এক বাঙালি ফুটবলপ্রেমীর শহিদের মৃত্যু: চল্লিশ বছর পরে কিছু কথা

শুভ্রাংশু রায়

ঘটনাটির কথা প্রথম শুনেছিলাম খুব সম্ভবত দুই দশক আগে। ক্রীড়া সাংবাদিক জয়ন্ত চক্রবর্তীর মুখে। জয়ন্তদা এবং আরও কয়েকজন চা-বিস্কুট সহযোগে ময়দানের নানা ঘটনার স্মৃতিচারণ করছিলেন। ক্রীড়া সাংবাদিকদের ক্লাবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আমি সেদিন নিছকই ছিলাম শ্রোতা। নানা প্রসঙ্গ ঘুরে সেদিন ১৬ আগস্টের কথা ওঠা মাত্র জয়ন্তদা বলে উঠলেন, “১৬ আগস্টের কথা সকলের জানা। কিন্তু আরেকটি মৃত্যুর ঘটনা অনেকে ভুলে গেছেন। সেটি পরের বছর বড় ম্যাচের সময় মাঠেই ঘটেছিল। নরেন দে নামে এক মোহনবাগান সমর্থক মাঠেই হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন।” ঘটনা এবং মৃত ব্যক্তির নাম মনে রয়ে গিয়েছিল। কারণ অবশ্যই ঘটনাটি ঘটেছিল মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচে এবং মৃত ব্যক্তির সঙ্গে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এক ক্যাবিনেট মন্ত্রীর নাম সাযুজ্যের কারণে। অনেক পরে প্রায় বছর দশেক পরে ডার্বি ম্যাচ বা বড় ম্যাচ নিয়ে লিখতে গিয়ে ঘটনাটির উল্লেখ আবার পাই। লিখেছিলাম কোনও একটি লিটল ম্যাগে। আজ দুপুরে সোনারপুর নিবাসী বিশিষ্ট সংগীত শিক্ষক সুরকার এবং ক্রীড়া লিখিয়ে সৌম্যকান্তি দে-র ফেসবুক পোস্ট দেখে চমকে উঠলাম। সেদিনের বড় ম্যাচের গ্যালারির মৃত সেই ফুটবলপ্রেমী এবং অবশ্যই মোহনবাগান সমর্থক নরেন দে সৌম্যকান্তিবাবুর দাদু। বাড়ির মানুষ। রক্তের সম্পর্ক। লেখাটি পড়তে লাগলাম। আর একে একে অনেক স্মৃতি মনে পড়তে লাগল। দুপুরে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ফোন লাগিয়ে ফেললাম সৌম্যকান্তিবাবুকে। কথা দিলাম পুরনো লেখাটি খুঁজে বার করে আবার লিখব বা কোথাও পোস্ট করব। বাড়ি ফিরে লেখাটি খুঁজেই পেলাম না। তাই কিছুটা স্মৃতি আর কিছুটা সৌম্যকান্তিবাবুর সঙ্গে কথার সূত্র ধরে একটা কিছু দাঁড় করানোর চেষ্টায় রত হলাম।

আরও পড়ুন: ১৯৬২-র ৪ সেপ্টেম্বর: এশিয়ান গেমস ফুটবলে সোনা জয়ের রূপকথা পা দিল হীরক জয়ন্তীতে

১৯৮১-র শিল্ড ফাইনাল ছিল শহরে ১৯৮০-র ১৬ আগস্টের পরে দ্বিতীয় বড় ম্যাচ। সেদিন ছিল ২৬ সেপ্টেম্বর, শনিবার। পরেরদিন ছিল মহালয়া। পুজোর আমেজকে সঙ্গে নিয়েই মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব মুখোমুখি হয়েছিল ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের। সেবার লিগের খেলায় মোহনবাগান ১-০ গোলে ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়ে দিয়েছিল। যদিও লিগের খেতাব মোহনবাগানের পক্ষে জেতা সম্ভব হয়নি। জিতেছিল মহামেডান স্পোর্টিং। সে অন্য প্রসঙ্গ। আইএফএ শিল্ডের ফাইনালে মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচটি হয়েছিল ইস্টবেঙ্গল এরিয়ান্স মাঠে। মোহনবাগান সদস্যের জন্য নির্দিষ্ট হয়েছিল এরিয়ান্স গ্যালারি। সদ্য ১৬ আগস্টের স্মৃতি টাটকা থাকায় কলকাতা পুলিশের তরফে দর্শকদের নিরাপত্তা এবং মাঠে শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছিল। তাই সে বছর থেকেই মোহন-ইস্ট ম্যাচে দুই দলের সমর্থকদের জন্য পৃথক গ্যালারির ব্যবস্থা করা শুরু হয়ে গিয়েছিল।

আমাদের আলোচনা যে মানুষটিকে কেন্দ্র করে, তিনি সেই এরিয়ান্স গ্যালারিতেই বসেছিলেন। সোনারপুর কামরাবাদ অঞ্চলের বাসিন্দা নরেন্দ্রনাথ দে ওরফে নরেন দে অবশ্য সেদিন একা মাঠে যাননি। সঙ্গে ছিলেন তাঁর মেজো পুত্র সৌমিত্র দে-ও। বাবা নরেন্দ্র ছিলেন গ্যালারির কিছুটা তলার অংশে। আর পুত্র সৌমিত্র ছিলেন ওপরের অংশে। সেদিন ম্যাচের আরেক বিশেষ দিক প্রদীপ চৌধুরি বা ‘গ্যালারির জেঠু’র সেটাই ছিল শেষ কলকাতা ডার্বি। খেলা শুরু হতেই ইস্টবেঙ্গলকে চেপে ধরে মোহনবাগান। প্রথমার্ধে অরূপ দাসের গোলে এগিয়ে রইল মোহনবাগান। হাফ টাইমে পিতা নরেন্দ্রর হাতে লজেন্স তুলে দিয়ে পুত্র সৌমিত্র বললেন, ‘বাবু তুমি এটা খাও।’ পিতা নরেন দে-র পাশে বসে খেলা দেখছেন তাঁর ডাক্তার বন্ধু। পুত্র সৌমিত্র দ্বিতীয়ার্ধে খেলা শুরুর মুখে আবার গ্যালারির ওপরে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে বাবাকে সৌমিত্র জানিয়ে গেলেন, পাড়ার পুজো কমিটির সেক্রেটারি হিসেবে খেলার শেষে ডেকরেটারের সঙ্গে সবকিছু ফাইনাল করতে যাবেন। পিতা নরেন্দ্র যেন নিজের মতো বাড়ি ফিরে যান।

আরও পড়ুন: মান্নাদা ৯৭: এক ফুটবল আত্মার জন্মদিনে কিছু স্মৃতিচারণ

দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরুর কিছুক্ষণ পরে সুরজিৎ সেনগুপ্তের করা গোল দুর্বোধ্য কারণে মহারাষ্ট্রের রেফারি এস এস শেঠি বাতিল করে দিলেন। প্রায় চার দশক পরে সেদিনের কথা বলতে বলতে ফোনে সৌম্যকান্তিবাবু বলে উঠলেন, সুরজিতের গোল বাতিল অনেক মোহন সমর্থকের মতো নরেনবাবুকেও বেশ উত্তেজিত করে তুলেছিল। ৭৩ মিনিটে ইস্টবেঙ্গলের গোলশোধ। ৭৫ মিনিটে ইস্টবেঙ্গল স্টাইকার চন্দ্র বাহাদুর থাপা (সি বি থাপা) এগিয়ে দিলেন ইস্টবেঙ্গলকে। মাত্র তিন মিনিটে মধ্য দু’টি গোল হজম। মাঠেই বুকে যন্ত্রণা নিয়ে লুটিয়ে পড়লেন সোনারপুর মন্দিরতলার দে সরকার পরিবারের সন্তান মোহনবাগান সদস্য এবং সফল ব্যবসায়ী নরেন দে। মাত্র কয়েক মিনিট। মাঠেই সব শেষ। তড়িঘড়ি স্টেচারে ইডেন গার্ডেন্সের অস্থায়ী মিনি হসপিটালে নিয়ে গিয়েও বাঁচানো গেল না নরেন্দ্রনাথ ওরফে নরেন দে-কে। পরের বছর থেকে টানা চল্লিশ বছর ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় ছবি দিয়ে নরেনবাবুকে স্মরণ করেন তাঁর পরিবারের মানুষজন। আজকেও তার অন্যথা হয়নি।

চার দশক পরেও সেদিন রাতের কথা বলতে গিয়ে বুক কেঁপে ওঠে সৌম্যকান্তিবাবুর। ”জানেন সেবার শেষ মিনিটে ফ্রান্সিস ডি’সুজার গোলে ম্যাচটি ২-২ হয়। আমরা শিল্ডে যুগ্ম বিজয়ী হই। আমরা মাত্র কয়েক ঘণ্টা সেই জয় উপভোগ করতে পেরেছিলাম। মাত্র কয়েক ঘণ্টা। তখন রাত সাড়ে আটটা বাজে। পাড়ায় নিশুতি লোডশেডিং চলছে। হঠাৎ পাড়ায় পুলিশের জিপ। ক্রমে পাড়ায় জটলা। আমাদের কাছে ক্রমে দুঃসংবাদ পৌঁছে গেল। জানলাম, নরেন দাদু আর নেই। ঠিক তখনি দেখলাম নরেন দে-র পুত্র সৌমিত্র কাকা পাড়ায় ঢুকছে। সে তখনও জানে না তার বাবা আর নেই। সেদিন রাতে গোটা পাড়ায় প্রায় কোনও বাড়িতে উনুন জ্বলেনি। পরের দিন অনেকেই রেডিয়োতে শোনেননি মহালয়া। সে বছর পাড়ায় দুর্গা পুজো হয়েছিল নমোনমো করে। পরের দিন রোববার প্রায় প্রত্যেক খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছিল নরেন দাদুর মৃত্যুর খবর।”

কথা বলেই চলেন সৌম্যকান্তি। ”উমাকান্ত পালধির কথা আজও মনে রেখেছে মোহন জনতা। কিন্তু নরেন দে-র কথা কি পরিবারের বাইরে মানুষজন আজ খেয়াল রেখেছে?” প্রশ্ন তুলে দেন সৌম্যকান্তি। গতবছর ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁর মা গত হয়েছিলেন। রাত পোহালেই এক বছর পূর্তি হবে তাঁর মাতৃ বিয়োগের। ভারক্রান্ত হয়ে ওঠে মন। সকালেই এই ঘটনাটি ফেসবুকে পোস্ট করেছেন সৌম্যকান্তি। পোস্টের শেষের দিকে তাঁর লেখা কয়েকটি লাইনে চোখ আটকে যায়।

”শ্রী হোক বা এটিকে বা পারিখ। কর্পোরেট ফুটবল সংস্থা কখনোই বটতলা, গড়ের মাঠ, মাউন্টেন পুলিশ, সর্পিল গতির বড় ম‍্যাচের লাইন আর উমাকান্ত পালোধি বা নরেন দে-দের মতো সমর্থকদের স্মৃতি আর আবেগকে ভুলিয়ে দিতে পারবে না।”

কলকাতা ফুটবল, দু’টি বড় ক্লাবের ভবিষ্যৎ কী হবে তার উত্তর আগামীর গর্ভে নিহিত রয়েছে। কিন্তু আমরা যারা কলকাতার ফুটবল ঐতিহ্য নিয়ে এত গর্ব করি, সোশ্যাল মিডিয়ায় এত তুফান তুলি আমরা কতখানি সে ঐতিহ্যকে বহন করতে পারছি? ঐতিহ্য মানে তো শুধু ফুটবল মাঠে জয় পরাজয় নয়। মাঠের বাইরে যে অগণিত মানুষজন নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্মকে ফেলে রেখে প্রিয় দলকে সমর্থন করতে ছুটেছেন বছরের পর বছর দশকের পর দশক। তাঁদের অভিজ্ঞতাকে কতটুকু লিপিবদ্ধ করেছি। নরেন দে-র মতো মানুষ যিনি নিজ ক্লাবের লড়াইকে নিজের জীবনযুদ্ধের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। ফুটবল মাঠ নামক যুদ্ধক্ষেত্রে গোল খাওয়া এবং পরাজয়ের আশঙ্কাকে নিজের হৃদয়ের ধমনী অবধি টেনে এনে জীবনকেই আলবিদা জানিয়েছেন কতটুকু আমরা মনে রেখেছি তাঁকে আমরা। শুনেছি একবার তাঁকে স্মরণ করে কামরাবাদে একটি নকআউট টুর্নামেন্ট হয়েছিল। কালের নিয়মে সেটির পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটেছে দ্রুত। ক্যানভ্যাসটা আরও বড় করুন, দেখবেন ফুটবল ময়দানে রণক্ষেত্রে ফুটবলপ্রেমী নরেন দে-র মৃত্যু আদতে এক ফুটবল শহিদেরই মৃত্যুবরণ। নাহ মৃত্যু মনে হয় এদের ঠিক ছুঁতে পারে না। এরা চিরকালই রয়ে যান অন্তত কিছু মানুষের মনে।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

4 comments

  • Debashis Majumder

    Ei rokom ekta article er janya lekhok ke onek onek dhanyabad.

  • Debraj Howlader

    আমি এখন সোনার পুরের বাসিন্দা। এই যোগসুত্র খুবই ভালো লাগছে। লেখক এর জন্য শুভেচ্ছা রইল।

  • নরেন দের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
    সমর্থকরাই ক্লাবের সম্পদ।
    অসাধারণ একটি লেখা পড়লাম।
    একেবারেই অজানা ছিল।

  • অনবদ্য লেখা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *