারেশনটা…’
   ‘ডক্টর মুখার্জি— বলে জেসাস কয়েক মুহূর্ত চুপ করে যায়, তারপর বলে আমাকে ৭২ ঘণ্টা সময় দিন। ফোনে আপনাকে ফাইনাল জানিয়ে দেব। আর একটা কথা কি জানেন তো আমাদের মতো প্রাইভেট ডিটেকটিভদের শেষপর্যন্ত ওই থানার পুলিশদের ওপরই নির্ভর করতে হয়।’
   ‘তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু আপনি ইয়ংম্যান, আপনার সঙ্গে কথা বলে আমার আপনাকে ভেরি ইম্প্রেসিভ আর কনফিডেন্ট বলেই মনে হয়েছে। পারলে আপনিই পারবেন। পুলিশের ওপর আমার কোনো ভরসা নেই।
   ‘ঠিক আছে… তাহলেও আর একটু ভেবে দেখি…’
   ‘ভেবে দেখা-টেখা নয় ইয়াংম্যান। চ্যালেঞ্জটা নিন, সাকসেসফুল হলে টোটাল কন্ট্রাক্ট-এর বাইরে এক্সট্রা আরো এক লাখ বোনাস। শুধু বলুন এখন কত অ্যাডভান্স করতে হবে আমায়’— বলেই ড. মুখার্জি টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা চেক বই বার করে সামনে রাখলেন…
   এই বয়স্ক মানুষটির নাছোড়বান্দা অনুরোধে জেসাস কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। শুধু বলে তার আগে আপনার লাইব্রেরির পুরোটা একবার দেখতে চাই…

পরবর্তী পর্ব আগামীকাল…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *