বধির দিবসে হই অঙ্গীকারবদ্ধ, শব্দদূষণকে করি জব্দ

ডা. শ্রীমন্তী বাগ
(কান-নাক-গলা বিভাগ, কেপিসি মেডিক্যাল কলেজ, যাদবপুর, কলকাতা)

‘শব্দকল্পদ্রুম!’— সুকুমার রায়ের এই উপহাসসূচক কবিতার মধ্যে সুপ্ত আছে এক আমোঘ সত্য— শব্দের শক্তির সত্য। আজকের এই রচনা সেই শব্দতরঙ্গের শক্তির কিছু অপব্যবহার, অপকারিতা আর তার সহজ প্রতিরোধ পন্থা নিয়ে।

শব্দদূষণ এমনই এক নিঃশব্দ আততায়ী, যা কিন্তু আমাদের দৈনিক জীবনের ছায়াসঙ্গী। তবুও তাকে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষা করে চলি। কারণ আমাদের ধারণা, শব্দদৈত্যের বাণে বলি হলে হবে আমাদের কান, হবে না এমন কোনও অঙ্গহানি, যাতে বিঘ্নিত হতে পারে প্রাণ। 

এখানেই আপনাদের ভুলটিকে সংশোধন করে রাখা ভালো মনে করি। শব্দদূষণ শুধু কানের ক্ষতিই করে তা নয়, এর একটানা প্রকোপে শরীরে আসতে পারে ধকল, মনঃসংযোগের অভাব, স্মৃতিভ্রংশতা, মানসিক অবসাদ। এমনকী, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদযন্ত্রের বা স্নায়ুতন্ত্রের গোলযোগের কারণে হওয়া অসুখগুলিও হানিকারক শব্দের একটানা তাণ্ডবে দেহের গভীরে বাসা বাঁধতে পারে।

কিন্তু শব্দদূষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব অবশ্যই আমাদের শ্রবণশক্তি কমিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে তাকে বধিরতার পথে ঠেলে দেওয়া, যাকে ডাক্তারি পরিভাষায় আমরা বলি, ‘NOISE INDUCED HEARING LOSS’ (NIHL)। আজ বিশ্ব বধির দিবসে আমরা এই বিশেষ ধরনের বধিরতার দিকে দৃকপাত করব।

আরও পড়ুন: করোনা আবহে জার্মানিতে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ‘কুরকুমা টে’

শব্দদূষণজনিত বধিরতা বলতে আমাদের আগেই মনে পড়ে কারখানার শ্রমিকদের কথা, যাঁদের দিনের অধিকাংশ সময়ই তীব্র শব্দের আর্তনাদের শিকার হতে হয়। কিন্তু আপনারা জানলে আঁতকে উঠবেন যে, শুধু কারখানা বা শিল্পাঞ্চলের কর্মচারীরাই নয়, আমার-আপনার সহ প্রত্যেকের কানই বিপন্ন হতে পারে এই শব্দাসুরে। যাঁদের বাড়ি বা কর্মক্ষেত্র একদম বড় রাস্তার ধারে, তাঁরা সমস্যায় পড়তে পারেন। অথবা, সেলস-মার্কেটিং জাতীয় পেশায় যুক্ত মানুষের কানে প্রতিদিনের জীবনযাত্রার যানচলাচলের উচ্চ তীব্রতর শব্দ পৌঁছিয়ে বিপত্তি তৈরি করতে পারে। এমনকী আমি-আপনি সারাদিন কানে হেডফোন লাগিয়ে রেডিয়ো বা মোবাইলে নিমজ্জিত হয়ে থাকলে কারোরই কিন্তু রেহাই নেই এই শব্দজনিত বধিরতার হাত থেকে। কাঠুরের করাত যেমন হানিকর, স্যালনের যে কর্মচারীরা চুলের শোভাবর্ধনের জন্য দিনভর ড্রায়ার নামক বৈদ্যুতিন যন্ত্র ব্যবহার করেন, তাও শব্দদূষণ সৃষ্টি করতে পারে। এভাবে নিজেদের অজান্তেই আমরা ক্রমশ শব্দদূষণের নিঃশব্দ গ্রাসে আত্মসমর্পণ করে চলেছি।

কোন শব্দ কতটা হানিকারক হবে, তা মূলত নির্ভর করে তার তীব্রতা (Intensity) আর কতক্ষণ তা একটানা কানের সংস্পর্শে আছে (time of exposure), এর ওপর। বিচ্ছিন্ন ধ্বনির থেকে একনাগাড়ে বেজে চলা আওয়াজ অনেক বেশি ক্ষতিসাধন করতে পারে। আর সর্বোপরি যেভাবে রোগ প্রতিরোধে শরীরের ইমিউনিটি নামক ক্ষমতাটি কখনও কখনও প্রধান বিচারকের আসনও গ্ৰহণ করে, তেমন এক্ষেত্রে কানের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা বিভিন্ন ব্যক্তির বিভিন্ন রকম হয়, তাই শব্দবধিরতার পরিমাপ এক এক ব্যক্তির এক এক রকম।

কী মশাইরা? এতদূর পড়েই ভাবছেন নাকি— সামনে পুজো আসছে, তারপর দীপাবলি, মাইকে গান বাজবে, পুজোর সানাই, কাঁসর-ঘণ্টা, শাঁখের ধ্বনি— কান কি তবে নিস্তেজ হয়ে পড়বে? পাঁচদিনের বাঙালির এই মহানন্দোৎসব কি অপূর্ণ থেকে যাবে? তাহলে আপনার আশঙ্কা নির্মূল করার মতো কিছু তথ্য দিই—

আমাদের কানের সবচেয়ে আভ্যন্তরীন অংশ যেটিকে ‘Inner ear’ বলে, তার মধ্যে দু-ধরনের কোষ থাকে— ‘Inner hair cells’ আর ‘Outer hair cells’. শব্দদূষণ সর্বপ্রথম ‘Outer hair cells’-কে জখম করে কিন্তু তীব্রতা আর সময় এই দুই যদি একটি নির্ধারিত চরম সীমা অতিক্রম না করে, তাহলে এই বাহিরের hair কোষগুলি পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসার ক্ষমতা রাখে। তখন আমরা তাকে আখ্যা দিই—’Temporary Threshold shift (TTS)’. আর বিপজ্জনক সময়সীমা বা তীব্রতা পার হয়ে গেলে, কোষগুলি চিরতরে অকর্মণ্য হয়ে পড়ে, তাকে বলা হয়— ‘Permanent Threshold Shift (PTS)’. ফলে আমাদের কান যতক্ষণ TTS-এর লক্ষ্মণরেখার মধ্যে আছে, ততক্ষণ সে সুরক্ষিত। ‘National Institute for Occupational Safety and Health (NIOSH)’-এর নিয়মাবলি অনুসারে শব্দের তীব্রতা আর সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে একটি টেবিল করা আছে, যেটি নিম্নে উল্লেখ করলাম।  

শব্দদূষণের কবল থেকে যদি বাঁচতে চান, তবে এই টেবিলটি মেনে চলতে হবে, ওই নির্দিষ্ট তীব্রতায় যাতে ওই নির্দিষ্ট সময়সীমা পার না হয়। কিন্তু আপনি সেটি বুঝবেন কী করে?

হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষেত্রে যেমন ‘Electrocardiogram’ (ECG) হয়, তেমন বহুকাল ধরে প্রচলিত কানেরও শ্রবণক্ষমতা বিচার করার নকশা আছে, যাকে আমরা বলি ‘Puretone Audiogram’ (PTA)। তাতে আমাদের কোন কান কতটা শ্রবণশক্তি হারাল এবং তা কী ধরনের, সহজেই নির্ণয় করা যায়। NIHL-গ্ৰস্থ কানের PTA কেমন হয়, তার চিত্র দেওয়া থাকল—

ছবিটি শ্রীঅনির্বাণ বিশ্বাস লিখিত “CLINICAL AUDIO— VESTIBULOMETRY for Otologists and Neurologists, 5th Edition” থেকে সংগৃহীত।

কারখানার শ্রমিকদের সাধারণত এই সহজলভ্য আর সাশ্রয়কর পরীক্ষাটি প্রতি বছর করানো হয়। আপনারাও রুটিনমাফিক একটি PTA Test করিয়ে রাখতেই পারেন ক্রমান্বয়ে কানের শ্রবণ ক্ষমতা কতটা দুর্বল হয়ে আসছে, সেটি বোঝার জন্য।

কিন্তু শব্দদূষণ পূর্বে উল্লেখিত সুরক্ষার গণ্ডি অতিক্রম করে গিয়েছে কিনা, সেটি তৎক্ষণাৎ বুঝে উঠতে, চাই এক উদ্ভাবনামূলক যন্ত্রের প্রয়োগ— আপনার কানের বিপদ অবসম্ভাবী, সেটি ওই যন্ত্রই শনাক্ত করে নেবে আর সঙ্গে সঙ্গে বাজিয়ে দেবে অ্যালার্মের ঘণ্টি।

কী মনে হচ্ছে? পুরো ব্যাপারটা রহস্যময় লাগছে? তাহলে খোলসা করে বলি, এটি একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র, যাকে আমরা পোশাকি নাম দিয়েছি— ‘Hear -o – scope’। এটি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে। আমি নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ, ডা. শ্রীমন্তী বাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক্স বিভাগের দু’জন স্বনামধন্য ইঞ্জিনিয়র ড. প্রলয় শর্মা, শ্রীনীলাভ দেবাভুতি এবং অবসরপ্রাপ্ত ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়র শ্রীআশীস কুমার দাস এনাদের সহযোগিতায় ও যুগ্ম-উদ্যোগে এই যন্ত্রটিকে রূপদান করেছি।

শব্দদূষণের থেকে আপনাকে সতর্ক ও সচেতন করতে এর জুড়ি মেলা ভার। এর মধ্যে এমন একটি electronic circuit আছে, যেটি শব্দের তীব্রতাকে সর্বক্ষণ পরিমাপ করে যায় (decibel-এ), আর সেই তীব্রতা কতক্ষণ অবধি টানা স্থায়ী হল, সেটিও একসাথে নির্ণয় করে দেয়। যদি NIOSH নির্ধারিত সেই তীব্রতার নিরিখে সময়সীমা অতিক্রম করে যায়, এটির মধ্যে প্রতিস্থাপিত অ্যালার্ম যন্ত্র ধ্বনিত হতে থাকে, সঙ্গে জ্বলে ওঠে বেশ কয়েকটি LED আলো। এই যন্ত্রটির বিশেষত্ব হল, এটি এত ছোট আকার আর ওজনেও হালকা যে, আপনি সহজেই নিজের পকেটে নিয়ে যেতে পারেন, bluetooth headphone-এর মতো কানে লাগিয়ে নিতে পারেন, এর ডিজাইনের স্বতন্ত্রতা এমনই যে এটি গাড়ি বা মোটরবাইকের ড্যাশবোর্ডে প্রতিস্থাপন করা যায়। দেওয়াল ঘড়ির আকারেও করা যায় আবার smart watch-এর সঙ্গে সংযুক্ত করে দেওয়া যায়। এর সবচেয়ে ব্যবহারিক উপযোগিতা হল এটি একটি বিশেষ app দ্বারা মোবাইল ফোনের বা ট্যাবলেটের সঙ্গে বা software-এর দ্বারা কম্পিউটার বা ল্যাপটপে সংযুক্ত করে তাতে সর্তকতা কল বা মেসেজ উৎপাদন করা যায়। আপনার কান সারাদিনে কতক্ষণ কত তীব্রতার আওয়াজের সংস্পর্শে এসেছে, সেটির চলমান গ্রাফও দৃশ্যমান হবে, যতক্ষণ যন্ত্রটি সক্রিয় থাকবে।

এবার আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন, “সর্তক তো হলাম, কিন্তু শব্দদূষণের হাত থেকে রক্ষা পাব কী করে?” তার জন্য ব্যবহার করুন, সহজরূপে বাজারে সুলভ মূল্যে প্রাপ্ত কিছু কর্ণরক্ষক, যেগুলি ‘ear plug’ বা ‘ear muff’ নামে পরিচিত। এই জিনিসগুলি কানে শব্দ প্রবেশের পথে দ্বাররক্ষক হয়ে পথ আগলে দাঁড়ায়। যেই মুহূর্তে Hear – o- scope যন্ত্রটি তার সর্তকবাণী শোনাবে, সেই মুহূর্তে ear plug বা ear muff কানে পরে নিন আর শব্দদূষণকে করুন জব্দ।

নিচে দেওয়া থাকল ‘Hear – o – scope’-এর পরিকাঠামোর ছবি।

আরও পড়ুন: অক্সিজেন সংবেদন

এই রচনার সমাপন করব একটি সুন্দর কাহিনি দিয়ে। দু’টি কান ছিল। একটি কান Hear – o- scope-কে সর্বদা নিত্যসঙ্গী বানিয়ে শব্দদূষণের অমোঘ বাণের বিরুদ্ধে নিজের ঢাল তৈরি করে নিয়েছিল। তাই আজ সে জয়ী, শব্দদূষণকে করেছে পরাজিত, আসছে পুজোয় সে মন খুলে, প্রাণভরে উপভোগ করবে। আর একটি কান ছিল অবাধ্য। শব্দদূষণকে করল অগ্রাহ্য। দিনের পর দিন টানা ক্ষতিকারক শব্দে পর্যুদস্ত হতে হতে আজ সে এতই ক্লান্ত যে, কানে শোনার যন্ত্র বা hearing – aid-এর সাহায্য ছাড়া সে পঙ্গু। আজ এই বধির দিবসে আপনিই মনস্থির করে নিন, আপনার কানের নাম আপনি এর মধ্যে কোন দলে লেখাতে চান?

পুনশ্চঃ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

ক) প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রবিবার আন্তর্জাতিক বধির দিবস (International Deaf Day) হিসেবে পালিত হয়।

খ) এই বছরে ২০ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এই সপ্তাহটি আন্তর্জাতিক বধির সপ্তাহ (International week of the Deaf People) হিসেবে পালিত হচ্ছে।

গ) এই বছরের (২০২১) আন্তর্জাতিক বধির সপ্তাহের বিষয়বস্তু (Theme) হল, ‘সমৃদ্ধ বধির সম্প্রদায় উদ্‌যাপন’ (Celebrating thriving deaf communities)।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *